Pages

Friday, February 1, 2013

আতঙ্কের নাম তিতাস কমিউটার- চলন্ত ট্রেন থেকে ফেলে ৩ যাত্রী হত্যা

আতঙ্কের নাম তিতাস কমিউটার- চলন্ত ট্রেন থেকে ফেলে ৩ যাত্রী হত্যা


এটিই প্রথম ঘটনা নয়। তিতাস কমিউটারের যাত্রী হয়ে এর আগেও মৃত্যুমুখে পতিত হয়েছেন অনেক যাত্রী। আর গতকাল দুর্বৃত্তরা ট্রেন থেকে ছুড়ে ফেলে দিয়ে হত্যা করলো ৩ যাত্রীকে। আহত হয়েছেন ২ জন। একটি কামরার ৫ জন যাত্রীকেই চলন্ত ট্রেন থেকে ছুড়ে ফেলা হয় সর্বস্ব হাতিয়ে নেয়ার পর। ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান দুই যাত্রী। যদিও তাদের অবস্থা গুরুতর। গতকালের এ ঘটনার পর এ ট্রেনটিতে দুর্বৃত্তদের নিয়মিত অভিযানের আরও অনেক ঘটনা বেরিয়ে এসেছে। আখাউড়া-ঢাকার মধ্যে চলাচলকারী তিতাস কমিউটার ট্রেনটি গতকাল সকাল সাড়ে ৫টায় আখাউড়া থেকে ছেড়ে পাঘাচং রেলস্টেশনে পৌঁছলে তাতে ডাকাতরা হানা দেয়। ৭-৮ জনের ডাকাত দলটি ইঞ্জিনের পেছনের বগিটিতে ওঠে। ওই কামরায় যাত্রী ছিলেন ৫ জন। এর মধ্যে একজন মহিলা। ঘটনার শিকার আখাউড়া কালাছড়া গ্রামের রুবেল মিয়া (২২) জানান, ডাকাতরা কামরাতে উঠেই এলোপাতাড়ি মারধর করতে শুরু করে সবাইকে। তার কাছ থেকে নগদ ২ হাজার টাকা ও মোবাইল ফোন নিয়ে দরজা দিয়ে তাকে ছুড়ে বাইরে ফেলে দেয়। সমতল জায়গায় পড়ায় তিনি প্রাণে বেঁচে যান। এভাবে একে একে বাকি ৪ যাত্রীকেও ছুড়ে মারা হয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের কাউতলী রেল ব্রিজে ওঠার আগে পরে ডাকাতরা আরও ৩ যাত্রীকে ছুড়ে ফেলে। এই ৩ জনই ঘটনাস্থলে মারা যান। তাদের একজনের লাশ পাওয়া গেছে কুরুলিয়া রেলসেতুর নিচে পাথরের ওপর। এ থেকে আরও কয়েক শ’ গজ দক্ষিণে পাওয়া গেছে বাকি দু’জনের লাশ। ফজরের নামাজ শেষে লোকজনের চলাফেরা শুরু হলে তারা লাশ পড়ে থাকতে দেখে। খবর পেয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর থানা ও আখাউড়া জিআরপি থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে লাশগুলো উদ্ধার করে। নিহত ৩ জনের মধ্যে ২ জনের পরিচয় পাওয়া গেছে। তারা হচ্ছেন বিজয়নগর উপজেলার মেরাশানী গ্রামের সুদ মিয়া (৫০) এবং একই গ্রামের মুসলিম মিয়ার স্ত্রী শাহানা বেগম (৪০)। তারা দু’জন সম্পর্কে চাচা-ভাইঝি। দুপুরে খবর পেয়ে তাদের স্বজনরা ছুটে আসেন জেলা সদর হাসপাতালে। লাশ দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন। দুপুরে ময়নাতদন্ত শেষে স্বজনদের কাছে লাশ বুঝিয়ে দেয়া হয়। আখাউড়া জিআরপি থানার ওসি আবুল কালাম আজাদ বলেন, ডাকাতরা তাদের ছুড়ে ফেলে দিয়েই হত্যা করেছে। তাদের শরীরে ধারালো অস্ত্রের কোন আঘাত ছিল না। তিনি জানান, ট্রেনে ঢাকা জিআরপির একটি টহল দল ছিল। তবে ঘটনার সময় তারা কোথায় ছিল তা তিনি জানাতে পারেননি। বলেন, তাদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলে এ ব্যাপারে জানবো। তবে এলাকার লোকজন ট্রেনে জিআরপি দায়িত্ব পালন করা না করা নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ করেন। সকালে ঘটনাস্থলে গেলে ভাদুঘর ও কাউতলী এলাকার অনেক লোকজন জানান, তারা প্রায়ই এভাবে রেললাইনের পাশে রক্তাক্ত মানুষ পড়ে থাকতে দেখেন। গতকাল এ ট্রেনটিতে মোট ৬টি যাত্রীবাহী বগি ছিল।
আতঙ্কের ট্রেন: শুধু গতকালই ছুড়ে ফেলে দিয়ে ৩ জনকে হত্যা করেনি দুর্বৃত্তরা- এর আগে ঘটেছে এমন আরও অনেক ঘটনা। আশুগঞ্জ থেকে আখাউড়া পর্যন্ত সীমানায় ট্রেনটিতে দুর্বৃত্তরা নিয়মিতই এমন ঘটনা ঘটিয়ে নেমে পড়ছে। এখানে সেখানে রেললাইনের পাশে আহত-অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকছে মানুষ। ২রা ডিসেম্বর রাতে তিতাস কমিউটার ট্রেনে ছিনতাইয়ের পর চলন্ত ট্রেন থেকে ছুড়ে ফেলে দেয়া হয় এক ব্যবসায়ীকে। ব্যবসায়ীকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায় পুলিশ। ছিনতাইকারীরা তার কাছে থাকা নগদ ২ হাজার টাকা, মোবাইল ফোন, বেশ কিছু টাইলস এবং আচারের সামগ্রী নিয়ে যায়। আখাউড়া উপজেলা কমপ্লেক্স সংলগ্ন বাসিন্দা, আচার ব্যবসায়ী নজরুল ইসলাম ওই রাতে তিতাস কমিউটার ট্রেনে করে ঢাকা থেকে ফিরছিলেন। রাত সাড়ে ১১টার দিকে ভাতশালা এলাকায় ট্রেনটি ধীরগতিতে চলতে থাকলে চারজন যুবক ট্রেনের ওই বগিতে ওঠে। তাদের মধ্য থেকে একজন এসে লাভলুর কাছে সিগারেট চায়। একটু পরেই সংঘবদ্ধ হয়ে এসে সবাই মিলে তাকে প্রচণ্ড মারধর শুরু করে। এক পর্যায়ে গলায় দড়ি পেঁচিয়ে চলন্ত ট্রেন থেকে তাকে ফেলে দেয়া হয়। এরপর ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর থানার টহল পুলিশের একটি দল এদিক দিয়ে গেলে একজনকে হাত উঠিয়ে সাহায্য চাইতে দেখে পুলিশের দলটি এগিয়ে যায়। পরে রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধারের পর তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সপ্তাহ দুয়েক আগে রাত দেড়টার দিকে এক মহিলা আখাউড়া রেলজংশনে এসে কান্নাকাটি করতে থাকেন। জানান, তার ছেলেকে তালশহরের এখানে চলন্ত ট্রেন থেকে ফেলে দেয়া হয়েছে। পরে ওই ছেলের কি দশা হয়েছে তা আর জানা যায়নি। এ ঘটনার মাস দুয়েক আগে ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে পাঘাচং যাওয়ার পথে কাছাইট গ্রামের আবদুল হান্নানকে চলন্ত ট্রেন থেকে ফেলে দেয় দুর্বৃত্তরা। আবদুল হান্নান দুধ বিক্রেতা। রাতে বাড়ি ফেরার পথে ঘটনার শিকার হন তিনি। তাকে ফেলা হয় কুরুলিয়া রেলব্রিজের কাছে। আহত অবস্থায় সেখান থেকে তিনি কাউতলী এলাকায় এসে লোকজনের সহায়তায় হাসপাতালে ভর্তি হন। অনুসন্ধানে জানা গেছে, অহরহই এমন ঘটনা ঘটছে। ট্রেনটি সকাল ৫টায় ঢাকার পথে ঠিক সময়ে ছাড়লেও রাতে ঢাকা থেকে এর পৌঁছার সময় ঠিক থাকে না। ব্রাহ্মণবাড়িয়া স্টেশনে এর পৌঁছার সময় রাত পৌনে ৯টা হলেও কখনও ১১টা-১২টার আগে পৌঁছায় না। এরপর এখান থেকে আখাউড়া পৌঁছতে বেজে যায় সাড়ে ১২টা-১টা। তবে আশুগঞ্জ থেকে আখাউড়া পর্যন্ত সীমার মধ্যেই দুর্বৃত্তরা সুযোগ বুঝে যাত্রীদের ওপর চড়াও হয়। আখাউড়া জিআরপি থানার ওসি আবুল কালাম আজাদ বলেছেন, তার এমন ঘটনা জানা নেই। তার এখানে যোগদানের পর এমন ঘটনা ঘটেনি।

No comments:

Post a Comment