দূর থেকে বাঁশ ঝাড়টির দিকে তাকালে মনে হয় যেন সাদা সাদা ফুলের কোনো বাঁশ
বাগান। কাছাকাছি আসতেই শোনা যায় কক কক আর কিচির মিচির শব্দ। চারদিক মুখরিত
হয় সেই শব্দে।
প্রতিদিন সকালে ঝাঁকে ঝাঁকে ওই বাঁশ বাগান থেকে সাদা সাদা বক বের হয়ে যায়
খাদ্যের সন্ধানে। সারাদিন নদী-নালা, খাল-বিল, পুকুর-ডোবায় গিয়ে খাদ্যের
চাহিদা মিটিয়ে সন্ধ্যায় সারি বেঁধে নিড়ে ফেরে। এমনি এক দৃশ্য দেখা যায়
শেরপুরের নালিতাবাড়ি উপজেলার বাঘবের গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ব্রজেন্দ্র
বর্মনের বাড়িতে।
এলাকাবাসী তাই ব্রজেন্দ্র মাস্টারের বাড়িটির নাম দিয়েছে ‘বক বাড়ি’। ওই
গ্রামের বাইরে থেকে কেউ বেড়াতে আসলে অনেকটা হকচকিত হয়ে কিছুক্ষণের জন্য
হলেও থমকে দাঁড়িয়ে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন ওই বাড়ির দিকে।
শেরপুরের নালিতাবাড়ি উপজেলার ওই গ্রামের ব্রজেন্দ্র মাস্টারের বাড়িটি
এলাকায় এক সময় ‘মাস্টার বাড়ি’ নামে পরিচিত থাকলেও বর্তমানে ‘বক বাড়ি’ নামে
চেনেন সবাই। বাড়িটির পেছনে বিশাল একটি বাঁশ ঝাড়। এই বাঁশ ঝাড়টিতেই প্রায় এক
যুগ ধরে বাসা করে আছে কয়েক হাজার বক।
অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ব্রজেন্দ্র চন্দ্র বর্মণ জানান, প্রতিদিন ভোরে বকের
কলকাকলীতে ঘুম ভাঙে বাড়ির লোকজনের। সারাদিন বিভিন্ন স্থান থেকে খাদ্য গ্রহণ
করে সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে আসার আগেই পাখিগুলো বাসায় ফিরে আসে।
তিনি জানান, বেশ কয়েক বছর আগে দুই থেকে তিন হাজার বকের বাস ছিলো এখানে।
প্রতিকুল আবহাওয়া আর খাদ্য সংকটের কারণে বর্তমানে এর সংখ্যা দাড়িয়েছে প্রায়
এক হাজারে। বছরের প্রায় চার মাস বকগুলো এখানে থাকে। বিশেষ করে, বর্ষাকালে
এদের আগমন ঘটে। ডিম থেকে বাচ্চা বের হয়ে যখন উড়তে পারে তখন তাদের যাওয়ার
সময় হয়ে যায়।
বকের ডিম, ছানা, পরিত্যক্ত মাছ খাওয়ার লোভে বাঁশ ঝাড়ের নিচে জড়ো হয় সাপ, গুইসাপ, বেজীসহ বিভিন্ন প্রকারের পশু ও জীব জন্তু।
ব্রজেন্দ্র মাস্টার বকগুলোকে খুব পছন্দ করেন। নিজের সন্তানের মত ভালবাসেন।
রাত-দিন নজরে রাখেন, কেউ যেন এদের কোনো প্রকার ক্ষতি না করতে পারে।
তিনি জানান, ইদানিং বকের সঙ্গে ওইসব বাশঁ ঝাড়ে পানকৌড়িও সহাবস্থান বা
আস্তানা করতে শুরু করেছে। বক ও পানকৌড়ি পরস্পর ভিন্ন প্রজাতির পাখি হলেও
তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব হয় না কখনো।
ঝড়-বৃষ্টিতে অনেক সময় বকের ছানা মাটিতে পড়ে গেলে ব্রজেন্দ্র মাস্টার এবং
তার পরিবারের অন্য সদস্যরা আবার সে ছানাগুলোকে বকের বাসায় রেখে আসে। ওদের
নিরাপদ আশ্রয়ের কথা ভেবে কখনো বাঁশঝাড় থেকে বাঁশ কাটেন না তিনি।
ইতিমধ্যে বকদের দখলের কারণে বাঁশগুলো দিনদিন মরে যাচ্ছে। বকের বিষ্ঠা খুব
দুগন্ধযুক্ত হলেও সে গন্ধ ব্রজেন্দ্র মাস্টারের পরিবারের সদস্যদের সহ্য হয়ে
গেছে। সন্ধ্যার আগে গ্রামের মানুষ ওই বক বাড়ির দিকে আপন মনে চেয়ে থাকে
ঝাকে ঝাকে বকগুলোর ঘরে ফেরার দৃশ্য দেখতে।
তাই গ্রামবাসীও ব্রজেন্দ্র মাস্টারের মতোই বকগুলোকে খুবই ভালবাসেন। কেউ
শিকারে এলে গ্রামবাসীই প্রতিরোধ করেন। ভোরে ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে যাওয়া বকের
দৃশ্য আর সন্ধ্যায় ফের বাসায় ফেরার প্রতিযোগিতা দেখলে মন জুড়িয়ে যায়।
জেলার আর কোথাও এক সঙ্গে এতগুলো বক দেখা যায় না। ওই গ্রাম এবং আশপাশের
বিভিন্ন গ্রামের কৌতুহলী মানুষ ব্রজেন্দ্র মাস্টারের বাড়ির পাশে এই
মনমুগ্ধকর অপরূপ দৃশ্য দেখতে ছুটে আসে প্রতিদিন।
ব্রজেন্দ্র মাস্টার বর্তমানে ওই বাঁশ ঝাড়ের নিচে একটি পুকুর খনন করে মাছ
চাষ করেছেন। বৃষ্টির সময় বকের বিষ্ঠা পানিতে মিশে পুকুরে মাছের খাদ্য তৈরি
হয়। মাছের জন্য পুকুরে আলাদা কোনো খাদ্যের প্রয়োজন হয় না। ফলে মাছ চাষেও
বেশ লাভলান হচ্ছেন তিনি।

No comments:
Post a Comment