ছাত্রলীগ নেতাদের নির্দেশেই হামলা
বিশ্বজিৎ হত্যাকাণ্ডে অন্যতম অভিযুক্ত রফিকুল ইসলাম শাকিলকে অবশেষে প্রেপ্তার করেছে গোয়েন্দা পুলিশ। বিশ্বজিৎকে যারা ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে জখম করে, শাকিল তাদের হোতা। তাকে নিয়ে বিশ্বজিৎ হত্যায় অভিযুক্ত ছয়জনকে গ্রেপ্তার করল ডিবি পুলিশ। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অবরোধকারীদের ব্যাপক 'সাইজ' করার নির্দেশ পেয়েই সেদিন ছাত্রলীগকর্মীরা নিরীহ বিশ্বজিৎ দাসকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে খুন করে। গ্রেপ্তার হওয়া ছাত্রলীগকর্মীরা পুলিশকে বলেছে, জগন্নাথ ছাত্রলীগ ও কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতার নির্দেশেই তারা ১৮ দলীয় জোটের ডাকা অবরোধের দিন পুরান ঢাকায় বিশ্বজিৎ দাসের ওপর হামলা চালায়।
শাকিলকে বরগুনার বেতাগী থেকে গ্রেপ্তার করে এরই মধ্যে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়েছে। গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, হত্যাকাণ্ডে অংশ নেওয়া অভিযুক্তদের সঙ্গে বিশ্বজিতের কোনো পূর্ববিরোধ থাকা বা অন্য কোনো যোগসূত্রের তথ্য পাওয়া যায়নি।
সূত্র মতে, হামলাকারীদের ওপর নির্দেশ ছিল, অবরোধকারীদের ব্যাপক 'সাইজ' করতে হবে। আদালতপাড়ায় ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটলে ছাত্রলীগের নেতারাই হামলাকারীদের 'ব্যাপারটি দেখতে' ও 'সাইজ' করতে বলেন। এমন উসকানি পেয়ে কয়েকজন ক্রেজি হয়ে একটু বাড়াবাড়ি করে! গ্রেপ্তার হওয়ার পর এমনই দাবি করছে জগন্নাথ ছাত্রলীগের ছয় কর্মী। বাংলাদেশ ছাত্রলীগ গ্রেপ্তারকৃতদের ছাত্রলীগের 'কেউ না' বলে দাবি করলেও বলছে, তারা সংগঠনের একনিষ্ঠ কর্মী। এই অভিযুক্তরা নিজেদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও চাঁদাবাজির অভিযোগও অস্বীকার করেছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এসব তথ্য জানিয়েছেন। সূত্র জানায়, চাঞ্চল্যকর এ হত্যা মামলাটি গতকালই গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
শাকিল যেভাবে গ্রেপ্তার : ঢাকা মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (মিডিয়া) মাসুদুর রহমান জানান, বরগুনার বেতাগী থেকে গ্রেপ্তারের পর গতকাল বিকেলে গোয়েন্দা পুলিশের একটি দল রফিকুল ইসলাম শাকিলকে ঢাকায় নিয়ে আসে। বরিশালের বাকেরগঞ্জ ও বেতাগী থানা পুলিশ গ্রেপ্তার অভিযানে ডিবিকে সহায়তা করে। গোয়েন্দা নজরদারির মাধ্যমে শুক্রবারই শাকিলের অবস্থান জানা যায়।
আমাদের বরিশাল অফিসের নিজস্ব প্রতিবেদককে বাকেরগঞ্জ থানার ওসি জানান, বেতাগীর দেশান্তরকাঠি গ্রামের কাঞ্চন মীরের বাড়ি থেকে শাকিলকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সেখানে শাকিল তার বোনের বাসায় পালিয়ে ছিল। তার বাড়ি পটুয়াখালী শহরের ফায়ার সার্ভিস সড়কে। তার বাবা পটুয়াখালী কর কার্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী আনসার আলী গতকাল সকালে মারা গেছেন।
স্বজনরা জানান, ছেলের নৃশংসতার দৃশ্য দেখার পর থেকেই লজ্জায়-গ্লানিতে মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন আনসার। গতকাল ভোরে ছেলের গ্রেপ্তার হওয়ার খবর পেয়ে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। বরিশাল শেরেবাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তির কিছু সময় পর তাঁর মৃত্যু হয়।
'সাইজ' করতে চাপাতি : গোয়েন্দা সূত্র মতে, শাওন জিজ্ঞাসাবাদে বলেছে, ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতারা অবরোধের সময় মিছিল করে শক্ত অবস্থান নিতে বলেছিলেন। অবরোধকারীদের ব্যাপকভাবে 'সাইজ' করতেও তাঁরা নির্দেশ দিয়েছিলেন। হামলার আগে মিছিল করে তারা জগন্নাথ ক্যাম্পাসের দিকে যাচ্ছিল। ওই সময় আদালতপাড়ায় ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটে। ছাত্রলীগ নেতারা তাদের ঘটনাটি 'দেখতে' বলেন। তাই অভিযুক্ত কর্মীরা প্রথমে আইনজীবীদের ওপর হামলা চালায়। পরে ককটেল বিস্ফোরণকারী সন্দেহে বিশ্বজিতের ওপর হামলা চালায়। শাকিল অস্ত্র বহনের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, সবাই বিশ্বজিৎকে মারধর করেছে।
এদিকে গ্রেপ্তার হওয়া আরেক ছাত্রলীগকর্মী নাহিদ জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশকে বলেছে, ককটেল নিক্ষেপকারী ভেবেই তারা বিশ্বজিতের ওপর হামলা চালায়। তার মতে, 'আঘাত বেশি হয়ে গেছে।' তবে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপানোর অভিযোগ নাহিদ অস্বীকার করে।
শাওন ও সাইফুল রিমান্ডে : আমাদের আদালত প্রতিবেদক জানান, গতকাল মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সূত্রাপুর থানার উপপরিদর্শক মাহবুবুল আলম আকন্দ আসামি জি এম রাশেদুজ্জামান শাওন ও সাইফুল ইসলামকে ঢাকা মহানগর হাকিম এম এ সালামের আদালতে হাজির করে ১০ দিনের রিমান্ডের অনুমতি চেয়ে আবেদন করেন। আদালত দুই আসামির আট দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, গত শুক্রবার রাতে সিলেটের জাফলংয়ের 'পর্যটন' হোটেল থেকে রাশেদুজ্জামান শাওন ও উৎপল দাস নামে দুজনকে আটক করা হয়। ঘটনায় জড়িত থাকার প্রমাণ না পাওয়ার কারণে গতকাল পর্যন্ত উৎপলকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়নি। এদিকে রাজধানীর উত্তরা এলাকার একটি বাড়ি থেকে আটক সাইফুলকে গতকাল গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।
এ মামলায় আরো তিন আসামি নাহিদ, কিবরিয়া ও টিপুকেও আট দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। আলোচিত এ মামলায় ১১ জনকে গ্রেপ্তারের দাবি করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর। তবে এক সপ্তাহেও সেই হিসাব মেলেনি। কোতোয়ালি থানায় আটক চার পিকেটারকেও বিশ্বজিৎ হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
সূত্র জানায়, ডিবি পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হওয়া ছয়জনই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের কর্মী। বিশ্বজিৎ হত্যার পর গণমাধ্যমে প্রকাশিত ছবিতে তাদের চারজনকে খুব ভালোভাবে দেখা গেছে। এসব কর্মী হলো শাকিল, শাওন, মাহফুজুর রহমান নাহিদ ও সাইফুল। অন্য গ্রেপ্তারকৃত কাইয়ুম মিয়া টিপু ও এইচ এম কিবরিয়াও ঘটনাস্থলে ছিল বলে তথ্য-প্রমাণ পেয়েছেন তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, গতকাল শাকিলকে গ্রেপ্তারের পর অন্য হামলাকারীদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। ছবি দেখে শনাক্ত হওয়াদের মধ্যে রাজন তালুকদার, ইমদাদুল হক ওরফে কাইল্যা ইমদাদ, মীর নুরে আলম লিমন, ওবায়দুল কাদের তাহসীন, আজিজুল হক, ইউনুছ আলী, আবদুল্লাহ আল মামুন, আল-আমিন উজ্জ্বল, আলাউদ্দিন, রিন্টু, হিসাববিজ্ঞানের মোশারফ, কালা সুমন, প্রাণিবিদ্যার ২০০৪-০৫ শিক্ষাবর্ষের সজীব, সোহেল, শিপলু ও পাভেল এখনো গ্রেপ্তার হয়নি।
মামলা ডিবিতে : আলোচিত বিশ্বজিৎ হত্যার পর থেকেই ডিবি ছায়া তদন্ত করছে। মামলাটির তদন্তের স্বার্থে ডিবিতে স্থানান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে গতকাল। মহানগর পুলিশের মুখপাত্র উপকমিশনার মনিরুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, 'ভিডিও ফুটেজে যাদের ছবি দেখা গেছে, তাদের শনাক্ত করা হয়েছে। শাকিলসহ মোট ছয়জনকে আমরা গ্রেপ্তার করেছি। সব আসামিকে আমরা আইনের আওতায় নিয়ে আসার চেষ্টা করছি।'
হত্যাকারীদের শাস্তি দাবি : এদিকে বিশ্বজিৎ হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্তদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং তাঁর পরিবারকে সহায়তা দেওয়ার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ। গতকাল বিকেলে শাঁখারীবাজারে সংগঠনটির ঢাকা মহানগর শাখা আয়োজিত এক বিক্ষোভ সমাবেশে বক্তারা এ দাবি জানান। সমাবেশে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট রানা দাসগুপ্ত বলেন, 'নৃশংস এ হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়ার পাশাপাশি নিহতের পরিবারকে সহযোগিতা করতে হবে।' সংগঠনটির যুগ্ম সম্পাদক বাবুল দাসের সভাপতিত্বে সমাবেশে আরো বক্তব্য দেন বিশ্বজিতের ভাই অপু দাস, পূজা উদ্যাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মনীন্দ্র কুমার নাথ, কাজল দেবনাথ, মিলন কান্তি দত্ত, অ্যাডভোকেট তাপস পাল, নির্মল চ্যাটার্জি, বিপুল ঘোষ শঙ্কর, অ্যাডভোকেট শ্যামল রায়, রজত সুর রাজু, অ্যাডভোকেট কিশোর কুমার বসু রায় চৌধুরী পিন্টু, ব্রজগোপাল দেবনাথ, সজীব দে, মিন্টু দত্ত, দিলীপ ঘোষ শম্পা প্রমুখ।