দিল্লির প্রাণভোমরা মেট্রো রেল
১৬ মিলিয়ন মানুষের শহর ভারতের রাজধানী নয়া দিল্লি। জনসংখ্যার বিচারে পৃথিবীর অষ্টম বৃহত্তম মহানগরী। ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম মহানগরাঞ্চল এ দিল্লিতেই রয়েছে এশিয়ার বৃহত্তম আবাসন কলোনি দ্বারকা উপনগর। আর ব্যস্ত নয়া দিল্লির প্রাণ দ্রুতগতির মেট্রো রেল। চারদিকে ছুটছে লাখ লাখ ব্যস্ত মানুষ। অল্প সময়ে কম খরচে পৌঁছে যাচ্ছে শহরের একপ্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। চারদিকে গতি আর প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর পরিবেশ। এক দশক আগেও এমন পরিবেশ ছিল না। সারা দেশ থেকে বিভিন্ন ভাষা ও জাতির মানুষ দিল্লিতে এসে বসবাস শুরু করায় দিল্লি পরিণত হয় বহুজাতিক মহানগরে। সে সঙ্গে ঘটেছে দ্রুত উন্নয়ন ও নগরায়ণ। নব্বইয়ের দশকে জনসংখ্যা ও যান আধিক্যে ন্যুব্জ হয়ে পড়েছিল দিল্লি শহর। প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছিল নগরবাসীর জীবনযাত্রা। বেড়ে গিয়েছিল শব্দ ও বায়ু দূষণ। যানজটে নষ্ট হচ্ছিল মানুষের মূল্যবান কর্মঘণ্টা। কিন্তু মাত্র একদশকের মধ্যেই পাল্টে গেছে দৃশ্যপট। ভারত সরকারের দূরদর্শী সিদ্ধান্তে মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই দিল্লি ফিরে পায় গতি। মেট্রো রেল ফিরিয়ে দিয়েছে নগরবাসীর প্রাণচাঞ্চল্য। যেটুকু পথ ট্যাক্সিতে পাড়ি দিতে খরচ পড়ে ১০০ রুপি সেটা মেট্রো নামিয়ে এনেছে ১০ রুপিতে। যেখানে দিল্লির অটো ও ট্যাক্সিওয়ালারা মিটারে যেতে অনাগ্রহী সেখানে মেট্রোই হয়ে উঠেছে নগরবাসীর প্রধান উপায়। আর পুরো নয়া দিল্লি শহরে জালের মতো ছড়িয়ে আছে এ মেট্রো লাইন। দিল্লিতে বেশিরভাগ লোকই আপনাকে স্বাগত জানাবে মেট্রো রেলে। আপনার জিজ্ঞাসার জবাবে পরামর্শও দেবে মেট্রো জার্নির। রসিকজন মাত্রই বলবেন, যে দিল্লির মেট্রোতে চড়েনি সে তো ‘জরুর পস্তায়ে’।
মেট্রো রেলের মাধ্যমে দিল্লি কেবল যানজটই দূর করেনি, উল্টো প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে পেয়েছে যাতায়াত ব্যবস্থা। শহর পেরিয়ে যার দিল্লি মেট্রো নেটওয়ার্ক সংযুক্ত করেছে পার্শ্ববর্তী গুরগাঁও ও নয়দা অঞ্চলকে। বর্তমানে ৬টি মেট্রো লাইন দিল্লি শহরের যাতায়াত ব্যবস্থাকে করেছে সহজ ও সুলভ। বর্তমানে উড়াল, ভূপৃষ্ঠ ও ভূগর্ভস্থ মিলিয়ে ১৯০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের রেল লাইনের ১৪২টি স্টেশনে বিস্তৃত এ নেটওয়ার্ক। দিল্লি মেট্রোতে ভ্রমণ যেমন সাশ্রয়ী তেমনি নিরাপদও। দ্রুত গতির এ পরিবহনে চলছে ৫-৭টি কোচের সমন্বয়ে ২১০টি ট্রেন। সকাল ৬টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত অনবরত ৩ থেকে ৫ মিনিটের ব্যবধানের প্রতিটি ট্রেন চলাচল করে। আপনি যে কোন মেট্রো স্টেশনে গিয়ে গন্তব্যের দূরত্ব অনুযায়ী টোকেন নিতে পারে। সেটা আর্চওয়ে গেটে স্পর্শ করলেই খুলে যাবে দুয়ার। ভ্রমণের পর কয়েনটি আর্চওয়ে বক্সের মধ্যে ফেললে ফের খুলে যাবে বেরোনোর দরজা। ফাঁকি দেয়ার সুযোগ প্রায় শূন্যের কোটায়। আবার যাত্রীদের টিকিট কাটার তিনটি পদ্ধতি রয়েছে। তাৎক্ষণিক যাত্রার জন্য দূরত্ব অনুযায়ী ওয়ান টাইম টোকেন। যা সর্বনিম্ন ৮ রুপি থেকে সর্বোচ্চ ৩০ রুপি। এছাড়া রয়েছে ৩ দিন থেকে এক মাসের ট্রাভেল কার্ড। যা সর্বনিম্ন ১০০ রুপি থেকে ৮০০ রুপি। প্রতিটি স্টেশন এবং কোচেই সাঁটানো রয়েছে চার্ট ও ম্যাপ। আপনি কোন স্টেশনে যেতে চাইলে কোন ট্রেনে উঠতে হবে। অনাবরত এনাউন্স হচ্ছে হিন্দি ও ইংরেজিতে। প্রতিটি স্টেশনে পৌঁছানোর আগেই কোচে এনাউন্স হচ্ছে স্টেশনের নাম। প্রতিটি ট্রেনের মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত রয়েছে আলাদা কোচ। এছাড়া দিল্লি মেট্রোর নিরাপত্তায় রয়েছে সেন্ট্রাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিকিউরিটি ফোর্স। ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা, প্লাটফর্মে ঢোকার মুহূর্তে আর্চওয়ে। কোন যাত্রীকে লম্বা সময় ধরে অপেক্ষা করতে হয় না প্লাটফর্মে। নেই নির্দিষ্ট ট্রেনে উঠতে না পারার ঝক্কি। ভুল ট্রেনে উঠলেও পরের স্টেশনে নেমে ট্রেন পাল্টানোর সুযোগ আছে। তবে সমস্যার মধ্যে রয়েছে অফিস আওয়ারে টিকিট কাটার দীর্ঘলাইন ও কোচে যাত্রীদের ঠাসাঠাসি। ২০১০ সালের এক জরিপ মতে, ১৪২ স্টেশন থেকে প্রতিদিন মেট্রোতে যাতায়াত করছে ২.০৬ মিলিয়ন যাত্রী। উদ্বোধনের প্রথম ৭ বছরে দিল্লি মেট্রোর সার্ভিস ভোগ করেছে প্রায় ১০০ কোটি যাত্রী। সার্বিকভাবে মেট্রো রেল যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে ভারত সরকার প্রমাণ করেছে একটি জনবহুল ব্যস্ত শহরকে কিভাবে যানজটমুক্ত রাখা যায়। কিভাবে সাশ্রয় করা যায় কোটি মানুষের মূল্যবান কর্মঘণ্টা। কম খরচে এবং দ্রুততম সময়ে নিশ্চিত করা যায় নগরবাসীর যাতায়াত।
জানা যায়, ১৯৮১ থেকে ৯৮ সালে শহরে জনসংখ্যা ও গাড়ির সংখ্যা বাড়ে ব্যাপকহারে। বেড়ে যায় যানবাহনের ভিড়, শব্দ ও বায়ু দূষণ। নষ্ট হয় মানুষের মূল্যবান কর্মঘণ্টা। এমন পরিস্থিতিতে ১৯৮৪ সালে দিল্লি ডেভেলপমেন্ট অথরিটি ও আরবান আর্টস কমিশন দিল্লি শহরের জন্য একটি বহুমুখী পরিবহন ব্যবস্থার প্রস্তাব রাখলে দিল্লি মেট্রোর পরিকল্পনা নেয়া হয়। ১৯৯৫ সালে কেন্দ্রীয় ও দিল্লি সরকার যৌথ উদ্যোগে দিল্লি মেট্রো রেল কর্পোরেশন (ডিএমআরসি) স্থাপন করে ১৯৯৮ সালে নির্মাণকাজ শুরু হয়। ২০০২ সালে দিল্লি মেট্রোর প্রথম অংশ রেড লাইন চালু হয়। এরপর ২০০৪ সালে ইয়েলো, ২০০৫ সালে ব্লু, ২০০৯ সালে ব্লু লাইনের নতুন শাখা, ২০১০ সালে গ্রিন লাইন চালু হয়। প্রকল্পের দ্বিতীয় ভাগে ২০১১ সালে এই লাইনগুলোর সম্প্রসারণ এবং দিল্লি এয়ারপোর্ট মেট্রো এক্সপ্রেস ও ভায়োলেট লাইন চালু হয়। কেন্দ্রীয় ও দিল্লি সরকারের আধাআধি মালিকানার এ প্রকল্প লাভজনক বলে ঘোষণা করেছে ভারত সরকার। এখন চলছে সমপ্রচারণ কাজ। নতুন এ সমপ্রসারণ কাজে প্রতি কিলোমিটারে খরচ ধরা হয়েছে ৩৭.৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। যার ৩০ ভাগ করে কেন্দ্রীয় ও দিল্লি সরকার এবং বাকিটা দীর্ঘমেয়াদি ঋণ হিসেবে জাইকা দেবে। বর্তমানে রেড লাইনে দিলশাদ গার্ডেন থেকে রিতালা পর্যন্ত ২৫.১৫ কিলোমিটারে মধ্যে ২১টি স্টেশনে ২৩টি ট্রেন, হলুদ লাইনে জাহাঙ্গির-পুরী থেকে হুদা সিটি সেন্টার পর্যন্ত ৪৪.৬৫ কিলোমিটারে ৩৪টি স্টেশনে ৪৫টি ট্রেন চলে। নীল লাইনে নয়দা সিটি সেন্টার থেকে দ্বারকা সেকশন ২১ পর্যন্ত ৪৯.৯৩ কিলোমিটারে ৪৪ স্টেশনে এবং যমুনা ব্যাংক থেকে বৈশালী পর্যন্ত ৮.৭৫ কিলোমিটারে ৮টি স্টেশনে ৫৯টি ট্রেন এবং সবুজ লাইনে ইন্দারলোক থেকে মুন্ডকা পর্যন্ত ১৮.৪৬ কিলোমিটারে ১৫টি স্টেশনে ও কীর্তি নগর থেকে অশোকনগর পর্যন্ত ৩.৩২ কিলোমিটারে ২টি স্টেশনে ১৫টি ট্রেন চলে। বেগুনি লাইনে কেন্দ্রীয় সচিবালয় থেকে বদরপুর পর্যন্ত ২০.০৪ কিলোমিটারে ১৫টি স্টেশনে ২৯টি এবং বিমানবন্দর এক্সপ্রেস নয়া দিল্লি থেকে দ্বারকা সেকশন ২১ পর্যন্ত ২২.৭০ কিলোমিটারে ৬ স্টেশনে ৮টি ট্রেন চলাচল করে। এখন হলুদ লাইন হুদা সিটি সেন্টার ছাড়িয়ে বাদলি পর্যন্ত, বেগুনী লেন বদরপুর ছাড়িয়ে কাশ্মির গেট পর্যন্ত ও আরেকটি লাইন বল্লভপুর ফরিদাবাদ পর্যন্ত, নীল লাইন নাজাফগড় পর্যন্ত, সবুজ লাইন বাহাদুরগড় পর্যন্ত সমপ্রসারিত করার কাজ চলছে। দিল্লি মেট্রো নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি আরও বেশকিছু পরিকল্পনা করছে ভারত সরকার। এর মাধ্যমে রাজধানী ছাড়িয়ে পাশপাশের এলাকাগুলো পুরোপুরি মেট্রোর আওতায় নিয়ে আসা হবে। দিল্লি মেট্রো কেবল বিশ্বের অন্যতম প্রধান মেট্রো রেল নেটওয়ার্কই নয়, নয়া দিল্লির শাস্ত্রী পার্কে অবস্থিত ডিএমআরসি ইনস্টিটিউটে প্রশিক্ষণ দেয়া হয় রেলের পরিচালক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের। যা দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র মেট্রো রেল ট্রেনিং ইনস্টিটিউটও বটে। যেখানে মেট্রো প্রযুক্তির উপর এক বছরের ডিপ্লোমা কোর্সও চালু রয়েছে। এছাড়া ডিএমআরসি বিদেশেও কনসালটেন্সি করে সুনাম অর্জন করেছে। জাকার্তা মেট্রো রেল সিস্টেমে ‘ম্যানেজমেন্ট কনসালটিং সেবা’র জন্য ২০১২ সালে পুরস্কৃত করেছে ইন্দোনেশিয়া সরকার। এছাড়া দিল্লি মেট্রো ট্রেন ও ট্রেন যোগাযোগকে সহনীয় দূষণমাত্রার বলে স্বীকৃতি দিয়েছে জাতিসংঘ। বাংলাদেশে প্রায় দেড় কোটি মানুষের শহর ঢাকা। যানজটে নাকাল নগরবাসী। ঢাকাকে যানজট মুক্ত করে মানুষের লাখ লাখ কর্মঘণ্টা সাশ্রয়ের প্রধান উপায় হতে পারে মেট্রো রেল চালু উদ্যোগ।













