স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তদন্ত প্রতিবেদন: তাজরিনে অগ্নিকাণ্ড নাশকতা অবহেলার কারণে মৃত্যু
তাজরিন গার্মেন্টে অগ্নিকাণ্ড সূত্রপাতের পেছনে ছিল ‘নাশকতা’। আর অমার্জনীয় অবহেলার কারণে ১১১ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। এজন্য গার্মেন্টটির মালিক দেলোয়ার হোসেন সহ ৯ জন দায়ী। তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি কার্যবিধির ৩০৪ (ক) ধারায় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। তাজরিন গার্মেন্ট নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটি তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে এসব বক্তব্য উল্লেখ করেছে। গতকাল বিকাল সাড়ে পাঁচটায় রিপোর্টটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব সি কিউ কে মুশতাক আহমেদের কাছে জমা দিয়েছেন তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মাইন উদ্দিন খন্দকার। গার্মেন্ট ভবনটি পরিদর্শন ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে কমিটি এই প্রতিবেদন তৈরি করে। রিপোর্ট জমা দেয়ার বিষয়টি স্বীকার করে তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মাইন উদ্দিন খন্দকার মুঠোফোনে মানবজমিনকে জানিয়েছেন, তদন্ত কার্যক্রম শেষ। ঘটনার কারণ চিহ্নিত করাসহ সামগ্রিক বিষয়ে একটি রিপোর্ট আজই (গতকাল) বিকালে জমা দিয়েছি। তিনি বলেন, এতগুলো মানুষের মৃত্যু কোনভাবেই মেনে নেয়া যায় না। এ জন্য আমরা তদন্ত রিপোর্টে বলেছি, অমার্জনীয় অবহেলার কারণেই ১১১ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। তদন্ত রিপোর্টে গার্মেন্টটিতে আগুন লাগার পেছনে নাশকতা কাজ করেছে বলে সন্দেহ পোষণ করা হয়। এজন্য গার্মেন্টটির কোন কোন কর্মকর্তা দায়ী বলে মত প্রকাশ করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনে গার্মেন্টটির মালিক দেলোয়ার হোসেন, তাজরিন ফ্যাশনের প্রশাসনিক কর্মকর্তা দুলাল উদ্দিন, স্টোর ইনচার্জ হামিদুল ইসলাম, নিরাপত্তা তত্ত্বাবধায়ক আল আমিনসহ গার্মেন্টটির বিভিন্ন ফ্লোরে দায়িত্ব পালনকারী আরও ৫ কর্মকর্তাকে দায়ী করা হয়েছে। তাদের ব্যাপারে রিপোর্টে বলা হয়েছে, এসব ব্যক্তি অগ্নিকাণ্ডের সময় শ্রমিকদের ভুল তথ্য দিয়ে বলেন, আগুন নেভানোর মহড়া চলছে। শ্রমিকরা বের হওয়ার চেষ্টা করলে তাদের নির্দেশেই কলাপসিবল গেটে তালা ঝুলিয়ে দেয়া হয়। এতে শ্রমিকরা ভেতরে আটকা পড়েন। ফৌজদারি কার্যবিধির ৩০৪ (ক) ধারায় দায়ীদের বিরুদ্ধে শাস্তির কথা বলা হয়েছে। এ ধারায় দোষী প্রমাণিত হলে পাঁচ বছরের জেল ও অনাদায়ে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা যাবে। ১১১ জন শ্রমিকের মৃত্যুর কারণ উল্লেখ করে তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কারখানায় অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র থাকলেও ঘটনার দিন একটিও ব্যবহার করা হয়নি। সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ হচ্ছে, আগুনের সতর্ক সঙ্কেত বাজার পরও কারখানার মধ্যম পর্যায়ের ব্যবস্থাপকেরা শ্রমিকদের কারখানা ত্যাগে বাধা দিয়েছেন। ফলে প্রাথমিকভাবে আগুন দেখার পর তা নিয়ন্ত্রণের জন্য একদিকে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র ব্যবহার করা হয়নি। অন্যদিকে ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা মালিকপক্ষের লোকজন শ্রমিকদের নিরাপদে বের হওয়ার সুযোগ না দিয়ে বরং কারখানার ভেতরে কাজ করতে নির্দেশ দিয়ে শ’ শ’ শ্রমিককে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছেন। এমনকি অগ্নিনির্বাপণ সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ থাকা বাধ্যতামূলক হলেও কারখানার মালিকপক্ষ বা শ্রমিকরা কেউ সাধারণ অগ্নি আত্মরক্ষা ও অগ্নিনির্বাপণ কৌশল প্রয়োগ করেনি। তাজরিন ফ্যাশনের মান সম্পর্কে তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, কারখানার অবস্থান একটি পল্লীর ভেতরে। কারখানার সামনের দিকে ৮ থেকে ১০ ফুট রাস্তা। পেছনে তিনদিকে লাগোয়া বাড়িঘর। ফলে এ ধরনের স্থাপনায় স্বাভাবিকভাবেই ফায়ার সার্ভিসের বড় গাড়ি অভিযান চালাতে পারে না। কোন ধরনের বহির্মুখী জরুরি নির্গমন পথ অথবা বিকল্প সিঁড়ি না থাকায় তৃতীয় ও চতুর্থ তলার শ্রমিকরা লোহার গ্রিল, কাচ, এগ্জস্ট ফ্যান ভেঙে জীবন বাঁচাতে পাশের টিনের চালে লাফিয়ে পড়েন। এ কারণেই হতাহতের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। রিপোর্টে বলা হয়, তাজরিন গার্মেন্টটি কোনভাবেই শ্রমিকের কর্মপরিবেশ উপযোগী বা যথাযথ মান পরিপালনকারী (কমপ্লায়েন্ট) কারখানা নয়। কারখানার ভবন তৈরিতেও ন্যূনতম ‘ভবন নির্মাণ বিধিমালা’ অনুসরণ করা হয়নি। কর্মক্ষেত্রের উপযোগী ন্যূনতম শর্তগুলো মানা হলে এত বেশি শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যু হতো না। নিশ্চিন্তপুরের তাজরিন ফ্যাশনসে একাধিকবার সরজমিন পরিদর্শন প্রসঙ্গে তদন্ত রিপোর্টে বলা হয়েছে, তাজরিন ফ্যাশনস কারখানার নয়তলা ভবনটির নিচতলার পুরোটাই ছিল গুদাম বা ওয়্যার হাউস। এখানে সুতা ও কাপড় গুদামজাত করা হয়। সেখানে ঢুকতেই একটি সদর দরজা, এরপর নিচতলার ওয়্যার হাউসের ভেতর থেকেই তিনটি সিঁড়ি প্রতিটি তলা স্পর্শ করে ছাদে গিয়ে মিলেছে। প্রতি তলার প্রবেশমুখেই কলাপসিবল দরজা। নিচতলার ওয়্যার হাউসে আগুন লাগায় এর অগ্নিদাহ্য সিনথেটিক জাতীয় সুতা, কাপড়ের বিশাল মজুত থাকায় আগুন লাগার পর পরই পুরো ভবনটি ইটভাটার মতো রূপ নেয় এবং সিঁড়িগুলো হয়ে ওঠে উত্তপ্ত চিমনি। নিচতলার ভয়াবহ আগুনের তাপ, শিখা ও কালো ধোঁয়া তিনটি সিঁড়ি দিয়ে ঊর্ধ্বমুখী হয়। ফলে শ’ শ’ কর্মব্যস্ত শ্রমিকরা প্রচণ্ড কালো ধোঁয়ার বহির্গমনের কোন পথ না পেয়ে দমবন্ধ ও পরবর্তী সময়ে অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা যান। এর আগে গত ২৪শে নভেম্বর রাতে তাজরিন ফ্যাশনস কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের পর চার সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে কমিটির সদস্যরা ছিলেন, শিল্পাঞ্চল পুলিশের মহাপরিচালক মো. আবদুস সালাম, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের পরিচালক (প্রশাসন) মো. আবদুস সালাম এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব সাঈদ মাহমুদ বেলাল হায়দার।
ওদিকে তদন্ত প্রতিবেদনে পাঁচটি চূড়ান্ত এবং ১৬টি সাধারণ সুপারিশ করা হয়েছে। এসব সুপারিশের মধ্যে রয়েছে- তাজরিনের মধ্য পর্যায়ের কর্মকর্তাদের অবহেলার জন্য শাস্তির সুপারিশ, দেশের যেসব জেলায় এ ধরনের শিল্পপ্রতিষ্ঠান রয়েছে ওইসব জেলায় মোবাইল কোর্ট পরিচালানার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়। উল্লেখ্য, গত ২৪শে নভেম্বর শনিবার সন্ধ্যায় সাভারের নিশ্চিন্তপুরে তুবা গ্রুপের তৈরী পোশাক কারখানা তাজরিন ফ্যাশনসে স্মরণকালের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় ১১১ জনের মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় রাষ্ট্রীয়ভাবে জাতীয় শোক পালন করা হয়। এরই মধ্যে নিহতদের পরিবারকে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে মোট ৬ লাখ টাকা করে চেক দেয়া হয়েছে। এছাড়া বেঁচে যাওয়া শ্রমিকদের বেতন ও আহতদের চিকিৎসা সহায়তা দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।









