সন্তানের গলায় চাপাতি ধরে মাকে হত্যা করে পালিয়ে গেল অতিথিবেশী চার ঘাতক। নিহতের নাম তাসলিমা আক্তার জেসমিন (৩৮)। গতকাল ভোরে রাজধানীর হাজারীবাগ থানাধীন টালি অফিস গলির ২৯১/বি, তেতলা ভবনের দোতলা থেকে জেসমিনের হাত-পা বাঁধা লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ বাসার দুই গৃহকর্মীকে আটক করেছে। পুলিশ জানিয়েছে, চার খুনির মধ্যে একজনের নাম আশা। সে নিহত তাসলিমাকে আপা বলে ডাকতো। তার মাধ্যমেই বাকি তিন খুনি ওই বাসায় প্রবেশের সুযোগ পেয়েছিল। পরে শেষ রাতের দিকে ঘুমন্ত অবস্থায় তাসলিমাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়। এ সময় তার আট বছর বয়সী ছেলে প্রিন্স দেখে ফেলে। পরে তার গলায় চাপাতি ধরে চুপ থাকতে বলে ঘাতকরা। হত্যা শেষে বাসার গুরুত্বপূর্ণ মালামাল লুট করে নিয়ে গেছে তারা। নিহত জেসমিনের স্বামী এনামুল হক পারভেজ গত ছয় মাস ধরে ব্রাজিলে আছেন। হাজারীবাগ থানার এসআই জহিরুল ইসলাম বলেন, বুধবার রাত ১০টার দিকে ‘অতিথি’ বেশে দুই তরুণী ও দুই যুবক জেসমিনের বাসায় রাত কাটায়। পরে কোন এক সময়ে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে পালিয়ে যায়। যাওয়ার আগে খুনিরা একটি লাল, হলুদ-সবুজ রঙের লেডিস চাদর ও দুই জোড়া পুরুষের রেক্সিনের স্যান্ডেল রেখে গেছে। ওই আলামতের সূত্র ধরে খুনিদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। এছাড়া পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ-সিআইডির ক্রাইম সিন বিভাগ ও মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে গুরুত্বপূর্ণ আলামত জব্দ করেছে। ঘটনার রাতে বাসায় থাকা দুই গৃহকর্মী বৃষ্টি বেগম (২৩) ও কাজল বেগম (২২)কে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। নিহতের মেয়ে রুমানা আফরোজ শান্তা বাদী হয়ে কথিত ‘অতিথি’ আশা নামের এক তরুণী ও অজ্ঞাত তিনজনের বিরুদ্ধে হাজারীবাগ থানায় হত্যা মামলা করেছেন। বাসায় থাকা দুই গৃহকর্মী জানান, জেসমিনের এক ছেলে এক মেয়ে। মেয়ে শান্তা বিয়ের পর লালবাগে তার স্বামীর বাসায় থাকেন। জেসমিন তার ৮ বছরের ছেলে প্রিন্স ও দুই গৃহকর্মী বৃষ্টি ও কাজলকে সঙ্গে নিয়ে বাসায় ছিলেন। বুধবার সন্ধ্যায় নিহতের পূর্বপরিচিত আশা তার বন্ধু পরিচয়ে আরেক তরুণী ও দুই যুবককে নিয়ে জেসমিনের বাসায় আসেন। আশা ও অপর তরুণী দু’জনে তাদের সঙ্গে আসা দু’যুবকের সঙ্গে জেসমিনের বাসায় গভীর রাতে বিয়ে করবেন বলে জানানো হয়। জেসমিন তার তিন কক্ষের বাসার একটিতে ওই চারজনকে ঘুমানোর ব্যবস্থা করেন। দুই গৃহকর্মী এক কক্ষে ও ছেলে প্রিন্সকে নিয়ে রাত ১২টার দিকে জেসমিন তার শয়নকক্ষে ঘুমিয়ে পড়েন। প্রিন্সের চিৎকারে ভোরে গৃহকর্মীরা ঘুম থেকে জেগে দেখে জেসমিনের হাত-পা বাঁধা লাশ পড়ে আছে। গৃহকর্মীরা তাৎক্ষণিক বিষয়টি মুঠোফোনে লালবাগে স্বামীর বাড়িতে থাকা তার মেয়ে শান্তাকে জানায়।
শান্তা সাংবাদিকদের জানান, ভোরে ওই চার জন তার মা জেসমিনের ঘরে ঢুকে নগদ টাকা ও স্বর্ণ লুট করতে থাকে। এ সময় জেসমিন ও তার শিশুছেলে প্রিন্স জেগে যায়। তাৎক্ষণিক তারা প্রিন্সের গলায় চাপাতি ধরে বলে ‘চিৎকার করলে গলায় কোপ দিয়ে মেরে ফেলবো।’ ভয়ে প্রিন্স চুপচাপ থাকলেও জেসমিন তাদের বাধা দেয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় দুর্বৃত্তরা জেসমিনের হাত-পা বেঁধে শ্বাসরোধ করে হত্যার পর টাকা ও স্বর্ণ নিয়ে পালিয়ে যায়। হাজারীবাগ থানার ওসি মোহাম্মদ ইকবাল বলেন, টাকা ও স্বর্ণ লুটের উদ্দেশেই পরিকল্পিত এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে ঘাতকরা। তার ধারণা, টাকা ও স্বর্ণ লুটের সময় জেসমিন বাধা দেয়ায় দুর্বৃত্তরা তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেছে। ওসি ইকবাল আরও বলেন, খুনি হিসেবে অভিযুক্ত পূর্বপরিচিত আশা ও তার তিন সহযোগীকে গ্রেপ্তারের লক্ষ্যে পুলিশ ও ডিবি পুলিশের একাধিক টিম মাঠে নেমেছে। প্রিন্সের খালা শামীমা বলেন, ভোর রাতে ওই চার ‘অতিথি’ তাদের কক্ষে ঢোকে এবং তার গলায় চাপাতি ধরে চিৎকার করতে নিষেধ করে। এরপর তার সামনে তার মায়ের পা বেঁধে গলা চেপে ধরে হত্যা করে। শিশুটি ভয়ে তখন লেপের নিচে মুখ ঢেকে ছিল। তিনি বলেন, ওই চার জন চলে গেলে তার ভাগ্নে পাশের কক্ষে ঘুমিয়ে থাকা বৃষ্টি ও শিল্পীকে জাগিয়ে ঘটনাটি বলে। তখন রনি ও শিল্পী ঘটনা দেখে জেসমিনের মেয়ে রোমানা আফরোজ শান্তার স্বামী সুমনকে টেলিফোন করে সব জানায়। ওই ভবনের নিচতলার এক বাসিন্দা পুলিশকে জানিয়েছেন, সকাল ৮টার দিকে দুই নারীকে দোতলার বাসা থেকে বের হতে দেখেছেন। এসআই জহির বলেন, দোতলার সিঁড়ি ঘরের গ্রিল ভাঙা রয়েছে। ধারণা করছি, দুই ব্যক্তি রাতে ওই পথ দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার পর দুই নারী বেরিয়ে যায়। তিনি বলেন, আশা নামের তরুণী আগেও ওই বাসায় এসেছিল। ময়না তদন্তের জন্য লাশ স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠানো হয়েছে।
No comments:
Post a Comment