বড় লোক হওয়ার জন্য ৫শ' টাকার চাকু!
মিরপুরে নারী আইনজীবীর হত্যা :দুই আসামি গ্রেফতার
স্বপ্ন বড় লোক হবার। এজন্য গার্মেন্টসে চাকরি দিয়ে শুরু। না সেখানেও ফলাফল শূন্য। এরপর গার্মেন্টসের চাকরি ছেড়ে নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকায় আসা। এবার চেষ্টা কোন বিত্তবানের বাড়ি দারেয়ান হওয়া অথবা প্রাইভেটকার চালকের চাকরি। সফল হয়নি। পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেখে এমিকন সিকিউরিটি কোম্পানিতে গার্ডের চাকরি জোটে। আর সিকিউরিটি কোম্পানিতেই পরিচয় সমমনা যুবক রবিনের সঙ্গে। তারা কোম্পানি মালিককে অনুরোধ করে একই বাড়িতে দায়িত্ব নেয়। এরপর পরিকল্পনা শুরু করে টার্গেট পূরণে। প্রথম পরিকল্পনা ছিল প্রাইভেট চুরির। ব্যাটে বলে তা মেলেনি। এরপর টার্গেট করে ডাকাতির। ডাকাতির জন্য প্রয়োজন অস্ত্র। কিন্তু আগ্নেয়াস্ত্র সংগ্রহ করাও দুঃসাধ্য। এ অবস্থায় নিরাপত্তা (গার্ড রুম) রুমের সিলিং ফ্যান বিক্রি করে ৫শ টাকা দিয়ে কেনে অত্যাধুনিক চাকু। আর তা দিয়ে প্রথম অভিযান শুরু করে গত ৩১ ডিসেম্বর সকালে। বাড়ির তিন তলার বাসিন্দা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএর শিক্ষক মাহবুব-ই-সাত্তারের ফ্ল্যাটে। হত্যা করে তার স্ত্রীকে। লুট করে ২০ হাজার টাকা ও ৫শ ডলারসহ অন্যান্য মালামাল। নিজের সম্পর্কে এভাবে বক্তব্য দেয় আইনজীবী রওশন আক্তার খুনের ঘটনায় জড়িত রাসেল ওরফে সাকিব। মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) দুইটি টিম বুধবার রাতে নারায়ণগঞ্জ ও ময়মনসিংহ থেকে সাকিব ও তার সহকর্মী সোলায়মান ওরফে রবিন ওরফে তাজুলকে গ্রেফতার করে। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে তারা নিজের জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে বিস্তারিত বর্ণনা করে। ডিবি পুলিশ গতকাল তাদের ৬ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে।
গত ৩১ ডিসেম্বর সকাল ১০টার দিকে মিরপুরের ৬ নম্বর সেকশনের এ ব্লকের ৩ নম্বর সড়কের ৪ নম্বর শেলটেক টিউলিপ ভবনের তিন তলার একটি ফ্ল্যাটে খুন হন আইনজীবী রওশন আক্তার। রবিন ও রাসেল ঐ বাড়ির নিরাপত্তা কর্মী ।
ডিসি ডিবি (উত্তর) মোল্লা নজরুল ইসলাম জানান, গ্রেফতারকৃতরা অল্প সময় বড়লোক হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে প্রথমে গাড়ি চুরি করার পরিকল্পনা করেছিল। গাড়ি চুরিতে ব্যর্থ হয়ে তারা স্বর্ণ ও টাকা লুটের জন্য হত্যা করার পরিকল্পনা করে।
তিনি আরও বলেন, গ্রেফতারকৃতরা পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেখে মৌচাকে সিকিউরিটি নিয়োগকারী একটি নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের কাছে ১০ হাজার টাকা জমা রেখে ভুয়া কাগজপত্র জমা দিয়ে এমিকন সিকিউরিটি কোম্পানিতে চাকরি নেয়। শেলটেক টিউলিফ ভবন ফ্ল্যাটের ফ্ল্যাট মালিক সমিতি নাম ঠিকানা যাচাই-বাছাই না করে এমিকন সিকিউরিটি কোম্পানি হতে সিকিউরিটি ভাড়া করেছিল।
ডিবি এডিসি মশিউর রহমান বলেন, রবিন ও রাসেল গত ১০ ডিসেম্বর সিকিউরিটি কোম্পানির পক্ষ থেকে শেলটেক টিউলিপ এপার্টমেন্টে সিকিউরিটি গার্ড হিসেবে দায়িত্ব পায়। এরপরই তারা এপার্টমেন্টের কোন ফ্ল্যাটে চুরির পরিকল্পনা করতে থাকে। এরই ধারাবাহিতায় গত ১৮ ডিসেম্বর সিদ্ধান্ত নেয় আইনজীবী রওশন আক্তার ফ্ল্যাটে চুরি করার। পরিকল্পনা মোতাবেক গার্ড রুমের সিলিং ফ্যান বিক্রি করে ৫০০ টাকা দিয়ে চাকু কেনে। ঘটনার দিন সকালেই রওশন আক্তারের স্বামী ও ডাক্তার মেয়ে বাসা থেকে বের হন। এ সুযোগে তারা রওশন আক্তারের ফ্ল্যাটে গিয়ে কলিংবেল টেপে। দরজা খোলেন রওশন আক্তার।
দরজা খোলার পরপরই তারা ভেতরে ঢোকে। রবিন বালিশের কভার দিয়ে রওশনের মুখ চেপে ধরে। আর রাসেল চাকু দিয়ে ভয় দেখায়। এ অবস্থায় তারা দুজনে মিলে তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। এরপর আলমারি ও ওয়ারড্রব ভেঙ্গে ২০ হাজার টাকা, ৫শ মার্কিন ডলার, কয়েকটি ঘড়ি, কয়েকটি স্বাক্ষর করা ব্ল্যাঙ্ক চেক নিয়ে গার্ড রুমে যায়।
তিনি আরও বলেন, হত্যার এক পর্যায়ে ধস্তাধস্তি করতে গিয়ে রাসেলের হাত কেটে যায়। তারা নীচে এসে গার্ড রুম থেকে একটি ছেঁড়া লুঙ্গির অংশ দিয়ে হাত বাঁধার সময় নীচের গাড়ির একজন চালক তা দেখে ফেলে। এ সময় চালক তাদের জিজ্ঞাসা করে, 'কী হয়েছে'? তখন রাসেল ও সোলায়মান জানায়, তারা উপরে খেলতে গিয়ে হাত কেটে ফেলেছে। এর কিছু সময় পর তারা ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।
ডিবির সহকারী পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম ও আবু তোরাব বুধবার নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানাধীন লামা এলাকায় এবং ময়মনসিংহের চরপাড়া এলাকায় পৃথক অভিযান চালিয়ে সোলায়মান ওরফে রবিন ওরফে তাজুল (১৯) ও রাসেল ওরফে সাকিবকে গ্রেফতার করেন।
No comments:
Post a Comment