নয়া লেবাসে এমএলএম ব্যবসা
বাহারি সব নামে অর্থ হাতিয়ে নেয়ার আবারও নয়া ফাঁদ পেতেছে বেশ কয়েকটি এমএলএম কোম্পানি। খোদ রাজধানী শহরে বসেই ওই প্রতারণার জাল পাতা হচ্ছে দেশব্যাপী। এবার মাত্র ৫ মাসে দ্বিগুণ টাকা দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে মাঠে কর্মী নামানো হয়েছে। সূত্রমতে ইতিমধ্যে এরাও হাতিয়ে নিয়েছে কয়েক কোটি টাকা। সরজমিনে অনুসন্ধানকালে দেখা গেছে, রাজধানীর পান্থপথে বসুন্ধরা সিটির রেস্টুরেন্টে বসে কাজ করছে দু’টি কোম্পানি, পুরানা পল্টন কেন্দ্রিক একটি, উত্তরা এলাকায় তিনটি এবং বনানীতে একটি প্রতারক চক্র। গোয়েন্দা সূত্রমতে বিগত তিন বছরে দেশের দেড় কোটি গ্রাহকের প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে ৬২টি এমএলএম কোম্পানি। গোয়েন্দাদের রিপোর্টে হাতিয়ে নেয়া টাকার পরিমাণ ১০ হাজার কোটি টাকা বলা হলেও প্রতারিত গ্রাহকদের মতে হাতিয়ে নেয়া টাকার পরিমাণ কম করে হলেও ২৫ হাজার কোটি টাকা। গত বছর ডিসেম্বর মাসে সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থা এমএলএম কোম্পানিগুলোর একটি গোয়েন্দা প্রতিবেদন তৈরি করে। ওই প্রতিবেদনে দেখা যায় দেশে ৬২টি এমএলএম কোম্পানি বছরে দ্বিগুণ লাভ দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে দেশের প্রায় দেড় কোটি গ্রাহকের কাছ থেকে ১০ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। ওই ৬২টি এমএলএম কোম্পানির মধ্যে একমাত্র ডেসটিনি’র গ্রাহক সংখ্যা ৫০ লাখের বেশি। ওই সব প্রতারক এমএলএম কোম্পানিগুলো হচ্ছে-গ্লোবাল নিউওয়ে প্রাঃ লিমিটেড, ইউনিপেটুইউ, ইউনিগেটওয়ে, ডেসটিনি ২০০০ লিঃ, ভিসার্যাব, মানিসুইম, রেভনেক্স, স্পিক এশিয়া, লিনাক্স, টিভিআই, ইউনাইকো, এম স্টার, এমওয়ে, গুগল ইডুকেশন, মিটস আইটি ডেভেলপমেন্ট, ভাইভ মাউন্টেন, জুরতি, স্কাই ল্যান্সর, টাইমটু পেমেন্ট, রিসওডালন্ড, ক্রিয়েশন, ডায়মন্ড ফরেক্স, ইউনি ফরেক্স, ইউনোব্যান, এ্যাসিনিটি গ্রো, মাইকোব্রিফ, পারফেক্ট রিস, গেইনপ্লাস, ডিসিএল, মাইক্রোডেট টেকনোলজি, দি ব্লু, ওসানা, ইউনাইডেট ফরেক্স, ইস্কোপবিডি, সার্ভে ওয়ার্ল্ড, ডোল্যান্চার, বিডিএফ, ক্লিকটুপে, পিক এশিয়া অনলাইন, মা, যুবক, রুটস, ফাইন্যান্স, র্যাবন এক্স, পলিকম, ইজেন্ট ইন্টারন্যাশনাল, ল’ এ্যাট ভিশন, ইউনি গেটওয়ে।
সরকারি গোয়েন্দা প্রতিবেদনে ৬২টি প্রতারক এমএলএম কোম্পানিকে প্রতারক হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও এ পর্যন্ত সরকারিভাবে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে মাত্র যুবক, ডেসটিনি ও ইউনিপেটুইউ’র কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। অনুসন্ধানে দেখা যায় বাহারি সকল নামের ওই সব এমএলএম কোম্পানির বেশির ভাগের উৎপত্তিস্থল দেশের বাইরে। অনলাইন ভিত্তিক প্রতারণার কাজে বাইরের কোন দেশের নিয়ন্ত্রিত সফটওয়্যার ব্যবহার করা হয়েছে। দেখা গেছে, প্রতারক প্রতিষ্ঠান ইউনিপেটুইউ’র নিয়ন্ত্রণ ছিল মালয়েশিয়ার কয়েক ব্যক্তির হাতে। গ্লোবাল নিউওয়ে নিয়ন্ত্রণ করে ভারতীয় বংশোদ্ভূত এক কানাডিয়ান নাগরিক ও এক শ্রীলঙ্কার নাগরিক। বাংলাদেশ থেকে প্রতারণার মাধ্যমে হাতিয়ে নেয়া ওই সব এমএলএম কোম্পানিগুলোর টাকা পাচার হয়েছে বিদেশে। কি পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার করা হয়েছে সরকারের কাছে তার সঠিক কোন পরিমাণ না থাকলেও গ্রাহকদের সূত্রে জানা গেছে, ইউনিপেটুইউ’র বেশির ভাগ টাকা পাচার করা হয়েছে মালয়েশিয়াতে, গ্লোবাল নিউওয়ের টাকা চলে যাচ্ছে কানাডায়। দুর্নীতি দমন কমিশনের এক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ডেসিটিনি’র বিপুল অঙ্কের টাকা পাচার করা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, কানাডা, হংকং ও সিঙ্গাপুরে। ওই সব দেশের ব্যাংকগুলোতে ডেসটিনি ও ডেসটিনির এমডি রফিকুল আমিনের নামে একাধিক ব্যাংক একাউন্টের সন্ধান পেয়েছে দুদক। সিঙ্গাপুরে ২টি ব্যাংক একাউন্টের সন্ধান পাওয়া গেছে। সেখানে রফিকুল আমিনের ব্যাংক একাউন্টে গচ্ছিত আছে ৬৪, ৫৮১ সিঙ্গাপুরি ডলার এবং ডেসটিনি’র নামে একাউন্ট খুলে রাখা হয়েছে ১৩ হাজার সিঙ্গাপুরি ডলার। হংকংয়ের একটি ব্যাংকে ডেসটিনি’র এমডি রফিকুল আমিনের নামে আছে বাংলাদেশের মুদ্রায় ৫০ কোটি টাকা। বেস্ট এভিয়েশনের নামে একাউন্ট খুলে রফিকুল আমিন ফ্রান্সের একটি ব্যাংকে রেখেছেন ৮৪ হাজার ৬শ’ ইউরো। এছাড়াও দুদক কানাডার কনস্কোভশিয়ার ব্যাংক ও যুক্তরাষ্ট্রের জেপি মরগান পেজ ব্যাংকে রফিকুল আমিনের নামে অর্থের সন্ধান পেয়েছে দুদক। দুদকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা মনে করছেন ৬২টি এমএলএম কোম্পানির হাতিয়ে নেয়া টাকার পুরোটাই হয়তো বিদেশে পাচার করা হয়েছে, ব্যাপক অনুসন্ধান করলে হয়তো সেটা বের করা সম্ভব।
দেশের দেড় কোটি গ্রাহকের ওই বিপুল পরিমাণ টাকা হাতিয়ে নেয়ার পরও অনুসন্ধানে পাওয়া গেছে ওই প্রতারক কোম্পানিগুলোর দ্বিতীয় ও তৃতীয় সারির প্রতারকরা নতুন লেবাসে আবার দেশব্যাপী প্রতারণার ফাঁদ পেতে বসেছে। নতুন লেবাসে ওই সব এমএলএম কোম্পানিগুলো হচ্ছে ইউনি ফরেক্স, গ্লোবাল নিউওয়ে, টু পার্সেন্ট ইউনি ফরেক্স, পিপি মেঘা, বুলিস ট্রেড ও জাস্ট বিল পেইড ও বি ব্লু। মাত্র ৫ মাসে বিনিয়োগকৃত টাকার দ্বিগুণ লাভ দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তারা নয়া ফাঁদ পেতেছে। রাজধানীর পল্টন এলাকার একটি অভিজাত খাবার হোটেলে দিন-রাত বসে ইউনি ফরেক্স এমএলএম কোম্পানি পরিচালনা করছে জাহিদ নামের এক যুবক। ওই যুবক এক সময়ে কাজ করতো ইউনিপেটুইউ’র দালাল হিসেবে। পুরানা পল্টনে তারা একটি অফিসও ভাড়া নিয়েছে। অফিস ডেকোরেশনের কাজ চলছে। মোবাইল ফোনে সারা দেশের ইউনিপেটুইউ’র কর্মীদের আবার গোছানো হচ্ছে মাত্র ৫ মাসে দ্বিগুণ লাভের প্রতিশ্রুতি দিয়ে। গ্লোবাল নিউওয়ে পরিচালনা করছে এক ভারতীয় বংশোদ্ভূত কানাডিয়ান ও এক শ্রীলঙ্কার নাগরিক। রাজধানীর বনানীর চেয়ারম্যান বাড়িতে বিশাল আলিশান ভবনের দু’টি ফ্লোর ভাড়া নিয়ে চলছে তাদের অফিস। রাজধানীর পান্থপথের বসুন্ধরা সিটির দু’টি রেস্টুরেন্টে বসে কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে টু পার্সেন্ট ইউনি ফরেক্স ও বি ব্লু নামের দু’টি এমএলএম প্রতারক প্রতিষ্ঠান। বি ব্লু কোম্পানির কর্ণধার হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিচ্ছেন মিঠু নামের এক যুবক এবং টু পার্সেন্ট ইউনি ফরেক্সের দেশীয় প্রতিনিধি হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিচ্ছে আফিস নামের এক যুবক। তাদের সূত্রে জানা গেছে, মাত্র তিন মাসে দ্বিগুণ লাভ দেয়ার প্রতিশ্রুতিতে ইতিমধ্যেই তাদের বেশ কিছু গ্রাহক জুটে গেছে। যদিও তারা জানান, অন্য কোম্পানির মতো তারা প্রতারক নন, গ্রাহকের টাকায় ব্যবসা করেই তারা গ্রাহকদের লাভ সহ টাকা ফেরত দিতে পারবেন। নতুন লেবাসে প্রতারক ব্যবসায় নাম লেখানো এমএলএম কোম্পানি বুলিস ট্রেড পিপি মেঘার এমডি বলে পরিচয় দেয়া এমএ মাসুম ও নাকিব হাসান দু’জনই তাদের প্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয় উত্তরা এলাকায় বলে জানান। আপাত অফিসের ঠিকানা প্রকাশ করা নিষেধ বলে জানান। সূত্রমতে নতুন লেবাসে এমএলএম কোম্পানি চালু করা ওই দুই যুবক একসময়ে কাজ করতো জিজিএন নামের একটি এমএলএম কোম্পানিতে। জিজিএন প্রতারণা করে চলে যাওয়ার পর তারা কাজ করতো নিউওয়েতে সেখান থেকে ইউনিপেটুইউতে। এখন তারা নতুন লেবাসে নতুন নামে শুরু করেছে এমএলএম ব্যবসা। সরকারের কোন দপ্তরের অনুমোদনহীন ও সকল প্রতারক প্রতিষ্ঠান যে আবারও সর্বনাশা খেলায় নেমেছে সে খবর রাখে না সরকারের কোন বিভাগ।
No comments:
Post a Comment