গুগল সায়েন্স ফেয়ার ২০১৩
'গুগল' নামটির সাথে এই প্রযুক্তির বিশ্বে কাউকে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার কিছু নেই। প্রযুক্তি বিশ্বের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই অবদান রেখে বিশ্বকে সমৃদ্ধ করে যাচ্ছে এই টেক জায়ান্ট। তবে কেবল নিজেরাই নিরলস কাজ করে যাচ্ছে না, বিজ্ঞান আর প্রযুক্তিতে যাদের আগ্রহ এবং প্রতিভা রয়েছে, তাদের প্রতিভা এবং মেধার স্বাক্ষরকে বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছে দিতেও কাজ করে যাচ্ছে তারা। কিশোর-কিশোরীদের নিয়ে গুগল গত কয়েক বছরের ধারাবাহিকতায় এবারেও আয়োজন করেছে 'গুগল সায়েন্স ফেয়ার ২০১৩'। ৩১ জানুয়ারি থেকে এই প্রতিযোগিতায় প্রকল্প জমা দেওয়ার সুযোগ উন্মুক্ত হয়েছে। চলবে এপ্রিলের শেষ দিন পর্যন্ত। গুগল সায়েন্স ফেয়ারের এই প্রতিযোগিতা নিয়ে বিস্তারিত তথ্য জানাচ্ছেন তরিকুর রহমান সজীব
টেক জায়ান্ট গুগল তাদের নতুন নতুন উদ্ভাবনী দিয়ে ক্রমশই বিশ্বকে সমৃদ্ধ করে যাচ্ছে। তবে কেবল নিজেদের উদ্ভাবনী নিয়েই বসে নেই গুগল। অন্যদের প্রতিভা আর মেধাও যাতে গোটা বিশ্বকে সমৃদ্ধ করতে পারে, তা নিয়েও তারা কাজ করে যাচ্ছে। বিশেষ করে কিশোর-কিশোরীদের নিয়ে গুগল কয়েক বছর ধরে আয়োজন করে যাচ্ছে বিজ্ঞান আর প্রযুক্তি নিয়ে এক বিশেষ প্রতিযোগিতা। সারা বিশ্বের ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সীদের নিয়ে আয়োজন করা হয় এই প্রতিযোগিতা। চলতি বছরেও কিশোর-কিশোরীদের নিয়ে আয়োজিত এই প্রতিযোগিতার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। বিজ্ঞান আর প্রযুক্তির বিভিন্ন দিক নিয়ে আয়োজিত এই প্রতিযোগিতার নাম 'গুগল সায়েন্স ফেয়ার'। সার্বিকভাবে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিভিন্ন দিককে ১১টি ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হয়েছে। এসব ক্যাটাগরির যেকোনো একটিতে নতুন কোনো উদ্ভাবনী ধারণা নিয়ে একটি প্রকল্প জমা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে এই প্রতিযোগিতায়। আর সেই সাথে প্রকল্পটি প্রতিযোগিতার বিজয়ী হিসেবে নির্বাচিত হলে থাকছে বিশ্বের অন্যতম সেরা প্রযুক্তি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সার্নে কাজ করার সুযোগ। তার সাথে শিক্ষাবৃত্তি এবং আরও নানা ধরনের সুযোগ সুবিধা তো রয়েছেই। আমাদের দেশের কিশোর-কিশোরীদের জন্যও উন্মুক্ত রয়েছে এই প্রতিযোগিতা। তাদের জন্যই এই লেখায় এই প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হলো।
প্রতিযোগিতার সাধারণ তথ্য
কিশোর-কিশোরীদের জন্যই এই সায়েন্স ফেয়ারের আয়োজন করেছে গুগল। এই প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার জন্য আগ্রহীদের বয়সসীমা ১৩ বছর থেকে ১৮ বছর। অর্থাত্, যাদের জন্ম ১৯৯৪ সালের ৩১ জানুয়ারি থেকে ২০০০ সালের ৩০ এপ্রিলের মধ্যে, কেবল তারাই অংশ নিতে পারবে এই প্রতিযোগিতায়। ব্যক্তিগত এবং দলগতভাবে অংশ নেওয়া যাবে এই প্রতিযোগিতায়। আমেরিকা, এশিয়া প্যাসিফিক এবং ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্য—এ তিনটি অঞ্চলে বিভক্ত হয়ে প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হবে। প্রতিযোগিতার প্রথম পর্যায়ে প্রতি অঞ্চল থেকে তিনটি বয়সভিত্তিক দলে ১০টি করে মোট ৯০টি দলকে নির্বাচিত করা হবে আঞ্চলিক ফাইনালিস্ট হিসেবে। এরপর ওই ৯০টি প্রকল্প থেকে নির্বাচিত করা হবে ১৫টি ফাইনালিস্ট দল। এই ১৫টি ফাইনালিস্ট দলের মধ্যেই অনুষ্ঠিত হবে চূড়ান্ত বিজয়ী নির্বাচনের প্রতিযোগিতা। বয়সের ভিত্তিতে প্রতিযোগীদের বিভক্ত করা হয়েছে তিনটি গ্রুপে। ১৩ থেকে ১৪, ১৫ থেকে ১৬ এবং ১৭ থেকে ১৮ বছরের তিনটি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে প্রতিযোগীরা অংশ নেবে এখানে। যেকেউ ব্যক্তিগতভাবে একাই অংশ নিতে পারবে এতে। আবার দলগতভাবেও অংশ নিতে পারবে। দলের সদস্য সংখ্যা হবে সর্বোচ্চ তিনজন। আর সেক্ষেত্রে দলের সদস্যদের মধ্যে যার বয়স বেশি হবে, তার বয়স অনুযায়ীই নির্ধারিত হবে বয়সের গ্রুপ। অঞ্চল এবং বয়সের গ্রুপ মিলিয়ে যে ১৫টি প্রকল্পকে চূড়ান্ত হিসেবে নির্বাচন করা হবে, সেপ্টেম্বর মাসের তৃতীয় সপ্তাহে গুগল'র সদর দপ্তরে সে প্রকল্পগুলো উপস্থাপন করা হবে সরাসরি বিচারকদের সামনে। সেখান থেকেই বাছাই করা হবে তিনটি সেরা প্রকল্প।
প্রকল্প জমা দেওয়ার জন্য করণীয়
প্রাথমিকভাবে এই প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে চাইলে কোথাও যাওয়ার প্রয়োজন হবে না। ইন্টারনেট সংযোগ থাকলে বাসায় বসেই অংশ নেওয়া যাবে এই প্রতিযোগিতায়। যে প্রকল্প বা উদ্ভাবন বা ধারণা নিয়ে প্রতিযোগী অংশ নিতে চায়, তার একটি সংক্ষিপ্ত ভিডিওচিত্র তৈরি করতে হবে। আর সেটি আপলোড করে দিতে হবে গুগল সায়েন্স ফেয়ারের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে। http://google.com/sciencefair ওয়েব লিংকে গেলেই এই প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ভিডিওটি আপলোড করা যাবে। ভিডিও'র দৈর্ঘ্য অবশ্য হতে হবে সর্বোচ্চ ২ মিনিট। যাদের ভিডিও ২ মিনিটের চাইতে বেশি হবে, তাদের ভিডিওর প্রথম ২ মিনিটই কেবল প্রতিযোগিতার জন্য বিবেচনা করা হবে। বাকী অংশ বিবেচনা করা হবে না। ভিডিও চিত্রের বদলে অবশ্য প্রজেক্ট সামারি স্লাইডশো জমা দিলেও চলবে। সে ক্ষেত্রে স্লাইডশোতে সর্বোচ্চ স্লাইড হবে ২০টি। এ ক্ষেত্রেও যাদের স্লাইড সংখ্যা ২০টির বেশি হবে, তাদের ক্ষেত্রে কেবল প্রথম ২০টি স্লাইডকেই বিবেচনা করা হবে প্রতিযোগিতার জন্য। এই ২ মিনিটের ভিডিও কিংবা ২০টি স্লাইডের মধ্যে প্রকল্পের বিস্তারিত সব তথ্য সংযোজন করতে হবে। এর আগে অবশ্য প্রতিযোগীদের প্রয়োজন হবে একটি গুগল অ্যাকাউন্ট। https://accounts.google.com/NewAccount লিংক থেকে বিনামূল্যেই গুগল অ্যাকাউন্ট তৈরি করা যাবে।
প্রতিযোগিতার বিষয়
আগেই বলা হয়েছে, সর্বমোট ১১টি ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হয়েছে প্রতিযোগিতার বিষয়বস্তু। বিষয়গুলো হচ্ছে—কম্পিউটার বিজ্ঞান ও গণিত, পৃথিবী এবং পরিবেশ বিজ্ঞান, আচরণ ও সামাজিক বিজ্ঞান, প্রাণী ও উদ্ভিদ, শক্তি ও মহাবিশ্ব, আবিষ্কার ও উদ্ভাবন, পদার্থ, জীববিজ্ঞান, রসায়ন, খাদ্য বিজ্ঞান এবং বিদ্যুত্ ও ইলেকট্রনিক্স। এসব বিষয়ের যেকোনো একটি বিষয়েই প্রকল্প জমা দেওয়া যাবে। একজন প্রতিযোগী প্রতিযোগিতায় কেবল একটি প্রকল্পেই অংশ নিতে পারবে। কেউ যদি একাধিক প্রকল্পে অংশ নিয়ে থাকে, তবে তার জমা দেওয়া প্রথম প্রকল্পটিই কেবল বিবেচনা করা হবে। আরেকটি বিষয় খেয়াল রাখতে হবে, এই প্রতিযোগিতার জন্য এমন কোনো প্রকল্প নিয়ে কাজ করা যাবে না যাতে কোনো মানুষ বা জন্তুর উপর পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাতে হয়। পরিবেশের ক্ষতি হয়, এমন কোনো পরীক্ষাও চালানো যাবে না।
যা থাকবে প্রকল্পে
এই প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে চাইলে যে প্রকল্প জমা দিতে হবে, তাতে ৮টি অংশ থাকতে হবে। এই অংশগুলোর প্রথমেই থাকবে প্রকল্পের সারসংক্ষেপ। এখানে এই প্রকল্পে কোন বিষয়গুলো থাকবে, প্রকল্পটি কী নিয়ে; তা সংক্ষেপে তুলে ধরতে হবে। দ্বিতীয় অংশে থাকবে প্রকল্পে অংশগ্রহণকারী বা অংশগ্রহণকারীদের তথ্য। এককভাবে অংশ নিলে নিজের তথ্য এবং দলগতভাবে অংশ নিলে দলের সকল সদস্যের ব্যক্তিগত তথ্য সংযুক্ত করতে হবে এখানে। তৃতীয় অংশে থাকবে প্রশ্ন বা প্রস্তাবনা। যে প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেতে এই প্রকল্পের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, কিংবা কোন সমস্যার সমাধান খুঁজে পেতে এই প্রকল্প তৈরি করা হয়েছে, তা জানাতে হবে এখানে। প্রকল্পের চতুর্থ অংশে থাকবে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট গবেষণার তথ্য। প্রকল্পের প্রস্তাবনা বা প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেতে কী পড়ালেখা করা হয়েছে এবং তা প্রকল্পটিকে কীভাবে সহায়তা করছে, তা উল্লেখ করতে হবে এখানে। পঞ্চম অংশে থাকবে এই প্রকল্পে যে পরীক্ষণ করা হয়েছে, তার বিববরণ। আলোচ্য সমস্যার যে সমাধান প্রস্তাব করা হয়েছে, তা কীভাবে পরীক্ষা করা হয়েছে, সেটাই বিস্তারিতভাবে তুলে ধরতে হবে এই অংশে। ষষ্ঠ অংশে থাকবে পরীক্ষণের ফলাফল। প্রকল্পের বিভিন্ন পরীক্ষণে যে ধরনের তথ্য-উপাত্ত পাওয়া গেছে, সেই ফলাফলকে ব্যাখ্যা করতে হবে এই অংশে। সপ্তম অংশে থাকবে উপসংহার বা রিপোর্ট। গোটা প্রকল্পের বিভিন্ন পরীক্ষণ থেকে সমস্যার সমাধান হওয়া বা না হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরতে হবে এই অংশে। সবশেষে থাকবে নির্ঘণ্ট, যেখানে পুরো প্রকল্পে যেসব রেফারেন্স বা তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে তার তথ্য এবং কৃতজ্ঞতা স্বীকার।
সাধারণ নিয়মাবলী
এই প্রতিযোগিতায় প্রকল্প জমা দিতে হলে বেশ কিছু নিয়মকানুন মেনে চলতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে, যেসব তথ্য বা উপাত্ত ইতিমধ্যেই তৈরি করা হয়ে গেছে বা সকলের মধ্যে বিদ্যমান, সেগুলো ব্যবহার করতে হবে। অবৈধ কোনো ব্যবস্থার মাধ্যমে তথ্যসংগ্রহ করা যাবে না। প্রাণীর ওপর পরীক্ষা চালালে সেটা এমন পরিবেশে করতে হবে, যেখানে পরিবেশ প্রাণীর আচরণে প্রভাব ফেলবে না। কোনো ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার করা যাবে না। কেবল তা-ই নয়, অন্যের মেধাস্বত্ব ভঙ্গ করে এমন কোনো উপাদানও ব্যবহার করা যাবে না। সায়েন্স ফেয়ারের ওয়েবসাইটেই এই সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাবে।
বিচারে যা বিবেচ্য
প্রতিটি প্রকল্পকে ১০০ নম্বরের ভিত্তিতে বিচার করা হবে। এর মধ্যে সারসংক্ষেপ অংশের জন্য বরাদ্দ রয়েছে ৪০ নম্বর। এর বাইরে প্রতিযোগীদের তথ্য, প্রশ্ন বা প্রস্তাবনা এবং উপসংহার বা রিপোর্ট অংশের প্রতিটির জন্য রয়েছে ২০ নম্বর। নম্বর বিভাজনকে মাথায় রেখেই তাই প্রকল্প জমা দিতে হবে।
পুরস্কার
এই প্রতিযোগিতায় বিজয়ী প্রকল্পগুলোর জন্য রয়েছে প্রচুর পুরস্কার। বয়সভিত্তিক তিনটি ক্যাটাগরিতে রয়েছে তিনটি পুরস্কার, যার মধ্যে একটিকে বিবেচনা করা হবে গ্র্যান্ড পুরস্কার হিসেবে। গ্র্যান্ড পুরস্কার বিজয়ীর জন্য রয়েছে ন্যাশনাল জিওগ্রাফির পক্ষ থেকে একটি ভ্রমণের সুযোগ; গুগল'র পক্ষ থেকে শিক্ষাবৃত্তি; গুগল, লেগো বা সার্নে শিক্ষাভ্রমণ; একটি লেগো প্রাইজ এবং বিজয়ীর স্কুলের জন্য থাকবে সায়েন্টিফিক আমেরিকানের আর্কাইভে অ্যাকসেস। অন্য বিজয়ীদের জন্যও রয়েছে একই ধরনের পুরস্কার। এ ছাড়া ফাইনালিস্ট ১৫ প্রকল্পের জন্যও রয়েছে পুরস্কার।