নাখোশ বিশ্বব্যাংক, মামলা না হলে গুডবাই
নাখোশ বিশ্বব্যাংক। দুর্নীতিতে জড়িতদের বিরুদ্ধে মামলা না হলে গুডবাই জানাবেন তারা। অবশ্য আজ পদ্মা সেতুর ভাগ্যনির্ধারণী বৈঠক বসছে দুদকে। এটাই হতে পারে শেষ বৈঠক। রোববার দুদক কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে এমন কঠোর মনোভাবই ব্যক্ত করেছে বিশ্বব্যাংক বিশেষজ্ঞ প্যানেল। বৈঠকে বারবার তারা দুদকের দুর্নীতি অনুসন্ধানে দৃশ্যমান অগ্রগতির দিকগুলো জানতে চেয়েছেন। সেগুলো না দেখে হতাশ ও নাখোশ হয়েছেন। বিশ্বব্যাংক প্যানেলের কাছে দৃশ্যমান অগ্রগতি মানে জড়িতদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের। দুদক সূত্র বলছে, তাদের দীর্ঘ অনুসন্ধানে এখনও তারা মামলা করার মতো অবস্থানে যেতে পারেননি, তেমন কোন দালিলিক প্রমাণ পাননি। দুদকের আইন উপদেষ্টা এডভোকেট আনিসুল হকও বলেছেন, মামলা করার মতো প্রমাণাদি তাদের হাতে নেই। গত ২রা ডিসেম্বর দুদক কর্মকর্তাদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সন্তোষ প্রকাশ করেননি বিশ্বব্যাংক প্রতিনিধি দল। ওই বৈঠক সম্পর্কে দুদক চেয়ারম্যান গোলাম রহমান বলেছেন, বিশ্বব্যাংক প্রতিনিধিরা মোটামুটি সন্তুষ্ট। তিনিও পুরো সন্তোষের কথা বলতে পারেননি। তবে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছেন, তদন্ত ও পদ্মা সেতুর কাজ এক সঙ্গে চলবে। দুদকের মামলার দু’টি স্তর। একটি অনুসন্ধান, অন্যটি তদন্ত। এখানে অনুসন্ধান হয় মামলা দায়ের করার আগে। তদন্ত হয় মামলা করার পরে। অর্থমন্ত্রীর কথা সঠিক হলে মামলা হচ্ছে দুর্নীতিতে জড়িতদের বিরুদ্ধে। গতকাল সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন ও সাবেক পররাষ্ট্রপ্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরীকে দ্বিতীয়বার জিজ্ঞাসাবাদের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে পদ্মা সেতুর দুর্নীতিতে দুদকের অনুসন্ধান। দুদক সূত্রে জানা গেছে, আজ জমা হতে পারে অনুসন্ধানের প্রতিবেদন। প্রতিবেদন জমা দেয়ার পর মামলা করার সিদ্ধান্ত হলে বা মামলা করার গ্রিন সিগন্যাল পাওয়া গেলে মামলা দায়েরের অনুমতি দেবে দুদক। মামলার অনুমোদন হলে আগামী ৫ই বা ৬ই ডিসেম্বর মামলা দায়ের হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে দুদক সূত্রে জানা গেছে। সূত্রমতে, মামলা হতে পারে ৫ জনের বিরুদ্ধে। ওই ৫ জন হচ্ছেন সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন, সেতু বিভাগের সাবেক সচিব মোশররাফ হোসেন ভূঁইয়া, পদ্মা সেতু প্রকল্পের পরিচালক রফিকুল ইসলাম, জাতীয় সংসদের হুইপ লিটন চৌধুরীর ভাই নিক্সন চৌধুরী ও সাবেক পররাষ্ট্রপ্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী। অন্য একটি সূত্র বলছে, মামলায় অভিযুক্তর সংখ্যা আরও দু’জন বাড়তে পারে। তাদের একজন এসএনসি লাভালিনের স্থানীয় প্রতিনিধি, তার মাধ্যমে ঘুষ লেনদেনের দরবার হয়েছিল। অন্যজন মূল্যায়ন কমিটির, এসএনসি লাভালিনকে কাজ দেয়ার পেপারে তিনি স্বাক্ষর করেছিলেন।
একটি সূত্র জানিয়েছে, মামলা দায়ের হলেই পদ্মা সেতুতে বিশ্ব্যাংক অর্থায়ন শুরু করবে- এমন কোন নিশ্চয়তা এখনও পাওয়া যায়নি। নাকি মামলা দায়ের করার পর আবার নতুন কোন শর্ত দেবে বিশ্বব্যাংক সেটাও নিশ্চিত বলতে পারছেন না কেউ। সে কারণে একটি মহল চিন্তা করছে- মামলাও হলো, আবার সরকারের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন হলো- কিন্তু পদ্মা সেতুর অর্থ পাওয়া গেল না- এমনটা হলে সরকারের ক্ষতি দু’দিকে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, তাহলে মামলা করে কি লাভ? মামলা দায়ের হলে অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারের বিষয়টি সামনে চলে আসবে। গ্রেপ্তার না হলে সরকারের সামনে আরেক বিপদ এসে দাঁড়াবে। ওইসব বিষয় চিন্তা করে দ্বিধা আছে মামলা দায়ের নিয়ে। সূত্রমতে, সরকারেরই একটি মহল মামলা দায়েরে অতি আগ্রহী- অন্যরা ততটা নয়। সূত্র জানায়, মামলা দায়ের করার আগে পদ্মা সেতুতে অর্থায়নের বিষয়টি নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে। কিন্তু এখনও সেটা পরিষ্কার হয়নি। কিন্তু বিশ্বব্যাংক পরামর্শক নিয়োগে দুর্নীতির বিষয়ে মামলাসহ কার্যকর ব্যাবস্থা গ্রহণে দুদককে অব্যাহতভাবে চাপ দিলেও এখন পর্যন্ত বিশ্বব্যাংক দুর্নীতির বিষয়ে কোন ডকুমেন্ট সরবরাহ করেনি। কানাডিয়ান রয়েল পুলিশের উদ্ধার করা ডায়েরির মালিক রমেশ সাহার সঙ্গেও এখনও কথা বলতে পারেনি দুদক। পদ্মা সেতুতে দুর্নীতির বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের কাছে নালিশ গিয়েছিল বাংলাদেশ থেকে। বাংলাদেশে ব্যবহৃত একটি মেইল থেকে দুর্নীতির কাহিনী পাঠানো হয়েছিল বিশ্বব্যাংকে। এখনও দুদককে ওই ই-মেইল পাঠিয়েছিল তার সন্ধান করতে পারেনি। দ্বিতীয়বারের মতো বাংলাদেশে আসা বিশ্বব্যাংক গঠিত বিশেষজ্ঞ প্যানেলের তিন সদস্য তাদের প্রধান
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি)-এর সাবেক প্রধান প্রসিকিউটর লুই গাব্রিয়েল ওকাম্পো ও হংকং-এর দুর্নীতিবিরোধী স্বাধীন কমিশনের সাবেক কমিশনার টিমোথি টং এবং যুক্তরাজ্যের দুর্নীতি দমন কার্যালয়ের সাবেক পরিচালক রিচার্ড অল্ডারম্যান আজ তৃতীয়বারের মতো বৈঠকে বসবেন দুদক কর্মকর্তাদের সঙ্গে। ওই তিন জনের সঙ্গে থাকবেন বিশ্বব্যাংকের আবাসিক প্রতিনিধি এ্যালেন গোল্ডস্টেইন। সূত্রমতে, আজকের বৈঠকেই চূড়ান্ত হয়ে যেতে পারে পদ্মা সেতুর ভাগ্য। হয়তো মামলা না হলে গুডবাই জানাবে বিশ্বব্যাংক- এমনটিই বলছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
No comments:
Post a Comment