Pages

Wednesday, December 19, 2012

অভিনব হরতাল

অভিনব হরতাল


এ এক অভিনব হরতাল হয়ে গেল রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে। হঠাৎই বদলে গেলেন পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা। প্রতিটি হরতালে যাদের ব্যস্ত দেখা যেতো পিকেটার দমনে গতকাল ইউটার্ন নিলেন তারা। স্বল্প সংখ্যক পিকেটারকে কোন বাধাই দেয়া হলো না। উল্টো বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই পিকেটারের ভূমিকায় দেখা গেল পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের। রাস্তায় ব্যারিকেড আর কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে হরতাল পালন করলেন তারা। স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন হরতাল আর কোন দিন দেখা যায়নি। হরতালের আহ্বায়ক ছিল বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) এবং বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)। যাদের সংসদে আসন নেই, কোনকালে ছিলও না। তাদের পিকেটারদের গানবাজনা করতে দেখা গেছে হরতালের সময়। এ হরতালের প্রধান দাবি দু’টো। যুদ্ধাপরাধের বিচার ত্বরান্বিত করা এবং জামায়াতসহ ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করা। হরতাল সফলে আগের রাতেই প্রস্তুতি নেয়া হয় সরকারের তরফে। মালিকদের জানিয়ে দেয়া হয়েছিল রাস্তায় বাস নামানো যাবে না। সরকারি সিদ্ধান্তে বিআরটিসির কোন বাসও রাস্তায় নামেনি। যদিও আগের হরতালগুলোতে বিআরটিসির বাসই দেখা যেতো সবচেয়ে বেশি। রাস্তায় নিজের প্রাইভেট গাড়ি চালাতে গিয়েও অনেকে পুলিশি বাধার সম্মুখীন হয়েছেন। গাড়ি ঘুরিয়ে দিয়েছে পুলিশ। কারণ জানতে চাওয়া হলে অজুহাত দেখানো হয়েছে নিরাপত্তার। পরিবহন না পেয়ে পায়ে হেঁটে চলতে হয়েছে হাজার হাজার মানুষকে। মজার ব্যাপার হলো এতে নাকি তাদের কোন কষ্টই হয়নি। দিন শেষে হরতাল আয়োজনকারীদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর। অভিযুক্ত পক্ষ ছাড়া যুদ্ধাপরাধের বিচার নিয়ে কেউই কোন আপত্তি জানায়নি। দেশের প্রায় সব মানুষই এ বিচার চান। এ বিচার ত্বরান্বিত করার দাবিতে পালিত হরতালে সরকারের সমর্থনে একটি প্রশ্ন সামনে এসেছে, তাহলে কি যুদ্ধাপরাধের দ্রুত বিচার নিয়ে সরকারের নীতিনির্ধারকদের মনে কোন সংশয় আছে। ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করার দাবি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন পর্যবেক্ষকরা। এমন এক সময়ে এ দাবি উত্থাপিত হলো যখন সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ইসলামের কথা বলা আছে। এমনকি পঞ্চদশ সংশোধনীতে এটিকে সংবিধানের মৌলিক কাঠামো হিসেবেও গণ্য করা হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, বৃটেন, ভারতের মতো ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে যেখানে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি চালু আছে সেখানে বাংলাদেশে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করার দাবির যৌক্তিকতা খুঁজে পাচ্ছেন না বিশ্লেষকরা। হরতালের প্রতি সাধারণ মানুষের আকর্ষণ নষ্ট করে দেয়ার জন্যই সরকারি আয়োজনে এমন হরতাল পালনের গুঞ্জন এরই মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে।
হরতালে পুলিশের সহায়তা!
বাম রাজনৈতিক দলগুলোর ডাকা হরতাল চলাকালে হরতালকারীদের সহায়ক হিসেবে দেখা গেছে পুলিশকে। শান্তিপূর্ণ হরতাল চলাকালে রাজধানীতে যানবাহনের সংখ্যা ছিল কম। বিআরটিসিসহ অন্যান্য পরিবহনের বাস রাস্তায় না নামায় ছোট যানবাহনই ছিল যাত্রীদের ভরসা। কিন্তু রাস্তার মোড়ে মোড়ে এসব যানবাহনও আটকে দিতে দেখা গেছে পুলিশকে। কোন কোন রাস্তায় অস্থায়ী ব্যারিকেড দিয়ে যানবাহন চলাচল বন্ধ রাখে পুলিশ। রাজধানীর অন্যতম ব্যস্ততম সড়ক বাংলামোটরে পুলিশকে দেখা যায় যানবাহন আটকে দিতে। দুপুর দেড়টায় দু’টো অ্যাম্বুলেন্স শাহবাগের দিকে যেতে চাইলে তাতেও বাধা দেয়া হয়। পুলিশ যানবাচনকে বিকল্প পথে মগবাজার হয়ে গন্তব্যে যেতে বলে।
শাহবাগ পয়েন্টকে কেন্দ্র করে পুলিশ বাংলামোটর, এলিফ্যান্ট রোড, মৎস্য ভবন এলাকায় ব্যারিকেড দিয়ে রাস্তা বন্ধ করে দেয়। পল্টন পয়েন্টকে কেন্দ্র করে প্রেস ক্লাব, কাকরাইল, দৈনিক বাংলা, গুলিস্তান জিরো পয়েন্ট দিয়ে পল্টনমুখী রাস্তায় যানবাহন বন্ধ করে দেয়া হয়। মতিঝিল পয়েন্টে যানবাহন বন্ধ করার প্রবেশমুখগুলোতে বাধা দেয়া হয়। কোথাও কোথাও রাস্তা বন্ধ করে মাঝখানে দাঁড়িয়ে পুলিশকে দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়। এদিকে রাজধানী ডিআরএইউতে একটি অনুষ্ঠানে আজ আইন প্রতিমন্ত্রী এডভোকেট কামরুল ইসলাম হরতালে সরকারের সমর্থনের ইঙ্গিত দিয়ে বলেন, অহিংস হরতালে সরকার বাধা দেবে না। হরতাল গণতান্ত্রিক অধিকার। নৈরাজ্য না হলে সরকার হরতাল পালনে সহযোগিতা করবে।
পল্টনে অবস্থান
হরতাল চলাকালে সকাল থেকেই পল্টন মোড়ে সিপিবি ও বাসদ এবং গণতান্ত্রিক বাম মোর্চার নেতা-কর্মীরা অবস্থান করেন। তারা সেখানে রাস্তায় মিছিল ও সংগীত পরিবেশন করেন। এ সময় পুলিশ আশপাশের রাস্তায় অবস্থান করে। সকাল থেকেই দলগুলোর কেন্দ্রীয় নেতারা বক্তব্য রাখেন। সমাবেশে সিপিবি সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, সাবেক সভাপতি মঞ্জুরুল আহসান খান, বাসদের সাধারণ সম্পাদক খালেকুজ্জামান, বাম মোর্চার সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি প্রমুখ বক্তব্য রাখেন। বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের কর্মীরাও সেখানে জড়ো হয়ে মিছিল এবং সমাবেশ করেন। তাদের হাতে ছিল লাল পতাকা। জাতীয় পতাকাও বহন করেন কর্মীরা।
প্রেস ক্লাব এলাকায় দিনভর গণসংগীত
হরতালে মৎস্য ভবন, হাইকোর্ট এলাকায় সকাল থেকে গাড়ি চলাচল ছিল বন্ধ। প্রেস ক্লাবের সামনে সকাল থেকেই নেতা-কর্মীরা অবস্থান নেন। বন্ধ করে দেয়া হয় উভয় পাশের রাস্তা। কোন যানবাহনই চলতে দেয়া হয়নি প্রেস ক্লাব থেকে পল্টন যাওয়ার রাস্তা দিয়ে। এই এলাকায় হরতাল পালিত হয়েছে শান্তিপূর্ণ। নিরাপত্তায় ব্যাপক পুলিশ র‌্যাব নিয়োজিত থাকলেও রাস্তায় বসে দাঁড়িয়ে তাদের দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়। প্রেস ক্লাব, হাইকোর্ট ও সচিবালয় এলাকায় সিপিবি, বাসদ, গণতান্ত্রিক বাম মোর্চা, প্রগতিশীল ছাত্র জোট, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের ব্যানারে খণ্ড খণ্ড মিছিল হয়েছে সকাল থেকেই। প্রেস ক্লাবের উল্টো পাশের সামনের রাস্তায় উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী অস্থায়ী মঞ্চ বানিয়ে হরতালের সমর্থনে সংগীত পরিবেশন করে। দুপুর দুইটার পর হাইকোর্ট মৎস্যভবন এলাকা দিয়ে কিছু গণপরিবহন চললেও যাত্রী ছিল কম।
শাহবাগ ও বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় মিছিল সমাবেশ
সকাল থেকে শাহবাগ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় হরতাল পালিত হয়েছে শান্তিপূর্ণভাবে। ভোর ছ’টা থেকে বাম ঘরানার ছাত্র সংগঠনগুলোর কর্মীরা টিএসসি ও আশপাশ এলাকায় জড়ো হয়। কিছুক্ষণ পর টিএসসি এলাকায় মিছিল শেষে তারা শাহবাগ এলাকায় অবস্থান নেয়। সেখানে তারা পুলিশের ব্যবহার করা কাঁটাতারের ব্যারিকেড, বাঁশ-কাঠ দিয়ে পথ আটকে চারপাশের যান চলাচল বন্ধ করে দেয়। তারপর প্রগতিশীল ছাত্রজোটের ব্যানারে এ এলাকায় দফায় দফায় মিছিল করে কর্মীরা। বাস, সিএনজিসহ অন্যান্য যানবাহন এ এলাকায় চলাচল না করলেও রাস্তাঘাটে যথেষ্ট পরিমাণ রিকশা চলাচল করে। শাহবাগ মোড়ের অস্থায়ী মঞ্চে ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্রফ্রন্ট, ছাত্র ফেডারেশন ও ছাত্রমৈত্রীর কেন্দ্রীয় ও বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নেতৃবৃন্দ বক্তব্য রাখেন।
ঢাবিতে ক্লাস ও পরীক্ষা হয়নি
হরতালের কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস ও পরীক্ষা হয়নি। এর আগে সব হরতালে ক্লাস ও পরীক্ষা হয়েছিল। ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ছিল না। ক্যাম্পাস ঘুরে দেখা যায়, বিভিন্ন বিভাগের অফিসগুলো বন্ধ। বিভাগে শিক্ষকদের উপস্থিতি ছিল না। তবে প্রশাসনিক কার্যক্রম প্রতিদিনের মতো সচল ছিল। এদিকে বামদলগুলোর ছাত্র সংগঠন প্রগতিশীল ছাত্র জোট হরতাল উপলক্ষে শাহবাগ মোড়ে সমাবেশ করেছে।
হরতাল সফল: সিপিবি-বাসদ
বিকালে হরতাল সফল বলে দাবি করেন সিপিবি ও বাসদ নেতারা। হরতালকে সফল উল্লেখ করে একে নতুন মাত্রার গণতন্ত্রের রাজনীতি হিসেবে বর্ণনা করেন তারা বলেন, এ হরতালে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি ফিরে এসেছে। জনগণের ন্যায্য দাবি উত্থাপন করতে সক্ষম হয়েছি। বিকাল ৪টায় রাজধানীর মুক্তিভবনের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে সিপিবির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম অভিযোগ করে বলেন, হরতালে দেশের বিভিন্ন স্থানে যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও পুলিশ হরতাল সমর্থনকারীদের ওপর হামলা চালিয়ে তাদের ১৫ জন নেতা-কর্মীকে আহত করেছে। পুলিশ আটক করেছে ২০ জন নেতা-কর্মীকে। বিশেষ করে বরিশাল, সুনামগঞ্জ, যশোর, গাজীপুর, নরসিংদী, মৌলভীবাজারে মিছিলে হামলা করেছে শাসক গোষ্ঠীর সন্ত্রাসী ও পুলিশ বাহিনী। প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, এই হরতাল ব্যতিক্রম ছিল। মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে যোগ দিয়েছে। মানুষ দেশে এখন একটা বিকল্প পথ খুঁজছে। আর এই বিকল্প রাজনৈতিক শক্তিকে এগিয়ে নিতে প্রতিটি জাতীয় ইস্যুতে রাজপথে থাকবে তাদের সংগঠন। সরকারের মন্ত্রীরা যুদ্ধাপরাধীদের রায়ের বিষয়ে আগেই মন্তব্য করছেন। তারিখ উল্লেখ করছেন। এটা ঠিক নয়। দেশে বিদেশে এই বিচার নিয়ে ষড়যন্ত্র হচ্ছে। অহেতুক কালবিলম্ব করে বিচার ঠেকাতে মদতদাতাদের সুযোগ করে দেয়া হচ্ছে। এই বিচার বানচাল করতে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার খরচের অভিযোগ করেন সিপিবির সভাপতি। আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফের ‘কার স্বার্থে হরতাল’ এ বক্তব্যের জবাবে সেলিম বলেন, আওয়ামী লীগের দুঃশাসনের স্বার্থ রক্ষার জন্য তারা হরতাল করেননি। একই দাবিতে আগামী ২৮শে ডিসেম্বর বিকাল ৩টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে মিছিল-সমাবেশ, ৩রা থেকে ৭ই জানুয়ারি জাগরণ অভিযান নামে দেশব্যাপী ঝটিকা সফর কর্মসূচি ঘোষণা করেন। এতে ২৬টি জনসভা, ৫১টি সমাবেশ ও বিভিন্ন স্থানে পথসভা অনুষ্ঠিত হবে। প্রেস ব্রিফিংয়ে আরও উপস্থিত ছিলেন সিপিবির সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আবু জাফর আহমেদ, বাসদের সাধারণ সম্পাদক খালেকুজ্জামান, সিপিবির প্রেসিডিয়াম সদস্য সাজ্জাদ জহির চন্দন, লক্ষ্মী চক্রবর্তী, বাসদের বজলুর রশিদ ফিরোজ প্রমুখ।

No comments:

Post a Comment