নাফিস ইস্যু: দিস ইস নট আওয়ার ফেস
সপ্তাহ তিনেক আগে এক ভারতীয় বন্ধুকে নিয়ে আয়ারল্যান্ডের একটি দর্শনীয়
স্থানে বেড়াতে গিয়েছিলাম। সেখানে পঞ্চাশোর্ধ্ব এক আমেরিকান পর্যটকের সঙ্গে
পরিচয়। কথায় কথায় ভদ্রলোক আমাদের আদি নিবাস জানতে চেয়ে উত্তরের অপেক্ষা না
করেই অনেকটা হিউমার সেন্স মিশিয়ে বললেন, “পাকিস্তানি নও তো!”
দুজনেই একসঙ্গে মাথা নেড়ে না-সূচক উত্তর দিয়ে আমাদের পরিচয় তুলে ধরে আমি তাকে বললাম, পাকিস্তানি হলেই বা ক্ষতি কী! সব পাকিস্তানি তো জঙ্গি নয় কিংবা সব জঙ্গিই তো আর পাকিস্তানি নয়।
‘ভেরি স্মার্ট!’ বলেই আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “তোমাদের বাংলাদেশ তো এখনো বেশ ভালো। আল কায়েদা বা জঙ্গিসম্পৃক্ত কোনো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের খবর আমার নজরে পড়েছে কিনা তা মনে করতে পারছি না।”
ভদ্রলোক আয়ারল্যান্ডে এসেছিলেন নিছক বেড়ানোর জন্য। কথা বলে বোঝা গেল তিনি হাই প্রোফাইল কেউ নন। সাধারণ আমেরিকান নাগরিক। বহু বছর বিদেশযাপনের অভিজ্ঞতা থেকে অন্তত এটা উপলব্ধি করতে পেরেছি, শুধু ওই একজন আমেরিকানই নন, ইউরোপ-আমেরিকাসহ সারা বিশ্বের অধিকাংশ মানুষই বাংলাদেশকে ধর্মপ্রিয় ও শান্তি অন্বেষণকারী দেশ হিসেবেই জানতেন। দেশের ভেতরে মাঝে মধ্যে জঙ্গি কার্যক্রম মাথাচাড়া দিয়ে উঠলেও বহির্বিশ্বে বাংলাদেশ ছিল এ বদনাম থেকে অনেকটাই মুক্ত। কিন্তু গত ১৭ অক্টোবরের ঘটনায় বিশ্বদরবারে দেশটির চেহারা ভিন্নভাবে প্রতিফলিত হলো।
একুশ বছরের বাংলাদেশী তরুণ কাজী মোহাম্মদ রেজওয়ানুল আহসান নাফিস নিউ ইয়র্কে ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক বোমা মেরে উড়িয়ে দিতে চাইলে এফবিআই (মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা) ও সিটি পুলিশ তাকেহাতে নাতে ধরে ফেলে এবং সারা পৃথিবীর গণমাধ্যমে তা লিড নিউজ আকারে প্রকাশ পায়। এফবিআইর দেয়া তথ্য অনুযায়ী এ তরুণকে আল কায়েদাসংশ্লিষ্ট এক সন্ত্রাসী হিসেবে উল্লেখ করে প্রচারমাধ্যমে খবরটা প্রকাশ পাওয়ায় বাংলাদেশের ভাবমূর্তি বিশ্ব দরবারে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে।
নাফিস আল-কায়েদাসংশ্লিষ্ট জঙ্গি কিংবা অন্ধ জিহাদি যাই হোক না কেন সেটা বড়ো কথা নয়, একজন বাংলাদেশী হয়ে সে যে জঘন্যতম হঠকারিতার আশ্রয় নিয়েছে সেটাই সত্যি (যদিও আসলে বোকার মতো এফবিআইর পাতানো ফাঁদেই পা দিয়েছে)। ফেডারেল ব্যাংক উড়িয়ে দেয়ার মতো ঘৃণ্য প্রচেষ্টার খবর বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ায় প্রতিটি প্রবাসী বাঙালিকে আজ চরম বিব্রতকর অবস্থার মধ্য দিয়ে চলতে হচ্ছে।
পত্রিকায় দেখা গেল, আমেরিকান বাঙালি কমিউনিটিতে বিরাজ করছে চাপা আতঙ্ক ও থমথমে অবস্থা। নাফিসের ঘটনার সংবাদ সম্পর্কে স্কুলের বাঙালি ছেলেমেয়েরা অবহিত কিনা সে বিষয়েও শিক্ষকরা তাদের কাছ থেকে জানতে চাচ্ছেন। এ ধরনের অস্বস্তিকর পরিবেশের মোকাবিলা করা কোমলমতি শিক্ষার্থীদের জন্য বড়ই কষ্টের। আমেরিকার বাঙালি অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে ধিক্কার ও বিদ্রূপাত্মক শব্দপ্রয়োগের মাধ্যমে বিদেশিরা বাঙালি অস্তিত্বে আঘাত হানছে বলেও খবর পাওয়া গেছে। ঘটনাটি আমেরিকাকেন্দ্রিক বলে ওখানকার বাঙালিদের ভয়ানক নাজুক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে চলতে হচ্ছে সত্যি, কিন্তু বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা সব বাঙালি অভিবাসীর উপরই এর নেতিবাচক প্রভাব কমবেশি পড়ছে। এমনকি আমাকেও সহকর্মীদের কাছে নাফিসবিষয়ক কিছু কৌতূহলী প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়েছে।
নাফিসের এ ঘটনা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও মন্দা প্রভাব ফেলার আশঙ্কা রয়েছে। প্রবাসে চাকরির বাজারে স্বকীয় গুণের জন্য বাঙালিদের বেশ সুনাম থাকলেও বর্তমান বৈরী পরিস্থিতিতে তা মলিন হয়ে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। অভিবাসী হিসেবে যারা বর্তমানে বেকার, তাদের যেমন চাকরিবাকরি পেতে কষ্ট হবে, তেমনি নতুন করে কর্মসংস্থান নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমানোটাও হবে খুব কঠিন। অনেক অভিবাসী যারা যুক্তরাষ্ট্রসহ পাশ্চাত্যের দেশগুলোতে স্থায়ী অধিবাসী বা নাগরিকত্ব অর্জনের ক্ষেত্রে প্রক্রিয়াধীন আছেন, তাও বাধাগ্রস্ত হওয়ার শংকা রয়েছে। শিক্ষার্থীদের স্থায়ীকরণের ক্ষেত্রে যে আইনের শিথিলতা বা অবৈধভাবে বসবাসরতদের বৈধকরণের যে অঘোষিত নীতিমালা সেসব থেকেও বাঙালিরা বঞ্চিত হতে পারেন বলে আপাতদৃষ্টিতে ধারণা করা যায়। নতুন করে স্টুডেন্ট ভিসাসহ ট্যুরিস্ট বা বিজনেস যে কোনো ভিসা পেতেই পোহাতে হবে হাজারো অযাচিত ঝামেলা, এতে সন্দেহ নেই। মোট কথা, বিদেশী রেমিটেন্স বৃদ্ধির ক্ষেত্রে মারাত্মক ঝুঁকি হয়ে দাঁড়াল নাসিফের এ ঘটনা।
একুশ বছরের নাফিস বুঝেই হোক বা না বুঝেই হোক এফবিআইয়ের কৌশলী ফাঁদে পা দিয়ে বাঙালির মুখে যে চুনকালি দিয়েছে তা অত সহজে মুছে ফেলার নয়। তারপরও আমাদের হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকলে চলবে না। প্রকৃত তথ্য উদ্ঘাটনে রাষ্ট্রীয়ভাবে সচেষ্ট ভূমিকা পালন করতে হবে। সত্যি যদি সে আল কায়েদা সংশ্লিষ্ট জঙ্গিবাদের পূজারি হয়ে থাকে তবে সম্প্রতি আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নাফিস ইস্যুতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সহযোগিতার কথা বলে যে বক্তব্য দিয়েছেন তাকে আমরা স্বাগত জানাই। এতে ভূলুণ্ঠিত ভাবমূর্তি পুরোপুরি ফিরে না পেলেও বিশ্বে অন্তত এতোটুকু প্রতীয়মান হবে যে, নাফিসদের মতো বিপথগামীরা আল-কায়েদার প্রেমে হাবুডুবু খেলেও গোটা দেশ বা জাতি তাদেরকে ধিক্কার জানিয়ে প্রত্যাখ্যান করতে সক্ষম। পক্ষান্তরে আওয়ামী লীগের একজন মধ্যম সারির নেতা নাফিসের ব্যাপারে কথা বলতে গিয়ে একটি বিশেষ দলকে দায়ী করে যে রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়েছেন তা অবশ্যই পরিতাজ্য। এ ধরনের একটি স্পর্শকাতর বিষয়কে রাজনীতির চোরাবালিতে গুলিয়ে ফেলা যে মোটেও শোভন নয় তা আমাদের রাজনীতিবিদদের উপলব্ধি করা উচিত।
খবরে প্রকাশ, নাফিস বড়ো ধরনের কোনো নাশকতা ঘটানোর পূর্বপরিকল্পনা নিয়েই আমেরিকাতে পাড়ি জমায় গত জানুয়ারিতে। এ বিষয়ে আমার যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। প্রকৃতপক্ষেই যদি সে ওই হীন উদ্দেশ্য চরিতার্থের জন্যই দেশ ছেড়ে যেত, তাহলে বাংলাদেশ থেকে কিংবা আমেরিকাতে বসবাসরত শক্তিশালী কোনো নিজস্ব লোকের দক্ষ ও সুপরিকল্পিত হাত তার পেছনে কাজ করত। এফবিআইর পাতানো ফাঁদে পা দিয়ে ইঁদুরছানার মতো তাকে ধরা পড়তে হতো না। হতে পারে, নাফিস আমেরিকাবিদ্বেষী জিহাদি মনোভাবসম্পন্ন এক তরুণ। দুনিয়া কাঁপানো কোনো ধ্বংসাত্মক কাজ করাও ছিল তার লক্ষ্য। কিন্তু এসব করতে গেলে যে শক্তি-সামর্থ্য, পরিপক্কতা বা মুন্সিয়ানা ও অর্থনৈতিক যোগানের প্রয়োজন তার কি আদৌ কোনোটা ছিল? আজ নিউ ইয়র্কে ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক উড়িয়ে দেয়ার প্রচেষ্টায় এক হাজার পাউন্ড ওজনের যে বিস্ফোরক দ্রব্য ও ভ্যানের কথা বলা হচ্ছে, সেগুলোর জোগানদাতা কারা তা আমরা সবাই জানি। পত্রিকায় যে দুজন বন্ধুবেশি বাংলা ভাষাভাষী এফবিআই এজেন্টের কথা উঠে এসেছে তারা যদি নাফিসকে নিয়ে ব্যাঙের মতো খেলা না খেলতেন তাহলে হয়তো তাকে এত দ্রুত আল-কায়েদা সংশ্লিষ্ট ঘৃণ্য জঙ্গি অপবাদ নিয়ে বিশ্বদরবারে আত্মপ্রকাশ করতে হতো না। কিংবা চারপাশের অসংখ্য প্রতিকূলতার মুখে পরাস্ত হয়ে অপকর্মের স্পৃহা হারিয়ে আপন মনেই সঠিক পথে ফিরে আসত। আজ নাফিসের আল কায়েদাসংশ্লিষ্ট সন্ত্রাসের খবর বিশ্ব মিডিয়াকে আজান দিয়ে যেভাবে প্রচার করতে হচ্ছে, তখন হয়তো তার কোনো প্রয়োজনই হতো না ।
ভারতীয় প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের একটি উপন্যাসের গল্প দিয়ে লেখাটি শেষ করব। বহু বছর আগে পড়া (উপন্যাসটির নাম মনে নেই)। গ্রামের এক মেধাবী তরুণ উচ্চশিক্ষার জন্য কলকাতায় ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হতে আসে। প্রথম দিনেই সাক্ষাৎ মেলে এক নকশাল নেতার। ভর্তিসহ হোস্টেলে সিট পাইয়ে দেয়ার লোভ দেখিয়ে দলে টানে। সময়ে-অসময়ে মিছিল-মিটিংয়ে যাবারও তাগাদা দেয়। এভাবে এক পর্যায়ে দলীয় ক্যাডার থেকে সন্ত্রাসীতে পরিণত হয় সে। কোনো এক রাজনৈতিক দাঙ্গায় প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার সময় তার পা গুলিবিদ্ধ হয়। কেটে ফেলার প্রয়োজন হয় পুরো পা। পঙ্গুত্বের অভিশাপ নিয়ে বারো বছর জেল খেটে অবশেষে ক্রাচে ভর দিয়ে হেঁটে আসে প্রিয়ার কাছে। লেখাপড়া দূরের কথা, বিপন্ন জীবন নিয়ে বেঁচে থাকাটাই যেন তার দায় হয়!
গল্পের এ তরুণটির মতো নাফিসের জীবনে এরকম অন্ধকার নেমে আসুক তা আমরা কখনো চাই না। আশার কথা, যুক্তরাষ্ট্র সরকার তার পক্ষে আইনজীবী নিয়োগ করেছেন বলে খবর বেরিয়েছে। সঠিক তদন্তসাপেক্ষে যদি সে নির্দোষ প্রমাণিত হয় তবে যাদের অপব্যাখ্যা বা ভুল তথ্য পরিবেশনের ফলে তার তথা বাঙালি জাতির গায়ে জঙ্গিবাদের দুর্গন্ধ লেগেছে, তাদেরকে যেমন বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর দাবি থাকবে, তেমনি দোষী সাব্যস্ত হলে তারও দৃষ্টান্তমূলক বিচার হোক তা আমরা চাই।
আমেরিকার সবচেয়ে পুরনো সংগঠন লীগ অফ আমেরিকা ‘সন্ত্রাসী হামলার’ পরিকল্পনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছে, নাফিস আমাদের পরিচয় নয়। দিস ইস নট আওয়ার ফেস। আমি মনে করি সংগঠনটির সাথে সুর মিলিয়ে প্রবাসে বসবাসরত প্রতিটি বাঙালিরই উচিত নিজস্ব অবস্থান থেকে বিদেশীদের কাছে এ বার্তাটি পৌঁছে দেয়া– দিস ইস নট আওয়ার ফেস।
দুজনেই একসঙ্গে মাথা নেড়ে না-সূচক উত্তর দিয়ে আমাদের পরিচয় তুলে ধরে আমি তাকে বললাম, পাকিস্তানি হলেই বা ক্ষতি কী! সব পাকিস্তানি তো জঙ্গি নয় কিংবা সব জঙ্গিই তো আর পাকিস্তানি নয়।
‘ভেরি স্মার্ট!’ বলেই আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “তোমাদের বাংলাদেশ তো এখনো বেশ ভালো। আল কায়েদা বা জঙ্গিসম্পৃক্ত কোনো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের খবর আমার নজরে পড়েছে কিনা তা মনে করতে পারছি না।”
ভদ্রলোক আয়ারল্যান্ডে এসেছিলেন নিছক বেড়ানোর জন্য। কথা বলে বোঝা গেল তিনি হাই প্রোফাইল কেউ নন। সাধারণ আমেরিকান নাগরিক। বহু বছর বিদেশযাপনের অভিজ্ঞতা থেকে অন্তত এটা উপলব্ধি করতে পেরেছি, শুধু ওই একজন আমেরিকানই নন, ইউরোপ-আমেরিকাসহ সারা বিশ্বের অধিকাংশ মানুষই বাংলাদেশকে ধর্মপ্রিয় ও শান্তি অন্বেষণকারী দেশ হিসেবেই জানতেন। দেশের ভেতরে মাঝে মধ্যে জঙ্গি কার্যক্রম মাথাচাড়া দিয়ে উঠলেও বহির্বিশ্বে বাংলাদেশ ছিল এ বদনাম থেকে অনেকটাই মুক্ত। কিন্তু গত ১৭ অক্টোবরের ঘটনায় বিশ্বদরবারে দেশটির চেহারা ভিন্নভাবে প্রতিফলিত হলো।
একুশ বছরের বাংলাদেশী তরুণ কাজী মোহাম্মদ রেজওয়ানুল আহসান নাফিস নিউ ইয়র্কে ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক বোমা মেরে উড়িয়ে দিতে চাইলে এফবিআই (মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা) ও সিটি পুলিশ তাকেহাতে নাতে ধরে ফেলে এবং সারা পৃথিবীর গণমাধ্যমে তা লিড নিউজ আকারে প্রকাশ পায়। এফবিআইর দেয়া তথ্য অনুযায়ী এ তরুণকে আল কায়েদাসংশ্লিষ্ট এক সন্ত্রাসী হিসেবে উল্লেখ করে প্রচারমাধ্যমে খবরটা প্রকাশ পাওয়ায় বাংলাদেশের ভাবমূর্তি বিশ্ব দরবারে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে।
নাফিস আল-কায়েদাসংশ্লিষ্ট জঙ্গি কিংবা অন্ধ জিহাদি যাই হোক না কেন সেটা বড়ো কথা নয়, একজন বাংলাদেশী হয়ে সে যে জঘন্যতম হঠকারিতার আশ্রয় নিয়েছে সেটাই সত্যি (যদিও আসলে বোকার মতো এফবিআইর পাতানো ফাঁদেই পা দিয়েছে)। ফেডারেল ব্যাংক উড়িয়ে দেয়ার মতো ঘৃণ্য প্রচেষ্টার খবর বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ায় প্রতিটি প্রবাসী বাঙালিকে আজ চরম বিব্রতকর অবস্থার মধ্য দিয়ে চলতে হচ্ছে।
পত্রিকায় দেখা গেল, আমেরিকান বাঙালি কমিউনিটিতে বিরাজ করছে চাপা আতঙ্ক ও থমথমে অবস্থা। নাফিসের ঘটনার সংবাদ সম্পর্কে স্কুলের বাঙালি ছেলেমেয়েরা অবহিত কিনা সে বিষয়েও শিক্ষকরা তাদের কাছ থেকে জানতে চাচ্ছেন। এ ধরনের অস্বস্তিকর পরিবেশের মোকাবিলা করা কোমলমতি শিক্ষার্থীদের জন্য বড়ই কষ্টের। আমেরিকার বাঙালি অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে ধিক্কার ও বিদ্রূপাত্মক শব্দপ্রয়োগের মাধ্যমে বিদেশিরা বাঙালি অস্তিত্বে আঘাত হানছে বলেও খবর পাওয়া গেছে। ঘটনাটি আমেরিকাকেন্দ্রিক বলে ওখানকার বাঙালিদের ভয়ানক নাজুক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে চলতে হচ্ছে সত্যি, কিন্তু বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা সব বাঙালি অভিবাসীর উপরই এর নেতিবাচক প্রভাব কমবেশি পড়ছে। এমনকি আমাকেও সহকর্মীদের কাছে নাফিসবিষয়ক কিছু কৌতূহলী প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়েছে।
নাফিসের এ ঘটনা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও মন্দা প্রভাব ফেলার আশঙ্কা রয়েছে। প্রবাসে চাকরির বাজারে স্বকীয় গুণের জন্য বাঙালিদের বেশ সুনাম থাকলেও বর্তমান বৈরী পরিস্থিতিতে তা মলিন হয়ে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। অভিবাসী হিসেবে যারা বর্তমানে বেকার, তাদের যেমন চাকরিবাকরি পেতে কষ্ট হবে, তেমনি নতুন করে কর্মসংস্থান নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমানোটাও হবে খুব কঠিন। অনেক অভিবাসী যারা যুক্তরাষ্ট্রসহ পাশ্চাত্যের দেশগুলোতে স্থায়ী অধিবাসী বা নাগরিকত্ব অর্জনের ক্ষেত্রে প্রক্রিয়াধীন আছেন, তাও বাধাগ্রস্ত হওয়ার শংকা রয়েছে। শিক্ষার্থীদের স্থায়ীকরণের ক্ষেত্রে যে আইনের শিথিলতা বা অবৈধভাবে বসবাসরতদের বৈধকরণের যে অঘোষিত নীতিমালা সেসব থেকেও বাঙালিরা বঞ্চিত হতে পারেন বলে আপাতদৃষ্টিতে ধারণা করা যায়। নতুন করে স্টুডেন্ট ভিসাসহ ট্যুরিস্ট বা বিজনেস যে কোনো ভিসা পেতেই পোহাতে হবে হাজারো অযাচিত ঝামেলা, এতে সন্দেহ নেই। মোট কথা, বিদেশী রেমিটেন্স বৃদ্ধির ক্ষেত্রে মারাত্মক ঝুঁকি হয়ে দাঁড়াল নাসিফের এ ঘটনা।
একুশ বছরের নাফিস বুঝেই হোক বা না বুঝেই হোক এফবিআইয়ের কৌশলী ফাঁদে পা দিয়ে বাঙালির মুখে যে চুনকালি দিয়েছে তা অত সহজে মুছে ফেলার নয়। তারপরও আমাদের হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকলে চলবে না। প্রকৃত তথ্য উদ্ঘাটনে রাষ্ট্রীয়ভাবে সচেষ্ট ভূমিকা পালন করতে হবে। সত্যি যদি সে আল কায়েদা সংশ্লিষ্ট জঙ্গিবাদের পূজারি হয়ে থাকে তবে সম্প্রতি আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নাফিস ইস্যুতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সহযোগিতার কথা বলে যে বক্তব্য দিয়েছেন তাকে আমরা স্বাগত জানাই। এতে ভূলুণ্ঠিত ভাবমূর্তি পুরোপুরি ফিরে না পেলেও বিশ্বে অন্তত এতোটুকু প্রতীয়মান হবে যে, নাফিসদের মতো বিপথগামীরা আল-কায়েদার প্রেমে হাবুডুবু খেলেও গোটা দেশ বা জাতি তাদেরকে ধিক্কার জানিয়ে প্রত্যাখ্যান করতে সক্ষম। পক্ষান্তরে আওয়ামী লীগের একজন মধ্যম সারির নেতা নাফিসের ব্যাপারে কথা বলতে গিয়ে একটি বিশেষ দলকে দায়ী করে যে রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়েছেন তা অবশ্যই পরিতাজ্য। এ ধরনের একটি স্পর্শকাতর বিষয়কে রাজনীতির চোরাবালিতে গুলিয়ে ফেলা যে মোটেও শোভন নয় তা আমাদের রাজনীতিবিদদের উপলব্ধি করা উচিত।
খবরে প্রকাশ, নাফিস বড়ো ধরনের কোনো নাশকতা ঘটানোর পূর্বপরিকল্পনা নিয়েই আমেরিকাতে পাড়ি জমায় গত জানুয়ারিতে। এ বিষয়ে আমার যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। প্রকৃতপক্ষেই যদি সে ওই হীন উদ্দেশ্য চরিতার্থের জন্যই দেশ ছেড়ে যেত, তাহলে বাংলাদেশ থেকে কিংবা আমেরিকাতে বসবাসরত শক্তিশালী কোনো নিজস্ব লোকের দক্ষ ও সুপরিকল্পিত হাত তার পেছনে কাজ করত। এফবিআইর পাতানো ফাঁদে পা দিয়ে ইঁদুরছানার মতো তাকে ধরা পড়তে হতো না। হতে পারে, নাফিস আমেরিকাবিদ্বেষী জিহাদি মনোভাবসম্পন্ন এক তরুণ। দুনিয়া কাঁপানো কোনো ধ্বংসাত্মক কাজ করাও ছিল তার লক্ষ্য। কিন্তু এসব করতে গেলে যে শক্তি-সামর্থ্য, পরিপক্কতা বা মুন্সিয়ানা ও অর্থনৈতিক যোগানের প্রয়োজন তার কি আদৌ কোনোটা ছিল? আজ নিউ ইয়র্কে ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক উড়িয়ে দেয়ার প্রচেষ্টায় এক হাজার পাউন্ড ওজনের যে বিস্ফোরক দ্রব্য ও ভ্যানের কথা বলা হচ্ছে, সেগুলোর জোগানদাতা কারা তা আমরা সবাই জানি। পত্রিকায় যে দুজন বন্ধুবেশি বাংলা ভাষাভাষী এফবিআই এজেন্টের কথা উঠে এসেছে তারা যদি নাফিসকে নিয়ে ব্যাঙের মতো খেলা না খেলতেন তাহলে হয়তো তাকে এত দ্রুত আল-কায়েদা সংশ্লিষ্ট ঘৃণ্য জঙ্গি অপবাদ নিয়ে বিশ্বদরবারে আত্মপ্রকাশ করতে হতো না। কিংবা চারপাশের অসংখ্য প্রতিকূলতার মুখে পরাস্ত হয়ে অপকর্মের স্পৃহা হারিয়ে আপন মনেই সঠিক পথে ফিরে আসত। আজ নাফিসের আল কায়েদাসংশ্লিষ্ট সন্ত্রাসের খবর বিশ্ব মিডিয়াকে আজান দিয়ে যেভাবে প্রচার করতে হচ্ছে, তখন হয়তো তার কোনো প্রয়োজনই হতো না ।
ভারতীয় প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের একটি উপন্যাসের গল্প দিয়ে লেখাটি শেষ করব। বহু বছর আগে পড়া (উপন্যাসটির নাম মনে নেই)। গ্রামের এক মেধাবী তরুণ উচ্চশিক্ষার জন্য কলকাতায় ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হতে আসে। প্রথম দিনেই সাক্ষাৎ মেলে এক নকশাল নেতার। ভর্তিসহ হোস্টেলে সিট পাইয়ে দেয়ার লোভ দেখিয়ে দলে টানে। সময়ে-অসময়ে মিছিল-মিটিংয়ে যাবারও তাগাদা দেয়। এভাবে এক পর্যায়ে দলীয় ক্যাডার থেকে সন্ত্রাসীতে পরিণত হয় সে। কোনো এক রাজনৈতিক দাঙ্গায় প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার সময় তার পা গুলিবিদ্ধ হয়। কেটে ফেলার প্রয়োজন হয় পুরো পা। পঙ্গুত্বের অভিশাপ নিয়ে বারো বছর জেল খেটে অবশেষে ক্রাচে ভর দিয়ে হেঁটে আসে প্রিয়ার কাছে। লেখাপড়া দূরের কথা, বিপন্ন জীবন নিয়ে বেঁচে থাকাটাই যেন তার দায় হয়!
গল্পের এ তরুণটির মতো নাফিসের জীবনে এরকম অন্ধকার নেমে আসুক তা আমরা কখনো চাই না। আশার কথা, যুক্তরাষ্ট্র সরকার তার পক্ষে আইনজীবী নিয়োগ করেছেন বলে খবর বেরিয়েছে। সঠিক তদন্তসাপেক্ষে যদি সে নির্দোষ প্রমাণিত হয় তবে যাদের অপব্যাখ্যা বা ভুল তথ্য পরিবেশনের ফলে তার তথা বাঙালি জাতির গায়ে জঙ্গিবাদের দুর্গন্ধ লেগেছে, তাদেরকে যেমন বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর দাবি থাকবে, তেমনি দোষী সাব্যস্ত হলে তারও দৃষ্টান্তমূলক বিচার হোক তা আমরা চাই।
আমেরিকার সবচেয়ে পুরনো সংগঠন লীগ অফ আমেরিকা ‘সন্ত্রাসী হামলার’ পরিকল্পনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছে, নাফিস আমাদের পরিচয় নয়। দিস ইস নট আওয়ার ফেস। আমি মনে করি সংগঠনটির সাথে সুর মিলিয়ে প্রবাসে বসবাসরত প্রতিটি বাঙালিরই উচিত নিজস্ব অবস্থান থেকে বিদেশীদের কাছে এ বার্তাটি পৌঁছে দেয়া– দিস ইস নট আওয়ার ফেস।
No comments:
Post a Comment