অমর একুশে আজ

আজ মহান ২১শে ফেব্রুয়ারি। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। বাঙালি বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষায় জীবন দিয়েছিল যেদিন, তা-ই একুশে ফেব্রুয়ারি। এ দিনের ইতিহাস, মুখের ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করতে আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো রাজপথের ইতিহাস। প্রাণ দিয়ে সেই ইতিহাস সৃষ্টি করেছিল বাংলার সূর্যসন্তান, ভাষাসৈনিকেরা। এদিন এখন শুধু বাঙালির নয়। সবার জন্য পালনীয়। ১৯৫২-এর এদিনে জীবন দিয়েছেন সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, শফিউরসহ নাম না জানা অনেকে। আজ তার ৬১তম বার্ষিকী। তাদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানিয়ে দিনটি শুরু হলো বাঙালির। আজ একুশের প্রথম প্রহর থেকে শহীদদের জন্য শ্রদ্ধাঞ্জলি নিয়ে শহীদ মিনারে সমবেত সবাই। মধ্য রাতেই শুরু হয়েছে সে জমায়েত। কেবল বাংলাদেশে নয়। বিশ্বের সব প্রান্তে আজ পালিত হবে বীরের রক্তস্রোত আর মায়ের অশ্রুভেজা অমর একুশে।
৬১ বছর আগের এই দিনে বাংলার সংগ্রামী ছেলেরা যে ত্যাগ ও গৌরবগাথা রচনা করেছিলেন তারই পথ ধরে আমরা মুখোমুখি হই স্বাধীনতা সংগ্রামে। রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত হয় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। লাভ করি লাল সবুজের পতাকা। বাঙালির রক্তস্নাত ভাষা আন্দোলনের স্বীকৃতি দিয়ে জাতিসংঘের সহযোগী সংস্থা ইউনেস্কো ১৯৯৯ সালের ১৭ই নভেম্বর ২১শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণা করে। এরপর থেকেই যথাযোগ্য মর্যাদায় সারা বিশ্বে একযোগে পালিত হয়ে আসছে দিনটি। এবারও বিশ্বের সব ক’টি দেশে পালিত হবে মহান একুশে। মহান ভাষা দিবস উপলক্ষে প্রেসিডেন্ট জিল্লুর রহমান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়া পৃথক বাণী দিয়েছেন। মধ্যরাতে একুশের প্রথম প্রহরে পুরো জাতি শ্রদ্ধা জানিয়েছে ভাষাশহীদদের। সারা দেশের সব রাস্তার শেষ ঠিকানা ছিল শহীদ মিনার। লাখো কণ্ঠে ধ্বনিত হয়, ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি আমি কি ভুলিতে পারি?’ একুশের প্রথম প্রহরে রাত ১২টার পর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে প্রথমে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন প্রেসিডেন্ট মো. জিল্লুর রহমান। এরপর একে একে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, জাতীয় সংসদের স্পিকার এডভোকেট আবদুল হামিদ, মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, জাতীয় সংসদের স্পিকার, ঢাকা সিটি মেয়র, বিভিন্ন কূটনৈতিক মিশনের প্রধান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, তিন বাহিনীর প্রধান শহীদ বেদিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। ফুলে ফুলে ছেয়ে যায় শহীদ মিনার। নানা শ্রেণী-পেশার মানুষের হৃদয় নিংড়ানো শ্রদ্ধা আর ভালবাসায় সিক্ত হয় স্মৃতির মিনার।
শহীদ মিনারে যাওয়ার পথ
ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য আজিমপুর কবরস্থান ও কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে যাতায়াতের জন্য একটি রুটম্যাপ নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি কিছু রাস্তা নিরাপত্তার জন্য বন্ধ করা হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একুশে উদযাপন কেন্দ্রীয় সমন্বয় কমিটি এটি প্র্রণয়ন করে। ১. পুরানো হাইকোর্টের সামনের রাস্তা দিয়ে দোয়েল ক্রসিং, বাংলা একাডেমী, টিএসসি মোড়, উপাচার্য ভবনের পাশ দিয়ে নীলক্ষেত পুলিশ ফাঁড়ি মোড়, নিউ মার্কেট-ক্রসিং পার হয়ে আজিমপুর কবরস্থানের উত্তর দিকের গেইট দিয়ে কবরস্থানে প্রবেশ করবেন এবং শহীদদের কবর জিয়ারতের পর আজিমপুর গোরস্তানের মূল গেইট (দক্ষিণ দিকের) দিয়ে বের হয়ে আজিমপুর সড়ক হয়ে পলাশী মোড় ও ফুলার রোড মোড় হয়ে অর্থাৎ সলিমুল্লাহ হল ও জগন্নাথ হলের সামনে দিয়ে শহীদ মিনারে যাবেন। ২. গোরস্তানে না গিয়ে বিকল্প পথে যারা শহীদ মিনারে যেতে চান তারা ভিসি ভবন পার হয়ে নীলক্ষেত পুলিশ ফাঁড়ি মোড় থেকে বাম দিকের রাস্তা দিয়ে (জহুরুল হক হলের পশ্চিমের রাস্তা) সলিমুল্লাহ হল ও জগন্নাথ হলের সামনের রাস্তা হয়ে শহীদ মিনারে যেতে পারবেন। ৩. নিউ মার্কেট ক্রসিং থেকে হোম ইকোনমিক্স ও ইডেন কলেজের সামনের রাস্তা দিয়েও আজিমপুর (বেবী আইসক্রিম) মোড়, পলাশী মোড় হয়ে সলিমুল্লাহ হল ও জগন্নাথ হলের সামনের রাস্তা হয়ে শহীদ মিনারে যাওয়া যাবে। ৪. চাঁনখার পুল এলাকা থেকে বকশীবাজার মোড় হয়ে বুয়েটের দক্ষিণ পাশের রাস্তা দিয়েও পলাশী মোড় হয়ে সলিমুল্লাহ হল ও জগন্নাথ হলের সামনের রাস্তা দিয়ে শহীদ মিনারে যাওয়া যাবে।
যেসব রাস্তা বন্ধ থাকবে
নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলার জন্য টিএসসি মোড় থেকে জগন্নাথ হলের পূর্ব পাশের রাস্তা অর্থাৎ শিব বাড়ির পশ্চিম পাশ দিয়ে শহীদ মিনারে ও মেডিকেল কলেজে যাওয়ার রাস্তা সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে। এছাড়া ভিসি ভবন গেট থেকে ফুলার রোড মোড় পর্যন্ত রাস্তা এবং চাঁনখার পুল থেকে কার্জন হল পর্যন্ত রাস্তা জনসাধারণের যাতায়াতের জন্য সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে। শহীদ মিনারে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণের পর সেখান থেকে বিশ্ববিদ্যালয় খেলার মাঠের সামনের রাস্তা দিয়ে দোয়েল চত্বর ও পেছনের রাস্তা দিয়ে চাঁনখার পুল হয়ে শুধুমাত্র প্রস্থান করা যাবে, শহীদ মিনারের দিকে আসা যাবে না।
নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তায় ঢাকা
শ্রদ্ধা নিবেদনের সময় গতকাল বিকাল থেকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকা ছিল পর্যাপ্ত নিরাপত্তায় ঢাকা। মিনারমুখী সব রাস্তায় ছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যের সতর্ক পাহারা। তাদের সঙ্গে পুরো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে দায়িত্ব পালন করে বিশ্ববিদ্যালয় বিএনসিসি ও রোভার স্কাউটের কয়েক হাজার সদস্য। সন্ধ্যা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টিকার ছাড়া কোন গাড়ি বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ঢুকতে দেয়া হয়নি। সমন্বয় কমিটির সদস্য সচিব ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর আমজাদ আলী বলেন, অমর একুশে উদযাপনের জন্য শহীদ মিনার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও আশপাশের এলাকায় যথাযথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। র্যাব পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।
নানা কর্মসূচি: দিবস উপলক্ষে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে আয়োজন করা হয়েছে বিস্তারিত কর্মসূচি।
ইতিহাসের পাতা থেকে
১৯৫২ সালের এই দিনে পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠী ঘোষিত ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মায়ের ভাষা প্রতিষ্ঠার দাবিতে আন্দোলনরত বাঙালি রাজপথ রক্তে রঞ্জিত করে। উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রতিবাদ কর্মসূচির অংশ হিসেবে ২১শে ফেব্রুয়ারিকে সামনে রেখে হরতালের প্রস্তুতি চলতে থাকে। সরকার ২০শে ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা ছয়টায় একটানা এক মাসের জন্য ঢাকা জেলার সর্বত্র হরতাল, সভা, মিছিলের ওপর ১৪৪ ধারা জারি করে। এসব নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ছাত্ররা দলে দলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জমায়েত হয়। ঐতিহাসিক আমতলায় ছাত্রদের সভা থেকে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। পরিকল্পনা করা হয়, চারজন চারজন করে মিছিল নিয়ে বের হওয়ার। ছাত্ররা মিছিল শুরু করলে পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করে ট্রাকে তুলতে থাকে। বেলা তিনটায় গণপরিষদের অধিবেশনের আগেই শুরু হয়ে যায় ছাত্র-পুলিশ সংঘর্ষ। বিকাল চারটায় পুলিশ ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনে ছাত্রদের ওপর গুলি চালায়। বুলেট কেড়ে নেয় জব্বার ও রফিকের প্রাণ। গুলিবিদ্ধ আবুল বরকত রাত পৌনে আটটায় হাসপাতালে মারা যান। তাদের মৃত্যু সংবাদে বাংলা ভাষার প্রাণের দাবি সারা দেশে স্ফুলিঙ্গের মতো ছড়িয়ে পড়ে। এরপর থেকেই একুশে ফেব্রুয়ারি অমর ভাষা দিবস হিসেবে পালনের রেওয়াজ চালু হয়। সারা দেশে তৈরি হয় অসংখ্য শহীদ মিনার।
প্রেসিডেন্টের বাণী: মহান শহীদ দিবস উপলক্ষে প্রেসিডেন্ট মো. জিল্লুর রহমান তার বাণীতে বলেন, ভাষা আন্দোলন কেবলই আমাদের মাতৃভাষার দাবি আদায় করেনি, বরং তা বাঙালি জাতীয়তাবোধের উন্মেষ ঘটায় এবং স্বাধিকার অর্জনে বিপুলভাবে উদ্বুদ্ধ করে। বাঙালি অর্জন করে মাতৃভাষার অধিকার। ভাষা আন্দোলন আমাদের নিজস্ব ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতির লালনসহ সামনে এগিয়ে যাওয়ার অফুরন্ত প্রেরণা যোগায়, অন্যায়-অবিচার ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে উজ্জীবিত করে। তিনি বলেন, ভাষা ও সংস্কৃতি হাত ধরাধরি করে চলে। পৃথিবীর বর্ণাঢ্য ভাষা ও সংস্কৃতির বহমান ধারাকে বাঁচিয়ে রাখতে লুপ্তপ্রায় ভাষা ও সংস্কৃতিকে রক্ষায় বিশ্ববাসী আরও অবদান রাখবেন বলে আমার বিশ্বাস।
প্রধানমন্ত্রীর বাণী: পৃথক বাণীতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, মহান একুশে বাঙালির জীবনে শোক, শক্তি ও গৌরবের প্রতীক। আজ তা দেশের সীমানা ছাড়িয়ে ১৯৩টি দেশের মানুষের প্রাণের অনুরণিত হয়। সারা বিশ্বের সকল নাগরিকের সত্য ও ন্যায়ের অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রেরণার উৎস আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস।
No comments:
Post a Comment