Pages

Thursday, January 10, 2013

৩.২ :দেশের ইতিহাসে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা

৩.২ :দেশের ইতিহাসে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা


শৈত্যপ্রবাহে কাঁপছে সারাদেশ। দেশের সর্বত্র তাপমাত্রা নেমেছে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে। গতকাল বুধবার দিনাজপুরে তাপমাত্রা ছিল ৩ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা বাংলাদেশের ৪২ বছরের ইতিহাসে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা। এর চেয়ে কম তাপমাত্রা ছিল স্বাধীনতার আগে, ১৯৬৮ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি। ওই দিন শ্রীমঙ্গলে সর্বনিম্ন ২ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়। সে হিসাবে গত ৪৫ বছরের মধ্যে বাংলাদেশের শীতলতম দিন ছিল গতকাল।
দিনাজপুর প্রতিনিধি জানান, ৩ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা জেলার ১৭ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। গত সোম ও মঙ্গলবার দিনাজপুরে ৭ দশমিক ২ ও ৬ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়।
বাংলাদেশে এর আগে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল রাজশাহীতে। ২০০৩ সালে সেখানে ৩ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়। স্বাধীনতার পর সেবারই প্রথম তাপমাত্রা ৪ ডিগ্রির নিচে নেমে আসে। অথচ গতকাল একদিনে দেশের আরও তিনটি স্থানে তাপমাত্রা ৪ ডিগ্রির নিচে নামে। গতকাল সৈয়দপুরে ৩ দশমিক ৫, চুয়াডাঙ্গা ও ঈশ্বরদীতে ৩ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়, যা দেশের ইতিহাসে সর্বনিম্ন পাঁচটি তাপমাত্রার তালিকায় ঠাঁই পেয়েছে। রংপুর ও যশোরে ৪ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ডের পাতায় ঠাঁই পেয়েছে। বুধবার শ্রীমঙ্গলে তাপমাত্রা ছিল ৪ দশমিক ৪। গতকালের হিসাব বাদ দিলে বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বনিম্ন পাঁচ জেলার তাপমাত্রা হলো ২০০৩ সালে রাজশাহীতে ৩ দশমিক ৪, ১৯৯৬ সালে দিনাজপুরে ৩ দশমিক ৮, ১৯৭৮ সালে ময়মনসিংহে ৪ দশমিক ২,
২০০৩ সালে চুয়াডাঙ্গায় ৪ দশমিক ৩ ও ১৯৭৮ সালে কুমিল্লায় ৪ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। স্বাধীনতার আগে ১৯৬৮ সালে শ্রীমঙ্গলে ২ দশমিক ৮ ডিগ্রি ও ১৯৬৪ সালে ৩ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়।
গতকাল ঢাকায় তাপমাত্রা ছিল ৭ দশমিক ২, যা গত মঙ্গলবারের তাপমাত্রার চেয়ে ২ দশমিক ৪ ডিগ্রি কম। টাঙ্গাইলে ৫ দশমিক ৫ ও ফরিদপুরে ৫ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়। ঢাকায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ১৮ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস; চট্টগ্রামে ৯ দশমিক ৬, বরিশালে ৬ দশমিক ৫ ও সিলেটে ৮ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
গত ডিসেম্বরে কুয়াশায় তীব্র শীত জেঁকে বসে সারাদেশে। কুয়াশা কেটে যাওয়ার পর শীত কমে আসে। মাত্র দেড় সপ্তাহের ব্যবধানে আবার ফিরে এসেছে শীত। শৈত্যপ্রবাহের দাপটে হাড় কাঁপানো শীত পড়েছে দেশের উত্তর, দক্ষিণ ও মধ্যাঞ্চলে।
আবহাওয়া অধিদফতরের আবহাওয়াবিদ আবদুর রহমান জানান, ঢাকা, রাজশাহী, রংপুর, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের ওপর দিয়ে মাঝারি থেকে তীব্র শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে এবং তা অব্যাহত থাকবে। শীতের এই প্রকোপ থাকতে পারে আরও কয়েক দিন। আবহাওয়াবিদ আবদুর রহমান জানান, আরও অন্তত দু'দিন স্থায়ী হতে পারে তীব্রশৈত্যপ্রবাহ। তবে তাপমাত্রা কমে যাওয়ার আশঙ্কা না থাকলেও চলতি মাসের ২০ তারিখের পর আরও দু'একটি শৈত্যপ্রবাহ আসতে পারে। এসব শৈত্যপ্রবাহ দেশের উত্তর, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল, উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও মধ্যাঞ্চলে বয়ে যেতে পারে। তাপমাত্রা থাকতে পারে ৮ থেকে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে।
তীব্র শীতের জন্য আবহাওয়াবিদরা উত্তর থেকে আসা হিমেল হাওয়াকে দায়ী করেন। আবহাওয়াবিদ শামীম হাসান ভূঁইয়া শীতের কারণ হিসেবে জানান, বায়ুমণ্ডলের জেড প্রবাহ শক্তিশালী হয়েছে। এ সময়ে সূর্যের অবস্থান থাকে দক্ষিণ গোলার্ধের কাছাকাছি। ওই এলাকায় উত্তাপ বেশি থাকায় বায়ু লঘু হয়ে যায়। প্রাকৃতিক নিয়ম অনুযায়ী বাতাস লঘু হলে পাশের এলাকা থেকে ভারী বা শীতল বাতাস সেদিকে প্রবাহিত হয়। তাই এ সময়ে উত্তর দিক থেকে মৌসুমি বায়ু বাংলাদেশের ওপর দিয়ে দক্ষিণ গোলার্ধের দিকে প্রবাহিত হয়। উত্তর গোলার্ধ থেকে হিমালয় পর্বতমালা হয়ে আসা এই বাতাস হিমবাহের কারণে তীব্র ঠাণ্ডা থাকে। এই বাতাসের কারণেই শীতের প্রকোপ তীব্র হয়।
অস্বাভাবিক শীতের জন্য মৌসুমি বায়ু নয়, জলবায়ুর বিরূপ পরিবর্তনকে দায়ী করেছেন পরিবেশ বিশেষজ্ঞ ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. আইনুন নিশাত। তিনি সমকালকে বলেন, 'সারাবিশ্বেই এমন চরম ভাবাপন্ন জলবায়ুর ঘটনা বাড়ছে।' তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, 'নিউজিল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ায় এখন তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা স্বাভাবিক নয়। বাংলাদেশ ও ভারতে তাপমাত্রা কম। দিলি্লর তাপমাত্রা আজ (বুধবার) ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এটাও স্বাভাবিক নয়। ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক উষ্ণতার কারণে এসব বাড়তেই থাকবে।'
ড. আইনুন নিশাত বলেন, বৈশ্বিক উষ্ণতার ফলে বরফ সংকুচিত হচ্ছে, সামুদ্রিক পানির ওপর চাপ বাড়ছে, ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে। বিভিন্ন দেশে বৃষ্টিপাত, তাপপ্রবাহ ও দাবানলের ধরন পাল্টে যাচ্ছে। ভারত ও চীনের পর বাংলাদেশেও এবার বৈশ্বিক উষ্ণতার সরাসরি প্রভাব দেখা যাচ্ছে বলে মনে করেন তিনি। এসব দেশেও চলতি শীতে তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে কমে গেছে।

No comments:

Post a Comment