Pages

Showing posts with label kolkata. Show all posts
Showing posts with label kolkata. Show all posts

Saturday, January 5, 2013

ট্রেনটি এখন কোথায়?

ট্রেনটি এখন কোথায়?

যুতসই জবাবই পেয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পশ্চিমবঙ্গের মানুষকে নববর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়ে তার ফেসবুক পেজে তিনি লিখেছেন- আমরা বদলালে পৃথিবীও বদলাবে। তাই চলুন আমাদের প্রত্যেকে প্রথম পদক্ষেপটা করি। আসছে বছরের নতুন সূচনা করি। মুখ্যমন্ত্রীর মুখে এই বদলানোর ডাক শুনেই তাকে পাল্টা বার্তা ফিরিয়ে দিয়েছেন ফেসবুক জনতা। তারা রাজ্যের কর্ণধারকেই আহ্বান জানিয়েছেন, নিজেকে প্রথমে বদলে দেখানোর জন্যে। পশ্চিমবঙ্গের চিত্র যখন এই তখন আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশেও দিনবদলের প্রশ্ন আজ জ্বলন্ত। চার বছর আগে এ দিনবদলের আওয়াজ তুলেই ক্ষমতার মসনদে আবির্ভূত হয় আওয়ামী লীগ তথা মহাজোট। জনঅভ্যুত্থানসহ নানা বিশেষণে মহিমান্বিত করা হয়েছে সে জয়কে। কিন্তু দিন কি বদলিয়েছে? নাকি খেলোয়াড়ই শুধু পরিবর্তন হয়েছে? এটা স্পষ্ট তেমন কিছুই বদলায়নি। পুরনো খেলাই চলছে নতুন করে। ওয়ান-ইলেভেনের শিক্ষা কথাটি আদর্শ লিপির পাঠ্য না হয়েও ছড়িয়ে পড়ে সবখানে। সে শিক্ষা যে কেউ নেয়নি চলতি ঘটনাপ্রবাহ তার সাক্ষী। জরুরি জমানার সেনাপ্রধান জেনারেল মইনের একটি উক্তি আলোচনার জন্ম দিয়েছিল সবখানে। তিনি বলেছিলেন, লাইনচ্যুত ট্রেনকে লাইনে তোলার চেষ্টা করছেন তিনি। সে ট্রেনটি এখন কোথায়? রাজনীতি নিয়ে কথা যত কম বলা যায় ততই ভাল। এটা ঠিক রাজপথে আগের সহিংসতার পরিমাণ অনেক কমেছে। তবে অশ্লীলতা বেড়েছে বহুমাত্রায়। রাজনীতিবিদরা একজন আরেক জনকে কালনাগিনী বলতেও পিছু হটছেন না। তবুও কিছু করার নেই। এদের নিয়েই এগোতে হবে আমাদের। ভবিষ্যতের পথে। মহাজোট জমানায় সবচেয়ে বড় অপরারেশন হয়েছে শেরে বাংলানগরের অপারেশন থিয়েটারে। সংবিধান কাটাছেঁড়া বাংলাদেশে নতুন কিছু নয়। তবে পঞ্চম সংশোধনীতে সংবিধানে যেভাবে কাটাছেঁড়া হয়েছে তা অভিনব। সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা কেটে ফেলা হয়েছে। দোহাই দেয়া হয়েছে সুপ্রিম কোর্টের রায়ের। অথচ সেই রায়েই বলা হয়েছে, জনগণ ও রাষ্ট্রের নিরাপত্তাই সর্বোচ্চ আইন। যেখানে দুই মেয়াদে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থাকে হালাল করা হয়েছে। যদিও নিশ্চিতভাবেই বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক রাজনীতিকে রাজনীতিবিদদের জন্য কঠিন করে দিয়ে গেছেন। ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া কোন পথে হয় সেটাই হবে এখন সবচেয়ে বড় দেখার বিষয়। শেখ হাসিনা তার এজেন্ডা পূরণের পথে বহু দূর এগিয়ে গেছেন। বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার আসামিদের মৃত্যুদণ্ড এরই মধ্যে কার্যকর করা হয়েছে। বিরোধীনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে তার সেনানিবাসের বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। স্বামীর স্মৃতিবিজড়িত বাড়ি থেকে উৎখাত হয়ে নিজের কান্না থামাতে পারেননি তিনি। খালেদা জিয়ার দুই ছেলে কার্যত নির্বাসনেই আছেন। ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর এরই মধ্যে সাজা হয়েছে ঢাকার আদালতে। লন্ডনে থাকা তারেক রহমানের বিরুদ্ধে বিচারাধীন রয়েছে এক ডজন মামলা। খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধেও সচল আছে একাধিক মামলা। শান্তিতে নোবেলজয়ী প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে উচ্ছেদ করা হয়েছে তার প্রাণপ্রিয় প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ ব্যাংক থেকে। সারা দুনিয়ার মানুষ তার ক্ষুদ্রঋণ মডেলের প্রশংসা করলেও নিজ ভূমে আক্রমণের শিকার হয়েছেন তিনি। যার উদাহরণ দিয়ে আলোচিত মন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেছেন, বাঘে ধরলে ছাড়ে, হাসিনা ধরলে ছাড়ে না। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতিহারের এক অন্যতম প্রধান এজেন্ডা ছিল যুদ্ধাপরাধের বিচার। নাম পরিবর্তন করে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার শুরু হয়েছে প্রায় তিন বিছর আগে। জামায়াত এবং বিএনপি’র এক ডজন নেতাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়েছে। তবে মাস খানেক আগে যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রথম চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। যখন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. নিজামুল হকের স্কাইপ আলাপ ফাঁস হয়ে যায়। এর সূত্র ধরে পদত্যাগ করতে হয় তাকে। বৃটেনের বিখ্যাত পত্রিকা দি ইকোনমিস্ট এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়ার্ল্ড স্ট্রিট জার্নালও এ বিচার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। দি ইকোনমিস্টের কাভারে মুদ্রিত হয়েছে, ইনজাস্টিস ইন বাংলাদেশ। মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের বাইরে এগিয়ে চলছে ২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা, ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলার বিচার। পিলখানা হত্যাযজ্ঞের বিচারও শেষ পর্যায়ে রয়েছে। যদিও এ বিচার প্রক্রিয়া নিয়েও হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ কয়েকটি মানবাধিকার সংস্থা প্রশ্ন তুলেছে। মহাজোট জমানায় শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারিতে সর্বস্ব হারিয়েছেন ৩৩ লাখ বিনিয়োগকারী। আত্মহত্যাও করেছেন তাদের কেউ কেউ। ইব্রাহিম খালেদের তদন্ত রিপোর্ট কার্যকর হয়নি আজও। ছাত্রলীগ চার বছর ধরেই ছিল বেপরোয়া। গত বছরের শেষ মাসে চাপাতি হাতে বিশ্বজিৎ দাস নামের এক নিরীহ পথচারীর ওপর যে নির্মমতায় ঝাঁপিয়ে পড়ে ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনটি তা হতবাক করেছে প্রত্যেক মানুষকে। ২৮শে অক্টোবর থেকে যে, বাংলাদেশ বেশি দূর এগোয়নি এ যেন তারই প্রমাণ। স্বপ্নের পদ্মা সেতু এখনও স্বপ্নই থেকে গেছে আবুল কাণ্ডে। শুরুতে স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন কোন ধরনের দুর্নীতির অভিযোগের সত্যতা না পেলেও পরে বিশ্বব্যাংকের চাপে পড়ে দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগে মামলা দায়ের করেছে। যদিও সে মামলায় পবিত্র সৈয়দ আবুল হোসেনকে আসামি করা হয়নি। হলমার্ক কেলেঙ্কারিতে সরকারের অনেক রাঘব বোয়াল জড়িত থাকার কথা শোনা গেছে। তবে প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের হাতে সময়মতো বই পৌঁছে দেয়া, লোডশেডিং কমানোর ক্ষেত্রে সফলতা দেখিয়েছে সরকার।
বিএনপি’র মতো দুর্বল বিরোধী দল পাওয়াকে শেখ হাসিনার সৌভাগ্য হিসেবে চিহ্নিত করেছেন বুদ্ধিজীবী সৈয়দ আবুল মকসুদ। গত চার বছরে বিএনপি চেষ্টা করছে সে দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক তৈরির ক্ষেত্রে অবশ্য বিএনপি সফলই হয়েছে। চীন ও ভারত সফরে উষ্ণ অভ্যর্থনাই পেয়েছেন বিরোধীনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। বিশেষ করে ভারতের সঙ্গে দূরত্ব কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে অনেকটা সফল হয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন। তবে সাংগঠনিক ক্ষেত্রে বিএনপি তেমন বড় কোন সফলতা দেখাতে পারেনি। খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর আজ পর্যন্ত একজন মহাসচিবও নিয়োগ দিতে পারেনি দলটি। ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কারাগারে থাকলেও এ নিয়ে তেমন রা নেই বিএনপিতে। আন্দোলনের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফিরিয়ে আনা হবে বার বার খালেদা জিয়া এ ঘোষণা দিলেও এ আন্দোলনের সামর্থ্য বিএনপি’র আছে কিনা এ নিয়ে প্রশ্ন রয়েই গেছে। সাবেক স্বৈরশাসক এইচএম এরশাদ আবারও এককভাবে নির্বাচন করে ক্ষমতায় যাওয়ার খোয়াবের কথা বলেছেন বার বার। তবে টাঙ্গাইল ও রংপুরের নির্বাচন তার সে স্বপ্ন ধূসর করে দিয়েছে অনেকটাই। জামায়াতে ইসলামী তাদের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। দলটির শীর্ষ সব নেতাই কারাগারে আটক রয়েছেন। তবে জামায়াত-শিবির কর্মীদের পুলিশের ওপর হামলার সমালোচনা করছেন অনেকেই। লক্ষ্যহীন আন্দোলন করছে দলটি এমনই ধারণা পর্যবেক্ষকদের। একটি কথা নিশ্চিত করেই বলা যায়, যতদিন যাবে রাজনীতি ততই কঠিন হবে। মানুষ বিক্ষুব্ধ। নেতাদের হাতে নিয়ন্ত্রণ সব সময় না-ও থাকতে পারে। তবে রাজনীতি জনতার হাতে থাকবে না অন্য কারও হাতে সময়ই সে প্রশ্নের জবাব দিতে পারবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যুতে রাজনীতিবিদরা সমঝোতায় পৌঁছাতে না পারলে সমূহ বিপদ অপেক্ষা করছে সবার জন্য। একটি ধর্ষণের ঘটনায় পুরো ভারতবাসীর একতাবদ্ধ প্রতিবাদ কিছুটা লজ্জাতেই ফেলে দিয়েছে বাংলাদেশকে। প্রায় একই সময়ে বাংলাদেশের টাঙ্গাইলে একই ধরনের ঘটনা ঘটলেও তার প্রতিবাদ দেখা যাচ্ছে না কোথাও। পুরো বাংলাদেশ যেন নীরব। চার বছরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে গুম সংস্কৃতি চালু হয়েছে। এক রাতে হঠাৎ হারিয়ে যাওয়া বিএনপি নেতা এম ইলিয়াস আলীর খোঁজ মিলেনি আজও। এমন আরও অনেকেই শিকার হয়েছেন গুমের। রাজনীতির বাইরে ক্রিকেটে গত চার বছরে মাঝে-মধ্যে কিছু সুখবর পেয়েছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশী তরুণীর হিমালয় চূড়ায় ওঠার ঘটনাও ঘটেছে।
শেষ কথা: রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ। কোথাও কোন সুখবর নেই। দিন বদলের বদলে গাঢ় অন্ধকারের দিকেই যাত্রা করছে বাংলাদেশ। তবে এতকিছুর মধ্যেও আশার কথা রয়েছে বিশ্বাসীদের জন্য। পবিত্র ধর্মগ্রন্থের উদ্ধৃতি অটোরিকশার পেছনে প্রায়ই চোখে পড়ে, ‘তোমরা যদি মুমিন হও, তোমরা হতাশ হয়ো না।’