Pages

Monday, December 17, 2012

সক্রিয় হয়ে উঠছে রাজধানীর আন্ডারওয়ার্ল্ড

সক্রিয় হয়ে উঠছে রাজধানীর আন্ডারওয়ার্ল্ড


একের পর এক গোপনে জামিনে বেরিয়ে আসছে রাজধানীর ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসীরা। রাজনীতির গরম হাওয়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সক্রিয় হয়ে উঠছে রাজধানীর আন্ডারওয়ার্ল্ড। পরিবেশ আরও গরম করে তুলতে প্রভাবশালীরা জামিন পেতে সহায়তা করছে তাদের পছন্দের সন্ত্রাসীদের। জামিনে বেরিয়েই সন্ত্রাসীরা আবার জড়িয়ে পড়ছে অপরাধে, শুরু করেছে বেপরোয়া চাঁদাবাজি। পাশাপাশি দেশের বাইরে থাকা ও জেলে থাকা হাইপ্রোফাইল সন্ত্রাসীরাও হঠাৎ করে বিভিন্ন পাড়া-মহল্লা কেন্দ্রিক তাদের ক্যাডারদের সক্রিয় করতে শুরু করেছে বলে একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে। দেশের বাইরে থেকে মোবাইল ফোনে দখলবাজিও চলছে। ভয়ঙ্কর সব সন্ত্রাসীর প্রকাশ্য সশস্ত্র মহড়ায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে বিভিন্ন পাড়া-মহল্লার সাধারণ
মানুষ। অন্যদিকে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের জামিন পাওয়ায় গা-ঝাড়া দিয়ে উঠেছে তাদের ক্যাডাররা।
নভেম্বর মাসের ২০ তারিখ রাজধানীর নাখালপাড়ায় ঢাকার সন্ত্রাসীদের একটি বৈঠক হয়। সভাশেষে বড় আকারে খানাপিনার ব্যবস্থা করা হয়। ওই সমাবেশটি ছিল রাজধানীর উত্তরাংশের সন্ত্রাসীদের সমঝোতা বৈঠক। সেখানে বর্তমান সরকার আমলে ভাগবাটোয়ারা নিয়ে সৃষ্ট মতবিরোধ মনোমালিন্য দূর করা হয়। সূত্রমতে, এক পর্যায়ে সন্ত্রাসীদের মাঝে উত্তেজনা দেখা দিলে দু’গ্রুপ সশস্ত্র অবস্থানে চলে যায়। পরে স্থানীয় সরকারের এক সাবেক জনপ্রতিনিধির হস্তক্ষেপে উত্তেজনার নিরসন হয়। ওই বৈঠকে ৫০ থেকে ৬০ জন সন্ত্রাসী গডফাদার উপস্থিত ছিল। রাজধানীর মিরপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় এখন অতিপরিচিত হয়ে উঠেছে একটি ভিনদেশী মোবাইল নম্বর। কোন ব্যবসায়ীর মোবাইল ফোন স্ক্রিনে ওই নাম্বারটি ভেসে ওঠামাত্র তার শরীর থেকে ঘাম ঝরতে শুরু করে, জীবন-ভয়ে আতঙ্কিত হয়ে ওঠেন তিনি। নম্বরটি ব্যবহার করে মিরপুরের সন্ত্রাসী গাজী সুমন। সে এক সময়ে ছিল মিরপুরের শাহাদত বাহিনীর কিলার। জেল থেকে মুক্তি পেয়ে নিজেই এক বাহিনী গড়ে তোলে সে। বর্তমানে ভারতে অবস্থান করে সে মোবাইল ফোনে চাঁদাবাজি করছে ঢাকায়। গত এক মাসে ভারতীয় ৯১৮৩৪৯৯৩১৪৯৬ নম্বর থেকে ফোন করে চাঁদা চাওয়া হয়েছে রাজধানীর একাধিক ব্যবসায়ীর কাছে।
তিন মাস আগে গোপন জামিনে বেরিয়ে এসেছে মিরপুরের আরেক ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসী ব্যাঙ্গা বাবু। ক্ষমতাধর এক প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা জামিন করিয়ে এনেছেন তাকে। জেল থেকে বেরিয়েই বেপরোয়া চাঁদাবাজি শুরু করেছে সে। গত সপ্তাহে ব্যাঙ্গা বাবু এক গার্মেন্ট ব্যবসায়ীর কাছে ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করলে ওই ব্যবসায়ী দারুস সালাম থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। কিন্তু তাতে ফল আসে নি কোন। এখনও প্রকাশ্যে মিরপুর দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ব্যাঙ্গা বাবু। চার মাস আগে একটি প্রভাবশালী রাজনৈতিক মহল চার লাখ টাকা খরচ করে জেল থেকে ছাড়িয়ে আনে কেরানীগঞ্জের পরাগ অপহরণকারী মুক্তার হোসেন আমির ও তার তিন সহযোগীকে। পুরান ঢাকার সন্ত্রাসী কালা খোকনের নামে চাঁদাবাজিসহ একাধিক অভিযোগ থাকলেও পুলিশকে ম্যানেজ করে প্রকাশ্যে অবস্থান করছে র‌্যাব পুলিশের তালিকাভুক্ত ওই সন্ত্রাসী। মিরপুরের শীর্ষ সন্ত্রাসী শাহাদত বাহিনীর প্রধান শাহাদত ভারতে অবস্থান করেই মোবাইল ফোনে ওলট পালট করছে মিরপুর। মোবাইলেই চলছে তার দখল বাণিজ্য। মিরপুর ১ নম্বর সেকশনের মিরপুর-মহাখালী ও মিরপুর-ঝিগাতলা বাসস্ট্যান্ডটি মোবাইল ফোনে হুমকি দিয়ে দখল করে নিয়েছে সে। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে ওই বাসস্ট্যান্ডটির আয় ভোগ করতেন মিরপুর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এস এম হানিফ। সূত্র মতে, শাহাদতের ভয়ে তিনি বাসস্ট্যান্ড ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন। ঢাকার আন্ডার ওয়ার্ল্ডের অন্যতম শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইন কলকাতায় গ্রেপ্তার হয়েছে। বাংলাদেশে তার ক্যাডারদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ও চাঁদবাজি করতে গিয়েই পশ্চিমবাংলা পুলিশের জালে ধরা পড়ে সে। ঢাকার মগবাজার এলাকায় আবার সংগঠিত হতে শুরু করেছে তার ক্যাডাররা। একাধিক সূত্রে জানা গেছে, সুব্রত বাইন কলকাতায় গ্রেপ্তার হওয়ার পর ঢাকায় তার ক্যাডারদের একটি গোপন বৈঠক হয়েছে বড় মগবাজার এলাকার একটি চারতলা ভবনের দোতলায়। সূত্র মতে, ওই বৈঠকে সুব্রত বাইনের পক্ষে উকিল নিয়োগের জন্য টাকা পাঠানোর বিষয়ে আলোচনা হয়। কিভাবে টাকার যোগাড় হবে সে বিষয়েও আলোচনা হয় বৈঠকে। একটি সূত্র জানিয়েছে, মিরপুরের শাহাদত ভারতে গ্রেপ্তার হয়েছে গুজব ছড়িয়ে তার মুক্তির জন্য ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে প্রায় ২০ লাখ টাকা চাঁদা তোলা হয়েছে গত মাসে। ভারতের কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পেয়ে বর্তমানে অস্ট্রেলিয়া অবস্থান করছে ঢাকার শীর্ষ সন্ত্রাসী তানভীরুল ইসলাম জয় ও হারিস। দেশের অভ্যন্তরে তাদের ক্যাডারাও হঠাৎ করে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। ক্যাডারদের মাধ্যমে ওই দুই সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজি করছে ঢাকায়। সন্ত্রাসীদের চাঁদার দাবি পরিশোধ করার পর মুখ খুলতে নারাজ ব্যবসায়ীরা। এমনই একজন ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী আলাপকালে জানান, রাজধানীর একটি থানায় এক শীর্ষ সন্ত্রাসীর নামে অভিযোগ দায়ের করার এক ঘণ্টার মধ্যে বিদেশ থেকে ওই সন্ত্রাসী ফোন করে তাকে হুমকি দেয় অভিযোগ তুলে আনতে, ভয়ে তিনি থানায় যান অভিযোগ প্রত্যাহার করতে। থানায় গিয়ে দেখেন তার অভিযোগটি থানা আমলেই নেয়নি, থানা অভিযোগ রেকর্ডই করেনি- কিন্তু তার আগেই অভিযোগ দায়েরের কথা জেনে যায় বিদেশে অবস্থান করা ওই সন্ত্রাসী। সমপ্রতি কঠোর গোপনীয়তার মাধ্যমে প্রভাবশালীদের সহায়তায় রাজধানীর শীর্ষ সন্ত্রাসী বিকাশের জামিন নিয়ে আত্মগোপন করার ঘটনায় তোলপাড় চলছে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে। একটি সূত্র জানিয়েছে, গোপন জামিনের তোড়জোড় চলছে রাজধানীর কয়েক ডজন চেনা সন্ত্রাসীর। দেনদরবার, বোঝাপড়া ঠিক হলে আরও কঠোর গোপনীয়তায় জামিন পেয়ে যাবে ওইসব সন্ত্রাসীরা।

No comments:

Post a Comment