একের পর এক বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে মন্ত্রী-এমপিরা
মহাজোট সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই একের পর এক বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছেন এমপি-মন্ত্রীরা।শুধু প্রতিপক্ষ নয়, নিজ দলের মন্ত্রী-এমপিদের এ ধরনের অঘটন সরকারকে চরমভাবে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলছে। মহাজোট সরকারের মেয়াদকালেই অন্তত অর্ধডজন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী নানাভাবে বির্তকিত কর্মকাণ্ডে জড়িয়েছেন।এছাড়াও বহু সংসদ সদস্য লাঞ্ছিত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
বিশিষ্টজনেরা মনে করছেন, তাদের এ বির্তকিত কর্মকাণ্ডের জন্য মহাজোট তথা আওয়ামী লীগকে আগামী জাতীয় নির্বাচনে মাশুল দিতে হবে।
এ প্রসঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. আকবর আলী খান নতুন বার্তা ডটকমকে বলেন, “সরকারের মন্ত্রী-এমপিরা এ ধরনের যে সব কাজ করছেন তা বেআইনি। এজন্য সরকারি দলকে অবশ্যই আগামী নির্বাচনে মাশুল দিতে হবে। কারণ এ সকল কর্মকাণ্ড জনগণ ভালো ভাবে নেয় না, কখনো নেবেও না।”
২০০৯ সালের ৬ ডিসেম্বর মহাজোট সরকার শপথ নেয়ার পর থেকেই এমপি-মন্ত্রীরা নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন। তারমধ্য অর্থ কেলেঙ্কারি, ধর্ম নিয়ে কটাক্ষ, অস্ত্র উঁচিয়ে জনতার ওপর গুলি, এবং নিজস্ব সন্ত্রাসী বাহিনী দ্বারা নিজ এলাকায় নিয়ন্ত্রণ, টেন্ডার পাইয়ে দেয়াসহ নানা অভিযোগ।
সর্বশেষ গত বৃহ্পতিবার ময়মনসিংহ-১০ আসনের এমপি গিয়াস উদ্দিন আহমেদ প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের গুলি করে হত্যার হুমকি দিয়েছেন এবং তাদের গালিগালাজ করেছেন।পরে তিনি কর্মকতাদের বিরুদ্ধে মন্ত্রীর কাছে নালিশ করেন। এক পর্যায়ে এমপি গিয়াস মন্ত্রীকে বলেন, “আপনি জানেন আমি মেজর জিয়াকে হত্যা করেছি, আমি ফাঁসির আসামি, কাউকে ভয় পাই না। আমি আসার সঙ্গে সঙ্গে আমার কাজ করে দিতে হবে।”
এমপি গিয়াস উদ্দিনের ক্ষেত্রে এটাই প্রথম ঘটনা নয়, এর আগেও তিনি তার নিজ এলাকায় লাইসেন্স করা পিস্তল উঁচিয়ে জনগণের ওপর গুলিও করেন।
বায়তুল মোকাররম মসজিদ এলাকায় নৌপরিবহণমন্ত্রী শাজাহান খান ইসলামী রাজনীতি নিয়ে আপত্তিকর বক্তব্য দেয়ায় মুসল্লিরা মন্ত্রীকে লক্ষ্য করে জুতা নিক্ষেপ করেন।
‘ইসলামে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির কোনো স্থান নেই, কোরআনে এ সম্পর্কে কোনো আয়াত নেই, রাসূল (সা.) ধর্মভিত্তিক রাজনীতি পছন্দ করতেন না, তিনি এ কাজ কখনো করেননি’- মন্ত্রীর এমন বক্তব্যের পর মঞ্চের সামনে বসা মুসল্লিদের মধ্য থেকে একজন হঠাৎ দাঁড়িয়ে চিৎকার করে জানতে চান, মুসলমান হিসেবে মন্ত্রী কেন তাহলে রাজনীতি করছেন? এক পর্যায়ে কয়েকজন মুসল্লি দাঁড়িয়ে যান এবং মন্ত্রীকে লক্ষ্য করে জুতা নিক্ষেপ করতে থাকেন। পরে নিরাপত্তা কর্মীরা মন্ত্রীকে মঞ্চ থেকে নামিয়ে গাড়িতে উঠিয়ে নিয়ে যান।
এর আগেও একটি বেসরকারি টিভি চ্যালেনের টকশোতে আওয়ামী লীগের ওই মন্ত্রী বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়াকে চোখ তুলে নেয়ার হুমকি দেন।
এছাড়া সাবেক যোগাযোগ মন্ত্রী আবুল হোসেনের বিরুদ্ধে পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ এবং রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেন গুপ্তের বিরুদ্ধে রেলে নিয়োগের নামে অবৈধ অর্থ কেলেঙ্কারির ঘটনা চরম বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে সরকারকে।
অন্যদিকে, মহাজোট সরকারের চার বছরে নির্বাচিত এলাকাতেই অবাঞ্ছিত হয়েছেন বেশ কয়েকজন মন্ত্রী-এমপি। বেশ কয়েকজন মন্ত্রীর বাসা-বাড়িতেও হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর ও অগি্নসংযোগ করা হয়েছে। অবাঞ্ছিত হয়ে কোনো কোনো মন্ত্রী আবার নিজ এলাকায় দীর্ঘদিন ঢুকতেও পারেননি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ক্ষমতায় থাকাকালে দলের অনেক মন্ত্রীই নির্বাচনী এলাকার সঙ্গে সম্পর্ক রাখছেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। নিজ দলীয় নেতাকর্মীরাও তাদের সাক্ষাৎ পান না। ফলে অনেকেই নিজেদের স্থানীয় নেতা-কর্মীদের বিচ্ছিন্ন হামলার শিকার হচ্ছেন।
ঠাকুরগাঁওয়ে পানি সম্পদ মন্ত্রী রমেশ চন্দ্র সেনের বাড়িতে জনতা হামলা চালায়। গত ১৫ অক্টোবর ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার রুহিয়া ইউনিয়নকে বিভক্ত করে নতুন করে গেজেট সংশোধন করার প্রতিবাদে এ হামলা ও ভাঙচুর চালায় বিক্ষুব্ধ জনতা। তারা রাস্তায় কাঠ ও টায়ার জ্বালিয়ে দুই ঘণ্টা বিক্ষোভও করে।
নিজ এলাকা নরসিংদীতে অবাঞ্ছিত হন শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী রাজিউদ্দিন আহমেদ রাজু। দলীয় লোকেরাই মন্ত্রীকে নিজ এলাকায় প্রবেশে বাধা দেয়। দীর্ঘ ১১ মাস এলাকা ছাড়া থাকার পর গত ১৫ সেপ্টেম্বর নিজ এলাকায় কড়া নিরাপত্তায় প্রবেশ করেন তিনি। আওয়ামী লীগ নেতা ও পৌর মেয়র লোকমান হত্যার ঘটনাকে ঘিরে এমন বিব্রতকর পরিস্থিতির শিকার হন রাজিউদ্দিন আহম্মেদ রাজু। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী মোতাহার হোসেন নিজ এলাকায় লাঞ্ছিত হন দলীয় লোকজনের হাতে।
টিআর, কাবিখাসহ বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রম ও নিয়োগের ক্ষেত্রে অনিয়মের কারণে নির্বাচিত এলাকার বহু এমপি হামলার শিকার হয়েছেন।বর্তমান সরকারের মেয়াদে সরকারদলীয় সংসদ সদস্যদের মধ্যে প্রথম ২০১০ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর আক্রমণের শিকার হন বরিশাল-২ (উজিরপুর-বানারীপাড়া) আসনের এমপি মনিরুল ইসলাম মনি। একই বছরের ১৪ নভেম্বর নিজ বাড়িতে হামলার শিকার হন কুষ্টিয়া-১ (দৌলতপুর) আসনের এমপি আফাজউদ্দিন আহম্মেদ। এছাড়া লাঞ্ছিত হন সরকারের শরিক জাতীয় পার্টির রংপুরের গঙ্গাচরার এমপি, এরশাদের ভাতিজা হোসেন মকবুল শাহরিয়ার আসিফ। খুলনা-১ আসনের সংসদ সদস্য ননী গোপাল মণ্ডলকে অতিথি না করায় তার হাতে দাকোপ উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান জয়ন্তী রানী সরদার লাঞ্ছিত হন। এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী ও এলাকাবাসী সংসদ সদস্যকে লাঞ্ছিত করেন।

