শমলার জীবনের মোড় ঘুরেনি এখনও
শমলা জানেন না তাকে নিয়ে লেখা ‘ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প’ জাতিসংঘ পুরস্কার পেয়েছে। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) বাংলাদেশের দুই কর্মকর্তা মাহতাব হায়দার ও নাদের রহমানের লেখা ‘শমলার ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প’ বিশ্বের ৬৬টি দেশ থেকে ১২০টি গল্পের মধ্যে দ্বিতীয় স্থান দখল করেছে। কিন্তু শমলার জীবনের মোড় এখনও ঘুরেনি। সাত বছর আগে নিরুদ্দেশ হওয়া স্বামী জালালের ফিরে আসার অপেক্ষায় আছেন আজও। বলেন, আমার স্বামী ফকির মানুষ। মাজারে মাজারে ঘুরে। গান শোনে। কোথায় আছে কি জানি! আজও তার অপেক্ষায় আছি। এই কষ্ট আমার কপালে আছিল। সে যাওয়ার পর আমি খালি কানছি। কথা বলতে পারি নাই। আমার তিন বছরের মেয়েটাও কথা বন্ধ করে দেয়। কতো হাসপাতাল, মর্গে তারে তালাশ করছি। মানসে কইতো, তোমার স্বামী গেছে গা। কান্না কইরা কি হইবো। স্থানীয়রা বলেন, দুইটা মেয়ে জন্ম হওয়ার কারণেই ঘর ছেড়ে পালিয়েছে জালাল। তারপর অনেক সংগ্রাম করে শমলা স্বাবলম্বী হয়েছেন। মেয়েদের রেখে তার বাপ গেছে। মা-ওতো পালিয়ে যেতে পারতেন। পারতেন আত্মহত্যা করতে। তিনি তা করেননি। বলেন, তাইলে ওরা কই যাইতো? ওদের জন্যই আমি সংগ্রাম করেছি। আমার বড় কোন আশা নেই। ওরা যেন আমার চেয়ে একটু ভাল থাকে। সুখ কইরা যেন ওরা খাইতে পারে- এটাই আশা।
১৪ বছর আগে গ্যারেজ শ্রমিক জালালের সঙ্গে বিয়ে হয় শমলার। চার বছর পর প্রথম তার কোলজুড়ে আসে কন্যা সন্তান শাহনাজ আক্তার (১০)। আরও তিন বছর পর শমলা পেটে ধারণ করেন আরেক কন্যা রত্নাকে (৭)। তের দিনের কন্যাসহ সংসার ফেলে ভবঘুরে স্বামী উধাও হয়ে যায় এক সকালে। সাত বছর ধরে নিরুদ্দেশ সে। ঋণ আর বন্ধকের দায়ে জর্জরিত সংসারে কপর্দকহীন শমলা তখন নিরুপায়। তবু হাল ছেড়ে দেননি। একটি চায়ের দোকান তার ভাগ্য বদলে দিয়েছে। শমলা এখন স্বাবলম্বী। দুই কন্যা শাহনাজ আর রত্নাকে বিদ্যালয়ে পাঠিয়েছেন। শমলার জীবন জয়ের এই গল্প এখন বিশ্বজয়ী। নিজের বয়স কত তাও বলতে পারেন না তিনি। কত বছর বয়সে বিয়ে হয়েছিল তাও জানেন না। বিয়ের আগে খেলতেন, বেড়াতেন। বাবা-মা মারা গেছেন স্বামী পালানোর আগেই। দুই ভাই আর দুই বোনের মধ্যে ছোট তিনি। বড়বোনও মারা গেছেন। তার নাম ছিল কমলা। শমলা নামটুকুই শুধু লিখতে পারেন। আর কোন অক্ষরজ্ঞান নেই। মেয়েরা কে কোন ক্লাসে পড়ে তাও জানেন না। জানেন শুধু স্কুলে যায় ওরা। এমনকি তারা অসুস্থ হলে তিনি ডাক্তারের কাছে যান না। পাশের কবিরাজের কাছ থেকে তাবিজ আর পানি পড়া এনে সুস্থ করেন সন্তানদের। শমলা বলেন, ছোট্ট মাইয়াডা রাইতে চিৎকার কইরা ওঠে। এইডাতো আর ডাক্তারে সারাইতে পারব না তাই তাবিজ লাগাইছি। বড় মেয়ে শাহনাজ জানায়, বস্তির এক স্কুলে তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ে। ছোট মেয়ে স্কুলে যাচ্ছে বছর খানিক ধরে। ১৪ বছর ধরেই রাজধানীর কড়াইল বস্তির জামাই বাজার মহল্লায় বাস করেন শমলা। সেখান থেকেই স্বামী পালিয়ে যায়। যে ঘরটিতে থাকতেন তা শমলার ভাইয়ের। কিছুদিন ভাইদের সহায়তায় সেখানে থাকলেও এখন ভাড়া দিতে হয় ভাইকে। একটি ছোট্ট খুপরি ঘরের ভাড়া মাসে এক হাজার টাকা। স্থানীয় বস্তিবাসী অধিকার সুরক্ষা কমিটির সদস্য হুমায়ূন কবিরের মাধ্যমেই প্রথম আড়াই হাজার টাকা অনুদান পায় ইউএনডিপির আরবান পার্টনারশিপ ফর পোভার্টি রিডাকশন (ইউপিপিআর) প্রকল্প থেকে। সেই টাকার সঙ্গে ভাইয়ের দেয়া কিছু টাকা এবং মানুষের বাড়িতে কাজ করে জমানো টাকা মিলিয়ে মোট পাঁচ হাজার টাকা পুঁজি সংগ্রহ হয়। সেই পুঁজি নিয়ে থাকার ঘরের অর্ধেক জায়গায় শুরু করেন একটা চায়ের দোকান। দুই মাসের মধ্যেই পুুঁজির চেয়ে বেশি মুনাফা লাভ করেন শমলা। চা আর বিস্কুট দিয়ে শুরু করা দোকানে একে একে এনেছেন ফ্রিজ, টিভি, আরও আনুষঙ্গিক জিনিস। তা দিয়ে এখন ভাল চলছে তার দোকান। অভাব কেবল স্বামীর। সন্তানের বাবার।
পুরস্কার প্রাপ্ত ওই গল্পে উঠে আসে, শমলার মতো আরও প্রায় ৫৫ হাজার হতদরিদ্র পরিবারকে অর্থসহায়তা করেছে ইউএনডিপির ওই প্রকল্প। তরুণ তরুণীদের কারিগরি দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য ওই প্রকল্পের মাধ্যমে সহায়তা দেয়া হয়েছে। যার মাধ্যমে গত এক দশকে বাংলাদেশের দারিদ্র্যের হার অর্ধেকে নেমে এসেছে। জীবনযুদ্ধে সফল সেই সব মানুষেরই একজন শমলা। শমলার এই সাফল্য নিয়ে ইউএনডিপি প্রশাসক হেলেন ক্লার্ক বলেন, গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি সফল হয়েছে। মানবিক উন্নতি ঘটেছে বিভিন্ন স্তরে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এখন বাংলাদেশকে বিভিন্নভাবে মডেল হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। গত ২৮শে জানুয়ারি সোমবার বিকালে (বাংলাদেশ সময় মঙ্গলবার ভোর রাত) জাতিসংঘ সদর দপ্তরে এক অনুষ্ঠানে এ পুরস্কার প্রদান করা হয়। ইউএনডিপি প্রশাসক হেলেন ক্লার্কের কাছ থেকে পুরস্কার গ্রহণ করেন জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ড. একেএ মোমেন। এ সময় ইউএনডিপির প্রেসিডেন্ট রোবেল ওলহাইয়ে, বাংলাদেশের অর্থ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. আসাদুল ইসলাম এবং জাতিসংঘে বাংলাদেশের ইকোনমিক মিনিস্টার বরুণ দেব মিত্র উপস্থিত ছিলেন।
No comments:
Post a Comment