Pages

Saturday, December 15, 2012

বিজয়ের পুনর্পাঠ

বিজয়ের পুনর্পাঠ হারলে হাহাকার করো। জিতলে জোয়ারে ভেসে যাও। আমাদের ক্রীড়া-সংস্কৃতির হাওয়াটা মোটামুটি এ রকম। গত কয়েক বছরে চিন্তায় একটু আধুনিকতা এসেছে, এখন হারলে আমরা এর মধ্যে শিক্ষা খুঁজি। কেন হলো না! ভবিষ্যতে তাহলে এমন করা উচিত! অমুকের জায়গায় তমুককে চেষ্টা করে দেখা যেতে পারে- ইত্যাদি। কিন্তু জয়ের ক্ষেত্রে এখনো সেই মধ্যযুগেই পড়ে। আবেগী জোয়ারে সব ভেসে গিয়ে বিষয়টা এমন দাঁড়ায় যে যা হয়েছে সব ঠিক হয়েছে। যিনি জেতা ম্যাচে শূন্য রান করেছেন তিনিও ঠিক করেছেন। বেদম ঠ্যাঙানি খাওয়া বোলারও এখানে নির্দোষ। কোনো কিছুই আর ভুল নয়। এবং ভুলটা আসলে এখানেই। জয়ের মধ্যেও শিক্ষা থাকে। সেই শিক্ষা নিতে হয়। নিলে ছোট জয় বড় জয়ের পথ তৈরি করে। এখন যখন ওয়েস্ট ইন্ডিজ জয়ের গরমটা একটু কমে এসেছে, যখন স্বপ্নে ওড়াউড়ি থেমেছে তখন একটু ফিরে গিয়ে দেখি আসলে এই বিজয় আমাদের কী শিক্ষা দিল! চলুন একটু পুনর্পাঠ হয়ে যাক।
ছোটখাটো অনেক শিক্ষা আছে। সেগুলোকে এক পাশে সরিয়ে একটু বড় করে চিন্তা করলে দেখছি শিক্ষা হচ্ছে তিনটি।
১. সাকিব-তামিম ছাড়াও বাংলাদেশ পরাক্রমশালী দলকে সিরিজে হারাতে পারে।
২. অধিনায়ক-সহঅধিনায়ক পারফরম করলে কাজ অনেক সহজ হয়ে যায়।
৩. সাফল্যের জন্য কোচের আসলে দরকারই নেই কোনো। ভারপ্রাপ্ত কোচ দিয়েই তো চলে।
প্রত্যেকটা ব্যাপার একটু সরলীকৃত। টীকা বা ব্যাখ্যা আবশ্যক। এক-এক করে একটু ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করি।
সাকিব-তামিম ছাড়াও হয়
এই উপশিরোনামের সঙ্গে অনেকেই দ্বিমত করবেন। তথ্যগত ভ্রান্তিই তো আছে। সাকিব ছিলেন না, তামিম তো ছিলেন। ছিলেন কিন্তু না থাকার মতোই তো। আমাদের আলোচ্য ওয়ানডে সিরিজে একটি বাদ দিলে বাকি চার ইনিংসে তাঁর সেই অর্থে রান নেই, তিনি ব্যর্থ, তবু দল চারটির দুটোতেই জিতেছে। মোটের ওপর সাকিবের পাঁচ ম্যাচে না থাকা এবং তামিমের প্রায় না থাকার মতো থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ সিরিজ জিতেছে। জিতে দিয়েছে বড় একটা স্বস্তি। বাংলাদেশ এখন আর শুধু দুই খেলোয়াড়ের দল নয়। এর বাইরের বাংলাদেশ তৈরি হয়ে গেছে। এতটাই যে তারা ওয়েস্ট ইন্ডিজকেও সিরিজ হারিয়ে দিতে পারে।
কোনোরকম ভণিতায় না গিয়ে স্পষ্ট বলে ফেলা যাক, বাংলাদেশের ক্রিকেটকে বদলেছেন সাকিব-তামিম। এর আগেও বিচ্ছিন্নভাবে বাংলাদেশ কিছু ভালো করছিল, হাবিবুল বাশার দীর্ঘদিন একা লড়াই করে বাংলাদেশকে টেস্টে টিকিয়ে রেখেছিলেন, আশরাফুল-মাশরাফিরাও নিজেদের প্রতিভার বিচ্ছুরণ ঘটিয়ে আগমনী ধ্বনি শুনিয়েছিলেন, কিন্তু সেগুলো আগমনী ধ্বনিই। বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে, বিশেষ করে ওয়ানডেতে সত্যিকারের শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা সাকিব-তামিমের মাধ্যমেই। বিশ্ব পর্যায়ের প্রতিভা তাঁরা, কিন্তু শুধু প্রতিভা বোধ হয় নয়, সঙ্গে এর যথাযথ প্রয়োগ এবং প্রতিপক্ষকে সুপার পাওয়ার না ভেবে স্রেফ প্রতিপক্ষ ধরে খেলে যাওয়ার মানসিকতা ঘটিয়েছে আমাদের ক্রিকেটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাঁকবদলটি। সাকিব পারফরম্যান্সের বিস্ময়কর ধারাবাহিকতায় বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার হয়েছেন, তামিম অবিশ্বাস্য সামর্থ্যে বিশ্বের অনেক বোলিংকে তুলোধুনো করেছেন। বাংলাদেশের মূল যে সমস্যা ছিল, প্রতিভার পারফরম্যান্সে অনূদিত না হওয়া, সেই আফসোসও দূর হয়েছে ওদের সামর্থ্যে ভর করে। আর তাতে পরের প্রজন্মে ছড়িয়েছে এই শিক্ষা। আমাদের এখানে যে বা যাঁরা সেরা তাঁরা বিশ্ব-ক্রিকেটেও সেরাদের কাতারে যেতে পারেন, যখন প্রাক সাকিব-তামিম যুগে ধরেই নেওয়া হতো আমাদের সেরারা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পেছনের বেঞ্চের ছাত্রই থাকবেন। বাংলাদেশের ক্রিকেটে সাকিব-তামিম এতটাই আর এতটা যখন তখন তাঁদের ছাড়া সিরিজ জেতার মূল্য কতটা! তাঁদের ছাড়া সিরিজ জিতে বাকিদের মধ্যে এই বিশ্বাসটা তৈরি হলো যে, আমরাও পারি। ব্যক্তিগতভাবে ওদের মতো বিশ্বসেরাদের কাতারে না যেতে পারলেও মিলিত শক্তিতে আমরাও আন্তর্জাতিক স্তরের। যে কাউকে হারাতে পারি। ব্যক্তিই দলের প্রতীক হয়, দলকে উঁচু থেকে উঁচুতে নেয়, কিন্তু ব্যক্তিসর্বস্ব হয়ে থাকলে সামগ্রিক উন্নতি ঘটে না। ব্যক্তির অবর্তমানেই তো সব শেষ। ওয়েস্ট ইন্ডিজ জয় জানিয়ে গেল, সাকিব-তামিমের বাইরেও বাংলাদেশের ক্রিকেট আছে। ক্রিকেটার আছে। এই সিরিজ দিয়ে চিন্তার, বিশ্বাসের একটা পথবদলও বোধ হয় ঘটল।
অধিনায়ক-সহঅধিনায়ক যদি সামনে থাকেন
যে সাকিব-তামিম বাংলাদেশের ক্রিকেটকে বদলে ছিলেন, তাঁরাই আবার আরেক দোষে দুষ্ট ছিলেন। পারফরম্যান্সগত পার্থক্যের কারণে দলের দুজন হয়েও তাঁরা ছিলেন একটু আলাদা। একটু ওপরে। সেটা প্রায় সব দলেই কেউ না কেউ থাকেন। এবং তাঁদের পারফরম করার পাশাপাশি আরেকটা দায়িত্বও থাকে। এই ব্যবধানটা স্পষ্ট হতে না দেওয়া। এমন কিছু না করা যাতে করে দলের বাকিদের মধ্যে হীনম্মন্যতা তৈরি হয়। বিশ্বকাপের সময় এবং জিম্বাবুয়ে সফরে সেটা হয়েছিল বলে অভিযোগ ওঠে, অপ্রিয় সিদ্ধান্ত নিয়ে তাঁদের সরিয়ে দিতে হয় দায়িত্ব থেকে। অপ্রিয় এবং খুবই ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত। অনেকেরই তখন সন্দেহ ছিল, দলের এত বড় দুজন তারকাকে দলে রেখে কে নেতৃত্ব দেবে? আদৌ সাফল্যের সঙ্গে সেটা সম্ভব হবে কি না! এশিয়া কাপে বাংলাদেশের উজ্জীবিত ছবিতে সন্দেহটা দূর হয়েছিল। মুশফিকের বাংলাদেশ হয়ে উঠেছিল সত্যিকারের এক দলের ছবি। তবু যেন কিছু বাকি ছিল। সেবার ফাইনালে উঠেও অল্পের জন্য হেরে চূড়ান্ত বিজয়টা হয়নি। অধিনায়কও সাফল্যের মিছিলের পুরোভাগে ছিলেন না। এবার হলো, দল জিতল আর একেবারে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিলেন মুশফিক। ঠিক তাঁর পাশে পাশেই চললেন আরেকজন। সহঅধিনায়ক মাহমুদ উল্লাহ। যত পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলুক ক্রিকেট খেলাটা আজও শেষ পর্যন্ত অধিনায়কের খেলা, সেখানে অধিনায়ক-সহঅধিনায়ক লড়াইয়ে সামনে থাকলে দল উজ্জীবিত হবেই। হতে বাধ্য। নিজে পারফরম করলে বাকিদের তাগিদ দিতে সুবিধা হয়, বলার মতো গলাও থাকে, পারফরম্যান্স না থাকলে যে শক্তিটা হারিয়ে যায়। নেতার নেতৃত্ব, ব্যক্তিত্ব এবং অভিভাবকত্ব মিলেই তৈরি হয় ক্রিকেট দলের গতিপথ। মুশফিক-মাহমুদের ব্যক্তিত্বে সংকট নেই, সতীর্থদের মধ্যে তাঁরা প্রিয় এবং শ্রদ্ধেয়। এখন দেখছি সংকট নেই তাঁদের পারফরম্যান্সেও। কাজেই আশার উজ্জ্বল আলো।
কোচ নিয়ে অকারণ বাড়াবাড়ি
রিচার্ড পাইবাসকে আনতে গিয়ে যেভাবে প্রায় নাকে খত দেওয়া হয়েছিল এবং যেভাবে প্রায় বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে তিনি গেলেন, সেটা বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য খুব ভালো উদাহরণ হয়নি। কয়েক সপ্তাহ আগেই এটা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করে প্রশ্ন তুলেছিলাম এই নিয়ে আমরা যতটা বাড়াবাড়ি করি অতটা বাড়াবাড়ির আসলে কি দরকার আছে? এই সিরিজের শিক্ষা- দরকার নেই আসলে। কারণ, এবার তো এক অর্থে বাংলাদেশ কোচ ছাড়াই খেলল। শন জার্গেনসেন দায়িত্ব পালন করেছেন, কিন্তু তিনি তো ভারপ্রাপ্ত কোচ। কেউ ছিলেন না বলে তাঁকেই...। এমন অগতির গতি দিয়ে যখন সিরিজ জিতেছি, যখন অনেক নামকরা কোচ নিয়েও লজ্জাজনক হার হয়েছে। তাতে প্রমাণিত হয়ে যাচ্ছে না যে কোচ লাগবে না কিন্তু অন্তত এটা বোঝা যাচ্ছে, কোচই সব করে দেন না। করে খেলোয়াড়রা। করে দল। সেই দলীয় সংহতি ঠিক রেখে, খেলোয়াড়দের সঙ্গে সঠিক যোগাযোগের মাধ্যমে সমন্বয়টা যিনি ঠিক রাখতে পারবেন তাঁকেই আসলে দায়িত্ব দেওয়া উচিত। এখন যাঁরা বিখ্যাত কোচ তাঁদের কেউই বিশ্বসেরা খেলোয়াড় ছিলেন না, তাঁদের নামটা হয়েছে ট্যাকটিকসের সূত্রে। সেই ট্যাকটিকস ঠিকঠাকমতো প্রয়োগ করা আবার মাঠের অধিনায়কের হাতে। সেখানেই সাফল্যের ফর্মুলাটা ঠিকঠাক তৈরি হয় যেখানে কোচ-অধিনায়কের রসায়নটা ঠিক জমে। ভাষা আর সংস্কৃতিগত ঘাটতি, তারকাখ্যাতিসূত্রে কোচের উন্নাসিকতা ক্ষেত্রবিশেষে সেই জুটি তৈরির পথে বাধা। নতুন কোচ নেওয়ার আগে এসব ভাবা উচিত। তা ভাবার জন্য যথেষ্ট সময় দিয়ে গেল সিরিজ। আর এর চেয়ে বড় শিক্ষাটা হলো আমাদের জন্য ট্যাকটিশিয়ান হেড কোচের চেয়েও বেশি জরুরি হলো স্পেশালিস্ট কোচ বা এই জাতীয় কিছু। নিশ্চিতভাবেই সাকলায়েন মুশতাকের কারণে আমাদের স্পিনারদের এমন ধারালো আর বিষাক্ত দেখিয়েছে, জরুরি মুহূর্তে তাঁর দেওয়া টোটকা টনিকের মতো কাজ করেছে নিশ্চয়। অন্যান্য ক্ষেত্রেও এ রকম বিশেষজ্ঞ কোচই বোধ হয় এখন দরকার, যেমন একজন বিখ্যাত ব্যাটসম্যান এসে ব্যাটসম্যানদের ভুলের সূক্ষ্ম জায়গাগুলো ধরিয়ে দিতে পারেন। জাতীয় দলের ক্ষেত্রে হেড কোচ হিসেবে ট্যাকটিকস জানা লোকই আদর্শ, কিন্তু মনে রাখতে হবে আমাদের খেলোয়াড়রা খুব ভালো কোচিং প্রক্রিয়ার মাধ্যমে উঠে আসেন না। মূল দলে এসেও তাই কিছু শিক্ষা, টেকনিকের কিছু বিন্যাস তাঁদের দরকার পড়ে। দরকার পড়ে ম্যাচ সিচুয়েশনের কিছু মনস্তাত্ত্বিক চাপ জেতার কৌশলও। কাজেই হেড কোচের মতো একজন ব্যাটিং কোচও বোধ হয় খুব তাড়াতাড়িই দরকার।
এর বাইরেও শিক্ষা আছে কিছু। টেস্টসহ পুরো সিরিজটাকে ধরলে আরেকটা বড় ব্যাপার হলো, আমাদের পরের প্রজন্ম খুব ভালো তৈরি হয়ে গেছে। যতই আমরা জাতীয় লিগকে হেলাফেলা করি না কেন, সেখানকার পারফরমাররা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের জন্য প্রস্তুত। নির্বাচকদের মাঠটা তাই বড় হয়ে গেল। সোহাগ-এনামুল-মমিনুলদের দেখে তাঁরা বিশ্বাসের সঙ্গেই জাতীয় লিগের যেকোনো পারফরমারকে দলে নিতে পারেন। চিন্তার বিষয় শুধু এটাই, এই পারফরমাররা শুরুর চমকটা ঠিক ধরে রাখতে পারেন না। কেন? দিকভ্রান্তিটা ঘটে ঠিক কী কারণে?
এই জয়োৎসবেও এসব নিয়ে কি একটু ভাবব! ভয় কিন্তু ওটাই। জিতলে যে আমাদের মনে হয় সবই ঠিক আছে। আমাদের কাছে জয় মানে তো জোয়ারে ভেসে যাওয়া। প্রাণঢালা সংবর্ধনা, আন্তরিক অভিনন্দন, হৃদয় নিংড়ানো আবেগ, লম্বা বক্তৃতা, বিস্তর পুরস্কার ইত্যাদি ইত্যাদি।

No comments:

Post a Comment