মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগ- অনলাইন বিড়ম্বনা
অনলাইন বিড়ম্বনায় ২ দিনে শত শত কর্মী মালয়েশিয়া যেতে নাম নিবন্ধন করতে পারেননি। পোহাতে হয়েছে ভোগান্তি। ঢাকা ও বরিশাল বিভাগে গতকাল দ্বিতীয় দিনের মতো রেজিস্ট্রেশন কার্যক্রম চলে। আজ এ দুই বিভাগে রেজিস্ট্রেশনের শেষ দিন। তবে যেসব এলাকায় নেটওয়ার্ক সমম্যার কারণে তিন দিনেও নিবন্ধন করতে পারবে না সেখানে আরও একদিন সময় বাড়বে বলে জানিয়েছেন বিএমইটি’র মহাপরিচালক বেগম সামছুন নাহার। তিনি বলেন, বিড়ম্বনা সত্ত্বেও ২ দিনে দেড় লাখ কর্মী রেজিস্ট্রেশন করেছেন। এদিকে গতকাল সরজমিন ঢাকা বিভাগের কেরানীগঞ্জ উপজেলার দু’টি ইউনিয়নে গিয়ে বেশকিছু অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া যায়। বিভিন্ন জেলা থেকে আমাদের প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন ইন্টারনেট-এর ধীরগতি, অদক্ষ অপারেটর এবং তাদের প্রশিক্ষণ না থাকায় রেজিস্ট্রেশন করতে লোকজনকে বিড়ম্বনা পোহাতে হয়। কোথাও কোথাও নির্ধারিত ৫০ টাকার বেশি ফি নেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
গতকাল বেলা ১২টা ৪৪ মিনিটে ঢাকার সন্নিকটে কেরানীগঞ্জ উপজেলার শাক্তা ইউনিয়ন পরিষদের তথ্য ও সেবা কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায় ১০০ ফরমের স্তূপ। বাইরে আগ্রহী প্রার্থীরা ঘুরাফেরা করছেন। কম্পিউটারের দায়িত্বে নিয়োজিত উদ্যোক্তা পরিচয় দিয়ে রাজিউল মাহবুব বললেন, নেটওয়ার্ক সমস্যার কারণে এ পর্যন্ত তিনি মাত্র ১০টি নিবন্ধন করতে পেরেছেন। মাঝে মাঝে সার্ভারে ব্যাপক সমস্যা দেখা দেয়। প্রথম দিন এই কেন্দ্রে তারা ৩৫টি নিবন্ধন সম্পন্ন করতে পেরেছেন। এখানে উপস্থিত উপজেলা প্রাথমিক ও গণশিক্ষা রিসোর্স সেন্টারের ইনস্ট্রাক্টর শামীমা ইয়াসমিন জানান, তিনি এখানে সকাল থেকেই আছেন। কোন অনিয়ম নেই। নেটওয়ার্ক সমস্যার কারণে নিবন্ধনের গতি ধীরে চলছে। তথ্য কেন্দ্র থেকে মূলকপির ফটোকপি দুই টাকার পরিবর্তে ১০ টাকা দিয়ে কিনছেন- এরকম অভিযোগ করেন প্রার্থী মো. আসাদ। এছাড়া পরিষদের বাইরে টেবিল সাজিয়ে ফরম পূরণ করছেন একদল। যারা ৪০ থেকে ৫০ টাকা নিচ্ছেন বলে অভিযোগ করেন জসিম। এই অভিযোগের ব্যাপারে শাক্তা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. সুলতান খান বলেন, যারা নিজেরা ফরম পূরণ করতে পারেন না তারাই ওদেরকে দিয়ে লেখাচ্ছেন। এখন তাদের না করে দিয়েছি। যার যার ফরম নিজেরাই ফরম করুক। ১০ টাকা প্রসঙ্গে তিনি তাৎক্ষণিক ওই ফরম পরিষদ থেকে ফ্রি দেয়ার ঘোষণা দেন।
একই উপজেলার তারানগর ইউনিয়ন পরিষদে গিয়ে দেখা যায় সেখানে তথ্য ও সেবা কেন্দ্র নেই। ওই পরিষদ থেকে ১০ থেকে ১২ কিলোমিটার দূরে এই তথ্য কেন্দ্র। বেলা ২ টা ৫ মিনিটে গিয়ে দেখা গেছে ১০-১২ জনের লাইন। অপেক্ষারত প্রার্থীরা জানান, সকালে একটু লাইন বড় ছিল। সাদ্দাম, ইকবাল ও মিলন নামের তিনজন অভিযোগ করে বলেন, তারা তিন জনে একত্রে ৩টি ফরমের ফটোকপি কিনেছেন ৫০ টাকা দিয়ে। এছাড়াও প্রত্যেককে সরকারি খাতে আরও ৫০ টাকা করে দিতে হবে। এই কেন্দ্রের উদ্যোক্তা আল আমিন বলেন, সার্ভারে ব্যাপক সমস্যা। নেটওয়ার্ক পাওয়া যায় না। এই পর্যন্ত ৪৩টা নিবন্ধন সম্পন্ন হয়েছে। আগের দিন করা হয় ৮৫টি।
এদিকে জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) পরিচালক (ট্রেনিং) ড. মো. নূরুল ইসলাম জানান, দ্বিতীয় দিন পর্যন্ত এক লাখ ৫০ হাজার ৫০৪ জন নিবন্ধন করেছেন। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগে এক লাখ ২৩ হাজার ৬৪০ জন এবং বরিশাল বিভাগে ২৬ হাজার ৮৬৪ জন অনলাইনে নিবন্ধন করেছেন। ইন্টারনেটের সমস্যার কথা স্বীকার করেন তিনি। ঢাকা ও বরিশাল বিভাগের নিবন্ধিত ব্যক্তিদের মধ্যে যারা মালয়েশিয়ায় যাওয়ার সুযোগ পাবেন তাদের লটারি হবে আগামীকাল ১৬ই জানুয়ারি। জেলা সদরে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে এ লটারি হবে। তবে জনসংখ্যা অনুপাতে বরাদ্দকৃত ইউনিয়নভিত্তিক কোটা অনুযায়ী তালিকা তৈরি করা হবে। একই ভাবে এরপর রাজশাহী, রংপুর ও সিলেট বিভাগের লোকজন ১৬ থেকে ১৮ই জানুয়ারি নাম নিবন্ধন করার সুযোগ পাবেন। এখানে ১৯শে জানুয়ারি লটারি হবে। খুলনা ও চট্টগ্রাম বিভাগে ১৯ থেকে ২১শে জানুয়ারি নাম নিবন্ধন করা হবে। এখানে লটারি হবে ২২শে জানুয়ারি। নিবন্ধন কার্যক্রম চলবে সকাল নয়টা থেকে বিকাল পাঁচটা পর্যন্ত।
কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, কিছু কিছু ইউনিয়ন তথ্যসেবা কেন্দ্রে আইটি সমস্যার কারণে কিছুটা বিঘ্ন সত্ত্বেও প্রথম দিন রোববার জেলার ১০৮টি ইউনিয়নে মোট ৫ হাজার ৩৫৪ জন মালয়েশিয়া গমনেচ্ছু কর্মী নিবন্ধন করেছেন। তবে কোন কোন ইউনিয়নে নিবন্ধন ফি বাবদ সরকার নির্ধারিত ৫০ টাকার পরিবর্তে ১০০ টাকা করে আদায় করা হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। জেলা প্রশাসনের আইসিটি কন্ট্রোল রুম সূত্র জানায়, সরকার নিবন্ধনের জন্য ১৩, ১৪ ও ১৫ জানুয়ারি-এই তিনদিন নির্ধারণ করে দিয়েছে। এর মধ্যে প্রথম দিনই ব্যাপক সাড়া পাওয়া গেছে। তবে ইউনিয়ন তথ্যসেবা কেন্দ্রের কিছু কারিগরি ত্রুটি এবং পর্যাপ্ত দক্ষতার অভাবে নিবন্ধন কাজে কিছুটা ধীরগতি লক্ষ্য করা গেছে। এদিকে হোসেনপুর উপজেলার পুমদী, সাহেদল, গোবিন্দপুর ইউনিয়ন তথ্য সেবাকেন্দ্রগুলোতে রেজিস্ট্রেশন প্রার্থীদের নিকট থেকে অতিরিক্ত টাকা আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রার্থীরা অভিযোগ করেন, সরকারিভাবে নির্ধারিত ৫০ টাকা নিবন্ধনের জন্য ধার্য থাকলেও ইউপি চেয়ারম্যান ও সদস্যরা ১০০ থেকে ১৫০ টাকা আদায় করছেন। এছাড়া নিবন্ধন ফরম বিক্রি করা হচ্ছে ২০ থেকে ৫০ টাকায়। এমন অভিযোগ পেয়ে সোমবার দুপুরে হোসেনপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ পুমদী ইউপি তথ্যসেবা কেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে এ ঘটনার সত্যতা পান। এ সময় সমবেত উপস্থিত নিবন্ধনের জন্য শত শত কর্মী ইউপি চেয়ারম্যানের এ বাড়তি টাকা আদায়ের অভিযোগ করেন। এ ব্যাপারে পুমদী ইউপি চেয়ারম্যান আরজুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, জেনারেটর ও আইপিএস বাবদ এ অতিরিক্ত টাকা নেয়া হচ্ছে। কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার বৌলাই ইউনিয়নে নিবন্ধন করতে প্রত্যেকের কাছ থেকে ৫০ টাকার স্থলে ১০০ টাকা করে আদায় করা হয়েছে বলে জানা গেছে। বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে জেনারেটর ভাড়া বাবদ এই টাকা আদায় করা হচ্ছে বলে লোকজনকে ব্যাখ্যা দেয়া হয়। এছাড়া ইটনা উপজেলার ইউনিয়নের জয়সিদ্ধি ইউনিয়নেও ১০০ টাকা করে আদায় করা হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
স্টাফ রিপোর্টার, বরিশাল থেকে জানান, মালয়েশিয়ার কর্মী নিবন্ধন ফরম বাবদ অতিরিক্ত মূল্য গ্রহণের অভিযোগ পাওয়া গেছে বিভিন্ন সেবা কেন্দ্র থেকে। কোন কোন কেন্দ্রে ৫০ টাকা ফি’র জায়গায় ৫০০ টাকা নেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। অপরদিকে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে বেশকিছু এলাকায় গতকালও নিবন্ধন চালু হয়নি এসব এলাকার আগ্রহী শ্রমিকদের বিকল্প পদ্ধতিতে নিবন্ধন চলছে বলে জানা গেছে। ইন্টারনেট ধীরগতির কারণে নিবন্ধন প্রক্রিয়াও শ্লথ হয়ে গেছে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা। গতকাল সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত বরিশাল জেলায় ২ দিনে ৫ হাজারের কিছু বেশি নিবন্ধন হয়েছে বলে জানা গেছে। বরিশাল সদর উপজেলার চরবাড়িয়া ইউনিয়ন কেন্দ্রের রফিকুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তি অভিযোগ করেন এখানে তার কাছে একটি ফরম ৫০০ টাকা দাবি করা হয়েছে। যদিও সংশ্লিষ্ট অপারেটর এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। একই অভিযোগ জাগুয়া কড়াপুর ইউনিয়নে। মেহেন্দিগঞ্জে গতকালও বিদ্যুৎ সমস্যার জন্য ৭টি কেন্দ্রে নিবন্ধন শুরু সম্ভব হয়নি। পার্শ্ববর্তী তথ্য সেবা কেন্দ্র এদের নিবন্ধন চলছে। বরিশাল জেলা তথ্য সেবার সহকারী প্রোগ্রামার চৌধুরী মোঃ শওকত জানান, মেহেন্দিগঞ্জের ৭টি তথ্যকেন্দ্রে বিদ্যুৎ সমস্যার কারণে আগেই বাদ দেয়া হয়েছে। তবে বেশকিছু স্থানে ইন্টারনেট এর শ্লথগতিত কাজ করতে সমস্যা হচ্ছে বলে তিনি জানান।
বরগুনা প্রতিনিধি জানান, জেলার বেশ কয়েকটি তথ্য সেবা কেন্দ্রে সকাল থেকে বিকাল পাঁচটা পর্যন্ত নিবন্ধন প্রার্থীদের ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। যে সব ইউপিতে বিদ্যুতের ব্যবস্থা নেই সেখানে বিকল্প হিসেবে জেনারেটর দিয়ে কাজ চলছে। সরকার সর্বসাকুল্যে প্রার্থীপ্রতি ৫০ টাকা ফি নির্ধারণ করলেও বেশকিছু কেন্দ্রে অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। বরগুনা সদর ইউনিয়ন তথ্যসেবা কেন্দ্রে গিয়ে নির্ধারিত ফি’র অতিরিক্ত ২০ টাকা আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে। সেখানে নিবন্ধন প্রার্থীদের কাছে ১০ টাকা মূল্যে ফরম বিক্রি করতে দেখা গেছে। এসময় একজন নিবন্ধন প্রার্থীর কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা আদায় নিয়ে গ্রাম পুলিশের সঙ্গে বাকবিতণ্ডা ও মারধরের ঘটনা ঘটেছে। অতিরিক্ত টাকা দিতে অস্বীকার করায় মনিরুল ইসলাম নামের একেজনকে মারধর করেছে কয়েকজন গ্রাম পুলিশ। পরে ইউপি চেয়ারম্যান ঘটনাস্থলে এসে ওই গ্রামপুলিশকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে সোপর্দ করেছেন। বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার কালমেঘা ইউনিয়নে মালয়েশিয়া গমনেচ্ছুদের নাম নিবন্ধনে অতিরিক্ত টাকা আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে। কালমেঘা ইউনিয়নে গতকাল নাম নিবন্ধন করতে আসা আবদুর রহিম নামের এক ব্যক্তি অভিযোগ করেন, প্রত্যেকের কাছ থেকে হাতে লেখা জীবনবৃত্তান্ত নিয়ে ১৪০-১৫০ টাকা করে আদায় করছেন দায়িত্বপ্রাপ্তরা। ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সচিব মোস্তফা কামাল ওই টাকা নিচ্ছেন। একই অভিযোগ করেন, ইউনিয়নের কূপদোন গ্রামের মো. আজাদ, পশ্চিম কালমেঘা গ্রামের মো. জুয়েল ও ঘুটাবাছা গ্রামের আরিফুল ইসলামসহ অনেকে।
অভিযোগ প্রসঙ্গে মোস্তফা কামাল বলেন, তথ্যসেবা কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা অতিরিক্ত অর্থ নিয়ে ফরম পূরণ করছিলেন। পরে তা বন্ধ করে অতিরিক্ত টাকা ফেরত দেয়া হয়েছে।
কালমেঘা ইউপি চেয়ারম্যান নূর আফরোজ বলেন, ফরম পূরণ করার জন্য ২০ টাকা অতিরিক্ত রাখা হচ্ছিল। অভিযোগ পেয়ে তা বন্ধ করে নির্ধারিত ৫০ টাকা করেই নিচ্ছি।