Pages

Monday, January 28, 2013

দুবাইয়ে বাংলাদেশী চক্রের অন্ধকার জগৎ

দুবাইয়ে বাংলাদেশী চক্রের অন্ধকার জগৎ


দুবাইয়ে বাংলাদেশী চক্রের অন্ধকার জগতে বন্দি হয়ে সর্বস্ব হারিয়ে নিঃস্ব বাংলাদেশী এক যুবতী। অভাব-অনটনের সংসারে একটু সুখ আনার জন্য পাড়ি দিয়েছিলেন সুদূর প্রবাসে। কিন্তু সুখ নামের সেই স্বপ্ন তার জীবনকে করে দিয়েছে ছারখার। এখন লোকলজ্জার ভয়ে কোথাও মুখও দেখাতে পারেন না। বলেন, এ জীবন রেখে কি লাভ? মনে হয় আত্মহত্যা করি। কিন্তু পারি না। ভাবি, যারা আমার জীবনকে নিঃশেষ করে দিয়েছে তাদের বিচার দেখতে চাই। এ জন্যই মামলা করেছি। ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল ৪-এ মামলা করেন তিনি। ২৩শে জানুয়ারি আদালত মামলার আসামী ফালি বেগম, রিপন, আসমা বেগম ও জমির আলীর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। পাশাপাশি বিচারক আরিফুল হক বলেছেন, ঘটনার সত্যতা যেহেতু আছে সেহেতু বিষয়টি আমলে নেয়া হলো।
ঢাকার নবাবগঞ্জ থানার ওই যুবতী বিভিন্ন বাসা-বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করতেন। দেখতে সুন্দরী হওয়ায় তার দিকে নজর পড়ে পাচারকারী চক্রের সর্দারনী নবাবগঞ্জের তেলেঙ্গা গ্রামের ফালি বেগমের। সে নানাভাবে ফুঁসলিয়ে সুখের স্বপ্ন দেখিয়ে দুবাইয়ে পাঠানোর ব্যবস্থা করে তার। ফালি বেগমের সহযোগী হিসেবে কাজ করে মো. রিপন, আসমা বেগম ও মূলবক্স গ্রামের জমির আলী। ২০০৭ সালের ৩রা মে তাকে পাঠানো হয় দুবাই। পাঠানোর আগেই আসমা বেগম চলে যায় দুবাই। দুবাই বিমানবন্দরে তাকে গ্রহণ করে আসমা বেগম ও সিলেটি সেলিম বলে একজন। বিমানবন্দর পেরুনোর পরই যুবতীর কাছ থেকে পাসপোর্টসহ সকল কাগজপত্র নিয়ে যায় আসমা। এরপর তাকে নিয়ে যাওয়া হয় আসমা বেগমের পতিতা পল্লীতে। প্রথম দিনের বর্ণনা দিতে গিয়ে ওই যুবতী বলেন, কিছু বুঝে ওঠার আগেই আমার চুল ধরে টেনে কিল, ঘুষি, লাথি মারতে মারতে মেঝেতে ফেলে দেয়। এরপর শরীরের ওপর চলতে থাকে উন্মাদ নৃত্য। বাকি রাখেনি কিছুই। ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোর করে খাইয়ে দেয় এক গ্লাস সবুজ শরবত। আর কিছু মনে নেই তার। সংজ্ঞা ফিরে দেখে ঘরের মেঝেতে পড়ে আছে, শরীরে কোন কাপড় নেই। সম্পূর্ণ উলঙ্গ। খালি গায়ে হাফপ্যান্ট পরা এক লোক ক্যামেরা দিয়ে ছবি তুলছে তার। পাশেই বিবস্ত্র এক বিদেশী। মুচকি হেসে কি যেন বলছে সে। তার ভাষা বুঝতে পারেনি ২২ বছর বয়সী এই যুবতী। এরই মধ্যে অস্ত্র হাতে ৪ জন তাকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে। ভীত-সন্ত্রস্ত যুবতী নিজেকে সামলাতে ব্যস্ত হয়ে উঠলে চারপাশে থাকা লোকগুলো অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে। এদের মধ্যে সেলিম নামের একজন বলে, কোন লাভ নেই। তোর কাপড়-চোপড় পাশের ঘরে। তোকে উলঙ্গ করে, এই যে বিদেশীকে দেখছিস, তাকে দিয়ে ধর্ষণের ছবি তুলে নিলাম। আমাদের প্রস্তাবে রাজি কিনা বল? রাজি না হলে এই ছবি বাংলাদেশে তোর আত্মীয়-স্বজন ও গ্রামবাসীর কাছে পাঠিয়ে দেবো। দেখাবো বিদেশে এসে তুই দেহব্যবসা করে টাকা রোজগার করছিস। এতে তোর পরিবারের মান-সম্মান ধুলায় মিশবে। তোরা সমাজচ্যুত হবি, মুখ দেখাতে পারবি না কোথাও। শেষে আত্মহত্যা করতে হবে তোকে। তার চেয়ে ভাল, আমাদের কথায় রাজি হয়ে যা। দেহব্যবসাকে পেশা হিসাবে নে। প্রচুর টাকা পাবি। বাড়ি-গাড়ি কিনা হবে তোর। দেশে ফিরে রানীর হালে থাকবি।
এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে দু’হাত দিয়ে মুখ ঢাকে যুবতী। কিছু লেখাপড়াও জানেন। ভূমিহীন পরিবারের সহায়-সম্বলহীন যুবতীকে বিয়ের কিছুদিন পরই স্বামী তালাক দেয়। সেই থেকে এলাকার বিভিন্ন লোকজনের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করতেন। একই এলাকায় বসবাস করার সুবাদে তেলেঙ্গা গ্রামের ফালি বেগম, রিপন, আসমা বেগম, জমির আলীর কাছে তার কোন কিছুই অজানা ছিল না।
দুবাইতে আসমার বাসায় আরও তিনটি মেয়ে ছিল। তাদের কাছে প্রতিনিয়ত বেগানা পুরুষরা আসতো। মেয়েদের সঙ্গে ওই সব পুরুষ আমোদ-ফুর্তি করতো। আসর বসতো মদের। এসব দেখে যুবতী পরে গভীর দুশ্চিন্তায়। তাকে কোথায় নিয়ে আসা হয়েছে? এরই মধ্যে আসমা বলে, ওদেরকে দেখছো? জীবন কিভাবে উপভোগ করছে, আনন্দ, ফুর্তি সঙ্গে টাকা আর টাকা। তোমাকেও এ কাজটিই করতে হবে। পুরুষদের সঙ্গে ফূর্তি করতে হবে। তাদের আনন্দ দেবে আর নিজেও আনন্দ পাবে। এটাই তোমার কাজ। তোমার বয়স কম। স্বাস্থ্য শরীর ভাল। খদ্দেররা তোমাকে লুফে নেবে। চিন্তা করো না, তোমার খাওয়া-দাওয়া, থাকা-পরা অসুস্থতা, চিকিৎসা সবই আমি করবো, দেশে যাওয়া-আসার বিমান ভাড়াসহ সব খরচা আমরাই দেবো। একেবারে রাজকীয় হাল তোমার। নাও প্রস্তুতি নাও এবং কাজে লেগে পড়। পাশের রুমে বিদেশী খদ্দের অপেক্ষা করছে। আসমার কথা শুনে হতভম্ব হয়ে পড়ে যুবতীটি। এ কাজ তার দ্বারা সম্ভব নয়। সারা শরীর কাঁপতে থাকে তার। এখন সে কি করবে? কার সাহায্য নেবে? এদের হাত থেকে বাঁচবে কিভাবে? অকস্মাৎ বিদ্রোহী হয়ে ওঠে সে। চিৎকার দিয়ে বলে ওঠে, না। এ কাজ জীবন থাকতে নয়। যুবতীটি মুখ থেকে ‘না’ শব্দটি বের হতে যত দেরি, ততক্ষণে পাশে দাঁড়ানো সিলেটি সেলিম রুমে আগে থেকে প্রস্তুত করে রাখা ক্যাসেট উচ্চ শব্দে ছেড়ে দিয়ে তাকে মারধর শুরু করে। চুল ধরে টেনে কিল, ঘুষি, লাথি মারতে মারতে মেঝেতে ফেলে দেয়। সেলিম তার নেতিয়ে পড়া দেহের ওপর উন্মাদের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে। মারের চোটে তার প্রাণ যখন প্রায় ওষ্ঠাগত তখন আসমার সাহায্যে পাশের রুম থেকে আনা সবুজ এক গ্লাস শরবত সেলিম জোর করে তার মুখের ভিতর ঢেলে দেয়। ওই শরবত খাওয়ার পরই যুবতী সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলে। যখন জ্ঞান ফিরে তখনই ঘটনার ভয়াবহতায় সে থর থর করে কাঁপতে থাকে, আর নিজকে দেখতে পায় মেঝের ওপর সম্পূর্ণ উলঙ্গ অবস্থায়। এত কিছুর পরও যুবতী দেহব্যবসায় অসম্মতি জানালে ওরা তাকে দু’দিন দানা-পানি কিছুই খেতে দেয়নি। এক পর্যায়ে যুবতী আত্মহত্যা করার হুমকি দিলে ওরা তার হাত-পা বেঁধে রাখে আর তার ওপর অত্যাচারের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। শেষে নিরুপায় যুবতী কেবল বেঁচে থাকার জন্য ওদের প্রস্তাবে রাজি হয়। শুরু হয় অন্য জীবন। যুবতীর ভাষায়, শরীর ভাল থাকলে প্রতিদিন ১০-১৫ জনকে দেহ দিতে হতো তার। ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী, মদখোর, সমাজের উঁচু-নিচু সর্বস্তরের লোকদের মনোরঞ্জন করতে হতো তাকে। এ অত্যাচার চলেছে ৫ বছরেরও বেশি সময়। এ সময়ের মধ্যে কখনওই যুবতীকে ঘরের বাইরে যেতে দেয়া হয়নি। তবে খদ্দেরদের সুবিধার্থে তাকে বিশেষ ব্যবস্থায় হোটেলে নিয়ে যাওয়া হতো। তা-ও রাতের অন্ধকারে। সেই ৫ বছরে যুবতীর দেহ বিক্রি বাবদ আসমারা রোজগার করে নিয়েছে ২ কেটি টাকারও বেশি। ওই টাকা থেকে যুবতীকে তারা দিয়েছে সর্বসাকুল্যে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। এক রাতে খদ্দেরদের মনোরঞ্জনের জন্য যুবতীকে নিয়ে যখন তারা হোটেলে যাচ্ছিল, তখন সকলের চোখ ফাঁকি দিয়ে হোটেলের সামনে থেকে পালিয়ে যায় সে। গভীর রাতে পাসপোর্ট ও কাগজপত্র বিহীন পেয়ে সে দেশের পুলিশ তাকে আটক করে। ৩০-৩৫ দিন জেল খাটার পর পুলিশ তাকে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়। দেশে এসে পাচারকারী দলের সদস্য ফালি বেগম, রিপন, আসমা, জমির আলী গংয়ের বিরুদ্ধে বিচার চাইলে উল্টা বিপত্তি ঘটে যুবতী ও তার মায়ের। প্রাথমিক তদন্তকালে তার মামলাটি মিথ্যা প্রমাণিত হওয়ায় তা বাতিল হয়ে যায়। এতে পাচারকারী সদস্যরা ক্ষিপ্ত হয় যুবতীকে জীবনে শেষ করে দেয়ার হুমকি দেয়। এ পর্যায়ে মান-সম্মান ও কলঙ্কের ভয় ত্যাগ করে তিনি ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল ৪-এ ফালি বেগম, তার ছেলে মো. রিপন, মেয়ে আসমা বেগম ও একই গ্রামের মৃত রশিদ মোল্লার ছেলে সালাম মোল্লা ও মূলবর্গ গ্রামের মৃত পেয়ার আলীর পুত্র জমির আলীর বিরুদ্ধে মামলা করেন। যুবতীর পক্ষে মামলা পরিচালনা করেন এডভোকেট এমদাদুল হক লাল। তিনি বলেন, ঘটে যাওয়া ঘটনার সারাংশ তুলে ধরে মামলা করা হয়েছে। আদালতের বিচারক মো. আরিফুর রহমান বিষয়টি তদন্তের জন্য দিলে প্রাথমিকভাবে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। আর সে কারণে ফালি বেগম, রিপন, আসমা বেগম, জমির আলীর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির নির্দেশ দিয়েছে আদালত।

No comments:

Post a Comment