বাইরে স্বাস্থ্য কেন্দ্র ভেতরে শূন্য
অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা, দুর্নীতি ও ডাক্তার-কর্মচারীদের অবহেলা, নানা
অব্যবস্থাপনা এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের মধ্যে চলছে বন্দর উপজেলা স্বাস্থ্য
কমপ্লেক্স। চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন চিকিৎসা সেবা নিতে আসা রোগীরা।
জেলা সিভিল সার্জন দুলাল দত্ত সততা স্বীকার করে বলেন, ইতিপূর্বে বন্দর
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পরিদর্শক করতে গিয়ে অব্যবস্থাপনা প্রমাণিত হয়ায় ৭
জনকে শোকজ এবং ৪ জনের বেতন বন্ধ করা হয়েছে। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সরকারি
হাসপাতালের নানা অব্যবস্থাপনার করুণ চিত্র। গত শনিবার স্বাস্থ্য কেন্দ্রে
গিয়ে দেখা যায়, জরুরি বিভাগের কেউ নেই। সেবার জন্য অপেক্ষায় বসে রয়েছেন
কয়েক একজন রোগী। আউটডোরে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছেন অসংখ্য শিশুসহ
নারী-পুরুষ। টিকিট কাউন্টারের চেয়ারশূন্য অবস্থায় পড়ে আছে। রোগীরা টিকিট
নেয়ার মতো কাউকে খুঁজে পাচ্ছেন না। এরই মধ্যে গিয়াস উদ্দিন নামের এক
কর্মচারীকে দেখা যায়, গেটের বাইরে এক মহিলার সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছে। প্যাথলজি ও
এক্সরে বিভাগ ছিল তালা বন্ধ। এক্সরে বিভাগের মেডিকেল টেকনোলজিস্ট
মহিউদ্দিনের সঙ্গে করে নিয়ে এক্সরে বিভাগের ভেতরে ঢুকলে সেখান থেকে বের
হচ্ছে দুর্গন্ধ। এতে বোঝা যাচ্ছিল কক্ষটি বেশ ক’দিন বন্ধ রাখা হয়েছে। এ
ব্যাপারে মহিউদ্দিনকে প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান, ওখানে নিয়মিত এক্সেরে করা
হয়। তবে এক্সরে রেজিস্টার দেখতে চাইলে তিনি তা দেখাতে ব্যর্থ হন।
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এক কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,
মহিউদ্দিন হাসপাতাল শুরু থেকেই এক্সরে বিভাগে কর্মরত। তিনি হাসপাতালে
এক্সরে ফ্লিম নেই বলে রোগীদের পাঠিয়ে দেন তার নিজস্ব প্রতিষ্ঠান বন্দর
বাজারস্থ আল রাজি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে। দন্ত বিভাগের ডা. সাহারা আক্তার
সপ্তাহে একদিন রোগী দেখেন। সার্জারি কনসালটেন্ট ডা. আবুল হাসনাত অবসর সময়
কাটাচ্ছেন। কারণ, এ হাসপাতালে সার্জারি বিভাগ এখনও চালু করা হয়নি। দেখা
যায়, একটি পরিত্যক্ত কক্ষে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে রান্না করা হয় রোগীদের
খাবার। ওদের নেই নিজস্ব বাবুর্চি। রান্না করা হচ্ছে বহিরাগত এক মহিলাকে
দিয়ে। রোগী থাকার দুটি ওয়ার্ডে পুরুষ ৫-৬ জন এবং মহিলা ও শিশু ওয়ার্ডে ৪ জন
রোগী রয়েছে। বাকি শয্যাগুলো নোংরা অবস্থায় পড়ে আছে। দুজন নার্স বসে তাদের
কক্ষে আড্ডা দিচ্ছেন। হাসপাতালে ভর্তি থাকা রোগীদের সঙ্গে আলাপ করলে তারা
জানান, ভর্তি হওয়ার পর, থেকে ডাক্তাররা কোনই খোঁজখবর নিচ্ছেন না। তাই বাধ্য
হয়ে রোগীরা ২-৩ দিন পরই স্বেচ্ছায় চলে যায়। আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা.
ফরিদুল হাসান কমপ্লেক্সের কোয়ার্টারে না থেকে তিনি ঢাকায় থাকেন। উপজেলা
স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. রমেশ চন্দ্র সাহা তিনিও সপ্তাহে এক-দু দিন
হাসপাতালে থাকলে বাকি সময় বাইরেই থাকেন। এ সময় ডা. আসাদুজ্জামানের সঙ্গে
দেখা হয়। তবে তিনি কোন কথা বলতে রাজি হননি। উল্টো সাংবাদিকদের হাসপাতালে
প্রবেশের অনুমতি নিয়েছে কিনা তা তিনি জানতে চান। ডায়রিয়া রোগী বিজয়ের মা
রুমি আক্তার জানান, হাসপাতালের পরিবেশ নোংরা, বেড কভার নোংরা, টয়লেটে সব
সময় ময়লা-আর্বজনা জমে থাকে বলেই ওয়ার্ডে সর্বক্ষণ দুর্গন্ধ লেগেই থাকে।
রোগী আছিয়া জানান, প্রতিদিন দুপুরে পাঙ্গাশ মাছ ছাড়া আর কোন মাছ দেয়া হয়
না। নার্স আসমা জানান, ৩১ শয্যা বিশিষ্ট কমপ্লেক্সে অতিরিক্ত ৮টিসহ সর্ব
মোট ৩৯টি বেড রয়েছে। এর মধ্যে ১৩টি বেডই অকেজো। ৫টি মেরামত করলে ব্যবহার
করা যাবে। উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. রমেশ চন্দ্র সাহাকে সঙ্গে
যোগাযোগ করার চেষ্টা করলে তিনি তার অফিস পাওয়া না গেলেও তিনি ট্রেনিংয়ে
আছেন বলে জানা গেছে। তার পরিবর্তে ভারপ্রাপ্ত মেডিকেল অফিসার ডা. আ.
কাদেরকেও খুঁজে পাওয়া যায়নি। পরে অফিস প্রধান আবুল হাশেমের সঙ্গে যোগাযোগ
করা হলে তিনি বলেন, টিএসআই স্যার ফিল্ডে আছেন। ওই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১১
জন নার্স ও ১০ ডাক্তার কর্মরত থাকলেও তারা নিয়মিত আসেন না বলে এমন অভিযোগও
করেন রোগী ও এলাকাবাসীর। এ ব্যাপারে জেলা সিভিল সার্জন দুলাল দত্তের
মোবাইলে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, ইতিপূর্বে বন্দর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে
পরিদর্শনের গিয়ে অব্যবস্থাপনা ও নানা সমস্যা অবহেলা দেখে ৭ জনকে শোকজ করেছি
এবং ৪ জনের বেতন বন্ধ রাখা হয়েছে।
No comments:
Post a Comment