বিশ্বজিত্ হত্যা :আরো ৬ জন গ্রেফতার
এদের নিয়ন্ত্রণ করেন কিছু ছাত্রনেতা
১৮ দলীয় জোটের অবরোধ চলাকালে পুরনো ঢাকায় নিরীহ পথচারী বিশ্বজিত্ দাস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গতকাল বৃহস্পতিবার আরও ৬ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এর আগে এই হত্যাকাণ্ডের অন্যতম হোতা মাহফুজুর রহমান নাহিদকে গত মঙ্গলবার গভীর রাতে মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইর থেকে গ্রেফতার করা হয়। এ নিয়ে গতকাল পর্যন্ত এই হত্যাকাণ্ডে গ্রেফতারের সংখ্যা দাঁড়ালো ৭-এ ।
এদিকে বিশ্বজিত্ হত্যার ঘটনায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নাহিদসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে ঢাকার সিএমএম আদালতে মামলা করেছেন এক আইনজীবী। গতকাল বৃহস্পতিবার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট শাহরিয়ার মাহমুদ আদনান বাদির জবানবন্দি গ্রহণ করেন। তিনি সূত্রাপুর থানায় একই ঘটনায় দায়ের করা মামলার সাথে আইনজীবীর আর্জি যুক্ত করে তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন।
গতকাল ডিবি পুলিশ নাহিদ তাদের হেফাজতে রয়েছে বলে হাইকোর্টকে জানিয়েছে। এর আগে এই হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের গ্রেফতার করে ২৪ ঘন্টার মধ্যে হাইকোর্টকে জানানোর নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। এদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহীউদ্দিন খান আলমগীর গতকাল সচিবালয়ে সাংবাদিকদের জানান, এই হত্যাকাণ্ডে এ পর্যন্ত ১১ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তিনি বলেন, গ্রেফতারের বিষয় নিয়ে বিভ্রান্তির কোন অবকাশ নেই। প্রথমে বিভিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে ৮ জন এবং পরে আরও ৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
তবে গতকাল পর্যন্ত গ্রেফতারকৃত ৭ জন ব্যতীত অপর ৪ জনের পরিচয় নিশ্চিত করা যায়নি। প্রকৃতপক্ষে ৭ জনকেই গ্রেফতার হয়েছে বলে একটি সূত্র দাবি করেছে। মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ কর্মকর্তারা বলেন, গ্রেফতার ১১ জন হলেও অপর ৪ জনের ব্যাপারে যাচাই-বাচাই চলছে। আটক ৭ জনের মধ্যে এইচএম কিবরিয়া ও কাইয়ূম মিয়া টিপুকে গতকাল মগবাজার থেকে গ্রেফতার করা হয়। কিবরিয়ার বাড়ি বরিশাল আগৈঝাড়া উপজেলায়। সে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় মনোবিজ্ঞান বিভাগের অনার্স শেষ বর্ষের ছাত্র। টিপু একই বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র বলে পুলিশ জানায়। গ্রেফতারকৃত নাহিদ, কিবরিয়া ও টিপুকে আজ শুক্রবার সিএমএম আদালতে হাজির করা হবে জানিয়েছে ডিবি পুলিশ ।
ডিসি (ডিবি, দক্ষিণ) মনিরুল ইসলাম বলেন, গ্রেফতারকৃত ওই ৩ জনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডের আবেদন করা হবে। পলাতকদের গ্রেফতার করতে একাধিক ডিবির টিম মাঠে রয়েছে বলে তিনি জানান।
৪ জনকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে
এদিকে জেলহাজতে থাকা ৪ জনকে বিশ্বজিত্ হত্যা মামলায় গ্রেফতার দেখানোর আবেদন গতকাল সিএমএম আদালত মঞ্জুর করেছে। সূত্রাপুর থানা ওই আবেদন করে। এরা হলেন- মামুনুর রশীদ, ফারুক হোসেন, নাহিদুজ্জামান তুহিন ও মোসলেহ উদ্দিন। তারা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র বলে পুলিশ জানায়। এর মধ্যে মামুনের বাসা রাজধানীর দক্ষিণখানের ২৯ মধুবাগে, তার পিতার নাম হারুন অর রশিদ। ফারুকের বাসা দক্ষিণখানের পূর্বপাড়ার ২ এয়ারপোর্ট লেনে, তার পিতার নাম ওয়াকিল উদ্দিন। তুহিনের বাসা ডেমরার সারুলিয়ায়, তার পিতার নাম শামসুজ্জামান এবং মোসলেমের বাসা মধ্য বাড্ডায়, তার পিতার নাম মজিবুল হক।
বিভিন্ন তথ্য-প্রমাণে এরা বিশ্বজিত্ হত্যাকাণ্ডে জড়িত বলে পুলিশ প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয়েছে। গ্রেফতারকৃতরা সকলেই 'ছাত্রলীগের ক্যাডার' বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। তাদের বিরুদ্ধে ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও মাদক ব্যবসাসহ নানা অভিযোগ রয়েছে। এরা পুরনো ঢাকায় চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে বলে জানান কয়েকজন ব্যবসায়ী। তবে তারা বলেন, এরা রাজনীতি নয়, নানা অপকর্মের সঙ্গে জড়িত। যে সরকার ক্ষমতায় আসে সেই সরকারের দলীয় ছত্রচ্ছায়ায় এরা অপরাধ করে বেড়ায়। ছাত্রলীগের এক শ্রেণীর সাবেক নেতা এদের নিয়ন্ত্রণ করে। প্রতিমাসে ওই নেতারা লাখ লাখ টাকার চাঁদার ভাগ পান বলে জানান বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টরা।
হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয় আরো কয়েকজন !
গ্রেফতারকৃত মাহফুজুর রহমান নাহিদ এবং পলাতক রফিকুল ইসলাম শাকিল, ইমদাদুল হক, মীর নূরে আলম লিমন ও ওবাইদুল কাদের তাওসীন সরাসরি বিশ্বজিত্ হত্যাকাণ্ডে অংশ নেন। এরমধ্যে শাকিল চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে ক্ষত-বিক্ষত করে বিশ্বজিতের মৃত্যু নিশ্চিত করেন। এছাড়া ছাত্রলীগের 'ক্যাডার গ্রুপে'র সক্রিয় সদস্য জুনায়েদ, ইউনুস, মেহেদী (কালোগেঞ্জি), রাজন ও আল আমিনও বিশ্বজিত্ হত্যাকাণ্ডে অংশ নেন বলে জানা গেছে। তবে এরা তাদের কমিটির কোন সদস্য নয় বলে দাবি করেছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি শরীফুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম। এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য কোতোয়ালী ও সুত্রাপুর থানায় এক মাস আগে একটি তালিকা দেয়া হয়েছে বলে ওই দুই নেতা জানান।
যে ১০ জনের নামে মামলা
কোর্ট রিপোর্টার জানান, এই হত্যার ঘটনায় সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভোকেট মাহাবুবুল আলম দুলাল যে ১০ জনের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেছেন তারা হলেন: মাহফুজুর রহমান নাহিদ, রফিকুল ইসলাম শাকিল, মো. এমদাদুল হক, ওবায়দুল কাদের, মীর মোহাম্মদ নুরে আলম লিমন, ইউনুছ, তাহসিন, জনি, শিপলু ও কিবরিয়া। আসামিরা সবাই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এবং কবি নজরুল ইসলাম কলেজের ছাত্র। এছাড়া মামলায় ওই ১০ জন ছাড়াও অজ্ঞাতনামা প্রায় শতাধিক ব্যক্তিকে আসামি করা হযেছে।
গত রবিবার অবরোধ চলাকালে রাজধানীর পুরান ঢাকার ভিক্টোরিয়া পার্কের সামনে 'ছাত্রলীগ ক্যাডারদের হাতে নির্মমভাবে খুন হন টেইলারিং ব্যবসায়ী বিশ্বজিত্ দাস। তার গ্রামের বাড়ি শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার ভোজেশ্বর মশুরা গ্রামে। রাতে অজ্ঞাতনামা ২৫ জনের বিরুদ্ধে সুত্রাপুর থানায় মামলা করেন সংশ্লিষ্ট থানার উপ-পরিদর্শক জালাল আহমেদ। একই থানার উপ-পরিদর্শক মাহবুবুল আলমকে মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।
No comments:
Post a Comment