রক্তাক্ত বিশ্বজিৎকে রড দিয়ে পিটিয়েছি
দলীয় নেতাদের মন যোগাতেই হাতে রড তুলে নিয়েছিলাম। আঘাত করেছিলাম রক্তাক্ত বিশ্বজিতের শরীরে। যাতে কোনভাবেই চাকরিটা মিস না হয়ে যায়। গতকাল মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এমন তথ্য দিয়েছে বিশ্বজিতের ওপর হামলাকারী হিসেবে শনাক্ত হওয়া আসামি এমদাদুল হক (২৬)। এর আগে গত সোমবার দিবাগত রাত দেড়টার দিকে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার টিম (দক্ষিণ) এবং বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিটের টিম ইনচার্জ মোহাম্মদ ছানোয়ার হোসেনের নেতৃত্বে একটি টিম চাঁপাই নবাবগঞ্জের সদর উপজেলার আরামবাগ এলাকার স্বপ্নপুরী রেস্টহাউজ থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে। পরে গতকাল দুপুরে মহানগর মুখ্য হাকিম আদালতে হাজির করে ৭ দিনের রিমান্ডে নিয়ে তারা জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছে। গোয়েন্দা দলের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এমদাদ জানায়, সে দরিদ্র পরিবারের ছেলে। তার বাবা আকবর আলী মারা গেছেন। মা বেঁচে আছেন। দুই ভাই ও পাঁচ বোনের মধ্যে সে ষষ্ঠ। ছেলে হিসেবে পরিবারের বড় সন্তান। বাড়ি যশোর জেলার শার্শা থানার পাঁচকাইবা গ্রামে। ২০১০-২০১১ শিক্ষাবর্ষে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করে। দীর্ঘদিন বেকার থাকার পরও ভাল কোন চাকরি পাচ্ছিল না। এজন্য একটি চাকরির জন্য দীর্ঘদিন ধরে নেতাদের পিছে পিছে ঘুরছিল। এরই মধ্যে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে সেকশন অফিসার পদে দরখাস্ত করেছে। ওই পদের চাকরিটা যাতে কোনভাবেই মিস হয়ে না যায়- এজন্য নেতাদের মন যুগিয়ে চলার চেষ্টা করেছে। যখন যে কাজ করতে বলেছে, তা-ই করেছে। বড় ভাইদের ফুট-ফরমাশ খেটেছে। এরই ধারাবাহিকতায় ৯ই ডিসেম্বরের মিছিলে অংশ নিয়েছে। এক পর্যায়ে রড হাতে বিশ্বজিৎকে ধাওয়া করেছে। এমদাদ আরও জানায়, ঘটনাস্থলে দোতলায় উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত ও চাপাতির কোপে বিশ্বজিতের শরীর যখন রক্তাক্ত, তখন আমি ছিলাম রড হাতে নিচে দাঁড়িয়ে। আশপাশে অনেক নেতা উপস্থিত ছিলেন। তাদের নজর কাড়তেই দৌড়ে পলায়নরত বিশ্বজিতের শরীরে রড দিয়ে ২-৩টা আঘাত করি। এ সময় বিশ্বজিৎ বারবার বলছিল, আমি কোন দোষ করি নাই। কিছুই করি নাই। আমারে মাফ কইরা দ্যান। কিন্তু বড় ভাইরা সামনে থাকায় বিনা আঘাতে ছেড়ে দিতে সাহস পাই নাই। সূত্র জানায়, বিশ্বজিতের মৃত্যুর খবর শুনে এমদাদ রাজধানীর বাইরে পালিয়ে যায়। পালানোর আগে বিভিন্ন নেতার কাছে আশ্রয়ের জন্য ফোন করেছিল। কিন্তু কোন সহযোগিতা না পেয়ে নিরাশ হয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে দেশ ছেড়ে পালানোর পরিকল্পনা করে। পরে জবি ছাত্রলীগের এক নেতার পরামর্শে ঘনিষ্ঠ আরেক নেতার তত্ত্বাবধানে চাঁপাই নবাবগঞ্জের স্বপ্নপুরী রেস্ট হাউজে ওঠে। সেখান থেকে গোদাগাড়ী সীমান্তপথ দিয়ে অবৈধভাবে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পথ খুঁজছিল। কিন্তু তার আগেই গোয়েন্দা পুলিশের হাতে ধরা পড়ে। জিজ্ঞাসাবাদে এমদাদ জানায়, স্বপ্নপুরী রেস্টহাউজের রুম ভাড়া নিয়েছিল বস্ত্র ব্যবসায়ী পরিচয়ে। তবে রেস্ট হাউজের রেজিস্টার বুকে তার নাম ছিল না। রেস্ট হাউজ কর্র্তৃপক্ষকে বলেছিল, শীতের গরম কাপড় সংগ্রহের জন্য সে এসেছে। কাপড়ের চালান আসার পর ফিরে যাবে। মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের ডিসি (দক্ষিণ) মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, ছদ্ম পরিচয়ে এমদাদ ভারতে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল।
৭ দিনের রিমান্ডে: গ্রেপ্তারের পরপরই এমদাদুল হককে ৭ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা। এর আগে গতকাল দুপুরে মহানগর মুখ্য হাকিম আদালতে হাজির করে ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন তিনি। মহানগর হাকিম তানভীর আহমেদ সাত দিন মঞ্জুর করেন।
২১ জন শনাক্ত: গতকাল দুপুরে ঢাকা মহানগর পুলিশের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের ডিসি (দক্ষিণ) মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, বিশ্বজিৎ হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে এখন পর্যন্ত ২০-২১ জনকে শনাক্ত করা হয়েছে। পত্রপত্রিকা ও ভিডিও ফুটেজ দেখে তাদের চিহ্নিত করা সম্ভব হয়েছে। এর মধ্যে ৭ জনকে ডিবি পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। সর্বশেষ গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে এমদাদুল হককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বিশ্বজিৎ হত্যার কথা সে স্বীকার করেছে। রফিকুল ইসলাম ওরফে শাকিল, জিএম রাশেদুজ্জামান ওরফে শাওন ও মাহফুজুর রহমান ওরফে নাহিদ আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। মনিরুল ইসলাম জানায়, এ মামলায় ফারুক হোসেন, কাজী নাহিদুজ্জামান তুহিন, মোসলেহ উদ্দিন ও মামুনুর রশীদকে গ্রেপ্তার দেখানো (শ্যোন অ্যারেস্ট) হয়েছে। তদন্তে অনেক তথ্য পাওয়া গেছে। যেহেতু সব আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়নি, তাই এ ব্যাপারে বিস্তারিত কিছু বলা সমীচীন হবে না। বিশ্বজিৎ হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে গতকাল পর্যন্ত ১১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে সাতজন ছাত্রলীগের নেতাকর্মী। সাতজনের মধ্যে পাঁচজনকে বহিষ্কার এবং দু’জনের সনদ বাতিল করে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। যে দু’জনের সনদ বাতিল করা হয়েছে, তাদের একজন এমদাদুল। এ ছাড়া গ্রেপ্তার হওয়াদের মধ্যে ছাত্রলীগের কর্মী নয় এমন চারজন এখন কারাগারে। ঘটনার দু’দিন পর এক ব্যক্তির জামিনের ব্যাপারে আদালতে গেলে পুলিশ ‘সন্দেহজনক ঘোরাঘুরি’র অভিযোগে ওই চারজনকে গ্রেপ্তার করে। পরে তাদের বিশ্বজিৎ হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
স্বপ্নগুলো ওলটপালট হয়ে গেল: গ্রেপ্তারকৃত শাকিল, শাওন, কিবরিয়া, টিপু, সাইফুল ও এমদাদ গোয়েন্দাদের কাছে আক্ষেপ করে বলেছে, ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছাত্রলীগের বড় ভাই, দায়িত্বশীল পুলিশ কর্মকর্তা, হাসপাতালের চিকিৎসক ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বোকামির কারণেই আমাদের স্বপ্নগুলো ওলটপালট হয়ে গেল। আমরা না হয় ভুল করেই ফেলেছি- তাই বলে হত্যার উদ্দেশ্যে মারিনি। মনে করেছি, হাসপাতালে নেয়ার পর সুস্থ হয়ে উঠবে। কিন্তু দীর্ঘক্ষণ পর এক রিকশাচালক হাসপাতালে নিয়ে গেলেও চিকিৎসকরা ঠিকমতো চিকিৎসা দেয়নি। ঘটনাস্থলে উপস্থিত পুলিশ কর্মকর্তারা দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে গেলে সঠিক চিকিৎসায় হয়তো সে সুস্থ হয়ে উঠতো। অন্তত বেঁচে থাকলে আমাদের এমন দশা হতো না।
No comments:
Post a Comment