Pages

Wednesday, December 19, 2012

দিল্লি বিরোধিতা কমিয়ে নতুন কৌশল খালেদার

দিল্লি বিরোধিতা কমিয়ে নতুন কৌশল খালেদার


তিস্তার পানি বণ্টন ও সীমান্ত প্রটোকল চুক্তি স্বাক্ষর না হওয়ায় ভারতের সঙ্গে হাসিনা সরকারের টানাপড়েন স্পষ্ট। একই সময়ে দিল্লির বর্তমান নেতৃত্বের সঙ্গে বিরোধীদলীয় নেত্রী খালেদা জিয়ার বৈঠক এবং দেশে ফিরে খালেদা জিয়ার ভারত নিয়ে নয়া কৌশল নিয়ে নানা আলোচনা সকল মহলেই। ঢাকা সফরে আসা আনন্দবাজারের দিল্লি প্রতিনিধি অগ্নি রায় আরও লিখেছেন:
জনশ্রুতি আছে, বেগম খালেদা জিয়া যে কোন রাজনৈতিক সমাবেশে এক ঘণ্টা বক্তৃতা দিলে সাধারণত তার মধ্যে ৩০ মিনিট ব্যয় করেন ভারত-বিরোধিতায়!
সেই খালেদা জিয়া গত ১৮ই নভেম্বর ভারত সফর সেরে ফিরে আসার পর এক মাস কেটে গেছে। এখন পর্যন্ত চারটি জনসভা করেছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী। কক্সবাজার, উখিয়া, ঢাকা ও বরিশালে। এ দেশের রাজনীতির কারবারিরা সবিস্ময়ে লক্ষ্য করছেন, ভারত শব্দটাই তার অভিধান থেকে যেন উধাও হয়ে গেছে! বাংলাদেশে ভোটের আগে বিএনপির এই পরিবর্তিত অবস্থান যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করা হচ্ছে।
বিষয়টি এমন নয় যে, খালেদার দল বিএনপি রাতারাতি নিজেদের অবস্থান বদলে মনমোহন সিংহ সরকারের পাশে দাঁড়িয়েছে। বরং দলীয় সূত্রের খবর, ভারত সম্পর্কে খালেদা জিয়ার এ নরম অবস্থান তার নিজের দলের ভিতরেই প্রশ্নচিহ্ন তৈরি করেছে। গত সপ্তাহে বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে ভারত সম্পর্কে খালেদার এই নয়া নীতি নিয়ে তার দলের অনেক নেতাই দ্বিমত পোষণ করেছেন। প্রশ্ন উঠেছে, একদিকে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কে নতুন যুগের কথা বলা হচ্ছে, অন্যদিকে দলের ভারত নীতিতে কোন পরিবর্তন না আনার কথাও বলা হচ্ছে। বিষয়টি পরস্পরবিরোধী। খালেদা পরিবারের ব্যক্তিগত বন্ধু এবং রাজনৈতিক পরামর্শদাতা মাহমুদুর রহমান এ নিয়ে প্রকাশ্যেই ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তার বক্তব্য, এ পরস্পরবিরোধিতা কি ভোটের আগে দলের হাসিনা-বিরোধিতাকে সর্বাঙ্গীণভাবে লঘু করে দেবে না?
বাংলাদেশের রাজনৈতিক কারবারিদের মতে, ভারত সম্পর্কে খালেদার এ তুলনামূলক নরম অবস্থান নিছকই কৌশলগত কারণে। সামনাসামনি উগ্র ভারত বিরোধিতা না করে জামায়াতের মতো জোটসঙ্গীদের দিয়ে সেই কাজটা চালিয়ে যাচ্ছেন খালেদা। এটা ঘটনা যে, ভারতের সঙ্গে তিস্তা ও সীমান্ত চুক্তি এখনও রূপায়ণ না করতে পারার প্রশ্নে যথেষ্ট কোণঠাসা হয়ে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রশ্ন উঠছে, তার ভারত-বন্ধুত্বের ফল নিয়ে। আওয়ামী লীগের একটি অংশও মনে করছে, এ দু’টি চুক্তির বিষয় নিয়ে প্রচার এতটা উচ্চগ্রামে নিয়ে যাওয়াটা হয়তো ঠিক হয়নি। আওয়ামী লীগের এক নেতার কথায়, ‘তিস্তা চুক্তি হলে সরাসরি রাজশাহী এলাকা উপকৃত হবে এবং পদ্মায় পলি পড়ার হার কমে তা সচল হবে। একথা ঠিকই। কিন্তু গোটা দেশজুড়ে তিস্তা নিয়ে যে উন্মাদনা তৈরি হয়েছে, তা প্রায় জাতীয় ইস্যুর সমান!’ ফলে প্রধানমন্ত্রীর ওপর চাপ বেড়েছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ওই দুই চুক্তি না হওয়ার ফলে দেশের অভ্যন্তরে যে ভারত-বিরোধী আবেগ তৈরি হয়েছে, তাকে সুকৌশলে কাজে লাগাচ্ছে জামায়াত।
বাংলাদেশের বক্তব্য, মুখে ভারত-বিরোধী কোন বিবৃতি না দিলেও খালেদা জিয়া পেছন থেকে গোটা পরিস্থিতিকে কাজে লাগাচ্ছেন। আওয়ামী লীগের এমপি আবদুর রহমানের কথায়, ‘পাকিস্তানের হাতে তামাক খেয়ে ভারতকে যতটা সম্ভব চাপে রাখতে জামায়াত প্রবলভাবে সক্রিয়। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে ভারতকে সবসময় অস্বস্তিতে রাখতে পারলে বেশ কিছু গোষ্ঠীর স্বার্থসিদ্ধি হয়। এ কাজে পশ্চিম এশিয়ার কিছু দেশ টাকাও ঢালছে।’ হাসিনা শিবিরের বক্তব্য, বৃহত্তর ভূ-রাজনীতির কথা মাথায় রেখে (মার্কিন-পাকিস্তান সম্পর্ক ইত্যাদি) বেগম জিয়া কৌশলগতভাবে প্রকাশ্যে ভারত বিরোধিতা বন্ধ রেখেছেন ঠিকই- কিন্তু ক্ষমতায় এলেই তিনি ফের পুরনো অবস্থানে ফিরবেন। ভোট যত এগিয়ে আসবে, জামায়াতকে কাজে লাগিয়ে দেশে অস্থিরতা তৈরির কাজটিও এগোবে।
তবে ঘটনা হলো- শুধুমাত্র ভারত-বিরোধিতা দিয়ে যে ভোটের কিস্তিমাত করা যাবে না, তা বিলক্ষণ জানে বিরোধী জোট। তিস্তা বা সীমান্ত চুক্তি রূপায়ণে ব্যর্থতা (যদিও দীপু মনি এখনও বলছেন, তারা আশাবাদী, এই দু’টি চুক্তি সই করেই ভোটে যেতে পারবে হাসিনা সরকার) নির্বাচনী প্রচারে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি, পদ্মায় সেতু নির্মাণে দুর্নীতি, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আকাশছোঁয়া দামসহ অনেক বিষয়ই গুরুত্ব পাবে বিরোধীদের প্রচারে।
তবে বিরোধীদের ভোট প্রচারে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেতে চলেছে ভোটের আগে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গড়তে না-চাওয়া নিয়ে সরকারের যুক্তি- যা উড়িয়ে দিচ্ছে সরকার-পক্ষ। দীপু মনির কথায়, ‘বিএনপির কাছে প্রচারের অন্য কোন হাতিয়ার নেই। তাই তারা এই ধুয়ো তুলেছে। আমরা যেভাবে নির্বাচনী সংস্কার করেছি, তা যথেষ্ট স্বচ্ছ। কমিশনও এখন যথেষ্ট শক্তিশালী।’ তাদের বক্তব্য, নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ ও শক্তিশালী করার জন্য খালেদা জিয়া যদি কোন প্রস্তাব নিয়ে আসেন, তাহলে অবশ্যই আলোচনায় রাজি সরকার।

No comments:

Post a Comment