Pages

Saturday, January 5, 2013

ঊর্ধ্বমুখী দ্রব্যমূল্য জনগণের নাভিশ্বাস

ঊর্ধ্বমুখী দ্রব্যমূল্য জনগণের নাভিশ্বাস


বিদায়ী বছরজুড়েই নিত্যপণ্যের বাজার ছিল ঊর্ধ্বমুখী। এ কারণে জনগণের মধ্যে এক ধরনের নাভিশ্বাস উঠেছে। বাজার নিয়ে ক্রেতা ও বিক্রেতাদের মধ্যে ছিল এক ধরনের হতাশা। সঙ্গে ছিল সরকারের হতাশাজনক বাজার নিয়ন্ত্রণের তৎপরতা। এটি সফল না হওয়ায় দেশের মানুষের মাঝে পণ্য মূল্য নিয়ে ছিল অব্যাহত চাপা ক্ষোভ। মূলত বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের ব্যর্থতার কারণেই এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। বেসরকারি ভোক্তা অধিকার সংস্থা কনজ্যুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর পরিসংখ্যান অনুসারে বিদায়ী বছরে পণ্যমূল্য বৃদ্ধির হার ছিল ১৩ শতাংশ। আর যে সকল পণ্যের মূল্য একবার বেড়েছে তা আর কখনও নামেনি। তা হলো- চালের মধ্যে কাটারি ভোগ, চিনিগুঁড়া, কালোজিরা, ডাল জাতীয় পণ্যে, লবণ, ডিম, পিয়াজ, ময়দা, মসলাসহ অন্যান্য পণ্যের দামে ঊর্ধ্বগতি এখনও অব্যাহত রয়েছে। অন্যদিকে এক বছরে আলু ও পিয়াজের দাম দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। এছাড়া রসুন, ছোলা, মসুর ডাল, লবণ, আদা, সয়াবিন, খেজুর, চাল ও ডিমের দাম ৩ থেকে ৬৩ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির এক বৈঠকে মন্ত্রণালয়ের দেয়া প্রতিবেদনে এ তথ্য পাওয়া গেছে। কমিটি এসব পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে তদারকি বাড়ানোর সুপারিশ করেছে। কেবল মাত্র শাক-সবজির বাজার ওঠানামা দুটোই ছিল এ বছর। সাবান জাতীয় পণ্যের দামও ছিল ঊর্ধ্বমুখী। জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির ফলে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে চক্রবৃদ্ধি হারে। বেড়েছে বোতাল প্রতি সয়াবিনের ও সরিষার তেলের দামও। চিনি বাজার বছরের শুরুতে ৫৮ টাকা কেজি বিক্রি করলেও এখন তা ৪৮-৫০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। সিন্ডিকেট আর পাইকারি ব্যবসায়ীদের চালবাজির কারণে সাধারণ ক্রেতাদের শুধুই পকেট খালি হয়েছে। এ সময় একাধিক বাজার মনিটরিং কমিটিও ব্যর্থ হয় বাজার নিয়ন্ত্রণে।
বাজার তদারকে ঢিলেঢালা ভাব: বাজার তদারকের জন্য মন্ত্রণালয় ও সংসদীয় কমিটি থাকলেও প্রকৃত পক্ষে সংশ্লিষ্টদের মাঝে এর খুব একটা উৎসাহ কিংবা প্রচেষ্টা দেখা যায়নি। তবে একাধিকবার বাজার পরিদর্শন করেছে মনিটরিং কমিটিগুলো। পৃথক ও যৌথভাবে নানা সময় তৎপরতা দেখালেও বাজারে এর কোন ইতিবাচক প্রভাব পড়েনি। বরং দেখা গেছে, মনিটরিং কমিটির সামনেই নির্ধারিত মূল্যের বেশি দামে পণ্য বিক্রি হতে। আবার মূল্য তালিকা টাঙানোর বাধ্যবাধকতা বেঁধে দিলেও বাজারে তার কোন প্রমাণ মেলেনি। এমনকি মনিটরিংয়ের সময় কিছু দোকানে তাৎক্ষণিকভাবে তা টাঙানো হয়। তবে পরক্ষণেই সেটা সরিয়ে নেয়া হয়। আইন না মানার অপরাধে তেমন কোন শাস্তি না দেয়ায় ব্যবসায়ীদের মাঝে কোন দায়বোধও জন্মাতে দেখা যায়নি।
বাজার নিয়ন্ত্রণে মরিয়া ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট: সরকার নিত্যপণ্যের দাম স্থিতিশীল রাখতে চাইলেও বাজারে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ রেখেছিল ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট। সরকারের তোড়জোড় আর হুমকি-ধমকি কোন কাজে আসেনি। দাম বেড়েছে সমান তালে। যেভাবে ওই সিন্ডিকেট চেয়েছে। অভিযোগ ছিল সরকারের উপর মহলের অনেকেরই এর সঙ্গে সম্পৃক্ততা ছিল এবং তারা সেখান থেকে ফায়দাও নিয়েছে। বছরের প্রায় প্রতিদিন কোন না কোন পণ্যের দাম বেড়েছে। সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় শীর্ষ ব্যবসায়ী ও ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করেও কোন ইতিবাচক ফল আনতে পারেনি। সাধারণ ক্রেতাদের দুর্ভোগ বাড়লেও শীর্ষ ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের কারণে কোন পণ্যের দামের লাগাম টেনে ধরতে পারেনি সরকার। তেল-চিনির দাম না বাড়ানোর প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিল ব্যবসায়ীরা।
মিলে তেলেসমাতি: চাতাল, তেল পরিশোধন কারখানা, চিনিকল সবখানেই ছিল মিলমালিকদের তেলেসমাতি। তারা গুদামজাত করে রাখেন পণ্য। বাজারে ছাড়েননি। অল্প অল্প ছাড়েন। এভাবে সঙ্কট সৃষ্টি করে ফায়দা নেয়া হয় বাজার থেকে। পণ্য না ছাড়তে তারা নানা অজুহাত দেখান। এলসি খোলার পরও পণ্য আমদানি হচ্ছে না। জাহাজ থেকে খালাস হচ্ছে না। জাহাজে আছে। উৎপাদন কম হচ্ছে ইত্যাদি। কৃষি মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আর খাদ্য মন্ত্রণালয় দেশে তাদের পণ্যের যোগান পর্যাপ্ত বললেও ব্যবসায়ীরা সব সময়ই সঙ্কটের নানা অজুহাত দেখিয়েছেন। এখন ধানের ভরা মওসুমেও চালের দাম তেমন কমেনি। কৃষকের কাছ থেকে অল্প দামে ধান কিনে মিল মালিকরা বেশি দামে বিক্রি করছেন। এরকম অভিযোগ অহরহ রয়েছে। পাইকারি বিক্রেতার কাছে চড়া দামে বিক্রি করায় এর প্রভাব পড়ে খুচরা বাজারে। ব্যবসায়ীরা ওই সময় দাবি করেন, কম দামে ধান কিনলেও মিল মালিকদের হাতে এসে তা বেড়ে যায়। কৃষকরা অনেক সময় ন্যায্য মূল্যে গোলার ধান বিক্রি করতে পারেন না। কিন্তু মিলগুলো সব সময়ই লাভের ওপর থাকে। ধানের বাজার মন্দা বলে কৃষকের কাছ থেকে কম দামে কিনলেও তারা সব সময়ই চড়া দামে চাল বিক্রি করেন। আবার চালের যোগান কিংবা উৎপাদন কমের দোহাই দিয়ে বাজার চড়া করেন। মূলত দেশের চাল ও ধানের বাজার এভাবেই নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে মিলমালিকদের দ্বারা।
ক্যাবের তথ্য অনুযায়ী: কয়েকটি পণ্যের দাম বছরের শুরুর থেকে শেষ পর্যন্ত কি পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে তার ভিত্তিতে তুলে ধরা হলো। ১৮ টাকার দেশী পিয়াজ ৭০ টাকা। বছরে শুরুতে ১৮ টাকা বিক্রি হলেও তা এখন ৭০ টাকা। শতকরা ২৮৯ টাকা বেড়েছে। আমদানিকৃত ১৮ টাকা থেকে ৪৩ টাকা হয়েছে। ডিম-ডিমের হালি লাল ফার্ম ১০ টাকা বেড়ে ২৮ থেকে ৩৮ টাকা হয়েছে। আটা খোলা- বছরের শুরুতে কেজি ছিল ২৯ টাকা। তা বেড়ে এখন ৩৪ টাকা। প্যাকেট প্রতি ৩৪ টাকা থেকে বেড়ে ৩৮ টাকা কেজিতে ১১ শতাংশ বেড়েছে। ময়দা বছর গড়াতে ৪০ টাকা থেকে ৪৮ টাকা হয়েছে। ডাল মসুর ক্যাঙ্গারু বছরের শুরুতে ৭৫ টাকা ছিল। তা এখন বেড়ে ১৪৫ টাকা। দেশী মসুর ডাল ৯০ টাকা থেকে ১৩৫ টাকা, খেসারি ৪২ টাকা থেকে ৮৪ টাকা, ছোলা (ভাঙা) ৮২ টাকা থেকে ১০০ টাকা। চাল কাটারি ভোগ ৬৪ থেকে ৭৬ টাকা, চিনিগুঁড়া ৭৫ থেকে ১১০ টাকা (৪৭ শতাংশ বেড়েছে), কালোজিরা ৭০ টাকা থেকে ৯৫ টাকা হয়েছে। তবে চালের মধ্যে কিছু আইটেমের দাম অল্প কমেছে এই সময়ে। লবণ কেজিতে মোল্লা সুপার কেজি ২৪ টাকা থেকে ৩৩ টাকা, ব্র্যাক ২৫ থেকে বেড়ে ৩৩ টাকা, কনফিডেন্ট ২৫ থেকে ৩৫ টাকা, এসিআই ২৫ থেকে ৩২ টাকা, ফ্রেশ ২৪ থেকে ৩৪ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে কেজিতে। বাজারে লবণের মূল্য অস্বাভাবিক বৃদ্ধির কারণ অনুসন্ধানে চলতি মাসে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।
৩ লাখ টন চাল কিনবে সরকার: চলতি আমন মওসুমে প্রতি কেজি ২৬ টাকা দরে ৩ লাখ টন চাল কিনবে সরকার। ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ থেকে চাল সংগ্রহ শুরু হয়েছে। সমপ্রতি খাদ্যমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক বৈঠক শেষে এ তথ্য জানান। খাদ্যমন্ত্রী বলেন, এবার প্রতি কেজি চালের উৎপাদন খরচ হয়েছে ২৪ দশমিক ৭৬ টাকা। বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের গবেষণায় দেখা গেছে, উৎপাদন খরচ কম হয়েছে। সবদিক বিবেচনা করে ২৬ টাকায় চাল কেনার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। মন্ত্রী বলেন, বর্তমানে বাজারে চালের সর্বনিম্ন দাম প্রতি কেজি ২২, ২৩ ও ২৪ টাকা। ঢাকা নগরীতে ২৬, ২৭ টাকায় মোটা চাল পাওয়া যাচ্ছে। মিনিকেট চালের মূল্য প্রতি কেজি ৩১ থেকে ৩২ টাকা। তবে নাজিরশাইলের দাম একটু বেশি। এ বছর আমন উৎপাদন হয়েছে এক কোটি ৩০ লাখ টন।
তদারকি বাড়াতে সংসদীয় কমিটির তাগিদ: এক বছরে আলু ও পিয়াজের দাম দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। এছাড়া রসুন, ছোলা, মসুর ডাল, লবণ, আদা, সয়াবিন, খেজুর, চাল ও ডিমের দাম ৩ থেকে ৬৩ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির বৈঠকে মন্ত্রণালয়ের দেয়া প্রতিবেদনে এ তথ্য পাওয়া গেছে। কমিটি এসব পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে তদারক বাড়ানোর সুপারিশ করেছে। ১৯শে ডিসেম্বর সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত সংসদীয় কমিটির বৈঠকে এ সুপারিশ করা হয়। বৈঠকে মন্ত্রণালয়ের দেয়া প্রতিবেদনে বলা হয়, এক বছরে আলুর দাম বেড়েছে ১২৭ শতাংশ। গত বছরের ১২ই ডিসেম্বর যে আলুর কেজিপ্রতি দাম ছিল ৮ থেকে ১৪ টাকা, চলতি বছরের ১২ই ডিসেম্বর তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৪ থেকে ২৬ টাকায়। একইভাবে এক বছর আগে যে পিয়াজের দাম ছিল ২০ থেকে ২৮ টাকা, এখন সেই পিয়াজের দাম ৪০ থেকে ৬০ টাকা। আর রসুনের দাম বেড়ে হয়েছে ৪০ থেকে ৯০ টাকা, মসুর ডাল ৩৮ দশমিক ৭১ শতাংশ বেড়ে ৭৫ থেকে ১৪০ টাকা, খেজুর ৩৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ বেড়ে ৯০ থেকে ১৫০ টাকা, লবণ ২৬ দশমিক ৩২ শতাংশ বেড়ে ১৮ থেকে ৩০ টাকা, ছোলা ২১ দশমিক ৪৩ শতাংশ বেড়ে ৮০ থেকে ৯০ টাকা, আদা ১০ শতাংশ বেড়ে ৫০ থেকে ৬০ টাকা, সয়াবিন ৫ দশমিক ৪১ শতাংশ বেড়ে ১১৬ থেকে ১১৮ টাকা এবং মাঝারি চাল প্রায় ৩ শতাংশ বেড়ে ৩৪ থেকে ৩৬ টাকা বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া ফার্মের ডিম প্রতি হালি ৩৫ দশমিক ২৯ শতাংশ বেড়ে ৩৪ থেকে ৩৫ টাকা বিক্রি হচ্ছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, এক বছরে হলুদের দাম সবচেয়ে বেশি কমেছে। এক বছর আগে যে হলুদের কেজি ছিল ১৫০ থেকে ২০০ টাকা, এখন তার দাম ৯০ থেকে ১৪০ টাকা। এছাড়া প্রতি কেজি মোটা চাল ৯ দশমিক ২৩ শতাংশ কমে ২৭ থেকে ৩২ টাকা, সরু চাল ১১ দশমিক ৮৩ শতাংশ কমে ৩৪ থেকে ৪৮ টাকা, খোলা পাম অয়েল ১৭ দশমিক ৬৫ শতাংশ কমে ৭৬ থেকে ৭৮ টাকা, চিনি ১৩ দশমিক ২৭ শতাংশ কমে ৪৮ থেকে ৫০ টাকা এবং শুকনা মরিচ ১০ শতাংশ কমে ১২০ থেকে ১৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

No comments:

Post a Comment