নীতিমালা প্রস্তুত- বৈধ হচ্ছে পুলিশের ডোনেশন বাণিজ্য

বৈধ হচ্ছে পুলিশের ডোনেশন বাণিজ্য। এতদিন ডোনেশন নেয়া ছিল রেওয়াজ। এবার আইনি কাঠামোর মধ্যে তা আনা হচ্ছে। এ নিয়ে খসড়া নীতিমালাও তৈরি করা হয়েছে। শিগগিরই তা চূড়ান্ত করা হবে। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় খসড়াটি তৈরি করেছে। এতে ২টি কমিটির মাধ্যমে ডোনেশন নেয়ার কথা বলা হয়েছে। পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স কর্তৃক ৫ সদস্যর কমিটি প্রথমে ডোনেশন দিতে ইচ্ছুক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বিষয়ে খোঁজ-খবর নিয়ে প্রতিবেদন দেবে। পরে ডোনেশন গ্রহণ অনুমোদন নামের আরও একটি কমিটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিষয়ক সংসদীয় কমিটিতে সমপ্রতি এ নীতিমালা উপস্থাপন করা হয়েছে। বিভিন্ন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে পুলিশ ডোনেশন হিসেবে গাড়ি, আসবাবপত্র কিংবা অন্যান্য সরঞ্জাম নিয়ে থাকে। এদিকে ডোনেশন নেয়ার বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে বেশ কিছু যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে- পুলিশ বিভাগে মোট জনবল প্রায় ১ দশমিক ৫ লাখ এর বেশি। বিগত ৪ বছরে বাংলাদেশ পুলিশ বিভাগে আনুমানিক ৩০ হাজার নতুন জনবল অন্তর্ভুক্ত হলেও সে অনুযায়ী যানবাহনের সংখ্যা বৃদ্ধ পায়নি। বাংলাদেশ পুলিশের সব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে গতিশীলতা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। যে কোন ঘটনা সংঘটনের আগে অথবা ঘটনা পরবর্তী সময়ে ন্যূনতম সময়ে ঘটনাস্থলে পুলিশের উপস্থিতি জনমনে আইনশৃঙ্খলা সম্পর্কে ইতিবাচক নির্দেশক হিসেবে কাজ করে। আর পুলিশ সদস্যদের এ গতিশীলতা নিশ্চিতকরণে যানবাহনের কোন বিকল্প নেই। এতে বলা হয়েছে, যেহেতু বাংলাদেশ পুলিশ বিভাগে যানবাহনে তীব্র সঙ্কট বিদ্যমান, কাজেই আইনশৃঙ্খলা সমুন্নত রাখার স্বার্থে বিভিন্ন সময় পুলিশ বিভাগের বিভিন্ন ইউনিট কর্তৃক ডোনেশনের গাড়ি নেয়া হয়। যেহেতু সম্পূর্ণ সরকারি কাজে এবং কেবলমাত্র আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার্থেই এ রূপ ডোনেশনের গাড়ি ব্যবহার করা হয়, কাজেই এক্ষেত্রে নীতিমালা প্রণয়ন করা যেতে পারে।
ডোনেশন নীতিমালায় যা আছে
নীতিমালায় আটটি ধারার কথা বলা হয়েছে। এগুলো হচ্ছে- ১ম, ডোনেশনের গাড়ি গ্রহণ সংক্রান্তে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স কর্তৃক ন্যূনতম ৫ সদস্যদের একটি কমিটি গঠন করা যেতে পারে। ২য়, বাংলাদেশ পুলিশের যে কোন ইউনিট কর্তৃক ডোনেশন গ্রহণের প্রস্তাবনা ওই কমিটি কর্তৃক পর্যবেক্ষণ ও নিরীক্ষা করা হবে। ৩য়, গঠিত কমিটি কোন প্রস্তাবনাপ্রাপ্ত হয়ে ওই প্রস্তাবনার গ্রহণযোগ্যতা সম্পর্কে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন পেশ করবে। ওই প্রতিবেদনে ডোনেশনকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য বিশেষ করে ব্যক্তি বা প্রাতিষ্ঠানিক সুনাম, ঋণ সংক্রান্ত তথ্য, ফৌজদারি মামলা সংক্রান্ত তথ্য, স্থানীয় এলাকায় ভাবমূর্তি এবং ডোনেশনের প্রস্তাবনার ক্ষেত্রে পুলিশ সদস্যদের কার্যক্ষেত্রে কোন নেতিবাচক প্রভাব বিস্তারের সম্ভাবনা রয়েছে কিনা এতদ্সংক্রান্তে প্রয়োজনীয় সব তথ্য ও উপাত্ত বিশ্লেষণপূর্বক ডোনেশন গ্রহণের পক্ষে বা বিপক্ষে সুস্পষ্ট মতামত প্রদান করবেন। ৪র্থ, ডোনেশন গ্রহণ অনুমোদন সংক্রান্ত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক একটি পূর্ণাঙ্গ কমিটি করা যেতে পারে। ৫ম, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক গঠিত কমিটি পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স কর্তৃক একই উদ্দেশ্যে গঠিত কমিটির কাছ থেকে প্রাপ্ত প্রস্তাবনা যাচাই-বাছাই পূর্বক এ সংক্রান্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবে। ৬ষ্ঠ, ডোনেশন গ্রহণের পক্ষে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রাপ্ত হলে এ জাতীয় যানবাহনের পৃথক তালিকা পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স কর্তৃক সংরক্ষণ করা হবে। ৭ম, পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স কর্তৃক প্রেরিত //টিওঅ্যান্ডই-এর প্রস্তাবনা চূড়ান্ত অনুমোদনকালে ডোনেশনকৃত যানবাহনের সঙ্গে টিওঅ্যান্ডই// অন্তর্ভুক্ত নতুন যানবাহন সমন্বয় করা হবে। এবং ৮ম, ডোনেশনকৃত যানবাহন রেজিস্ট্রেশন, ব্যবহার, মেরামত, সংরক্ষণ, দুর্ঘটনা, আর্থিক সংশ্লেষ এবং অকেজোকরণে সরকারি নীতিমালা অনুসরণ করা হবে।
ডোনেশন বাণিজ্য নিয়ে দ্বন্দ্ব
এর আগে গত বছরের ২৮শে আগস্ট বিষয়টি নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিষয়ক সংসদীয় কমিটিতে বিরোধ দেখা দেয়। সংসদীয় কমিটি ডোনেশন নেয়ার বিপক্ষে অবস্থান নেয়। ওই বৈঠকে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এডভোকেট সাহারা খাতুন ও মহাপুলিশ পরিদর্শক (আইজিপি) হাসান মাহমুদ খন্দকার পক্ষে মত দেন। তাদের যুক্তি ছিল- ডোনেশন নেয়া বন্ধ হলে পুলিশি তৎপরতায় ভাটা পড়বে। একই সঙ্গে দেশের সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা কঠোর করাও বাধাগ্রস্ত হবে। বৈঠকে কমিটির সভাপতি আবদুস সালাম বিষয়টি উত্থাপন করেন। তিনি বলেন, বিভিন্ন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে পুলিশ বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ধরনের ডোনেশন নিয়ে থাকে। এটা অনুচিত। এতে অনেক আইন ভঙ্গকারী বিনিময়ে পুলিশের কাছ থেকে সুবিধা পেয়ে থাকেন। নামে ডোনেশন হলেও পরে বিষয়টি ঘুষ হিসেবে দেখা দেয়। তাই এখনই এটা বন্ধ করা উচিত। সভাপতির এ বক্তব্যর পরই সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এর বিরোধিতা করেন। তিনি বলেন, এখনই এটা বন্ধ করা উচিত হবে না। পুলিশের নানা সমস্যা রয়েছে। সীমাবদ্ধতাও অনেক। ডোনেশন হিসেবে অনেকেই গাড়ি, আসবাবপত্র কিংবা অন্যান্য সরঞ্জাম দিয়ে থাকেন। এগুলো দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ রাখতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। এ নিয়ে কমিটির বেশ কয়েকজন সদস্য যুক্তি-পাল্টা যুক্তি দেখান। এ প্রসঙ্গে আইজিপি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য সমর্থন করেন। পরে সংসদীয় কমিটির পক্ষ থেকে বিষয়টি একটি আইনি কাঠামোর মধ্যে আনার পরামর্শ দেয়া হয়। সংসদীয় কমিটি তাদের পরামর্শে বলে, অভিযুক্ত কিংবা অভিযোগকারী কারও কাছ থেকে কোন ধরনের ডোনেশন নেয়া যাবে না। এ প্রসঙ্গে কমিটির সদস্য জাতীয় পার্টি দলীয় এমপি মুজিবুল হক মানবজমিনকে বলেন, বিষয়টি নিয়ে কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্টমন্ত্রী ভিন্ন মত দিয়েছেন। তবে কমিটির সদস্যরা আলোচনা শেষে আইনি কাঠামোর মধ্যে পুলিশের ডোনেশন নেয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন। এখন যেভাবে ডোনেশন নেয়া হচ্ছে তা মোটেই আইনসিদ্ধ নয় বলে জানান তিনি।