Pages

Wednesday, December 19, 2012

কী আছে পদ্মা সেতুর ভাগ্যে

কী আছে পদ্মা সেতুর ভাগ্যে


পদ্মা সেতুর ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ প্যানেলের ওপর। তারা এখন দুদকের মামলার নথি পর্যালোচনা করবে। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধান স্বচ্ছ ও পরিপূর্ণ হয়েছে_ এ মর্মে বিশেষজ্ঞ পর্যবেক্ষক দলের ইতিবাচক প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই পদ্মা সেতু প্রকল্পে অর্থায়নের পথে অগ্রসর হবে বিশ্বব্যাংক। পদ্মা সেতুর দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগে দুদকের মামলা করার পর গতকাল এক প্রতিক্রিয়ায় এ কথা জানিয়েছেন বিশ্বব্যাংকের ঢাকাস্থ কান্ট্রি ডিরেক্টর অ্যালেন গোল্ডস্টেইন। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত গতকাল রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা করেই পদ্মা সেতুর দুর্নীতির মামলা করেছে দুদক। এ সরকারের আমলে সেতুর কাজ শুরু হবে বলে আশাবাদী তিনি। অন্যদিকে পদ্মা সেতুর ভাগ্য নিয়ে অনেকেই উৎকণ্ঠা প্রকাশ করে বলেছেন, পদ্মা সেতুর ভাগ্যে কী আছে, তা বিধাতাই জানেন।
জানা গেছে, পদ্মা সেতুর সর্বশেষ অবস্থান নিয়ে আলোচনার জন্য বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর অ্যালেন গোল্ডস্টেইন অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য সময় চেয়েছেন। আজকালের মধ্যেই এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।
পদ্মা সেতুর দুর্নীতি মামলার একদিন পর দুদক চেয়ারম্যান গোলাম রহমান সাংবাদিকদের বলেন, অনুসন্ধান স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ হয়েছে, কারও চাপে এ মামলা করা হয়নি। অন্যদিকে সাবেক যোগাযোগমন্ত্রীকে দুর্নীতির মামলা থেকে বাদ দেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করেন দুদক সচিব ফয়জুর রহমান। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি দাবি করেন, পদ্মা সেতুর দুর্নীতির ঘটনায় আবুল হোসেনের ভূমিকা 'ইররিগুলার হলেও ইলিগ্যাল নয়'। গতকাল পদ্মা সেতুর দুর্নীতির মামলার প্রধান আসামি সেতু বিভাগের সাবেক সচিব মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়াকে ওএসডি করেছে সরকার। এ ছাড়া পদ্মা সেতুর দুর্নীতির গভীরতা অনুসন্ধানের জন্য চার সদস্যের কমিটি গঠন করেছে দুদক।
এদিকে, দুদকের মামলার পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর অ্যালেন গোল্ডস্টেইন এক লিখিত প্রতিক্রিয়ায় বলেন, 'আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত বিশ্বব্যাংকের পর্যবেক্ষক প্যানেল দুর্নীতি দমন কমিশনের করা মামলার এজাহার পর্যালোচনার পর একটি প্রতিবেদন দেবে। পদ্মা সেতুতে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নের বিষয়টি প্যানেলের ওই প্রতিবেদনের ওপরই নির্ভর করবে।' সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দুর্নীতির
মামলা বিষয়ে প্যানেল দলের পর্যালোচনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, তাদের মূল্যায়নের ওপরই নির্ভর করছে পদ্মা সেতু প্রকল্পে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন এবং বাস্তবায়ন।
অর্থনীতিবিদ ও সুশীল সমাজ সমকালের কাছে প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, তদন্ত ও মামলা নিয়ে বিশ্বব্যাংক সন্তুষ্ট না হলে আবারও জটিলতায় পড়তে পারে পদ্মা সেতু প্রকল্প।
জানা গেছে, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক প্যানেল পদ্মা সেতুর দুর্নীতির বিষয়ে তাদের প্রতিবেদন খুব শিগগির বিশ্বব্যাংকের কাছে জমা দেবে। তার সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে পৃথক একটি বিবৃতিও দেবে প্যানেল দল। দুদক সূত্রে জানা গেছে, গতকাল পদ্মা সেতুর দুর্নীতির এজাহার কপি বিশ্বব্যাংক প্যানেলের কাছে পাঠানো হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের নিযুক্ত আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের সাবেক প্রসিকিউটর লুই গাব্রিয়েল মোরেনো ওকাম্পোর নেতৃত্বে তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক প্যানেল দুদকের তদন্ত পর্যবেক্ষণে দুই দফা ঢাকা সফর করে। সর্বশেষ গত ১ ডিসেম্বর প্যানেল দল ঢাকায় আসে। দুদকের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠকের পর আলোচনা এক পর্যায়ে ভেঙে যায়। মূলত সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী আবুল হোসেনকে দুর্নীতির মামলায় আসামি করা হবে, কি হবে না_ এ নিয়ে দুদকের সঙ্গে মতভেদের কারণে আলোচনা সফল হয়নি।
গত ৫ ডিসেম্বর ঢাকা ছাড়ে প্যানেল দল। এর পরপরই বিশ্বব্যাংক কড়া ভাষায় একটি বিবৃতি দেয়। ওই বিবৃতিতে সংস্থাটি সরকারকে সাফ জানিয়ে দিয়েছে, 'কেবল পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ তদন্ত করলেই বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতু প্রকল্পের অর্থায়নে অগ্রসর হবে।' বিশ্বব্যাংক আরও মনে করিয়ে দেয়, তারা দুর্নীতির বিষয়ে যথেষ্ট পরিমাণে সাক্ষ্য-প্রমাণও দিয়েছে সরকারকে। এরপরই দুদকের পক্ষ থেকে বলা হয়, অনুসন্ধানী প্রতিবেদন চূড়ান্ত করে তারা মামলা করে বিশ্বব্যাংকের কাছে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন পাঠাবে। সে অনুযায়ী, সোমবার মামলা করল দুদক। তবে সাবেক যোগাযোগমন্ত্রীকে বাদ দিয়ে মামলা করায় বিষয়টি বিশ্বব্যাংক ভালোভাবে দেখেনি বলে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিস সূত্রে জানা গেছে। বিশ্বব্যাংক বলেছে, পদ্মা সেতুর দুর্নীতির বিষয়ে তারা কোনো আপস করবে না। কারণ, একটি দুর্নীতিমুক্ত সেতুর বিষয়ে আগে থেকেই সরকারকে সতর্ক করে দিয়ে আসছে তারা। কাজেই ভবিষ্যতে এ ইস্যুতে বিশ্বব্যাংকের অবস্থান একই থাকবে বলে ওই সূত্র জানায়।
কানাডীয় কোম্পানি এসএনসি-লাভালিনের দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ ওঠার পর গত বছরের সেপ্টেম্বরে ২৯১ কোটি ডলারের পদ্মা সেতু প্রকল্পে ১২০ কোটি ডলারের ঋণচুক্তি স্থগিত করে বিশ্বব্যাংক। দুদক এরপর তদন্ত শুরু করলেও সরকার এবং তৎকালীন যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন দুর্নীতির অভিযোগ নাকচ করে অনড় থাকেন। এই প্রেক্ষাপটে গত জুন মাসে ঋণচুক্তি বাতিল করে বিশ্বব্যাংক। এরপর আবুল হোসেনের পদত্যাগ, প্রকল্পের ইন্টেগ্রিটি অ্যাডভাইজর ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মসিউর রহমান এবং সেতু বিভাগের তৎকালীন সচিব মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়াকে ছুটিতে পাঠানোসহ সরকারের নানামুখী তৎপরতায় বিশ্বব্যাংক প্রকল্পে ফেরার ঘোষণা দেয়। তাদের দেওয়া শর্ত অনুযায়ী, ওকাম্পোর নেতৃত্বে তিন সদস্যের পর্যবেক্ষক প্যানেল দুদকের তদন্ত পর্যবেক্ষণে ঢাকায় আসে। তারা চলে যাওয়ার ১২ দিনের মাথায় সোমবার দুদক যে মামলা করেছে তাতে প্রধান আসামি করা হয়েছে সেতু বিভাগের সাবেক সচিব মো. মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়াকে। তবে আলোচনায় থাকা সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন ও সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরীকে এ মামলায় আসামি করা হয়নি। তবে সন্দেহভাজনের তালিকায় রয়েছে। এখন সব কিছু নির্ভর করছে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ প্যানেলের ওপর।

No comments:

Post a Comment