সমুদ্রের সাফল্য তিস্তায় ম্লান!
মহাজোট সরকারের ৪ বছরের বড় কূটনৈতিক সাফল্য মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্র বিরোধ মামলায় আদালতের রায়ে নিষ্পত্তির বিষয়টি। একান্তভাবেই এ বিজয়কে ‘কূটনৈতিক সাফল্য’ মনে করছে সরকার। পেশাদার কূটনীতিকরাও এই বিজয়ে উল্লসিত। তবে দিন শেষে তাদের হতাশার বড় অংশ জুড়ে আছে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত। মহাজোট সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর দেশটির সঙ্গে সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় ‘আকাশের কাছাকাছি’ পৌঁছে দেয়ার যে প্রত্যাশা সৃষ্টি হয়েছিল তা বহু আগেই থেমে গেছে। তিস্তা চুক্তি ও ল্যান্ড বাউন্ডারির রেটিফিকেশন না হওয়াই হতাশার মূল কারণ। কূটনীতিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, মহাজোট সরকারের ‘সমুদ্র সাফল্য’ তিস্তায় ম্লান হয়ে গেছে। তবে এখনই ঢাকা আশা ছাড়ছে না। ভারতের সরকারেও বড় ধরনের রদবদল ঘটেছে। পোড় খাওয়া রাজনীতিক সলমন খুরশিদ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়ার নবউদ্যোগে ঢাকা-দিল্লি বিদ্যমান দূরত্ব ঘুচিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা আশা করছে আগামী মাসে তিস্তা ও ল্যান্ড বাউন্ডারির রেটিফিকেশনের নতুন কোন বার্তা নিয়ে সফরে আসবেন তিনি। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াতে শেখ হাসিনা সরকার শুরু থেকেই ছিল তৎপর। বড় ‘ঝুঁকি’ নিয়ে বিদ্রোহী নেতা রাজখোয়াকে দেশটির হাতে তুলে দেয়া হয়েছে। শেখ হাসিনা দিল্লি সফর করেছেন দায়িত্ব গ্রহণের দ্বিতীয় বছরে। তৃতীয় বছরে ফিরতি সফরে ঢাকা এসেছেন প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং। তবে সেখানেই সব থেমে গেছে। বহুল প্রত্যাশিত তিস্তা চুক্তি হয়নি মুখ্যমন্ত্রী মমতার বাগড়া দেয়ার অজুহাতে। মনমোহন সিংয়ের হাইপ্রোফাইল সফরে ঢাকা ক’টি প্রতিশ্রুতি ছাড়া প্রত্যাশার তুলনায় তেমন কিছুই পায়নি। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ আশা করেছিল, সীমান্তে বিএসএফ’র গুলি, হত্যা, নির্যাতন বন্ধ হবে। মনমোহন সিং সহ ভারতের সরকার ও রাজনৈতিক শীর্ষ নেতৃত্ব বিষয়টি নিয়ে স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু চার বছরে তাতো বন্ধ হয়নি বরং নতুন বছর শুরুই হলো বিএসএফ’র গুলি দিয়ে। ১লা জানুয়ারি দু’জন ব্যবসায়ীকে গুলি করে হত্যার ২৪ ঘণ্টা পার হওয়ার আগেই আরও ২ জনের প্রাণ কেড়েছে বিএসএফ’র বুলেট। বাংলাদেশে ঢুকে আরও তিন কৃষককে ধরে নিয়ে গেছে ভারতীয় সীমান্ত বাহিনীর সদস্যরা। তাদের ভাগ্যে কি ঘটেছে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত জানতে পারেনি ঢাকার পররাষ্ট্র দপ্তর। টিপাইমুখে বাঁধ নিয়ে উদ্বেগ এখনও নিরসন হয়নি। এর মধ্যে দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলে আরও ২টি নদীতে বাঁধ দিয়ে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের খবর উদ্বেগ ছড়িয়েছে। ঢাকা তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ জানিয়েছে, যৌথ সমীক্ষায় দাবি করেছে। বাংলাদেশের কারাগারে দীর্ঘ দিন ধরে আটক রয়েছেন বিদ্রোহী উলফা নেতা অনুপ চেটিয়া। তাকে ফেরত চায় দিল্লি। শীর্ষ বিদ্রোহী রাজখোয়াকে পাওয়ার পর থেকেই অনুপ চেটিয়ার অপেক্ষায় ভারত। বাংলাদেশ বন্দিবিনিময়ে প্রস্তুত। তবে বিষয়টি আটকে আছে আইনি প্রক্রিয়ায়। চলতি মাসে এ নিয়ে বাংলাদেশ আরেক ধাপ অগ্রসর হবে বলে আভাস মিলেছে। ভারতের নয়া স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুশীল কুমার সিন্ধের ঢাকা সফরে দ্বিপক্ষীয় বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তিটি সই করতে তৎপরতা শুরু হয়েছে। দিল্লির সঙ্গে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সম্পর্ক অনেক পুরনো। সেই সুবাদে দেয়া-নেয়ার বিষয়টি অন্য যে কোন সরকারের তুলনায় এ আমলে বেশি হবে, এটাই স্বাভাবিক মনে করেছিলেন কূটনীতিকরা। তাই হয়েছে, তবে একতরফা অবশ্য বিরোধী দলের নেতা বেগম খালেদা জিয়ার ভারত সফরে দু’দেশের জনগণের পর্যায়ে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার একটি আলো দেখছেন তারা। এর পেছনে অকাট্ট যুক্তিও রয়েছে অনেকের। তাদের মতে, বিরোধী নেতাকে যেভাবে ভারতের প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলের নেতা সম্ভাষন জানিয়েছেন তা রীতিমতো নজিরবিহীন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি আর বনমন্ত্রী হাসান মাহমুদ সফরটি নিয়ে প্রতিযোগিতা করে তীর্যক মন্তব্য করেছেন। তাদের প্রতিযোগিতায় খোদ সরকারের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী, প্রভাবশালী আমলা, পেশাদার কূটনীতিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা নাখোশ হয়েছেন। এটাকে অসুস্থ প্রতিযোগিতা হিসেবেই দেখছেন তারা। গত ৪ঠা জানুয়ারি সরকারের চার বছরের সাফল্য-ব্যর্থতা নিয়ে বিশ্লেষণে বসেছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি। তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে সেদিন দুপুরে মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে জড়ো হয়েছিলেন ঢাকাস্থ মহাপরিচালক ও তদূর্ধ্ব কর্মকর্তারা। বৈঠক সূত্র মতে, সেখানে মোটা দাগে তিনটি কূটনৈতিক সাফল্য নিয়ে আলোচনা হয়েছে। প্রথমত, মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্র বিরোধ নিষ্পত্তি। দ্বিতীয়ত, জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী উত্থাপিত বিশ্বশান্তির মডেল সংস্থাটির রেজুলেশনে অন্তর্ভুক্তি তৃতীয়তঃ বাংলাদেশের তৎপরতায় অটিজমের বিষয়টি জাতিসংঘের রেজুলেশনে স্থান পাওয়া। উল্লিখিত তিনটি বিষয়ে একান্তভাবেই কাজ করেছেন পেশাদার কূটনীতিকরা। তাদের অর্জনে পররাষ্ট্রমন্ত্রীও পুলকিত। তবে ব্যর্থতার বিষয়টিও মন্ত্রীর বিবেচনায় এনেছেন তারা। সেখানে উঠে এসেছে স্পর্শকাতর সীমান্ত হত্যাসহ ভারতের সঙ্গে অনিষ্পন্ন বিষয়গুলো। এসেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ‘শীতলতা’, বাংলাদেশে বড় শ্রম বাজার সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ মধ্যপ্রাচ্যে বিভিন্ন দেশে শ্রমিকদের প্রবেশাধিকার বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং সেখানে থাকা শ্রমিকদের হয়রানির বিষয়টি। রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারের সঙ্গে সবকিছু আটকে থাকা এবং সংবেদনশীল এ ইস্যুতে ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ উন্নয়ন সহযোগী অনেক রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের স্থবিরতার বিষয়টিও আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে। নোবেল জয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও গ্রামীণ ব্যাংকের বিষয়ে সরকারের অতি উৎসাহী কিছু কর্মকাণ্ড নিয়েও বিব্রত তারা। বিষয়টি নিয়ে উন্নত দেশগুলোতে বাংলাদেশের পেশাদার কূটনীতিকরা প্রশ্নের সম্মুখীন হচ্ছেন বলেও জানা গেছে। বিগত চার বছরে প্রতিবেশীসহ পূর্ব দিগন্তের রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে বাংলাদেশের চেষ্টার প্রশংসা হয়েছে ওই বৈঠকে। মন্ত্রীর তরফে দিকনির্দেশনা দেয়া হয়েছে সরকারের বাকি মেয়াদে অসম্পূর্ণ এবং প্রতিশ্রুত কর্মগুলো সম্পাদনে। একজন কূটনীতিক মানবজমিনকে বলেন, সরকারের সহযোগিতা অব্যাহত থাকলে বাকি মেয়াদে অনেক কিছুই অর্জন করা সম্ভব। সংযুক্ত আরব আমিরাতে বাংলাদেশীদের ভিসা প্রাপ্তিতে জোর তৎপরতা শুরু হয়েছে। কাতারসহ অনেক দেশ এখানে বিনিয়োগে আগ্রহী। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শীতলভাবও কেটে যাবে। আগামী কয়েক মাসের মধ্যে ঢাকায় পার্টনারশিপ ডায়ালগের দ্বিতীয় পর্ব অনুষ্ঠিত হবে। মিয়ানমারের সঙ্গে এনার্জি কো-অপারেশন বিষয়ে সংলাপ হবে। সেখানে ভারত, নেপাল, ভূটান সহ অনেকেই আগ্রহী হবে বলে আশা করছে ঢাকা। চীনের সঙ্গে সহযোগিতার ক্ষেত্র বাড়বে। গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণ সহযোগিতায় তাদের আগ্রহের বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে। সরকারের শেষ বছরে কূটনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটবে। সব মিলেই সামনে এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ-প্রত্যাশা পেশাদার কূটনীতিকদের।
No comments:
Post a Comment