ওয়ানডেতেও জয়ে শুরু পাকিস্তানের
ম্যাচের উত্তেজনাটা আসলে মরে গিয়েছিল খেলার প্রথম ১০ ওভারেই। ২৯ রান তুলতেই পটাপট উপড়ে যায় ভারতীয় ব্যাটসম্যানদের পাঁচ উইকেট। এতে ভারত ব্যাটিংয়ের প্রথম চারজনই বোল্ড আউট। ভারতের ওয়ানডে রেকর্ডে এটি প্রথম ঘটনা আর ইতিহাসে সপ্তম। পাক-ভারত সিরিজের প্রথম ম্যাচের নায়ক দুই সেঞ্চুরিতে দু’দলের দুই ব্যাটসম্যান। এতে ভারত অধিনায়ক এমএস ধোনির কীর্তিকে ম্লান করে ম্যাচ শেষে আলোটা পাক ওপেনার নাসির জামশেদের সেঞ্চুরি আর পেস তারকা জুনায়েদের ৪ উইকেট শিকারে। গতকাল চেন্নাইয়ের চিদাম্বরম মাঠে ভারতকে হারিয়ে ওয়ানডে সিরিজ শুরু করলো পাকিস্তান। পাঁচ বছরে প্রথম ভারত সফরে এতে তিন ম্যাচ সিরিজে পাকিস্তান এগিয়ে রইলো ১-০তে। আগে জয় নিয়ে এবারের দুই ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজও পাকিস্তান শেষ করে ১-১ সমতায়। আগে ব্যাট করে ভারত পাকিস্তানকে ২২৮ রানের টার্গেট দেয়। দলের ব্যাটিং ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে ১১৩ রানের অপরাজিত ইনিংস খেলে পাকিস্তানের জন্য চ্যালেঞ্জটা ধরে রাখেন ভারত অধিানয়ক এমএস ধোনি। আর এ চ্যালেঞ্জের যোগ্য জবাবে ১০১ রানের অপরাজিত ইনিংসে ম্যাচজয়ী পাকিস্তানের নায়ক ওপেনার নাসির জামশেদ। এতে ৬ উইকেট ও দুই ওভার অক্ষত রেখে জয়ের এ লক্ষ্য পূরণ করে পাকিস্তান। যদিও ম্যাচের সেরা খেলোয়াড় নির্বাচনে ধোনির ইনিংসটাই মন ভোলায় এদিনের এডজুডিকেটরদের। ধোনির ম্যান অব দ্য ম্যাচ পুরস্কার জয় সান্ত্বনা হতে পারে ভারত সমর্থকদের। ২২৮ রানের টার্গেটে ব্যাটে গিয়ে আদতে ঢিলেঢালা ব্যাটিং দেখানোর সুযোগ ছিল না পাক ব্যাটসম্যানদেরও। চিদাম্বরম মাঠের সিক্ত পিচে সুইং বা স্পিনে বল ঘুরছিল খেয়াল খুশি মতো। আর পাকিস্তান ইনিংসের একবারে প্রথম বলেই এতে ছিল ধাক্কা। পাকিস্তান ব্যাটিংয়ের প্রথম ওভারের প্রথম বলেই নিজের উইকেট উপরে যেতে দেখে বিহ্বল পাকিস্তানের টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক হাফিজ। ওয়ানডেতে জীবনের প্রথম বলেই ভারতকে উইকেট সাফল্য এনে দিয়ে এর ঘটক পেস তারকা ভুবনেশ্বর কুমার। দলীয় ২১ রানে ওয়ান ডাউন ব্যাটসম্যান আজহার আলীও আউট হয়ে গেলে ততক্ষণে টেনশনও বড় হয়ে গেছে পাকিস্তান শিবিরে। পরিস্থিতি সামাল দিয়ে ওপেনার জামশেদ ও পরীক্ষিত পাক ব্যাটসম্যান ইউনুস খান তৃতীয় উইকেট জুটিতে স্কোর বোর্ডে যোগ করেন ১১১ রান। পেসার ডিন্ডার বলে অশ্বিনের হাতে ধরা পড়ার আগে ইউনুস পূর্ণ করেন ব্যক্তিগত অর্ধশতকও। তবে অবিচল নাসির জামশেদ জয় নিশ্চিত করার সঙ্গে পূর্ণ করেন নিজের দ্বিতীয় ওডিআই সেঞ্চুরিও। আর এতে ভারতের বিপক্ষে জামশেদের নৈপুণ্যের পরিসংখ্যানটাও হলো আরেকটু ভারি। ঢাকায় এশিয়া কাপে ভারতের বিপক্ষেই জামশেদের প্রথম সেঞ্চুরিটি। আর এ নিয়ে ভারতকে তৃতীয়বার মোকাবিলায় দুইবার নটআউট জামশেদের মোট রান ২৬৬। তবে পাকিস্তান ইনিংসের ৪২তম ওভারের শেষ বলে দলীয় ১৭২ রানে আলাদা জীবন পান শোয়েব মালিক। ধোনির হাতে ক্যাচ দিলেও অশ্বিনের নো-বলে উইকেট বাঁচে ভারত জামাতা মালিকের। আর আশা কমে ভারত সমর্থকদের। পাকিস্তান ব্যাটিং ইউনুস খান ও অধিনায়ক মিসবাহকে হারিয়েছিল তার আগেই।
তিন বছর পর সেঞ্চুরি ধোনির
টেস্ট ক্রিকেটে ভারত দলের সামপ্রতিক ব্যর্থতাটা ভক্তদের কাছে স্পষ্টই। একবছরে ওয়ানডেতেও নেই আহামরী সাফল্য। সঙ্গে ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের ঘাটতি নিয়ে এদিন মহাচাপে ব্যাট হাতে ক্রিজে যান এমএস ধোনি। আর ধোনি দেখান দৃঢ়তাও। কঠিন ম্যাচে তুলে নেন দারুণ সেঞ্চুরি। তিন বছর পর ধোনির ওয়ানডে সেঞ্চুরি দেখা গেলো এতে। আর এতে ধোনির ওয়ানডে রানের সংগ্রহটা পার করলো ম্যাজিক ফিগার ৭০০০।
এদিন ভারতের ইনিংসটা ছিল দুই ভাগে। এতে ভিন্ন দুই রূপ দেখতে পেয়েছেন দর্শকরা। প্রথমভাগে শীর্ষ পাঁচ ব্যাটসম্যানের ব্যর্থতায় স্বাগতিকরা ভারতের সংগ্রহটা দেখেছেন ভীতিকর ২৯/৫ । আর দ্বিতীয় ভাগে দেখা গেছে ভারত দলের পেছনের ব্যাটসম্যানদের দৃঢ়তা। চেন্নাইয়ের সকালটা এদিন ছিল মেঘাচ্ছন্ন-বৃষ্টিভেজা। চেপুকের চিদাম্বরম মাঠে এতে টস জিতে প্রতিপক্ষকে ব্যাটিংয়ে পাঠাতে দু’বার ভাবেননি পাক অধিনায়ক মিসবাহ-উল-হকও। আর ভেজা সবুজঘাসের পিচে ভারত ব্যাটসম্যানদের শুরুটা হয় নড়বড়ে। পাক পেস তারকা জুনাইদ খান ও মোহাম্মদ ইরফানের মারাত্মক সুইং খেলতে না পেরে ভারত ব্যাটসম্যানদের ৫ উইকেট উপড়ে যায় ইনিংসের ১০ ওভার ফুরানোর আগেই। তবে ভারতের মনোবল ফেরে ষষ্ঠ উইকেট জুটিতে। অধিনায়ক এমএস ধোনি ও সুরেশ রায়না এ জুটিতে যোগ করেন ৭৩ রান। কিন্তু ব্যক্তিগত ৪৩ রানে হাফিজের স্পিনে বোল্ড আউট হয়ে ভক্তদের টেনশনে ফেরান রায়না। তবে অন্যপ্রান্তে ধোনি তখনও ধৈর্যের মূর্তি। ৮৬ বলে পূর্ণ করেন অর্ধশতক। এ সময় এক ছক্কার সঙ্গে ধোনি বাউন্ডারি খেলেন মাত্র দু’টি। তবে ক্রমেই হাতখোলা হয়ে উঠে সপ্তম উইকেট জুটিতে ধোনি-অশ্বিন যোগ করেন ১২৫ রান। সপ্তম উইকেট জুটিতে এটি ভারতের সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড। ধোনি পরের ৬১ রান করেন ৩৯ বলে । এতে ভারতের শেষ ১০ ওভারে ওঠে ৮১ রান। পাক বোলার ইরফানকে ছক্কা হাঁকিয়ে ধোনি ৯৫ রান থেকে পূর্ণ করেন ব্যক্তিগত সেঞ্চুরি। ধোনির সেঞ্চুরিতেও ম্যাচ বাঁচেনি ভারতের। তবে ভারত অধিনায়কের দৃঢ়তা ছাড়া এদিন ১০০ ওভারের ম্যাচ প্রয়োজন হতো না, এটাও ঠিক।
স্কোর কার্ড
ভারত-পাকিস্তান ১ম ওয়ানডে
চিদাম্বরাম স্টেডিয়াম, চেন্নাই।
ভারত: ২২৭/৬ (৫০ ওভার)
পাকিস্তান: ২২৮/৪ (৪৮.১ওভার)
ভারত ইনিংস: রান বল ৪ ৬
গম্ভীর ব ইরফান ৮ ১৭ ১ ০
শেওয়াগ ব জুনাইদ ৪ ১১ ১ ০
কোহলি ব জুনাইদ ০ ৫ ০ ০
যুবরাজ ব জুনাইদ ২ ৩ ০ ০
রোহিত ক হাফিজ ব জুনাইদ ৪ ১৪ ০ ০
রায়না ব হাফিজ ৪৩ ৮৮ ২ ০
ধোনি অপরাজিত ১১৩ ১২৫ ৭ ৩
অশ্বিন অপরাজিত ৩১ ৩৯ ২ ০
অতিরিক্ত: (লব ১১, ও ৯, নব ২) ২২
মোট: (৬ উইকেট; ৫০ ওভার) ২২৭
উইকেট পতন: ১-১৭ (শেওয়াগ, ৩.৫ ওভার), ২-১৭ ( গম্ভীর, ৪.৪ ওভার), ৩-১৯ (কোহলি, ৫.৪ ওভার), ৪-২০ (যুবরাজ, ৫.৬ ওভার), ৫-২৯ (শর্মা, ৯.৪ ওভার), ৬-১০২ (রায়না, ৩৩.২ ওভার)
বেলিং: ইরফান ৯-২-৫৮-১, জুনাইদ ৯-১-৪৩-৪, গুল ৮-০-৩৮-০, আজমল ১০-১-৪২-০, হাফিজ ১০-২-২৬-১।
পাকিস্তান ইনিংস: রান বল ৪ ৬
হাফিজ ব কুমার ০ ১ ০ ০
জামশেদ অপরাজিত ১০১ ১৩২ ৫ ১
আজহার আলী ক শর্মা ব কুমার ৯ ৩৮ ০ ০
মিসবাহ ব ইশান্ত ১৬ ২৪ ১ ০
মালিক অপরাজিত ৩৪ ৩৫ ১ ০
অতিরিক্ত: (লব ৬, ও ৩, নব ১) ১০
মোট: (৪ উইকেট, ৪৮.১ওভার) ২২৮
উইকেট পতন: ১-০(হাফিজ০.১ ওভার), ২-২১(আজহার, ১০.২ ওভার), ৩-১৩৩(ইউনিস, ৩০.৩ ওভার), ৪-১৭২(মিসবাহ, ৩৮.২ ওভার)
বোলিং: কুমার ৯-৩-২৭-২, শর্মা ১০-০-৩৯-১, দিন্দা ৯.১-০-৪৫-১, অশ্বিন ১০-০-৩৪-০, যুবরাজ ৫-০-৩৩-০, রায়না ২.১-০-২৩-০, কোহলি ২.৫-০-২১-০
ফল: পাকিস্তান ৬ উইকেটে জয়ী।
ম্যান অব দ্যা ম্যাচ: মহেন্দ্র সিং ধোনি
সিরিজ: ৩-ম্যাচ সিরিজে ১-০।
No comments:
Post a Comment