প্রভাষককে আটকে নির্যাতন জাবি ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক গ্রেপ্তার
গাইবান্ধার আলহাজ সেলিমা রহমান কারিগরী মহাবিদ্যালয়ের প্রভাষককে অপহরণ করে ৪ দিন জাবিতে আটকে রেখে নির্যাতনের পর মুক্তিপণ দাবির অভিযোগে গতকাল সাভার মডেল থানায় একটি মামলা করা হয়েছে। এ ঘটনায় র্যাব ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদকসহ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা কলেজের ৫ ছাত্রকে গ্রেপ্তার এবং অপহৃতকে উদ্ধার করেছে।
অপহরণকারীদের দাবিকৃত মুক্তিপণের ১০ লাখ টাকা সোমবার সাভার করতোয়া কুরিয়ার সার্ভিস অফিস থেকে তুলতে আসলে ওঁত পেতে থাকা সদস্যরা তাদের গ্রেপ্তার করে বলে র্যাব জানিয়েছে।
গতকাল সকালে র্যাব গ্রেপ্তারকৃতদের সাভার মডেল থানায় সোপর্দ করলে দুপুরে প্রভাষক আহসান হাবীব প্রিন্স বাদী হয়ে সাভার মডেল থানায় অপহরণের মামলাটি (নং-২৫) দায়ের করেন।
মামলায় গ্রেপ্তারকৃত ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র জাবির হোসেন (২২), ইতিহাস বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র শফিক (২২), দর্শন বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র শাহেদ শাহ (২৪), ইতিহাস বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র আনিসুজ্জামান সিদ্দিকী (২২) ও ঢাকা কলেজের ইসলামের ইতিহাস বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র রুবেল ইসলাম (২৩) আসামি করা হয়েছে। এদের মধ্যে শফিক জাবির অ.ফ.ম কামাল উদ্দিন ও অন্যরা মাওলানা ভাসানী হলের ছাত্র। এছাড়া মামলায় পলাতক দেখিয়ে জাবির ছাত্র নাহিদ, তমালসহ অজ্ঞাতনামা ২-৩ জনকেও আসামি করা হয়। তাদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে বলে সাভার মডেল থানার ওসি মো. আসাদুজ্জামান জানিয়েছে। তিনি বলেন, জিজ্ঞাসাবাদের জন্য গ্রেপ্তার ৫ ছাত্রকে ৫ দিনের পুলিশ রিমান্ড চেয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছে।
র্যাব-৪ সাভার ক্যাম্প কমান্ডার ক্যাপ্টেন তাহসিন সালেহীন রানা জানান, গত শুক্রবার গাইবান্ধা জেলার সুন্দরগঞ্জ থানার আলহাজ সেলিমা রহমান কারিগরী মহাবিদ্যালয়ের প্রভাষক আহসান হাবীব প্রিন্স জরুরি কাজে ঢাকা আসেন। এ খবর পেয়ে তার পূর্ব পরিচিত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের ৪র্থ বর্ষের ছাত্র জাবির হোসেন তাকে ফুসলিয়ে সাভারে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আলবেরুণী হলের ২য় তলায় একটি রুমের মধ্যে এনে আটকে রেখে তার স্ত্রীর কাছে মোবাইল ফোনে ১০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। দাবিকৃত টাকা সাভার করতোয়া কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে পাঠাতে বলে। এরই মধ্যে অপহৃতের পরিবারের পক্ষ থেকে বিষয়টি সাভার র্যাব-৪ ক্যাম্প কমান্ডারের কাছে অবহিত করা হয়। পরে র্যাবের গোয়েন্দা দল নির্দিষ্ট সময়ে কুরিয়ার সার্ভিস অফিসের আশপাশ অবস্থান নেয়। সোমবার বিকাল আনুমানিক ৫টার দিকে অপহরণকারীরা অপহৃত আহসান হাবীব প্রিন্সকে সঙ্গে নিয়ে মুক্তিপণের টাকা তুলতে কুরিয়া সার্ভিসের অফিসে আসলে ওঁত পেতে থাকা র্যাবের গোয়েন্দা দল তাদের গ্রেপ্তার করে। উদ্ধার করে অপহৃত প্রভাষক আহসান হাবীব প্রিন্সকে। রাতভর র্যাব হেফাজতে গ্রেপ্তারকৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ শেষে মঙ্গলবার সকালে সাভার মডেল থানায় সোপর্দ করা হয়। তবে গ্রেপ্তারকৃতরা দাবি করে, প্রিন্সকে তারা অপহরণ করেনি। তাদের পাওনা টাকা আদার করার চেষ্টা করছিল। গ্রেপ্তারকৃত জাবির ছাত্র শফিক জানায়, ঢাকা কলেজের ছাত্র রুবেল ইসলাম তার বন্ধু সুমনের বোন জেসমিন জামালপুরে একটি কলেজে চাকরি করে। এমপিওভুক্ত করে দেয়ার জন্য প্রিন্স ২০১০ সালে ৮৭ হাজার টাকা নিয়েছে। কিন্তু কোন কাজ করে দিতে পারছে না, শুধু ঘুরাচ্ছে। এদিকে ছাত্র ইউনিয়নের জাবি শাখার সাধারণ সম্পাদক গ্রেপ্তারের খবর পেয়ে সকালে থানায় আসেন কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সাধারণ সম্পাদক সৌমিত চন্দ জয়দ্বীপ। তিনি সাংবাদিকদের জানান, ঘটনাটি সম্পূর্ণ সাজানো। জাবির হোসেন দেড় লাখ টাকা পাবে মামলার বাদী প্রিন্সের কাছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চাকরি দেয়ার নাম করে ওই টাকা নিয়েছে। তিনি দাবি করেন, আলবেরুণী হলের যে কক্ষে তাকে আটকে রাখা হয়েছে মামলায় উল্লেখ করেছে সে কক্ষের জানালার গ্রীল ভাঙা। ইচ্ছে করলে সে পালাতে পারতো। তাছাড়া সে কোন চিৎকার চেঁচামেচিও করেনি।
তবে পুলিশ রহস্যজনক কারণে গ্রেপ্তারকৃত জাবির হোসেনের সঙ্গে সাংবাদিকদের কথা বলতে দেয়নি।
ছাত্র ইউনিয়ন জাবি শাখার সহকারী সাধারণ সম্পাদক মং সিং হাই মারমা সাংবাদিকদের বলেন, মামলায় যেভাবে অপহরণের ঘটনা সাজানো হয়েছে তা মিথ্যা। তিনি দাবি করেন, সোমবার দুপুরেও প্রিন্সকে জাবির ভিতরে হোটেলে খেতে দেখেছি। তাছাড়া প্রিন্স প্রায় দুই বছর যাবত জাবিতে আসা-যাওয়া করছে। ঢাকায় আসলে রাতে সে ক্যাম্পাসে থাকতো বলেও তিনি জানান। তবে মামলার বাদী প্রভাষক আহসান হাবীব প্রিন্স তাদের কাছ থেকে টাকা নেয়ার কথা অস্বীকার করে বলেন, জাবির হোসেন গাইবান্ধায় এক আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে যেত সেখান থেকেই তার সঙ্গে পরিচয়। সেই পরিচয়ের সূত্র থেকেই মাঝেমধ্যে ঢাকায় আসলে তার সঙ্গে দেখা এবং জাবিতে আসা-যাওয়া করতেন বলে তিনি স্বীকার করেছেন। তিনি আরও বলেন, গাইবান্ধায় বিজনেস ম্যানেজম্যান্ট একটি কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। সেটার রেজিস্ট্রেশন করানোর জন্য ঢাকায় আসি। ওইদিন রাজধানীর কল্যাণপুরে গাড়ি থেকে নামলে জাবির হোসেন ফোন দেয়। তার ফোন পেয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আসলেই আটকে রেখে মারধর করে পরিবারের কাছে ফোনে ১০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে।
এদিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রক্টর ড. সোহেল আহমেদ জানান, আমাদের ছাত্ররা যে ওই প্রভাষককে জাবির ভিতরে আটকে রেখেছে তা কিন্তু ওই প্রভাষকের পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়নি। তারা সরাসরি র্যাবকে অবহিত করেছে। তিনি বলেন, আলবেরুণী হলে তাকে আটকে নির্যাতনের কথা বলা হলেও গ্রেপ্তারকৃতরা কেউ ওই হলের ছাত্র নয়। তাই বিষয়টি জাবির ডিসিপ্লিন বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। কমিটির তদন্ত রিপোর্ট পাওয়ার পরই ছাত্রদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে তিনি জানান।
No comments:
Post a Comment