গণধর্ষণ : উত্তাল ভারত
দিল্লিতে ধর্ষণের ঘটনা যে খুব বিরল, তা মোটেই নয়। বরং বেশিরভাগ ধর্ষিতাই মিডিয়ার পাদপ্রদীপের অন্ধকার-তলে কাঁদে নীরবে। তবে গত সপ্তাহে দিল্লির চলন্ত বাসের ভেতরে এক ছাত্রী-ধর্ষণ ঘটনায় উত্তাল হয়ে উঠেছে ভারত। এ ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই ত্রিপুরাতেও একটি গণধর্ষণের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় গত সপ্তাহজুড়েই দেশটির সাধারণ জনগণ থেকে শুরু করে সুশীল সমাজ, সংবাদমাধ্যম, এমন কি রাজনীতিকরাও ফেটে পড়েন প্রতিবাদে। দিল্লির গণধর্ষণ-ঘটনার প্রতিবাদে গত শনিবার রাজধানীর ইন্ডিয়া গেটের সামনে বিক্ষোভ মিছিল বের করা হলে পুলিশের কাঁদানে গ্যাস ও লাঠিপেটার শিকার হন আন্দোলনকারীরা।
ছাত্রী-ধর্ষণের এই ঘটনাটি ঘটে গত ১৬ ডিসেম্বর রবিবার রাতে। ভারতের বিভিন্ন সংবাদ সংস্থায় প্রকাশিত ঘটনার আদ্যোপান্ত থেকে জানা যায়, সে রাতে দিল্লিতে বাস নিয়ে বেরনোর আগে ছোটখাটো একটা পার্টি করেছিল বাসের চালক রাম সিং ও তার সঙ্গীরা। তারপর বাস নিয়ে শহর ঘুরতে বেরোয় তারা। পবন আর বিনয় নামে আরো দু'জন যোগ দেয় তাদের সঙ্গে। প্রত্যেকেই তখন মদ্যপ অবস্থায় ছিল। পরিকল্পনা ছিল আরো হৈ-হুল্লোড়ের। এই হৈ-হুল্লোড়ের টাকা জোগাতে তারা সিদ্ধান্ত নেয় যাত্রী তোলার। রাত সোয়া ন'টা নাগাদ ওই বাসে ওঠেন প্যারামেডিক্যালের এক ছাত্রী (২৩) ও তার বন্ধু (২৮)। বাসে ওঠার কিছুক্ষণ পর থেকেই ওই ছাত্রীকে লক্ষ্য করে অশালীন মন্তব্য করতে থাকে তারা। ছাত্রীর বন্ধুর জবানবন্দি থেকে জানা যায়, তারা দু'জন অত রাতে বাড়ির বাইরে কেন, এখানে কী করছিলেন, ইত্যাদি প্রশ্ন করে তাদের বিরক্ত করছিল তারা। স্বাভাবিকভাবেই এর প্রতিবাদ করেন ছাত্রীর বন্ধু। তারপরই কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে লোহার রড দিয়ে ছেলেটিকে পেটাতে শুরু করে বখাটেরা। বাধা দিতে গিয়ে রোষের মুখে পড়েন ওই তরুণী। প্রথমে রড দিয়ে মার, তার পরে পিছনের সিটে টেনে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করা হয় তাকে। ধর্ষণ করে, জামা-কাপড় ছিঁড়ে তাদের দু'জনকে উড়ালপুলের ওপর বাস থেকে ছুঁড়ে ফেলে দেয় তারা। তবে এরপরের ঘটনাও সমান বিস্ময়কর। এমন নৃশংস অপরাধের পরও নিশ্চিন্তে দৈনন্দিন জীবনে ফিরে গিয়েছিল অভিযুক্তরা। তাই সোমবার সকালে প্রতিদিনকার মতোই কাজে বেরোয় পবন ও বিনয়। রাম সিং আর তার ভাই মুকেশ অবশ্য খানিক লুকোচুরির চেষ্টা করেছিল। একপর্যায়ে পুলিশের হাতে ধরা পড়ে যায় তারা।
ধর্ষণের পরে প্রায় নগ্ন করে মেয়েটি ও তার বন্ধুকে ফেলে দেয়ার পরিকল্পনা রামের ছিল বলে পুলিশ জানিয়েছে। শুধু তাই নয়, রাম জানিয়েছে যে সে প্রমাণ লোপাটের জন্য পুরো বাসটিকে ধুয়ে ফেলে। কোনোভাবেই যাতে অসহায় ওই দু'টি ছেলেমেয়ে কোনো সাহায্য চাইতে না পারে, সেজন্য ছিনিয়ে নেয়া হয়েছিল তাদের মোবাইল ফোনও। সাঙ্গ-পাঙ্গদের নির্দেশ দিয়েছিল, পুরো বিষয়টি নিয়ে কাউকে কিছু না বলতে। কেউ যেন কিছু না জানতে পারে। রাম সিংকে ইতিমধ্যেই পাঁচদিনের পুলিশ হেফাজতে দেয়া হয়েছে। অন্য আর এক অভিযুক্ত, অক্ষয় ঠাকুরকে এদিন পুলিশ বিহারের ঔরঙ্গাবাদ থেকে আটক করেছে। পুলিশ জানিয়েছে, ধৃতদের কারো মধ্যেই কোনো অনুশোচনা ছিল না। বরং তারা যে সে রাতে মদ্যপ অবস্থায় 'মজা লুটে' বেশ খোশ মেজাজেই ছিল, সে কথাই বেরিয়ে এসেছে।
পুলিশ জানায়, অভিযুক্তরা অপরাধ স্বীকার করলেও শনাক্তকরণ প্যারেডে যেতে চায়নি পবন ও বিনয়। একমাত্র মুকেশ রাজি। মূল অভিযুক্ত, বাসচালক রাম সিং, প্রথমে অবশ্য দাবি করেছিল, সে কিছুই জানে না। শনাক্তকরণ প্যারেডে যেতে রাজি হয়নি সেও। পরে অবশ্য জেরার মুখে সব স্বীকার করে বলে পুলিশ সূত্রে খবর। সে জানিয়েছে, মেয়েটিকে নাকি 'উচিত শিক্ষা' দিতে চেয়েছিল সে। পুলিশ জানিয়েছে, এর আগে রাম সিংকে ডাক্তারী ছাত্রীটি যেভাবে হোক রুখতে গিয়ে প্রথমে চড় মারেন। হাতে কামড় দেন। তাতেই নাকি মাথায় রক্ত চড়ে যায় রামের। সে তখন তার আরও পাঁচ সঙ্গীকে নিয়ে মেয়েটিকে 'শিক্ষা দেয়ার জন্য' লোহার রড দিয়ে নির্মমভাবে মারতে থাকে। তবে গ্রেফতারের পর আদালতে অকপট স্বীকারোক্তিতে ধর্ষক পবন বলেছে, সে একটা ঘৃণ্য অপরাধ করেছে। আর তার একমাত্র শাস্তি ফাঁসি। কাজেই তার ফাঁসিই হওয়া উচিত। ধর্ষিতা মেয়েটির অবস্থা এখনও আশঙ্কাজনক। এ পর্যন্ত মোট পাঁচটি অস্ত্রোপচার হয়েছে। চিকিত্সকরা জানিয়েছেন, মেয়েটির বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ সারা জীবনের জন্য নষ্ট হয়ে গেছে। বাদ দেয়া হয়েছে অন্ত্রের অধিকাংশ। এখনও রয়েছেন ভেন্টিলেটরে। তরুণী যখন শোনেন যে দুষ্কৃতকারীরা ধরা পড়েছে, তার মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।
এ ঘটনা প্রকাশের পর ভারতের সংসদ থেকে রাজপথ, একটাই সুর— অপরাধীদের কঠোর শাস্তি দিতে হবে। ওই রবিবারের গণধর্ষণের ঘটনা সাধারণ মানুষের মধ্যে এতটাই প্রভাব ফেলেছে যে, এদিন দিল্লি হাইকোর্ট স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে একটি মামলা করে। পুলিশকে ভর্ত্সনা করে আদালত দু'দিনের মধ্যে স্টেটাস রিপোর্ট জমা দিতে বলেছে। বিচারকের প্রশ্ন, 'সেদিন রাতে ওই বাসটি অন্তত পাঁচটি পুলিশ চেকপোস্ট পেরিয়েছে। এই বর্বর ঘটনা কারো নজরে কেন পড়ল না? পুলিশ কি মজা দেখছিল?' মঙ্গলবার দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী শীলা দীক্ষিত হাইকোর্টকে অনুরোধ করেছিলেন, ধর্ষণের বিচারের ক্ষেত্রে ফাস্ট ট্র্যাক কোর্টের অনুমোদন দিতে। হাইকোর্ট সবমিলিয়ে পাঁচটি কোর্টের অনুমোদন দিয়েছে। ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুশীল কুমার শিন্ডে এদিন লোকসভায় এই মামলা সংক্রান্ত অ্যাকশন টেকেন রিপোর্ট পেশ করেন। সেখানে বলা হয়েছে, নারীদের নিরাপত্তার জন্য সরকার বেশ কিছু ব্যবস্থা নিচ্ছে। রাতে পুলিশ প্রহরা বাড়ানো হবে। সব এলাকাতেই চলবে টহলদারি। ধর্ষণ রুখতে এসবের পাশাপাশি বখাটেদের মানসিক বোধোদয় তৈরির ব্যবস্থাও সমান জরুরি বলে মনে করেন মনোবিদরা। অর্থাত্ গলদ রয়েছে অসংখ্য জায়গায়, যার সবটুকু চোখে দেখা যায় না।
উত্তাল ভারতের সংসদ
দিল্লিতে চলন্ত বাসে এক ছাত্রীর গণধর্ষণের ঘটনাকে কেন্দ্র করে নজিরবিহীনভাবে উত্তাল হয়ে ওঠে দেশটির সংসদের দুই কক্ষ। দল নির্বিশেষে নারী সাংসদেরা গত সপ্তাহে এই ঘটনার নিন্দায় ফেটে পড়েন। ট্রেজারি বেঞ্চে বসে বিরোধী সাংসদ তো বটেই, এমনকি নিজের দলের সাংসদদেরও ধিক্কার শুনতে হয় ভারতের কেন্দ ীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুশীলকুমার শিন্দেকে। ধর্ষণের জন্য ফাঁসির দাবি তোলেন বিরোধী নেত্রী সুষমা স্বরাজ। দেশজুড়ে নিন্দার ঝড় সামাল দিতে এই ঘটনার তদন্ত ফাস্ট ট্র্যাক আদালতে হবে বলে সংসদে বিবৃতি দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। এদিকে, ওই ঘটনার মূল অভিযুক্ত বাসচালক রাম সিংকে পাঁচদিনের পুলিশি হেফাজতে পাঠিয়েছে আদালত। গ্রেপ্তার করা হয়েছে আরও তিনজনকে। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে সরকারকে নির্দেশ দিয়েছেন কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধী। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুশীল কুমার শিন্ডে, দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী শীলা দীক্ষিত ও জাতীয় নারী কমিশনের চেয়ারপার্সন মমতা শর্মার সঙ্গে কথা বলেন কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধী। রাতে হাসপাতালে গিয়ে আহত তরুণীকে দেখে আসেন তিনি। ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরোর রেকর্ড থেকে জানা যায়, গোটা ভারতেই উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে ধর্ষণের ঘটনা। ভারতে এ মুহূর্তে ধর্ষণের অমীমাংসিত মামলার সংখ্যা ৭৯ হাজার ৪৭৬টি।
ধর্ষকদের মৃত্যুদণ্ড দাবি
ধর্ষকদের নির্বীজকরণ করা হোক, এমন দাবি জানাল ভারতের জাতীয় নারী কমিশন। কমিশনের সভাপতি মমতা শর্মা বলেছেন, চরম শাস্তি ধার্য না করা হলে কমানো সম্ভব নয় ধর্ষণের মতো অপরাধ। দিল্লি গণধর্ষণের অপরাধীদের জন্য মৃত্যুদণ্ডের দাবি তুলেছেন তিনি। শুধু তাই নয়, তাঁর পরামর্শ, শাস্তি হিসাবে নির্বীজকরণ করা হোক ধর্ষকদের। তাঁর কথায়, 'ওই অপরাধীদের নির্বীজকরণ করা হোক। সারাজীবন যেন তারা সেই শাস্তি মনে রাখে, প্রায়শ্চিত্ত করে।' সামগ্রিকভাবে ধর্ষণ ও নারীদের প্রতি অত্যাচারের ক্ষেত্রে আইন কড়া করাটা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন মমতা। তাঁর মতে, আইনী পথে সাহায্য না এলে নারীরা নিরাপদ বোধ করবেন না। শুধুমাত্র রঙিন কাঁচে নিষেধাজ্ঞা বসিয়ে আর প্রহরা কড়া করে এই অপরাধের মোকাবিলা করা যাবে না। ধর্ষণ ও নির্যাতনের তদন্তের ক্ষেত্রে পুলিশের কাছ থেকে আরও সংবেদনশীল ব্যবহারেরও দাবি করেন মমতা। 'হত্যার ক্ষেত্রে তো আক্রান্তের সমস্যা থাকে না। তবে একজন ধর্ষিতার জন্য আসল সমস্যা শুরু হয় ঘটনার পর থেকে।' বলছেন মমতা। তাঁর দাবি, রাজনীতি দূরে সরিয়ে রেখে নির্যাতিতাকে প্রকৃত ন্যায় দেয়ার প্রক্রিয়াটা শুরু হওয়া সবার আগে দরকার।
রাষ্ট্রপতিকে চিঠি শিশুদের
ধর্ষণ শব্দের অর্থ বোঝার মতো বয়স হয়নি তাদের অনেকেরই, তবু দিল্লির ধর্ষণের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জীকে একটি চিঠি লিখেছে শিশুরা। দিল্লির শিশু অধিকার রক্ষাকারী এক বেসরকারি সংস্থার শিশুরা এ চিঠি লেখে। তাদের ছোট্ট মনে ঘটনার প্রভাব এতটাই তীব্র যে তারা চায় না অভিযুক্তদের ফাঁসি হোক। বরং একটা ছোট ঘরে যদি তাদের আজীবন আটকে রাখা হয়, তবেই তারা অনুভব করবে তাদের অন্যায়ের নৃশংসতা। ধর্ষিতা 'দিদি'র সঙ্গে হওয়া অন্যায় ভবিষ্যতে বন্ধ করার জন্য রাতের রাস্তায় বেশি আলো,পুলিশি প্রহরা ও রাতঅবধি সরকারি বাস চালানোর অনুরোধও জানিয়েছে। হিংসা ছড়ানো সিনেমা বা ইন্টারনেট গেমের বিরুদ্ধেও সরব তারা। পরিবর্তন এত সহজে না হলেও আপাতত দোষীদের শাস্তির অপেক্ষায় খুদেরা।
No comments:
Post a Comment