আম্মাজান, কৃষ্ণবালা ও সুইসগিয়ার গ্রুপের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে ট্রেনের
যাত্রীরা। প্রতিদিনই দুর্ধর্ষ এই তিন গ্রুপের ছিনতাইকারীদের কবলে পড়ছেন
যাত্রীরা। তাদের টাকা-পয়সা ও মালামাল লুটে বগি থেকে লাফিয়ে লাফিয়ে হাওয়া
হয়ে যায় তারা। কেউ বাধা দিলে চলন্ত ট্রেন থেকে ফেলে দেয়া হয়। রেলওয়ে পুলিশ
সূত্র জানায়, ঢাকাগামী ট্রেনের প্রায় সব রুটেই ছিনতাইকারী ও ডাকাত দলের
অবাধ প্রবেশ। তাদের কাছে ট্রেনচালকও জিম্মি। বিশেষ কৌশলে ট্রেন থামিয়ে তারা
ইঞ্জিন বগিতে উঠে পড়ে। কখনও কখনও তাদের লোকজন আগে থেকেই ট্রেনে অবস্থান
করে, নির্ধারিত পয়েন্টে আসার পরপরই চেইন টেনে ট্রেন থামিয়ে ডাকাত দলের
প্রবেশে সুযোগ করে দেয়। এরপর একযোগে ডাকাতি শেষে পালিয়ে যায়। একই কৌশলে
গতকাল ভোরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার আখাউড়া থেকে ঢাকাগামী তিতাস কমিউটার
ট্রেনের তিনজন যাত্রীকে ছুরিকাঘাত করে চলন্ত ট্রেন থেকে ফেলে দিয়ে হত্যা
করা হয়েছে। নিহত দু’জনের পরিচয় পাওয়া গেলেও আরেকজনের পরিচয় মেলেনি। এরা
হলেন বিজয়নগর উপজেলার মিরাশানি গ্রামের সুদ মিয়া (৫০) ও তার প্রতিবেশী
সাহানা বেগম (৪০)। আহত হয়েছেন আখাউড়া পল্লী উন্নয়ন কর্মকর্তা খোরশেদ আলম।
খোরশেদকে জেলা সদর হাসপাতালের আইসিইউতে রাখা হয়েছে। তার মাথা, পা ও গলার
নিচে ছুরিকাঘাত করেছে ছিনতাইকারীরা। আহত খোরশেদ পুলিশের কাছে বলেন, ভোর
সাড়ে পাঁচটার দিকে ট্রেনটি ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলস্টেশনের কাছে ভাদুঘর
কুরুলিয়া রেলসেতু এলাকায় আসার পরপরই ছিনতাইকারীরা ছুরিকাঘাত করে তাদের ফেলে
দেয়। ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশ।
তাদের ধারণা এটি ভয়ঙ্কর ‘আম্মাজান’ গ্রুপের কাজ হতে পারে। রেলওয়ে সূত্রমতে,
বিভিন্ন ছিনতাইকারী দলের সক্রিয় সদস্য হয়েও ছদ্মবেশে রেলস্টেশনে সারা দিন
ঘুরে বেড়ায় ছিনতাইকারীরা। তাদের বয়স ১৭ থেকে ২৪ বছরের মধ্যে। কেউ পপকর্ন
বিক্রি করে। কেউ বাদাম কিংবা আমড়া। কিন্তু আসল পেশা তাদের ‘লেডিস কাম’। এর
মানে মহিলাদের স্বর্ণালঙ্কার ও ব্যাগ ছিনিয়ে নেয়া। একাজ তারা দিনের বেলায়ই
করতে পারে। রাত হলে উঠে পড়ে চলন্ত ট্রেনে। বগির বাতি নিভিয়ে যাত্রীদের
টাকা ও জিনিসপত্র ছিনিয়ে নেয়। এ কাজে তাদের মূল অস্ত্র বেল্ট। ছিনতাইয়ের
সময় কোন যাত্রী বাধা দিলে প্রথমে গলায় বেল্ট বেঁধে নির্যাতন এবং পরে চলন্ত
ট্রেন থেকে ফেলে দেয়। এ গ্রুপে আছে শিপন ওরফে বিল্লাল ওরফে বিলাই, জীবন
ওরফে অসহায় জীবন ওরফে দুখু মিয়া। রেলওয়ে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানায়,
‘আম্মাজান’ গ্রুপের সদস্যরা তাদের ওস্তাদ। নির্ধারিত ট্রেনে তাদের বখরা
দিয়েই তারা কাজ চালায়। ‘আম্মাজান’-এর মূল অস্ত্র বড় ড্যাগার ও ধারালো
অস্ত্র। বগিতে প্রবেশ করে একযোগে সবাইকে জিম্মি করে মালামাল লুটে চলন্ত
ট্রেন থেকেই সটকে পড়ে। এ গ্রুপের সক্রিয় সদস্য সোহেল, রাকিব, রনি ও জাভেদ।
‘সুইসগিয়ার’ গ্রুপের কাজ ছোট চাকু দিয়ে গলায় পোচ মারা। তারপরও উচ্চবাচ্য
করলে চ্যাংদোলা করে ট্রেন থেকে ফেলে দেয়া। এ গ্রুপে আছে রিপন, তোফাজ্জল,
সিলা মনির, রফিক, আলমগীর ও রানা। ২০১১ সালে গফরগাঁওয়ে জোড়া খুনের মামলায়
তারা এখন কারাগারে। তবে এ গ্রুপের অন্যান্য সদস্য এখনও সক্রিয়। রেলওয়ে
পুলিশ আরও জানায়, ‘লেডিস কাম’ পার্টির পুরনো নাম ‘কৃষ্ণবালা’। এরা যাত্রীর
গলায় গামছা ও বেল্ট পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে মালামাল লুট করে। বাধা দিলে ট্রেন
থেকে ফেলে দেয়। এদের সহজ বিচরণ ট্রেনের ছাদ ও বগিতে। প্রথমে ছাদে অবস্থান
নিয়ে কৌশলে খোলা দরজা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে। সুবিধাজনক জায়গায় পৌঁছলে
তাদের অপারেশন শুরু করে। গত ২৩শে ডিসেম্বর আন্তঃনগর ট্রেন তুরাগ এক্সপ্রেস
থেকে দুই বস্ত্র প্রকৌশলীকে ফেলে দেয় এ চক্রটি। পুলিশ ওই ঘটনায় পাঁচজনকে
গ্রেপ্তার করেছে। সমপ্রতি তাদের কর্মকাণ্ডের বর্ণনা করেছে আদালতের কাছে।
এরা হচ্ছে মমিন ওরফে সুজন ওরফে কালু (২০), শাহিন (২৪), রাব্বী ওরফে দুর্জয়
(১৭), মহাব্বত (২২) ও আকাশ (১৭)। আদালতে কালু তার জবানিতে দুই বস্ত্র
প্রকৌশলী মাজহারুল ইসলাম রিপন ও গোলাম মোরশেদ নয়নকে ফেলে দেয়ার নৃশংস ঘটনার
বর্ণনা দেয়। সূত্র জানায়, ২০১২ সালে বিভিন্ন রুটের ট্রেনে একের পর এক
ছিনতাই ও ডাকাতির পর দুর্ধর্ষ কৃষ্ণবালা পার্টির নাম জানতে পারে পুলিশ। পরে
ওই গ্রুপের ১১ সদস্যকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়। তাদের বর্ণনায় বের হয়ে
আসে কিভাবে গলায় গামছা পেঁচিয়ে চলন্ত ট্রেন থেকে যাত্রীদের ফেলে হত্যা করা
হয়। পরে পুলিশের সতর্কতা এবং ট্রেনের ছাদে ওঠার ওপর নিষেধাজ্ঞার কারণে এহেন
অপরাধ কর্মকাণ্ড কিছুটা কমে আসে। তবে গত বছরের শেষের দিকে আবারও এসব
পার্টি স্বয়ংক্রিয় হয়ে ওঠে। কমলাপুর জিআরপি থানা পুলিশ জানায়, ২৩শে
ডিসেম্বর সকালে তুরাগ এক্সপ্রেসে জয়দেবপুর যাওয়ার সময় তেজগাঁও রেলস্টেশনের
কাছে চলন্ত ট্রেন থেকে দুই প্রকৌশলী মাজহারুল ইসলাম রিপন ও গোলাম মোরশেদ
নয়নকেও ফেলে দেয় ছিনতাইকারীরা। একই বগির যাত্রী রেলের এক সাবেক
পয়েন্টম্যানকেও খিলক্ষেত এলাকায় ট্রেন থেকে ফেলে দেয় একই চক্র। এ ঘটনায়
২৫শে ডিসেম্বর কমলাপুর জিআরপি থানায় মামলা করেন রিপনের বড় ভাই মনিরুল
ইসলাম। গত ১৯শে নভেম্বর সন্ধ্যায় আজিজুর রহমান নামের এক চিকিৎসককে গাজীপুরে
তুরাগ এক্সপ্রেস থেকে ফেলে হত্যা করা হয়। আজিজুর রহমান স্বাস্থ্য
মন্ত্রণালয়ের অবসরপ্রাপ্ত উপ-পরিচালক এবং পলমল গার্মেন্টের চিকিৎসক ছিলেন।
গত ১৭ই ডিসেম্বর পদ্মা এক্সপ্রেস ট্রেনে শারমিন সুলতানা নামে এক নারী
ছিনতাইকারীর কবলে পড়েন। কমলাপুর জিআরপি থানার ওসি আলাউদ্দিন চৌধুরী বলেন,
সমপ্রতি ট্রেন থেকে কয়েকজনকে ফেলে দেয়ার অভিযোগ পাওয়ার পরপরই বেশির ভাগ
আসামিকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এখন আমাদের আওতাবহির্ভূত
এলাকায় কিছু ঘটনা ঘটছে।
No comments:
Post a Comment