রাজীব খুনের পর তিনটি ফোন একসঙ্গে বন্ধ হয়
ব্লগার আহমেদ রাজীব হায়দার শোভন ওরফে শুভ হত্যাকাণ্ডের ১৫ মিনিটের মধ্যে তিনটি মোবাইল ফোন একযোগে বন্ধ হয়ে যায়। ওই নম্বরগুলোর অবস্থান ছিল হত্যাকাণ্ডস্থলের আশপাশে। গতকাল থেকে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ ওই নম্বর ব্যবহারকারীদের হন্য হয়ে খুঁজছে। গোয়েন্দারা জানান, ওইদিন রাত ৮টা ৪৪ মিনিট থেকে রাজীবের বাসার সামনে তিনটি নতুন মোবাইল নম্বরের খোঁজ পায়। রাত ৯টা ১৪ মিনিটের পর থেকে সেই তিনটি মোবাইল নম্বর বন্ধ হয়ে যায়। তবে এখনও রাজীব হায়দার হত্যাকাণ্ডে জড়িত কাউকে শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ। জানতে পারেনি খুনের মোটিভ। হত্যাকাণ্ডের চারদিন পর গতকাল রাতে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ নিহত রাজীবের স্ত্রী আনিকা ব্রোজিনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন। তদন্ত সূত্রমতে, রাজীব নিহতের পর পারিবারিক আনুষ্ঠানিকতায় ব্যস্ত ছিলেন আনিকা। একারণে তাকে ডাকা হয়নি। খুনের রহস্য উদঘাটনে তার কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে। এ ধারণা থেকেই গোয়েন্দারা তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন। তবে কি ধরনের তথ্য পেয়েছেন তা জানাননি গোয়েন্দা কর্মকর্তারা।
গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, দীর্ঘদিনের পরিকল্পনায় রাজীবকে খুন করা হয়েছে। খুনের পরিকল্পনাটি অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে করা হয়েছে। খুনের পর রাজীবের দুই বান্ধবীসহ একাধিক ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। খুনের ঘটনায় তার পাঁচ বান্ধবীকে সন্দেহের তালিকায় রাখা হয়েছে। মোবাইল ফোন ট্রাকিং করে ১৩, ১৪ ও ১৫ই ফেব্রুয়ারি রাজীবের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েছে পুলিশ। রাজীবের অবস্থান এবং ওই তিনদিন কাদের সঙ্গে রাজীবের কথা হয়েছে এবিষয়কে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। সন্দেহভাজন অর্ধশতাধিক মোবাইল ফোনের ভয়েস রেকর্ড সংগ্রহ করছে পুলিশ। এইসব ভয়েস রেকর্ড যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।
র্যাবের গোয়েন্দা শাখার প্রধান লে. কর্নেল জিয়াউল আহসান জানান, পেশাদার কিলার রাজীবকে হত্যা করেছে। হত্যাকাণ্ডের ধরন দেখে ধারণা করা হচ্ছে, কোন উগ্র মৌলবাদী গোষ্ঠীর পরিকল্পনায় এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। অতীতে উগ্র মৌলবাদীদের হাতে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে রাজীবের হত্যার মিল রয়েছে বলে তিনি জানান।
গোয়েন্দা পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, নিহত রাজীব ব্লগ লিখতেন। ব্লগে মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে অনেক লেখা রয়েছে। এছাড়া, ইসলাম ও হযরত মুহম্মদ (সা.) কে উদ্দেশ্য করে তিনি কিছু ব্লগ লেখেছিলেন। ধারণা করা হচ্ছে, ব্লগে এইসব লেখালেখির জেরে তাকে হত্যা করা হয়েছে।
জানা যায়, গত ১৩ই ফেব্রুয়ারি দুপুর থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত রাজীব শাহবাগের প্রজন্ম চত্বরে অবস্থান করেন। এরপর দুই ঘণ্টার জন্য ধানমন্ডি গিয়েছিলেন। ধানমন্ডি থেকে ফিরে রাত ৮টা পর্যন্ত প্রজন্ম চত্বরে অবস্থান করে রাজীব পল্লবীর বাসায় ফিরে যান। ১৪ই ফেব্রুয়ারি রাজীব প্রজন্ম চত্বরে আসেননি। পরের দিন বিকাল ৩টা পর্যন্ত রাজীব তার পলাশ নগরের বাসায় ছিলেন। এসময় তার ঘনিষ্ঠ বান্ধবী তানজিলাও সঙ্গে ছিলেন। এরপর রাজীব তার বান্ধবীকে সঙ্গে নিয়ে পার্শ্ববর্তী বাইশটাকি এলাকাসহ আশপাশে ঘোরাফেরা করেন। রাত সাড়ে ৮টার দিকে বান্ধবী তানজিলাকে সঙ্গে নিয়ে মিরপুর ১০ নম্বর থেকে পল্লবীর নিজের বাসার কাছাকাছি আসেন। তানজিলা চলে গেলে রাত ৮টা ৫৮ মিনিটে রাজীব আরেক বান্ধবী রাফির সঙ্গে মোবাইলে কথা বলতে বলতে বাসার সামনে রাস্তায় চলে আসেন। রাত ৮টা ৫৯ মিনিট পর্যন্ত সে বান্ধবী রাফির সঙ্গে কথা বলেন। সেটাই ছিল ফোনে রাজীবের শেষ কথা বলা। গোয়েন্দারা ধারণা করছেন, এরপরই সে হামলার শিকার হয়।
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, রাত ৮টা ৪৪ মিনিট থেকে রাজীবের বাসার সামনে তিনটি নতুন মোবাইল নম্বরের খোঁজ পাওয়া যায়। রাত ৯টা ১৪ মিনিটের পর থেকে সেই তিনটি মোবাইল নম্বর বন্ধ হয়ে যায়। ওই তিন মোবাইল ফোনের গ্রাহককে খুঁজছে পুলিশ। রাত ১০টায় রাজীবের মোবাইলে একটি এসএমএস পাঠায় তানজিলা। এসএমএসটি ছিল- ‘দাদা বাসায় গেছো?’ সে সময় তানজিলার অবস্থান ছিল মিরপুর-২ এলাকায়।
গত শুক্রবার রাত ৯টার দিকে পল্লবীর ৫৬/৩ পলাশনগরের নিজ বাসার পাশেই নির্মমভাবে খুন হন ব্লগার আহমেদ রাজীব হায়দার।

