‘ও আমার ওপর পশুর মতো হামলে পড়ে’
‘ও আমার ওপর পশুর মতো হামলে পড়ে। কত অনুনয় করে বললাম, ছেড়ে দিন। কোন কথাই শুনলো না। পশুর মতো আমার মুখে কাপড় বেঁধে নির্যাতন করে। এর আগে ধারালো ছুরি ধরে রাখে গলায়। এতে আমি অজ্ঞান হয়ে পড়ি’-এ কথাগুলো বলে বার বার মূর্ছা যাচ্ছিলেন সিলেটের নির্যাতিতা তরুণীটি। ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নারী নির্যাতিতা কেন্দ্রে তিনি যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে এসব কথা জানান। তরুণীটির অবস্থা ভালো নয়। ঘটনার প্রায় ৮ ঘণ্টা পর তার রক্তক্ষরণ বন্ধ হলেও নির্যাতনের নির্মম দৃশ্য মনে হলেই আঁতকে উঠে। ফুলের মতো এই তরুণীর সঙ্গে নির্মম ও নিষ্ঠুর আচরণ করেছে সিলেটের এক পাষণ্ড। ঘুমন্ত অবস্থায় মুখে কাপড় বেঁধে তার ওপর চালিয়েছে অমানুষিক নির্যাতন। আর এই নির্যাতনে তছনছ হয়ে গেছে একটি জীবন। স্বাভাবিক হতে পারছেন না মেয়েটি। সিলেট শহরতলীর দাউদপুরের মাঝপাড়া গ্রামে শনিবার দুপুরে এ ঘটনা ঘটে। ঘটনার প্রায় ১০ ঘণ্টা পর ওই মেয়েকে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তার আগে বাড়িতে রেখে আপসে বিষয়টির মীমাংসা চালানোর চেষ্টা হয়। কিন্তু স্থানীয়রা কোন মীমাংসা করতে পারেন নি। তার বয়স পনেরো। পিতা রিকশা চালক। তিন ভাই ও দুই বোনের মধ্যে ওই তরুণী ৩য়। মাঝপাড়া গ্রামের হাওরের পাশে নতুন বাড়ি করেছেন পিতা। প্রতিদিনের মতো ওইদিনও বাড়ি থেকে সকালেই রিকশা নিয়ে বের হয়ে যান পিতা। পরিবারের অন্য সদস্যরাও যে যার কাজে চলে যান। বাড়িতে ছিল তরুণীটি ও তার ভাবী। ভাবী গৃহস্থালি কাজে বাড়ি থেকে প্রায় ৩শ’ ফুট দূরে জমিতে কাজ করছিলেন। আর তরুণীটি দরোজা খোলা রেখে ঘরের মধ্যে ঘুমাচ্ছিলো। এমন সময় ফাঁকা বাড়িতে ঢুকে মাঝপাড়া গ্রামের বাসিন্দা জাহাঙ্গীর আলম শামীম। শামীমের বয়স ২৪। সিলেট নগরীর লামাবাজারের ইউসিবি ব্যাংকের গার্ড। সে একই গ্রামের রিকব আলীর ছেলে। শামীম বাড়িতে ঢুকে ঘুমন্ত তরুণীকে একা পেয়ে মুখ বেঁধে ধর্ষণ করে। ঘটনার প্রায় আধা ঘণ্টা পর তরুণীটির ভাবী ও তার বড় বোন বাড়িতে প্রবেশ করে। এ সময় তাদের দেখে ঘরের ভেতর থেকে দৌড়ে পালাতে থাকে শামীম। এ দৃশ্য দেখে ভাবী ও বোন দৌড়ে ঘরে ঢুকে দেখেন তরুণীটির দেহ পড়ে আছে খাটের উপর। গোপনাঙ্গ দিয়ে রক্ত ঝরছে। তার মুখ বাঁধা। অচেতন অবস্থায় পড়ে আছে সে। এ দৃশ্য দেখে চিৎকার শুরু করে ভাবী ও বোন। তারা মুখের বাঁধন খুলে দিয়ে তার মাথায় পানি দেন। প্রায় ৫ মিনিট পর জ্ঞান ফিরে আসে তার। এরপর সে জানায়, শামীমের নির্যাতনের কথা। এদিকে, ঘটনার পর থেকে বার বার মূর্ছা যাচ্ছিলো তরুণীটি। বিষয়টি গোটা গ্রাম জানাজানি হলে তোলপাড় শুরু হয়। তরুণীর বড় বোনের স্বামী জানান, পশুও পশুর ওপর এরকম আচরণ করে না। হাসপাতালে ভর্তি করা পর্যন্ত তরুণীটির অবিরাম রক্ত ঝরছিলো বলে জানান তিনি। বিষয়টি স্থানীয়ভাবে শেষ করতে দাউদপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম আলম, স্থানীয় মেম্বার সেলিম আহমদ সহ এলাকার লোকজন চেষ্টা চালান। তারা সন্ধ্যায় বিষয়টি নিয়ে এলাকায় সালিশি বৈঠক ডাকেন। এবং ওই বৈঠকের মাধ্যমে নির্যাতিতা মেয়েটিকে শামীমের সঙ্গে বিয়ে দেয়ার প্রক্রিয়া চালান। মেয়েটির পরিবার অত্যন্ত দরিদ্র হওয়ায় বিয়ের বিষয়টি মেনে নিলেও শামীমের পরিবার বিয়ে মানে নি। মধ্যরাত পর্যন্ত সমঝোতার চেষ্টা বিফলে যায়। স্থানীয় ইউনিয়ন চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম আলম জানিয়েছেন, বিষয়টিকে বিয়ের মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করা হয়। এতে স্থানীয় মেম্বার সহ তিনি সমঝোতার চেষ্টা করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত শামীমের পরিবার বিষয়টি মানেনি। পরে রাত ১টার দিকে তাকে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওসিসিতে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসা প্রদান করা হলে ভোরের দিকে তার রক্তক্ষরণ বন্ধ হয়ে আসে বলে হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানিয়েছেন। তবে মানসিকভাবে বেশ ভেঙে পড়েছে সে। ঘটনার চিত্র তার চোখের সামনে ভেসে এলেই আতঁকে উঠে। তরুণীর স্বজনরা জানিয়েছেন, মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে সে। ডাক্তাররা বলেছেন, পুরোপুরি সুস্থ হতে বেশ সময় লাগবে। এদিকে, খবর পেয়ে গতকাল সকালে হাসপাতালের ওসিসিতে দেখতে আসেন মোগলাবাজার থানার ওসি মো. মুরছালিন। তিনি জানান, এ ঘটনায় নির্যাতিতার পিতা বাদী হয়ে থানায় মামলা করেছেন। মামলার একমাত্র আসামি শামীম। মামলা দায়েরের পর পুলিশ শামীমকে গ্রেপ্তারে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালালেও তাকে খুঁজে পায়নি। পিতা হাসপাতালের ওসিসি’র বাইরে বসে কাঁদছিলেন। মেয়ের ওপর এ অত্যাচারের বিচার চান তিনি। বলেন, কোন মানুষ ফুলের মতো এতটুকু মেয়ের ওপর এরকম নির্যাতন চালাতে পারে না। এদিকে, সকালে গোটাটিকর এলাকার একটি বস্তিতে শামীম নামের এক যুবক ১৪ বছরের এক কিশোরীকে ডেকে নেয়। পরে ঘরে আটকে রেখে তাকে ধর্ষণ করে। এ ঘটনায় পুলিশ শামীম ও ধর্ষণে সহযোগিতাকারী অভিনা নামের আরেক তরুণীকে গ্রেপ্তার করেছে।

No comments:
Post a Comment