আওয়ামী লীগের আপত্তিতে নির্বাচন কমিশনে অস্বস্তি:সংসদীয় আসনের সীমানা পুনঃনির্ধারণ
জাতীয় সংসদের সীমানা পুনঃনির্ধারণ নিয়ে অস্বস্তিতে পড়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সবকিছু ঠিকঠাক করে গুছিয়ে আনলেও শেষমুহূর্তে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সীমানা পুনঃনির্ধারণের বিপক্ষে অবস্থান নেয়ায় এখন সিদ্ধান্তহীনতায় রয়েছে ইসি। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের আগে আর সর্বোচ্চ ১০ মাস সময় থাকলেও এখনো মূল কাজ অর্থাত্ সীমানা পুনঃনির্ধারণের বিষয়ে কোনো নীতিমালা স্পষ্ট করেনি ইসি। ১৯৭৬ সালের সীমানা সংক্রান্ত অধ্যাদেশ অনুযায়ী আদমশুমারির প্রতিবেদন প্রকাশের পর সংসদের সীমানা পুনঃনির্ধারণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। যদিও আওয়ামী লীগ এই আইনের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে ২০১৮ সালের পর সীমানা পুনঃনির্ধারণ করতে ইসির কাছে দাবি জানিয়েছে।
দেশের সুশীল সমাজ, গণমাধ্যম, এনজিও প্রতিনিধি এবং বেশিরভাগ রাজনৈতিক দল সংবিধান অনুযায়ী সীমানা পুনঃনির্ধারণের দাবি জানালেও নির্বাচন কমিশন এ ব্যাপারে এখনও কার্যত কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের অবস্থান প্রকাশের পর নির্বাচন কমিশনে ধীর গতি চলে আসে। প্রথম দিকে হাঁকডাক করে সীমানা পুনঃনির্ধারণের কাজে মনোযোগী দেখানো হলেও এখন কমিশন যে সেই অবস্থায় নেই—তা যথেষ্টই স্পষ্ট।
নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো ঃ জাবেদ আলী গতকাল রবিবার ইত্তেফাককে বলেন, বিভিন্ন মহলের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা শেষে সীমানা পুনঃনির্ধারণের কাজ চলছে। দুই থেকে আড়াই মাসের মধ্যে ৩০০ সংসদীয় আসনের এ সংক্রান্ত খসড়া প্রকাশ করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। তবে পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে প্রায় ৫ মাস লাগতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সীমানা পুনঃনির্ধারণের বিষয়ে গত ১৩ সেপ্টেম্বর সুশীল সমাজ, ১০ অক্টোবর গণমাধ্যম প্রতিনিধি, ২২ নভেম্বর এনজিও প্রতিনিধি এবং গত ২৬ নভেম্বর থেকে ৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপে বসে কমিশন। প্রধান বিরোধী দল বিএনপি অংশ না নিলেও নিবন্ধিত ৩৮টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ২৮টি দল সংলাপে অংশ নেয়। গত ৫ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগ সংলাপে অংশ নিয়ে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে গঠিত নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ২০০৮ সালে প্রণীত নির্বাচনী সীমানায় দশম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের পক্ষে মত দেয়। সংলাপে অংশ নেয়া রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কেবল আওয়ামী লীগই সীমানা পুনঃনির্ধারণের বিপক্ষে অবস্থান নেয়।
এখনো ২৮টি দলের সংলাপের সারসংক্ষেপ প্রস্তুত করা হয়নি। অধিকাংশ দলই সীমানা পুনঃনির্ধারণের পাশাপাশি ঢাকার আসন কমানোর পক্ষে প্রস্তাব দেয়। কিন্তু সে বিষয়ে কমিশনের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট কোন নির্দেশনাও দেয়া হয়নি।
এদিকে রাজনৈতিক দলের সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের সংলাপের দরকার ছিল না মন্তব্য করে সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ড. এটিএম শামসুল হুদা ইত্তেফাককে বলেন, 'একই ইস্যু নিয়ে আমরাও গত বছর রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ করেছিলাম। সেই সংলাপের ভিত্তিতেই সীমানা পুনঃনির্ধারণের বিষয়ে আইনের খসড়ার প্রস্তাবও করেছিলাম। কিন্তু কমিশন সেই প্রস্তাবকে ভিত্তি ধরে এগুলে ভালো করতো। কারণ সীমানা পুনঃনির্ধারণের আগে ১৯৭৬ সালের আইনের সংশোধন প্রয়োজন। আইন সংশোধন না করে সীমানা পুনঃনির্ধারণ করা হলে নির্বাচন নিয়ে আইনি জটিলতার সৃষ্টি হতে পারে। ওই আইনে জনসংখ্যার ভিত্তিতে আসন বিন্যাসের কথা রয়েছে। এক্ষেত্রে ঢাকার আসন আরো বাড়বে। এজন্য কমিশনের ঢাকার আসন পুনঃনির্ধারণের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে আসা প্রয়োজন।'
তিনি বলেন, ম্যানুয়াল পদ্ধতি অনুসরণ করা হয় তাহলে আগামী ১০ বছরেরও সীমানা পুনঃনির্ধারণের কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হবে না। তবে জিআইএস পদ্ধতি অনুসরণ করলে ৪ মাসের মধ্যে তা করা সম্ভব বলে জানান তিনি।
ইসি সূত্র জানায়, রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপের সার সংক্ষেপ না হলেও সীমানা পুনঃনির্ধারণের বিষয়ে পরিকল্পনার কথা ফের জানিয়েছে ইসি। সীমানা পুনঃনির্ধারণ করে খসড়া প্রকাশ, তার ওপর আপত্তি শুনানি করে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করতে প্রায় চার মাস সময় লাগবে। এক্ষেত্রে আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ দিকে সংসদীয় সীমানার খসড়া তালিকা প্রকাশের পরিকল্পনা রয়েছে। খসড়ার উপর আপত্তির জন্য সময় দেয়া হবে এক মাস। এরপর বিভাগীয় শহরগুলোতে শুনানি শেষে এপ্রিল মাসে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ সম্ভব হবে।
সংবিধান অনুযায়ী আগামী বছরের ২৬ অক্টোবর থেকে ২০১৪ সালের ২৪ জানুয়ারির মধ্যে অনুষ্ঠিত হবে আগামী দশম সংসদ নির্বাচন। এ জন্য কমিশনের হাতে আর সময় রয়েছে ১০ মাস। অথচ এই স্বল্প সময়ের মধ্যে সীমানা পুনঃনির্ধারণসহ নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর আস্থা অর্জনের কঠিন চ্যালেঞ্জ রয়েছে ইসির সামনে।
উল্লেখ্য, জনসংখ্যার ভিত্তিতে ২০০৮ সালের সংসদীয় আসনের সীমানা পুনর্বিন্যাসে ঢাকা জেলায় ৭টি, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, নেত্রকোনা ও গাজীপুরে ১টি করে আসন বেড়ে যায়। অন্যদিকে, ১২টি জেলার আসন কমাতে হয়েছিল নির্বাচন কমিশনকে। এর ফলে ১৩০টি আসনের সীমানা ওলটপালট হয়ে যায়। সারাদেশে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়। সীমানা পুনঃবিন্যাস চেয়ে কমিশনের অসংখ্য আবেদন পড়ে।