Pages

Thursday, January 10, 2013

এশিয়ান হিউম্যান রাইটস কমিশনের রিপোর্ট- সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা মানতে ব্যর্থ সরকার

এশিয়ান হিউম্যান রাইটস কমিশনের রিপোর্ট- সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা মানতে ব্যর্থ সরকার


নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগকে স্বাধীন করা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের দেয়া নির্দেশনা বাস্তবায়নে বাংলাদেশ সরকার ব্যর্থ হয়েছে। ১৯৯৯ সালের ২রা ডিসেম্বর সুপ্রিম কোর্ট এ সংক্রান্ত একটি নির্দেশনা দিয়েছিল। তাতে বিচার বিভাগকে কিভাবে আলাদা করা যায় সে নির্দেশনা দেয়া হয়েছিল। কিন্তু সরকার তা মানতে ব্যর্থ হয়েছে। তবে স্বাধীন বিচার বিভাগ নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সরকার বাধ্য। এশিয়ান হিউম্যান রাইটস কমিশনের এক প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছে। ৮ই জানুয়ারি এ সংগঠনের নিজস্ব ওয়েবসাইটে ‘বাংলাদেশ: হোয়াই শুড জুডিশিয়াল ইন্ডিপেন্ডেন্স বি ডিলেইড এনি ফারদার?’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়। এতে বলা হয়, ১৯৮৫ সালে ইতালির মিলানে অনুষ্ঠিত অপরাধ প্রতিরোধ ও অপরাধীদের সঙ্গে আচরণ সম্পর্কিত জাতিসংঘের সপ্তম কংগ্রেসে গৃহীত বিচার বিভাগের স্বাধীনতার মূল নীতি অনুযায়ী সমস্ত সদস্য রাষ্ট্র তার দেশের বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে বাধ্য। কিন্তু বাংলাদেশে বিচার বিভাগ নির্বাহী বিভাগ থেকে স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে দাঁড়াতে লড়াই করছে। এ দেশটির জন্মের সময় থেকেই এই লড়াই চলছে। বিশেষ করে মাসদার হোসেনের নেতৃত্বে বিচারিক একটি গ্রুপ ১৯৯৫ সালে এ বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে হাইকোর্ট ডিভিশনে তোলেন। সেই থেকে এ বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। মাসদার হোসেন এখন জেলা ও দায়রা জজ। ১৯৯৯ সালের ২রা ডিসেম্বর সুপ্রিম কোর্ট সরকারকে নির্দেশনা দিয়েছে বিচার বিভাগকে কিভাবে নির্বাহী বিভাগ থেকে আলাদা করা যায় তা নিয়ে। তাতে একে কিভাবে প্রাতিষ্ঠানিক ও আর্থিক সমর্থন দেয়া যায় তা-ও বলা হয়। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার সুপ্রিম কোর্টের সেই নির্দেশনা মানতে ব্যর্থ হয়েছে। যদি আদালতের ওই ডিক্রি মানা হতো তাহলে তাতে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা অনেকটাই ফিরে আসতো। ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বিচার বিভাগের স্বাধীনতার বিষয়টি ফের সুপ্রিম কোর্ট আমলে নিয়েছেন। আদালত বিচার বিভাগের কর্মকর্তাদের বেতন বাড়িয়ে ও তাদের অন্যান্য আর্থিক সুবিধা বৃদ্ধি করে বিচার বিভাগের আর্থিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সরকারকে নির্দেশনা দিয়েছেন। দৃশ্যত, নীতিনির্ধারক পর্যায়ের চাপে সরকার আদালতের সেই নির্দেশনা বাস্তবায়ন করার পথে। এতে বলা হয়, ১৯৮৫ সালে মিলানে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের ওই সম্মেলনে প্রথম যে মৌলিক নীতি গৃহীত হয়েছিল তাতে বলা হয়েছে- রাষ্ট্র কর্তৃক বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত হতে হবে এবং তা সংবিধান অথবা দেশের আইন দ্বারা সুরক্ষিত হতে হবে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতার প্রতি সম্মান দেখানো ও তা রক্ষা করা সব সরকার ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব। ওই রিপোর্টে আরও বলা হয়, বিচার বিভাগের স্বাধীনতার উন্নয়ন প্রক্রিয়া কিভাবে এগিয়ে গেছে ইতিহাস থেকে সে বিষয়ে অনুপ্রেরণা নিতে পারে বাংলাদেশ সরকার। অবশ্য যদি তারা তা মনে করে। কর্নওয়ালিস কোড অনুযায়ী, ১৭৯৩ সালে তৎকালীন বঙ্গে নির্বাহী বিভাগ থেকে জেলা জজকে স্বাধীন করা হয়। ওই বঙ্গ থেকেই আজকের এই বাংলাদেশের উৎপত্তি। কর্নওয়ালিস কোড যখন অনুসরণ করা হতো তখন জেলা কালেক্টরেট থেকে জেলা জজের কাছে বিচারিক ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয়। বাংলাদেশের জাতীয় এনসাইক্লোপেডিয়া, যার নাম বাংলাপিডিয়া- তাতে বলা হয়েছে, প্রশাসনিক উত্তরাধিকার রীতিতে বেতন ও সম্মান (স্ট্যাটাস)-এর দিক দিয়ে ডিস্ট্রিক্ট কালেক্টরের চেয়ে জেলা জজদের উঁচুতে স্থান দেয়া হয়েছে। ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বিচার বিভাগের স্বাধীনতার গ্যারান্টি দেয় এমন বেশ কিছু ধারা আছে বর্তমান সংবিধানে। উদাহরণ হিসেবে বলা হয় ২২ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে- ‘নির্বাহী বিভাগ হইতে বিচার বিভাগের পৃথকীকরণ। রাষ্ট্রের নির্বাহী অঙ্গসমূহ হইতে বিচার বিভাগের পৃথকীকরণ রাষ্ট্র নিশ্চিত করিবেন।’ বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে সরকার বাধ্য তা এই ধারায় পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা হয়েছে। সংবিধানের ৩৫ (৩) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে- ‘ফৌজদারী অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তি আইনের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন ও নিরপেক্ষ আদালত বা ট্রাইব্যুনালে দ্রুত ও প্রকাশ্য বিচার লাভের অধিকারী হইবেন।’ এখানে বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের স্বাধীন বিচার বিভাগ পাওয়ার মৌলিক অধিকারের কথা বলা হয়েছে। সংবিধানের ৯৪ (৪) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে- ‘এই সংবিধানের বিধানাবলী-সাপেক্ষে প্রধান বিচারপতি এবং অন্যান্য বিচারক বিচারকার্য পালনের ক্ষেত্রে স্বাধীন থাকিবেন।’ এখানে চূড়ান্তভাবে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ধারণায় অর্থনৈতিক স্বাধীনতাকে অখণ্ড হিসেবে দেখানো হয়েছে।
আইনের শাসনের অধীনে সত্যিকারের গণতন্ত্রের ক্রমবিকাশ ও তার পরিপক্বতার জন্য স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রয়োজন। বাংলাদেশ গত চার দশক একটি স্বাধীন দেশ। এরই মধ্যে তাদের এই শিক্ষা পাওয়া ও তা অর্জন করা উচিত ছিল। কিন্তু তার পরিবর্তে বিচার বিভাগ রয়েছে ক্ষমতাসীনদের নিয়ন্ত্রণে। এর ফলে বিরোধী রাজনীতিকদের হয়রানি করা হয়। সুশীল সমাজের স্বাধীনতাকে অস্বীকার করা হয় ও দায়মুক্তিকে উৎসাহ দেয়া হয়। ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশের পুরো বিচারিক পরিমণ্ডলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- স্বাধীন বিচারিক প্রতিষ্ঠান বলতে যা হওয়ার কথা তা থেকে অনেক দূরে রয়েছে ফৌজদারী বিচারিক প্রতিষ্ঠানগুলো। এর ফলে নিখোঁজ, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, ব্যাপক নির্যাতন, নিরাপত্তা হেফাজতে অন্যান্য রকম নির্যাতন হচ্ছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলো নির্বাহী বিভাগের শক্তিশালী অঙ্গ। এসব মানবাধিকার ও সুশীল সমাজ নিপীড়নের বিচারে নির্বাহী বিভাগ থেকে মুক্ত না হওয়ায় বাংলাদেশের ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থা যন্ত্র অপারগ, অপ্রস্তুত ও কম শক্তিশালী। এতে আরও বলা হয়েছে, এর ফলে দেশে ন্যায়বিচারের ধারণায় প্রচণ্ড ধস নেমেছে। বিচার বিভাগকে স্বাধীনতা দেয়া না হলে অথবা বিচার বিভাগ আদর্শ মানে না এলে বিচার নিয়ে জনগণের আস্থা শক্তিশালী হবে না। কিন্তু বাংলাদেশে এ চিত্র তার ঠিক উল্টো।

No comments:

Post a Comment