বন্দুকযুদ্ধে নিহত নোয়াখালীর নিজাম ডাকাত
র্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নোয়াখালীর আলোচিত নিজাম ডাকাত নিহত হয়েছে। বুধবার রাত সাড়ে ৩টায় সুবর্ণচরের সেন্টার বাজারের মানিকের বাড়ির পাশে একটি বাগানে এ ঘটনা ঘটে। এসময় ঘটনাস্থল থেকে একটি দেশী বন্দুক, ইতালির তৈরী পিস্তল ও ছয়টি কার্তুজ উদ্ধার করা হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে আটক করা হয়েছে ৮ জনকে। গ্রেপ্তারকৃতরা হচ্ছে জয়নুল বাহিনী (৩৮), ফয়েজ কেরানী (৫০), সিরাজ বাহিনী (৪০), আকবর খাঁ (৪৫)। বাকিদের নাম পাওয়া যায়নি। চর জব্বার থানার ওসি মোশাররফ হোসেন তরফদার ও হাতিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ মোক্তার হোসেন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। চরজব্বর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোশাররফ হোসেন তরফদার বলেন, নিজাম ডাকাত শুধু হাতিয়া নয়, সে পুরো উপকূলের ত্রাস। তার বিরুদ্ধে হাতিয়া, চরজব্বর, মনপুরা, সন্দ্বীপ, ভোলা ও চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন থানায় প্রায় ৫০টির মতো মামলা আছে। ১৩টি মামলায় ওয়ারেন্ট রয়েছে। তিনি বলেন, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে র্যাব ১১-এর লে. কর্নেল নওরোজ এহসানের নেতৃত্বে একটি দল অভিযান চালায়। এ সময় তাদের উদ্দেশ্য করে পাল্টা গুলি ছোড়ে নিজাম ডাকাত। গুলি বিনিময়ের এক পর্যায়ে ঘটনাস্থলে বন ও জলদস্যু সম্রাট নিজাম ডাকাত নিহত হয়। পরে র্যাব সেখান থেকে তাকে উদ্ধার করে সুবর্ণচর উপজেলার চরজব্বর থানায় নিয়ে আসে। সেখানে তার সুরতহাল তৈরি করা হয়। এরপর তার লাশ নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়। এ সময় তার এক স্ত্রী উপস্থিত ছিল। হাতিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ মোক্তার হোসেন বলেন, নিজাম ডাকাত হাতিয়ার চরাঞ্চল ও মেঘনার দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী। সে নদীতে ডাকাতি, চরাঞ্চলের ভূমিহীনদের ভূমি দখল, ধর্ষণ, লুটপাট, অপহরণসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ড করে আসছিল দীর্ঘ চার বছর ধরে। তার নিয়ন্ত্রণে ছিল একদল সুসংগঠিত জল ও বনদস্যু বাহিনী। তিনি বলেন, ‘ইতিপূর্বেও তার আস্তানায় র্যাব-পুলিশ-কোস্টগার্ডসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বেশ কয়েকবার অভিযান পরিচালনা করেছে। কিন্তু সে সময় তাকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। এদিকে হাতিয়ার মাছ ব্যবসায়ী ও জেলেরা জানান, নদীতে মাছ শিকারে গেলে তাদের নিজাম ডাকাত বাহিনীর আতঙ্কে থাকতে হতো। এ বাহিনীর হামলা, লুটপাট, অপহরণসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে অতিষ্ঠ ছিলেন তারা। নিজাম ডাকাত লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলার চরগাজী গ্রামের মৃত রুহুল আমিনের ছেলে।
ভূমিহীনদের স্বস্তি, আনন্দ মিছিল: এদিকে নিজাম ডাকাতের মৃত্যুতে চরাঞ্চলে স্বস্তি নেমে এসেছে। স্থানীয় ভূমিহীনরা একত্রিত হয়ে নিজাম ডাকাতের দলের লোকজনকে ধাওয়া করে গণধোলাই দিচ্ছে। এ সময় ভূমিহীনরা চরের বিভিন্ন স্থানে আনন্দ মিছিল করেছে।
নিজাম ডাকাতের স্থলাভিষিক্ত বাহার কেরানী: অপরদিকে নিজাম ডাকাত নিহত হওয়ার পর তার স্থলাভিষিক্ত হিসেবে দলের সদস্যরা নিজাম ডাকাতের সেকেন্ড-ইন কমান্ড বাহার কেরানীকে নির্বাচিত করেছে। চরাঞ্চলের শীর্ষ জলদস্যু বাশার মাঝি নিহত হওয়ার পর তার স্থান দখল করে নেয় নাসির কেরানী। কিন্তু তার সঙ্গে হাতিয়ার স্থানীয় এক রাজনৈতিক নেতার চাঁদা নিয়ে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়। পরে ওই নেতার ছত্রচ্ছায়ায় নাসির কেরানীকে হটিয়ে সেই স্থান দখল করে নেয় নিজাম ডাকাত। পরবর্তীকালে নিজাম ডাকাতের রাজত্ব চলাকালে তার একান্ত কর্মকাণ্ডে বিশ্বস্ত হয়ে ওঠে বাহার কেরানী। নিজামের অনুপস্থিতিতে তার বাহিনীর সদস্যদের নিয়ন্ত্রণ করতো সে। চাঁদাবজি, অপহরণ, মুক্তিপণ, হত্যা, ধর্ষণসহ সকল কাজের নেতৃত্ব দিতো। নিজাম বাহিনী মেঘনা থেকে জেলেদের নৌকাসহ অপহরণ করে তার আস্তানায় নিয়ে গেলে সমঝোতার দায়িত্ব ছিল বাহার কেরানীর ওপর। এসব অপরাধে তার বিরুদ্ধে হাতিয়া, মনপুরা, সুবর্ণচরসহ কয়েকটি থানায় হত্যা, অপহরণ, ধর্ষণসহ ৬ ডজন মামলা হয়েছে।
কে এই বাহার কেরানী? হাতিয়া উপজেলার সোনাদিয়া ইউনিয়নের ৭নং পশ্চিম সোনাদিয়া গ্রামের মৃত পাটোয়ারী সরদারের ছেলে বাহার কেরানী। বর্তমানে ক্যারিংচরের বাথানখালী গ্রামে তার বাড়ি। সে কখনও লোকালয়ে আসে না। এমনকি নিজ বাড়ি হাতিয়াতেও প্রকাশ্যে তাকে দেখা যায়নি। বাহার কেরানী বাশার মাঝির হিসাব রক্ষকের (কেরানী) দায়িত্ব পালন করতো। একাধিক মামলার পলাতক এ আসামি পরবর্তীকালে চরাঞ্চলের নিজাম ডাকাতের সেকেন্ড ইন-কমান্ড হিসেবে কাজ করে। নিজাম ডাকাতের রেখে যাওয়া ভারি অস্ত্রও তার কাছে রয়েছে। এ ব্যাপারে হাতিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি অধ্যাপক মো. ওয়ালী উল্লাহ বলেন, নিজাম ডাকাত নিহত হয়েছে। এতে এমন কোন সুসংবাদের কিছুই নেই- যতক্ষণ পর্যন্ত না তার গড়ফাদারকে চিহ্নিত না করে বিচারের আওতায় আনা হবে। এটা না করতে পারলে আরেক নিজামের উত্থান ঘটবে। একই ধরনের কথা বললেন স্থানীয় সংসদ সদস্য প্রকৌশলী মোহাম্মদ ফজলুল আজিম। তিনি বলেন, নিজাম ডাকাত দেশের উপকূলের ত্রাস। বহুবার র্যাব-পুলিশ পাঠিয়েও তাকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। সে স্থানীয় এক নামধারী নেতার ছত্রচ্ছায়ায় থেকে এত দিন দ্বীপের মানুষের ওপর তাণ্ডব চালিয়ে আসছিল। ফজলুল আজিম আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, যদি নিজাম ডাকাতের গড়ফাদারকে গ্রেপ্তার করা না হয় তাহলে আরেক নিজামের সৃষ্টি হবে।
No comments:
Post a Comment