Pages

Monday, December 31, 2012

অস্তিত্বের লড়াইয়ে জামায়াতের বছর পার

অস্তিত্বের লড়াইয়ে জামায়াতের বছর পার


রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই করেই বছর পার করেছে জামায়াতে ইসলামী। এক বছরের বেশি সময় ধরে তাদের কেন্দ্রীয় কার্যালয় বন্ধ। দফায় দফায় শত শত নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার। প্রকাশ্য সভাসমাবেশের ওপর অলিখিত নিষেধাজ্ঞাসহ নানা প্রতিকূলতায় এ বছর তীব্র অস্তিত্বের সঙ্কটে পড়ে ধর্মভিত্তিক দলটি। শুধু তাই নয়- বিভিন্ন সময় চোরগোপ্তা হামলা, ঝটিকা মিছিল সমাবেশে করে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করে রাজনৈতিকভাবে নিষিদ্ধ হওয়ার ঝুঁকির মুখেও পড়ে বেশ ক’বার। যুদ্ধাপরাধসহ বিভিন্ন ঘটনায় দলের প্রায় ডজন খানেক শীর্ষ নেতা আটক। ভারপ্রাপ্ত আমীরসহ প্রথম ও দ্বিতীয় সারির প্রায় সব নেতা আত্মগোপনে। এ অবস্থায় নেতৃত্ব শূন্যতায় রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যেই বছরজুড়ে ঘুরপাক খায় ১৮ দলীয় জোটের শরিক দলটি। ’৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধে ভিন্নমত পোষণ করেছিল জামায়াত। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭৭ সালে প্রকাশ্য রাজনীতিতে সক্রিয় হয় তারা। তবে এ দীর্ঘ সময়ে ২০১২ সালের মতো এমন কঠিন সঙ্কটের মুখে পড়তে দেখা যায়নি তাদের। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শোচনীয় পরাজয়ের পর একের পর এক সঙ্কটের কবলে পড়ে জামায়াত। তবে এবার যুদ্ধাপরাধ ইস্যুতে সবচেয়ে বেশি কোণঠাসা হয়ে পড়ে তারা। দলের আমীর মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী, সাবেক আমীর অধ্যাপক গোলাম আযম, নায়েবে আমীর মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, প্রভাবশালী নেতা মীর কাসেম আলী মোহাম্মদ কামারুজ্জামান, এ টি এম আজহারুল ইসলাম, আবদুল কাদের মোল্লা যুদ্ধাপরাধ মামলায় বিচারের মুখোমুখি। এছাড়া পুলিশের ওপর হামলা, পুলিশের কাজে বাধা দেয়াসহ অন্য একাধিক মামলায় দলের প্রথম সারির নেতা অধ্যাপক তাসনীম আলম, মিয়া গোলাম পরওয়ার কারাগারে। এ ধরনের মামলায় ফেরার হয়ে আছেন ভারপ্রাপ্ত আমীর মকবুল আহমাদ, সদ্য ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুর ইসলাম খান, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মুজিবুর রহমান, ঢাকা মহানগর নেতা এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ এমপি, মাওলানা আবদুল হালিম, নুরুল ইসলাম বুলবুলসহ প্রথম ও দ্বিতীয় সারির সব নেতা। কারাগারে আটক আছেন জেলা-উপজেলা পর্যায়ের জামায়াত শিবিরের পাঁচ হাজারের বেশি নেতা-কর্মী। এ পর্যায়ে চলতি ডিসেম্বরের মধ্যেই মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আটক মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীসহ একাধিক শীর্ষ নেতার মামলার চূড়ান্ত রায় ঘোষণার দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়। ওই রায়ের ফলাফল নিয়ে নিয়ে উদ্বেগ-উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে জামায়াত-শিবিরের সর্বস্তরে। শীর্ষ নেতাদের মুক্তি দাবি নিয়ে রাজধানীর বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের উত্তর গেটে ৩রা ডিসেম্বর প্রকাশ্য সমাবেশের ঘোষণা দেয় তারা। কিন্তু পুলিশের বাধায় সমাবেশ পণ্ড হয়ে গেলে পর দিন এককভাবে হরতাল পালন করে জামায়াত। বর্তমান সরকারের মেয়াদকালে প্রথমবারের মতো হরতাল পালনের পর আবারও চরম ক্র্যাকডাউনের কবলে পড়ে জামায়াত। রাজধানীসহ দেশজুড়ে শুরু হয় জামায়াত-শিবির গ্রেপ্তার অভিযান। অপরদিকে চোরাগুপ্তা হামলা, বিক্ষিপ্ত মিছিল-সমাবেশ করে দলীয় কর্মীদের মনোবল ধরে রাখার চেষ্টা করে তারা। কিন্তু ২১শে ডিসেম্বর ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ কৌশলে একসঙ্গে প্রায় অর্ধশত শিবির নেতাকে গ্রেপ্তার করলে সঙ্কটের বোঝা ভারি হয়ে যায় জামায়াতের। মহানগর শিবিরের প্রথম সারির এসব নেতা গ্রেপ্তারের জামায়াতের চলমান আন্দোলনে চরমভাবে ধাক্কা লাগে। তবে জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তারে আন্দোলন আরও বেগবান হবে বলে দাবি করেন। তিনি বলেন, সরকার বিরোধী দলের আন্দোলন দমন করার জন্যই ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীদের অন্যায়ভাবে গ্রেপ্তার করে অত্যাচার-নির্যাতন চালাচ্ছে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করার পরিবর্তে সরকার জুলুম-নির্যাতন ও নিপীড়নের পথ বেছে নিয়েছে। ফ্যাসিবাদী কায়দায় বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের ওপর অত্যাচার-নির্যাতন চালিয়ে অতীতে যেমন কোন সরকার রেহাই পায়নি, তেমনি মহাজোট সরকারও রেহাই পাবে না। জামায়াতের রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের চালিকা শক্তি শিবির সমপ্রতি দেশের বিভিন্ন এলাকায় পুলিশের ওপর বেশ ক’টি হামলার ঘটনায় ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়। এতে জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধের দাবিতে সরকার সমর্থক রাজনৈতিক দলগুলো মাঠে ময়দানে সোচ্চার হয়। এক পর্যায়ে ধর্মীয় রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিতে ১৮ই ডিসেম্বর সরকারের নেপথ্য সহযোগিতায় হরতাল পালন করে সিপিবিসহ বাম রাজনৈতিক দলগুলো। একইভাবে জামায়াতের সমর্থনে ইসলামপন্থি ১২ দল ২০শে ডিসেম্বর বাম দলগুলোর কাউন্টার হরতাল পালন করে। তবে এই দুই বিপরীত রাজনৈতিক ধারার পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি জাতীয় রাজনীতিতে তেমন প্রভাব ফেলতে পারেনি। এরপরও জামায়াতবিরোধী তৎপরতার ধারবাহিকতা অব্যাহত আছে। যুদ্ধাপরাধের বিচার দ্রুত শেষ করার দাবিতে আওয়ামী লীগসহ ১৪ দল ২২শে ডিসেম্বর রাজধানীতে গণমিছিল করে। যুদ্ধাপরাধের বিচারের রায় কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত তারা মাঠে থাকার শপথ নেয়। সব মিলিয়ে চরম বৈরিতার মধ্যে বছর কেটেছে জামায়াতের।

No comments:

Post a Comment