Pages

Tuesday, December 25, 2012

খুন, টেন্ডারবাজি, গোলাগুলিতে অচল ছিল শিক্ষাঙ্গন

খুন, টেন্ডারবাজি, গোলাগুলিতে অচল ছিল শিক্ষাঙ্গন


২০১২ বিদায় নিতে চলেছে। বিদায়ী বছরে দেশের উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ঘটেছে নানা অঘটন। চাঁদাবাজির টাকা ভাগাভাগি নিয়ে হয়েছে রক্তারক্তি। নিজ দলীয় ক্যাডারদের হাতে প্রাণ দিতে হয়েছে কয়েকজন ছাত্রকে। টেন্ডারের টাকা ভাগাভাগি নিয়ে হয়েছে হুলস্থূল কাণ্ড। ছাত্রকে অবৈধভাবে নম্বর দেয়ার প্রতিবাদে দেশের শীর্ষ প্রতিষ্ঠান বুয়েট দীর্ঘদিন ছিল অচল। বিদায়ী বছরে খুন, সমকামিতা, সংঘর্ষ, গোলাগুলি, চাপাতি ছিল শিক্ষাঙ্গনের আলোচিত ঘটনা। ২০১২ শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত শিক্ষাঙ্গন ছিল নানা কারণেই আলোচিত। দেশের শীর্ষ প্রতিষ্ঠান বুয়েটের ৩ ছাত্রলীগ কর্মীকে বহিষ্কারের দাবিতে ২০১১ সালের ৩১শে ডিসেম্বর মাঠে নামেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। অবরুদ্ধ করেন প্রো-ভিসি অধ্যাপক হাবিবুর রহমানকে। প্রো-ভিসিসহ ৫০ জন শিক্ষককে ১৭ ঘণ্টা অবরোধ করে রাখেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। ১৭ ঘণ্টা পর শিক্ষার্থীদের দাবি মানা হলে তারা অবরোধ তুলে নেন। যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও পুলিশের ত্রিমুখী সংঘর্ষের কারণে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয় ২রা জানুয়ারি। একই দিনে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের দুই পক্ষের মধ্যে ব্যাপক গোলাগুলি হয়। এক ছাত্রকে মারধরের ঘটনার প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে উঠে বুয়েট। ৯ই ডিসেম্বর বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটের অবরোধ প্রতিহত করতে গিয়ে ছাত্রলীগের ক্যাডাররা বিশ্বজিৎ দাস নামের এক দর্জি দোকানদারকে দিবালোকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করে। এ ঘটনাটি যেমন বিদায়ী বছরের অন্যতম আলোচিত বিষয় তেমনি অসংখ্য ছোটখাটো ঘটনা ঘটেছে বিদায়ী বছরে। তারমধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সারসংক্ষেপ দেয়া হলো।
‘এই গুলি চালা’: সরকার দলীয় একজন এমপি কর্তৃক সাংবাদিকদের ওপর গুলি চালানোর নির্দেশ দেয়ার ঘটনায় তোলপাড় সৃষ্টি হয় দেশব্যাপী। ৩রা জানুয়ারি রাজধানীর মনিপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভর্তি বাণিজ্যের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে প্রতিষ্ঠানটির গভর্নিং বডির সভাপতি এমপি কামাল আহমেদ মজুমদারের তোপের মুখে পড়েন বেসরকারি টেলিভিশন আরটিভির সাংবাদিক অপর্ণা সাহা ও ক্যামেরাম্যান সাইদ হায়দার। এমপি দলীয় ক্যাডারদের সাংবাদিকদের ওপর গুলি চালানোর নির্দেশ দেন। এ ঘটনায় দেশব্যাপী তোলপাড় সৃষ্টি হয়। প্রতিবাদে মাঠে নামেন অভিভাবকরা।
জোবায়ের খুন ও ভিসির পদত্যাগ: ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের গোলাগুলি ও সংঘর্ষে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ছাত্র জোবায়ের আহমেদ খুন হন ৯ই জানুয়ারি। ওই ঘটনার প্রতিবাদে ফেটে পড়েন ছাত্র-শিক্ষকরা। টানা কয়েক মাস আন্দোলনের পর ১৭ই মে বিশ্ববিদ্যালয়টির ভিসি অধ্যাপক শরীফ এনামুল কবির পদত্যাগে বাধ্য হন। পরবর্তীকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক আনোয়ার হোসেনকে জাবির ভিসি নিয়োগ দেয়া হয়।
ছাত্রলীগ-শিবির সংঘর্ষ: বিদায়ী বছরে বেশির ভাগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সংঘর্ষ হয়েছে ছাত্রলীগের বিভিন্ন গ্রুপের মধ্যে। ১১ই জানুয়ারি সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ-শিবির সংঘর্ষে কমপক্ষে ৫০ জন আহত হয়।
প্রকাশ্যে চাপাতি নিয়ে জবিতে মিছিল: চাঁদা আদায়কে কেন্দ্র করে রাজধানীর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৪শে জানুয়ারি ছাত্রলীগের নেতারা প্রকাশ্যে চাপাতি, রাম দা নিয়ে মিছিল ও সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। এতে বেশ কয়েকজন ছাত্র মারাত্মকভাবে আহত হন।
কারমাইকেলের সংঘর্ষ: বিদায়ী বছরে সরকারি কলেজগুলোতে যে কয়টি সংঘর্ষ হয়েছে তারমধ্যে রংপুরের সরকারি কারমাইকেল কলেজ ছিল অন্যতম। নিয়োগ বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে দুইপক্ষের সংঘর্ষে কমপক্ষে ৫০ জন আহত হয়।
চবির ২ ছাত্র নিহত: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় দীর্ঘদিন ধরেই ছাত্র শিবিরের ক্যাডাররা নিয়ন্ত্রণ করছে। দখল নিতে ছাত্রলীগ-শিবিরের মধ্যে বিভিন্ন সময় সংঘর্ষ হলেও ৮ই ফেব্রুয়ারির সংঘর্ষ ছিল বিদায় বছরের জন্য সবচেয়ে ভয়াবহ। ওই সংঘর্ষে শিবির নেতা মাসুদ বিন হাবিব ও মুজাহিদুল ইসলাম প্রাণ হারান। এছাড়া দুই পক্ষের কমপক্ষে ৪০ জন আহত হয়। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে চবি বন্ধ ঘোষণা করা হয় অনির্দিষ্টকালের জন্য।
সমকামিতার অভিযোগে রাবি উত্তাল: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মন্নুজান হলের ২ ছাত্রী তাদেরই এক সহপাঠীর বিরুদ্ধে সমকামিতার অভিযোগ করে প্রভোস্টের কাছে। অভিযোগের প্রেক্ষিতে ওই ছাত্রীর আবাসিকতা বাতিল করেন প্রভোস্ট। কিন্তু ১৮ই ফেব্রুয়ারি রাতে ওই ঘটনার প্রতিবাদ জানান সাধারণ ছাত্রীরা। তারা প্রভোস্ট ও প্রক্টরকে অবরুদ্ধ করে রেখে ভাঙচুর ও বিক্ষোভ চালান। শেষ পর্যন্ত পিছু হটে কর্তৃপক্ষ।
প্রাথমিক স্কুলে নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস: সরকারি প্রাথমিক স্কুলে সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা হয় ২৪শে ফেব্রুয়ারি। কিন্তু এর আগেই প্রশ্ন ফাঁস হয়ে যায়। প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে পুলিশ ২৮ জনকে আটক করে।
বুয়েটে গণপদত্যাগ: ভিসি ও প্রো-ভিসির অপসারণের দাবিতে বুয়েটের ডিন, প্রভোস্ট ও পরিচালকদের পদত্যাগের ঘটনা ছিল অন্যতম আলোচিত বিষয়। একদিনে ২৩ জন পদত্যাগ করেন। শেষ পর্যন্ত সরকার প্রো-ভিসি অধ্যাপক হাবিবুর রহমানকে সরিয়ে দেয়।
পদ্মা সেতুর টাকা ভাগাভাগিতে রাবি ছাত্র খুন: পদ্মা সেতু প্রকল্প থেকে বিশ্বব্যাংক সরে যাওয়ার ঘোষণার পর সরকার নিজস্ব উদ্যোগে পদ্মা সেতু নির্মাণের ঘোষণা দেয়। সেই লক্ষ্যে বিভিন্ন জায়গায় চাঁদা সংগ্রহ শুরু হয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ নিজ উদ্যোগে চাঁদা সংগ্রহ শুরু করে। সেই চাঁদার টাকা ভাগাভাগি করার ঘটনায় দুই পক্ষের সংঘর্ষে সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ৪র্থ বর্ষের ছাত্র আবদুল্লাহিল সোহেল নির্মমভাবে প্রাণ হারান।
মেডিকেলে ভর্তিচ্ছুরা রাজপথে: ভর্তি পরীক্ষার পরিবর্তে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার জিপিএ’র ভিত্তিতে মেডিকেলে শিক্ষার্থী ভর্তির সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। ওই ঘটনার প্রতিবাদে ১৩ই আগস্ট রাজপথে নামেন ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। টানা কয়েকদিন আন্দোলন চলে। হাইকোর্টে রিট হয়। শেষ পর্যন্ত সরকার পিছু হটে। বহাল থাকে পরীক্ষা।
বাস চাপায় ঢাবি ছাত্র নিহত: ২৮শে আগস্ট বাস চাপায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র তৌহিদুজ্জামান প্রাণ হারায়। ওই ঘটনার প্রতিবাদে রাজপথে নেমে আসেন সাধারণ ছাত্ররা। কয়েক ঘণ্টাব্যাপী চলে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ। দোকানপাটে চলে লুটপাট।
বিশ্বজিৎ হত্যা: বিদায়ী বছরে পুরান ঢাকার দর্জি দোকানদার বিশ্বজিৎ হত্যা ছিল অন্যতম আলোচিত বিষয়। বিশ্বজিৎকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করে ছাত্রলীগের ক্যাডাররা। এ ঘটনার প্রতিবাদের ঝড় ওঠে দেশজুড়ে। পুলিশ ইতিমধ্যেই কয়েকজন খুনিকে গ্রেপ্তার করেছে। ৯ই ডিসেম্বর ১৮ দলীয় জোটের ডাকা অবরোধ কর্মসূচির সমর্থনে সকাল নয়টার দিকে ঢাকার জজকোর্ট এলাকা থেকে বিএনপি ও জামায়াত-সমর্থিত আইনজীবীরা একটি মিছিল বের করেন। মিছিলটি ভিক্টোরিয়া পার্কের কাছে গেলে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ও কবি নজরুল সরকারি কলেজ শাখা ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা আইনজীবীদের ধাওয়া দেন। এ সময় ভিক্টোরিয়া পার্ক-সংলগ্ন একটি তেলের পাম্পের কাছে তিনটি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটে। তখন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা পাম্পের দিকে ধাওয়া দিয়ে যেতে থাকলে আতঙ্কে পথচারী বিশ্বজিৎ দৌড়ে সেখানকার ‘ইনটেনসিভ ডেন্টাল কেয়ার’ সেন্টারে আশ্রয় নেন। সেখানে ছাত্রলীগ ক্যাডার শাকিল ওরফে কোপা শাকিলসহ কয়েকজন চাপাতি দিয়ে উপর্যুপরি কোপাতে থাকে। গুরুত্বর আহত হয়ে পালাতে দৌড়ে দেন বিশ্বজিৎ। দৌড়ে শাঁখারীবাজারের তার দোকানের সামনের গলিতে লুটিয়ে পড়েন। রিকশাচালক রিপন মোল্লা স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় বিশ্বজিৎকে পুরান ঢাকার মিটফোর্ড হাসপাতালে নিয়ে যান। ততক্ষণে বিশ্বজিৎ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।

No comments:

Post a Comment