দুর্নীতির রাহুগ্রাসে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়- প্রয়োজন ছাড়া ভবন নির্মাণ গাড়ি কেনা, টেন্ডারে অনিয়ম
দুর্নীতির রাহুগ্রাসে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়। প্রয়োজন ছাড়া ভবন নির্মাণ, গাড়ি কেনা, টেন্ডারে অনিয়মসহ নানা ক্ষেত্রে হচ্ছে দুর্নীতি। দুর্নীতি ও অনিয়মের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম ভেঙে পড়েছে। কমে যাচ্ছে শিক্ষার্থীর সংখ্যা। বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা দুর্নীতির বিষয়ে শিক্ষক সমিতি প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রী ও ইউজিসির কাছে অভিযোগ করেছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি বলেছেন, এসব অভিযোগের কোন প্রমাণ নেই। মনগড়া অভিযোগ করা হয়েছে। প্রয়োজন ছাড়া ভবন নির্মাণ, কেনাকাটা, ক্যাম্পাসে অডিটরিয়াম-ট্রেনিং সেন্টার ও ২৫০ শয্যার গেস্ট হাউজ নির্মাণ ও মানিকগঞ্জ, জামালপুর ও গোপালগঞ্জে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাউবি) আঞ্চলিক ভবন নির্মাণসহ মুদ্রণ কাজে কোটি কোটি টাকার অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে। ২০১০ সালে কোন কারণ ছাড়াই বিভিন্ন প্রোগ্রামে ছাত্র ভর্তি বন্ধ করা হয়। ফলে ওই বছরই ছাত্র ভর্তির সংখ্যা ৯৬ ভাগ কমে যায়। পরে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের অব্যাহত চাপে আবার এসএসসি, এইচএসসি, বিএ/বিএসএস, বিএডসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রোগ্রামে ছাত্রভর্তি চালু করা হয়। কিন্তু সময়মতো এসএসসি ও এইচএসসির বইতে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংশোধন করার উদ্যোগ না নেয়ায় বছর শেষে তা সেভাবেই পুনঃমুদ্রিত হয়ে ছাত্রছাত্রীদের হাতে চলে যায়।
বাউবি একটি দেশব্যাপী প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়। এই প্রতিষ্ঠানের ১২টি আঞ্চলিক কেন্দ্র এবং ৮০টি স্থানীয় অফিস রয়েছে। সেগুলোতে কয়েক শ’ কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত আছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থে কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা বদলি হন। কিন্তু বর্তমান ভিসি বদলির সব রেকর্ড ভঙ্গ করেছেন। তিনি বিভিন্ন সময়ে কোন কারণ ছাড়াই প্রায় এক হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বদলি করেছেন। নিয়ম-নীতি বহির্ভূত এসব বদলির কারণে বাউবির কয়েক কোটি টাকা অপচয় হয়। এতে বাউবি প্রশাসন স্থবির এবং ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। বাউবির পরিবহন স্বল্পতা দূর করতে যানবাহন ক্রয়ের জন্য চলতি বাজেটে দুই কোটি ৫০ লাখ টাকা এবং গত বাজেটে প্রায় ৩০ লাখ টাকা বরাদ্দ ছিল। কিন্তু শিক্ষক-কর্মকর্তা ও কর্মচারীর জন্য কোন যানবাহন কেনার উদ্যোগ নেয়া হয়নি। তবে গত বছর নাভানার মোটরস থেকে ৫৬ লাখ টাকা দিয়ে দু’টি কাভার্ড ভ্যান কেনা হলেও পরে বিভিন্ন অজুহাতে সেগুলো সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে ফেরত দেয়া হয়। শিক্ষক সমিতির অভিযোগ বাউবি ক্যাম্পাসে ২৫০ শয্যার গেস্ট হাউজ নির্মাণে টেন্ডার প্রক্রিয়ার গোপনীয়তা ভঙ্গ করে ভিসি নিজ হাতে টেন্ডার সিডিউলে ভুল সংশোধনের নামে ঘষামাজা করে সর্বনিম্ন দরদাতা মেসার্স এনাম ট্রেডার্সের দর ১০ কোটি ৯৮ লাখ ৬৮ হাজার ১৯৫ টাকাকে ১২ কোটি ৯২ লাখ ৬৮ হাজার ১৯৫ টাকা বানিয়ে সর্বোচ্চ দরদাতা, টেকনো ইন্টারন্যাশনালের দর ১১ কোটি ৮৮ লাখ ৩৬ হাজার ৭৮২ টাকাকে ১২ কোটি ৮৮ লাখ ৩৬ হাজার ৭৮২ টাকা বানিয়ে সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে কাজ পাইয়ে দেয়া হয়েছে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে।
ভিসির গাড়িবিলাস: ৫৬ লাখ টাকা দিয়ে মাত্র চার বছর আগে একটি নিশান পেট্রল গাড়ি কেনা হয়েছিল বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির জন্য। কিন্তু অধ্যাপক ড. আরআইএম আমিনুর রশীদ নিয়োগ পাওয়ার পরপর নিশান গাড়িটি রেখেই ৭৩ লাখ টাকা দিয়ে একটি এবং ২৫ লাখ টাকা দিয়ে প্রায় একই সময়ে আরেকটি টয়োটা গাড়ি কিনেন। টয়োটা গাড়িটি ভিসির স্ত্রী ব্যবহার করছেন। পরে ৭৩ লাখ টাকা মূল্যের গাড়িটি প্রো-ভিসিকে সাময়িক ব্যবহারের জন্য দিয়ে ভিসির জন্য প্রায় কোটি টাকা ব্যয়ে আরেকটি গাড়ি কেনার প্রক্রিয়া চলছে।
আঞ্চলিক কেন্দ্রের টেন্ডার নিয়েও অনিয়ম: বাউবির ঢাকা আঞ্চলিক কেন্দ্রের ঊর্ধ্বমুখী সমপ্রসারণের কাজে একটি প্রতিষ্ঠান মেসার্স স্টারলাইট সার্ভিসেস দর প্রদান করে। টেন্ডার প্রক্রিয়ার গোপনীয়তা ভঙ্গ করে ভুল সংশোধনের নামে তার সাত কোটি ১৭ লাখ ৫১ হাজার ৩৭৫ টাকার দরকে সাত কোটি ৬৪ লাখ ৮১ হাজার ৫০ টাকায় উন্নীত করে বাড়তি ৪৭ লাখ ২৯ হাজার ৬৭৫ টাকার হাতিয়ে নিয়েছেন কর্মকর্তারা।
অডিটরিয়াম-কাম ট্রেনিং সেন্টার নির্মাণে দুর্নীতি: অডিটরিয়াম-কাম ট্রেনিং সেন্টার নির্মাণের প্রাক্কলিত নির্ধারিত ১০ কোটি ৩১ লাখ ৪৪ হাজার টাকার স্থলে নিজস্ব ক্ষমতাবলে পিপিআর-২০০৮ এর অনুসরণ না করে মোট ১৯ কোটি ১৬ লাখ ৫৬ হাজার ২৮৯ টাকা বৃদ্ধি করে ব্যয় অনুমোদন করেছে কর্তৃপক্ষ। বাড়তি টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া পরামর্শক নিয়োগ, কো-অর্ডিনেটিং অফিস নির্মাণ, স্বাধীনতা স্মারক ভাস্কর্য নির্মাণ, ক্যাম্পাসের নিচু জমি ভরাট, ভিসির রান্নাঘর বর্ধিতকরণসহ বিভিন্ন টেন্ডার প্রক্রিয়ায় আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য: এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর ড. আরআইএম আমিনুর রশিদ মানবজমিনকে বলেন, আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ করা হয়েছে তার কোন ভিত্তি নেই। যারা অভিযোগ করেছে তারা বিএনপি-জামায়াতের সঙ্গে আঁতাত করে চলছে। আমি সবসময় আইনের মধ্যে থেকে কাজ করছি। অতিরিক্ত গাড়ি কেনার বিষয়ে ভিসি বলেন, ভিসি হিসেবে আমি একটি গাড়ি পাই। আগে একটি গাড়ি ছিল এটা সত্য। ওই গাড়ি বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজে ব্যবহৃত হয়। তার পরিবারের সদস্যরা আইন মেনেই গাড়ি ব্যবহার করেন বলে জানান তিনি। ভিসি বলেন, আমি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতির সঙ্গে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেয়ার পরই তারা আন্দোলন শুরু করে। এই আন্দোলন আমার বিরুদ্ধে নয়, সরকারের বিরুদ্ধে। তিনি আরও বলেন, উন্নয়ন কাজ নিয়ে আমি একটি পয়সাও দুর্নীতি করিনি। এসব কাজের জন্য বিভিন্ন কমিটি আছে। আমি শুধু কমিটিগুলোর কাজ অনুমোদন করি। এ বিষয়ে বাউবি শিক্ষক সমিতির সভাপতি ড. কেএম রেজানুর রহমান বলেছেন, ভিসির বিরুদ্ধে সব জায়গায় অভিযোগ করা হয়েছে। নানা ক্ষেত্রে কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি হয়েছে। তিনি বলেন, অবৈধভাবে রেজিস্ট্রারকে অব্যাহতি দিয়ে সর্বকনিষ্ঠ একজন কর্মকর্তাকে রেজিস্ট্রারের দায়িত্ব দিয়েছেন।
