মা হতে এসে লাশ হয়ে যায় !
সোনাদিয়া ও সেন্টমার্টিন সমুদ্র সৈকতে আসতে শুরু করেছে বৃহদাকার সামুদ্রিক মা-কাছিম। টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপের সাগর সৈকতে দু-একটি কাছিম চোখে পড়লেও কক্সবাজার, হিমছড়ি, পেঁচার দ্বীপ, ইনানির সাগর সৈকতে সামুদ্রিক কোনো কাছিম ডিম দিতে আসে না। অপরিকল্পিত আবাসন, সৈকতে আলোর ঝিলিক ও পর্যটকের অনিয়ন্ত্রিত পদচারণায় কাছিমের ডিম দেয়ার পরিবেশ গত পাঁচ বছরে পুরোটাই নষ্ট হয়ে গেছে।
কক্সবাজার, সোনাদিয়া, সন্দীপ, কুতুবদিয়াসহ বিভিন্ন উপকূল থেকে প্রায় ২০ হাজার ট্রলার মাছ শিকার করছে গভীর সমুদ্রে। জেলেরা ট্রলার থেকে ভাসাজাল, ডুবাজাল, অনিয়ন্ত্রিত যন্ত্রচালিত ট্রলারসহ ৪০-৬০ ফুট লম্বা বিহুন্দি ও লাক্ষ্যা জাল পেতে রাখে সাগরতলে। অপরদিকে হাজার কিলোমিটার পেরিয়ে সামুদ্রিক কাছিম মা হওয়ার তাড়নায় ছুটে আসে এদেশের সাগর সৈকতে। কাছিমগুলো যখন সৈকতে এসে পৌঁছায়, তখন তারা এক একটি মস্তকবিহীন লাশ। নিথর দেহ নিয়ে ভেসে আসে জোয়ারের পানিতে। শরীরে তাদের আঘাতের দাগ।
বর্তমানে কমপক্ষে ৫০ হাজার বেহুন্দি জাল রয়েছে জেলেদের কাছে। গভীর সমুদ্রে জেলেদের জালে কাছিম আটকা পড়লে, জেলেরা তাদের বৈঠা, বাঁশ, কাঠ ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করে। জাল থেকে ঝামেলা এড়াতে জেলেরা কাছিমগুলো নির্মমভাবে হত্যা করে। সামুদ্রিক কাছিম গবেষক জহিরুল ইসলামের গবেষণায় দেখা যায়, প্রতিবছর উপকূলবর্তী এলাকায় ৬০০ থেকে ৮০০ মৃত কাছিম সৈকতে ভেসে আসে। আগত পর্যটকরা জানতেও পারে না, কেন তারা মারা পড়ে? অথচ উপকূলীয় এলাকায় উন্নয়ন, হোটেল-মোটেলের আলোর ঝলক, প্রবাল ধ্বংস, সৈকত দূষণ কাছিমের বংশবিস্তারে বড় প্রতিবন্ধকতা। সৈকতে আলো জ্বালালে এরা সহজেই বাধাপ্রাপ্ত হয় এবং ডিম না দিয়ে ফিরে যায়। আবার কখনও বালুচরে উঠতে না পেরে পানিতে ডিম দেয়। তবে সে ডিম থেকে কখনও বাচ্চা ফোটে না। মা হওয়ার আকাঙ্ক্ষা অপূরণ রেখে ফিরে যেতে হয় অন্য জায়গায়।
প্রাচীনকালে মানুষ যখন থেকে সমুদ্রে যাতায়াত ও তীরে বসবাস শুরু করে, তখন থেকে সামুদ্রিক কাছিমের সঙ্গে পরিচয় হয়। এরা সরীসৃপ। অতিপ্রাচীন এবং সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যারা ১০-১৫ কোটি বছর ধরে পৃথিবীতে টিকে আছে। এদের জীবনচক্র বড় জটিল ও রহস্যপূর্ণ। খাদ্যগ্রহণ এক জায়গায় আবার প্রজনন ক্ষেত্র আরেক জায়গায়। এ দূরত্ব প্রায় ১২ হাজার কিলোমিটার হতে পারে। জীবনচক্রে তারা বিভিন্ন সাগর-মহাসাগরে বিচরণ করে, নানাভাবে সামুদ্রিক পরিবেশ রক্ষা করে আসছে।
এখন পর্যন্ত অলিভ রিডলে, সবুজ কাছিম, হকসবিল, লগারহেড, লেদারব্যাক, ফ্লাটব্যাক ও ক্যাম্প রিডলে, এই সাত প্রজাতির সামুদ্রিক কাছিম বিশেজ্ঞরা শনাক্ত করেছেন। বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় এখন পর্যন্ত পাঁচ প্রজাতির সামুদ্রিক কাছিমের উপস্থিতির সন্ধান পাওয়ার তথ্য জানায় সামুদ্রিক কাছিম গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘মেরিন লাইফ অ্যালাইন্স’। তবে এ সংখ্যা কমে বর্তমানে শুধু ‘অলিভ রিডলে’ বালুচরে আসছে।
সামুদ্রিক কাছিমের সঙ্গে স্থলভাগের কাছিমের অনেক অমিল রয়েছে। যেমন- এরা মাথা লুকাতে পারে না। এদের পা’গুলো সমুদ্রে চলার জন্য সাঁতার উপযোগী। অনেকটা বৈঠার আকারে। একটি সামুদ্রিক কাছিম প্রাপ্তবয়স্ক হতে ২০ থেকে ২৫ বছর সময় লাগে। ওজন ৪০ থেকে ৬০ কেজি হয়।
স্ত্রী কাছিম প্রজাতিভেদে বছরে তিন থেকে সাতবার ডিম পাড়ে। শুকনো বালু সরিয়ে ৫০-৬০ বা ১০০-১১০ সেন্টিমিটার গভীর করসি আকারের গর্ত করে ১০০-১৫০টি গোলাকার সাদা ডিম দেয়। সামুদ্রিক কাছিমের বাচ্চা প্রাকৃতিক নিয়মে ডিম ফুটে বের হয়ে সমুদ্রে চলে যায়। জীবন বাঁচাতে সাগরে নেমেই টানা ৪৮ ঘণ্টার মতো সাঁতরে গভীর সাগরে যায়। বাচ্চা কাছিম যে সৈকতে জন্মে ছিল বয়ঃপ্রাপ্তির পর সে বালুচরেই তারা আবার ডিম দিতে আসে। বিজ্ঞানীরা এখনো নিশ্চিত নন কীভাবে সাগরের কাছিম নির্দিষ্ট সৈকত খুঁজে নিতে পারে। খাদ্য তালিকায় কাঁকড়া, শামুক-ঝিনুক, জেলিফিশ, সাগর শসা, চিংড়ি, লবস্টার, শ্যাওলা ও সামুদ্রিক ঘাস খেয়ে থাকে।
সামুদ্রিক কাছিম সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে সারা বিশ্বে হুমকিসমূহ কমানোর চেষ্টা চলছে। পরিযায়ী বলে কাছিম সংরক্ষণে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সমন্বয় প্রয়োজন। ২০০১ সালে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, ভারত মহাসাগরীয় দেশগুলো সামুদ্রিক কাছিম সংরক্ষণের জন্য একটি সমঝোতা চুক্তিতে স্বাক্ষর করে IOSEA, যা ‘Marine Turtle Mou’ হিসেবে পরিচিত। মূলত সাগরের কাছিম বিষয়ে শিক্ষা ও সচেতনতা বৃদ্ধিতে বাংলাদেশ সরকার ২০০৪ সালে IOSEA সামুদ্রিক কাছিম সমঝোতা চুক্তিতে স্বাক্ষর করে এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও ভারত মহাসাগরীয় এলাকতে সামুদ্রিক কাছিম রক্ষার জন্য অঙ্গীকারাবদ্ধ হয়। কিন্তু আজ পর্যন্ত নেই কোনো পর্যবেক্ষণ।
