বিনিয়োগে সোনা এক নম্বরে
২০১৩ সালে কোন পণ্যটি বিনিয়োগের জন্য ভালো হবে? বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দা অবস্থা বিরাজ করায় এ নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মাথাব্যথা ক্রমশ: বাড়ছে। তবে তাদের জন্য একমাত্র সমাধান সোনা নামক ধাতুটি। শুধু বিনিয়োগকারীরাই নয়, বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকও ঝুঁকছে সোনা কেনার দিকে। উন্নত দেশগুলো মন্দার রেশ কাটাতে প্রচুর পরিমাণ কাগুজে মুদ্রা ছাপিয়ে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে সোনাকেই শক্তিশালী বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকও সোনার মজুদ কিছুটা বাড়াচ্ছে। এছাড়া ২০১৩ সালে পণ্যখাতে বিনিয়োগে দ্বিতীয় নামটি হচ্ছে গম। তৃতীয় হচ্ছে তামা। চতুর্থ স্থানে আছে পরিশোধিত তেল এবং তুলা। পণ্যবাজার বিশ্লেষণ করে ভারতীয় প্রভাবশালী ইকোনমিক টাইমস্ এ খবর দিয়েছে।
গত কয়েক বছরে বিশ্ববাজারে কাগুজে মুদ্রার দাম ক্রমাগত পড়তে থাকায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এক ধরনের শংকা বিরাজ করে আসছে। অনেক বিনিয়োগকারী মুদ্রা কেনাবেচার চাইতে পণ্যের দিকে ঝুঁকছেন বেশি। যদিও ২০১২ সালে চীনা মুদ্রা ইউয়ান ছিলো বিনিয়োগের বড় খাত। কিন্তু এবার সে ইউয়ানও পেছনে পড়ে গেছে।
সোনা: বিনিয়োগে একনম্বর
বিনিয়োগকারীদের ধারণা ছিলো গতবছর সোনা হবে বিনিয়োগের অন্যতম আকর্ষণীয় পণ্য। বলা হয়েছিলো প্রতি আউন্স সোনার দাম এ সময়ে দুই হাজার মার্কিন ডলারে দাঁড়াবে। কিন্তু তা হয়নি। সোনার দাম আগের বছরের চাইতে মাত্র ৭ শতাংশ বেড়ে সেপ্টেম্বর মাসে ১৯'শ ডলারে দাঁড়িয়েছে। এজন্য অনেকে সোনা বিক্রি না করে ধরে রেখেছিলেন। বিনিয়োগ বিশ্লেষকরা বলছেন, যারা মজুদ করা সোনা বিক্রি করেননি তারা এবছর লাভবানই হবেন। কারণ উন্নত বিশ্বের দেশগুলো অর্থনৈতিক দুরাবস্থা থেকে মুক্তি পেতে প্রচুর পরিমাণে কাগুজে মুদ্রা ছাপিয়ে যাচ্ছে। বিশ্বের বিভিন্ন কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবছর ৪৫০ টন সোনা কিনবে বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
সারাবিশ্বে সোনার যে মজুদ আছে তার বেশিরভাগই ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে। এ মজুদের পরিমাণ সাড়ে ১০ হাজার টনেরও বেশি। আট হাজার টনের বেশি সোনার মজুদ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র আছে দ্বিতীয় স্থানে-যা তাদের মোট বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের ৭৭ শতাংশ। এর পরের অবস্থানগুলো হচ্ছে- জার্মানি-৩ হাজার ৩৯৬ টন, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল- ২ হাজার ৮১৪ টন, ইটালি- ২ হাজার ৪৫১ টন। বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকও সাড়ে ১৩ টন সোনা মজুদ করে রেখেছে। তবে মজার ব্যাপার হচ্ছে- সারাবিশ্বে যে পরিমাণ সোনা রয়েছে তার বেশিরভাগই ব্যবহার হচ্ছে জুয়েলারিতে যার পরিমাণ ৫২ শতাংশ। এর পরের অবস্থানে রয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ যার পরিমাণ ১৮ শতাংশ। ব্যক্তিগত বিনিয়োগের আওতায় আছে ১৬ শতাংশ, আর বিভিন্ন শিল্পে ব্যবহার হচ্ছে ১২ শতাংশ। সামনের দিনগুলোতে বাংলাদেশ ব্যাংক ডলার বা অন্যান্য মুদ্র্রার চাইতে বেশি পরিমাণে কিনতে পারে কিনা?—এমন প্রশ্নের জবাবে বিশিষ্ট ব্যাংকার ও অর্থনীতি বিশ্লেষক খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিজস্ব টিম আছে। তারা পর্যালোচনা করে দেখে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মুদ্রা কেনা লাভবান হবে নাকি সোনায় লাভবান হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিকট অতীতে রিজার্ভ হিসেবে সোনা কিনে লাভবান হয়েছে। বিশ্ব পরিস্থিতি দেখে তারা এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
গম: দ্বিতীয় পছন্দ
২০১৩ সালে গমে বিনিয়োগ দ্বিতীয় পছন্দে থাকবে। এক বছরে এ পণ্যটির দাম ২৪ শতাংশ বেড়েছে। পণ্যটির সরবরাহ কম হলেও চাহিদা বাড়ছে দিন দিন। তিনটি শীর্ষ গম আমদানিকারক দেশ হচ্ছে-মিশর, ইন্দোনেশিয়া ও জাপান। গম উত্পাদনকারী দেশ যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সে বৃষ্টির কারণে এবার ফলন কম হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। রাশিয়ার আশপাশের দেশগুলোতে খরা আর যুক্তরাষ্ট্র ও আর্জেন্টিনায় অকালবৃষ্টি এ পণ্যটির ফলন কমিয়ে দেবে। তবে এক্ষেত্রে ভারতীয় কৃষকরা লাভবান হবেন। কারণ এবার ভারতে ফলন হয়েছে সবচেয়ে বেশি। বিনয়োগকারীরা তাদের বিনিয়োগে এটি দ্বিতীয় নম্বরে রাখতে পারেন বলে বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন। বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি গম উত্পাদন করে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো যার পরিমাণ ১৩ কোটি ১৮ লাখ টন। দ্বিতীয় অবস্থানে আছে চীন। দেশটি মোট ১১ লাখ ৮০ হাজার টন গম উত্পাদন করে। ভারত উত্পাদন করে ৯ কোটি ৩৯ লাখ, আর যুক্তরাষ্ট্র উত্পাদন করে ৬ কোটি ১৭ লাখ। বিশ্বের গম উত্পাদনকারী দেশসমূহের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৩৪ নম্বরে। বাংলাদেশের মোট গম উত্পাদন ১০ লাখ টনের কাছাকাছি।
তামা: আস্থায় তৃতীয়
২০১৩ সালে বিনিয়োগকারীদের আস্থায় তৃতীয় নম্বরে আছে তামা। বিশেষ করে হাউজিং এবং বিদ্যুত্ উত্পাদন ক্রমাগতভাবে বেড়ে যাওয়ায় এ ধাতুটির চাহিদা বাড়ছে প্রতিনিয়ত। সারাবিশ্ব যে তামা ব্যবহার হয় তার ৪০ শতাংশই ব্যবহার করে চীন। বিশ্বে এমনিতেই পরিশোধিত তামার ঘাটতি আছে। বিশ্ব কপার স্টাডি গ্রুপের তথ্য অনুযায়ী- ২০১২ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সারবিশ্বে মোট এক কোটি ৪০ লাখ টন পরিশোধিত তামা উত্পাদন করা হয়েছে। আর এ সময়ে মোট তামা ব্যবহার করা হয়েছে ১ কোটি ৫০ লাখ টন। চাহিদা এবং উত্পাদনে ঘাটতি থাকায় ইতিমধ্যে ব্যবসায়ীরা তামা মজুদে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। সারাবিশ্বে প্রতিবছর প্রায় দুই কোটি টন তামা ব্যবহার হয়ে থাকে। এর মধ্যে এশিয়াতে ৪৬ শতাংশ, যুক্তরাষ্ট্রে ২৮ শতাংশ, ইউরোপে ১৯ শতাংশ, আফ্রিকায় ৫ শতাংশ তামা ব্যবহার হয়ে থাকে।
পরিশোধিত জ্বালানির অবস্থান চতুর্থ
মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে তেলের উত্পাদন কমে গেছে। আবার চীনসহ বিভিন্ন শিল্পোন্নত দেশের উত্পাদন ক্রমাগত বাড়তে থাকায় জ্বালানি তেলের চাহিদাও বাড়ছে। বিশ্বে গত একবছরে গাড়ী বিক্রির হার ৬ শতাংশ বেড়েছে। এর ফলে এবছর জ্বালানি তেল রয়েছে বিনিয়োগকারীদের আস্থায় চতুর্থ নম্বরে। সাধারণত: তিনটি কারণে জ্বালানি তেলকে বিনিয়োগকারীদের আস্থায় আনবে বলে মনে করা হচ্ছে। এ তিনটি কারণ হচ্ছে-তেলের উত্পাদন কমে যাওয়া, অন্যতম উত্পাদনকারী দেশ ইরানের ওপর অবরোধ আরোপ এবং উন্নত দেশগুলোতে সুদের হার ইচ্ছাকৃতভাবে কমিয়ে রাখা। তেল উত্পাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে ওপেকভূক্ত দেশের মজুদের পরিমাণ ১২'শ বিলিয়ন ব্যারেল। আর ওপেকের বাইরের দেশগুলোর মজুদ ২৮২ বিলিয়ন ব্যারেল। বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল পরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ১১১ মার্কিন ডলারের ওপরে। সরবরাহ ঘাটতির কারণে এবছর জ্বালানি তেলের দাম আরো বাড়বে বলে মনে করছেন বিনিয়োগ সংশ্লিষ্টরা।
No comments:
Post a Comment