অসাধারণ কিছু শিশু-কিশোর চলচ্চিত্রের কথা
বাংলাদেশে প্রতি বছর অসংখ্য চলচ্চিত্র নির্মিত হয় এবং মুক্তিও পায়।
কতগুলো দর্শকপ্রিয়তা পায় সেটা আলোচনার বিষয়। আমাদের দেশে শিশু-কিশোরদের
নিয়ে কিংবা তাদের লক্ষ্য করে তেমন কোনো ছবি নির্মিত হয় না। পরিচালকদের
প্রবল অনীহা এই বিভাগ নিয়ে কাজ করতে। তবে একেবারেই যে নির্মিত হয়নি তাও
কিন্তু নয়। না না করতে করতেই অনেকগুলো উল্লেখযোগ্য ছবি নির্মিত হয়েছে।
শিশু-কিশোরদের জন্যে নির্মিত অসাধারণ কিছু চলচ্চিত্রের কথা এখানে তুলে ধরা
হলো।
ছুটির ঘণ্টা
আজিজুর রহমান পরিচালিত ও সত্য সাহার সঙ্গীত পরিচালনায় ‘ছুটির ঘণ্টা’ ছবি
১৯৮০ সালে মুক্তি পায়। অভিনয় করেছেন রাজ্জাক, শাবানা, খান আতাউর রহমান,
সুজাতা ও মাস্টার সুমন। স্কুল ঈদের ছুটি হবে। খোকন ঈদের ছুটিতে এবার নানা
বাড়িতে বেড়াতে যাবে। যথাসময়ে স্কুল ছুটি হলো। খোকনের গাড়ি আসতে আজ দেরি
হচ্ছে। প্রকৃতির ডাকে খোকন বাথরুমে যায়। ছাত্ররা সবাই বাড়ি চলে গেছে এই
ভেবে স্কুলের দফতরি বাথরুমের দরজায় তালা লাগিয়ে দেয়। অনেক চিৎকার করেও খোকন
কাউকে পায় না তাকে সাহায্য করবার মতো। এরপর চোখে পানি চলে আসার মতো নানা
অমানবিক ঘটনা ঘটতে থাকে। দীর্ঘ ১০ দিন পর অনাহারে কষ্ট সহ্য করে শেষ
পর্যন্ত শিশুটি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।
আমার বন্ধু রাশেদ
মোরশেদুল ইসলাম পরিচালিত ইমপ্রেস টেলিফিল্মের ছবি আমার বন্ধু রাশেদ। ২০১১
সালে ছবিটি মুক্তি পায়। জনপ্রিয় কল্পকাহিনী লেখক মুহম্মদ জাফর ইকবালের
উপন্যাস অবলম্বনে আমার বন্ধু রাশেদ ছবিটি নির্মিত হয়েছে। প্রধান চরিত্রে
অভিনয় করেছেন জাওয়াতা আফনান, রাইসুল ইসলাম আসাদ, হুমায়রা হিমু, পারভেজ
মুরাদ প্রমুখ শিল্পী।
এই ছবিটি মুক্তিযুদ্ধর পটভহতিতে নির্মিত। দেশমাতৃকাকে স্বাধীন করবার জন্য
এক কিশোরের মন কিভাবে আন্দোলিত হয়েছে সেই চিত্র ফুটে উঠেছে ছবির কাহিনীতে।
স্কুলের কয়েকজন ছাত্র মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে যুক্ত হয়ে
যায়। সেনাবাহিনীর হাতে বন্দি এক মুক্তিযোদ্ধাকে উদ্ধার করে। যুদ্ধ শেষ হলে
একসময় সবাই টের পায় রাশেদ নেই। কিন্তু সবার অন্তরে সে অমর হয়ে রয়।
রামের সুমতি
১৯৮৬ সালে নির্মিত হয় রামের সুমতি। কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের
গল্প অবলম্বনে নির্মিত এই ছবিটি পরিচালনা করেছেন শহিদুল আমিন এবং প্রধান
চরিত্রে অভিনয় করেছেন ববিতা, ফারুক ও মাস্টার জয়। একটি কিশোরের দুর্দান্ত
দুষ্টুমির কাহিনী নিয়ে নির্মিত হয়েছে এই ছবি। দাদা-বৌদির কাছে বড় হচ্ছে
কিশোর ভাই জয়। পাড়া-পড়শির বাগান ও ক্ষেতে কোনো ফল ফলাদি থাকে না। এর বাড়িতে
এটা উধাও তো ওর বাড়ি থেকে সেটা। এই করেই দিন যায় জয়ের।
প্রতিদিন দাদা-বৌদির কাছে গণ্ডায় গণ্ডায় নালিশ আসে। সালিশ দরবার করতে করতে
তাদের জীবন অতিষ্ট। সেই দুষ্টু কিশোর ভাইটি একসময় তার ভুল বুঝতে পারে।
লক্ষ্মী ছেলেতে পরিণত হয়। অভিনেত্রী ববিতা ও জয় এই ছবিতে অসাধারণ অভিনয়ের
জন্যে জাতীয় পুরস্কার অর্জন করেন।
দিপু নম্বর টু
মোরশেদুল ইসলাম পরিচালিত ‘দিপু নম্বর টু’ ছবিটি জনপ্রিয় কল্প কাহিনী লেখক
মুহম্মদ জাফর ইকবালের গল্প অবলম্বনে নির্মিত। অরুন সাহা, বুলবুল আহমেদ ও
ববিতা অভিনয় করেছেন। ছবিতে একটি কিশোরের মনের ভেতরে চলতে থাকা টানাপোড়েন
সুন্দর করে তুলে ধরা হয়েছে। বাবার ট্রানফারের চাকরি। প্রতিবছর শিশুটিকে
স্কুল পরিবর্তন করতে হয়। আর যেখানেই সে যায় বন্ধু তৈরি করে ফেলে। বন্ধুদের
নিয়ে নানারকম রোমাঞ্চকর কাজে অংশগ্রহণ করে। বছর শেষে বাবা যখন আবার
ট্রান্সফার হয়ে যায় তখন শিশুটির বন্ধু হারানোর ভয় মনকে ক্ষত-বিক্ষত করে
তোলে। আবার নতুন পরিবেশ, আবার নতুন বন্ধু। অসাধারণ একটি শিশু-কিশোর ছবি
‘দিপু নম্বর টু’।
মাটির ময়না
তারেক মাসুদ পরিচালিত এবং ক্যাথরিন মাসুদ প্রযোজিত ছবি মাটির ময়না। ছবিতে
অভিনয় করেছেন রোকেয়া প্রাচী, জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়, লামিসা রিমঝিম, শোয়েব
ইসলাম, রাসেল ফরায়জি প্রমুখ। ২০০২ সালে ছবিটি মুক্তি পায়। বাংলাদেশের
স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রাক্কালে এক শিশুর মাদ্রাসা জীবনের কাহিনী বর্ণিত
হয়েছে। কাহিনীটি প্রয়াত পরিচালক তারেক মাসুদের জীবন থেকে নেয়া। মাদ্রাসার
শিশুটির শিক্ষকের আচরণ, তার সহপাঠীদের আচরণ এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে
তার নানা রকম সম্পর্কের ভেতর দিয়ে এগিয়ে চলে ছবিটির কাহিনী। তারেক মাসুদের
ক্লাসিক একটি ছবি মাটির ময়না।
লিলিপুটরা বড় হবে
মইনুল আহসান সাবেরের চিত্রনাট্য এবং রাকিবুল হাসানের পরিচালনায় ‘লিলিপুটরা
বড় হবে’ ছবিতে অভিনয় করেছেন রাইসুল ইসলাম আসাদ, আফসানা মিমি, চিত্রলেখা
গুহ প্রমুখ। ছবিটি ২০০৮ সালে নির্মিত হয়। গ্রামের হাইস্কুলের এক ইংরেজি
শিক্ষককে কেন্দ্র করে ছবিটির কাহিনী বিস্তৃত হয়েছে। শিক্ষকের ইংরেজি
শেখানোর পদ্ধতি নিয়ে নানারকম ঝামেলা শুরু হয়। ছাত্র শিক্ষকের অম্ল মধুর
সম্পর্কের নানা ঘটনা উঠে এসেছে এই ছবিতে।
এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী
বাদল রহমান পরিচালিত ‘এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী’ অসাধারণ একটি শিশু-কিশোর
চলচ্চিত্র। অভিনয় করেছেন গোলাম মোস্তফা, শর্মিলী আহমেদ, সারা যাকের, এটিএম
শামসুজ্জামান, শিশুশিল্পী মাস্টার পার্থ, টিপটিপসহ আরো এক ঝাঁক শিশু-কিশোর।
শিশুরাজ্য নানা রোমাঞ্চে ভরপুর থাকে। তাদের দুর্দান্ত রোমাঞ্চকর কাহিনী
ছবিতে ফুটিয়ে তুলেছেন প্রয়াত বাদল রহমান।
ডানপিটে ছেলে
ডানপিটে ছেলে ছবির চিত্রনাট্যকার ও গীতিকার ছিলেন খান আতাউর রহমান। ছবির
নামেই বোঝা যাচ্ছে ছবির বিষয়বস্তু কি হতে পারে। ছবিটির প্রাণ দুরন্ত এক
কিশোরের দুষ্টুমির কাহিনী। ছবিতে তাকে নিয়ে নানান ঘটন ও অঘটন বর্ণিত হয়েছে।
প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন শিশুশিল্পী শাকিল। শাকিল এ ছবিতে অভিনয় করে
পুরস্কার অর্জন করেন।
অশিক্ষিত
প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন শিশুশিল্পী মাস্টার সুমন। আরো ছিলেন অভিনেতা
রাজ্জাক, অঞ্জনা ও এটিএম শামসুজ্জামান। ছবিতে গ্রাম্য এক অশিক্ষিত মানুষের
স্বাক্ষরতা লাভের হাহাকার বর্ণিত হয়েছে। শিক্ষক হিসেবে আবির্ভূত হন মাস্টার
সুমন।
অসাধারণ একটি ছবি অশিক্ষিত। মানবিক আবেদনে ভরপুর। শেষে শিক্ষকরূপী মাস্টার
সুমন মৃত্যুবরণ করে কিন্তু তার ছাত্র ততদিনে নাম স্বাক্ষর করা শিখে ফেলে।

No comments:
Post a Comment