Pages

Friday, October 5, 2012

সাংবাদিক হাবীবুর রহমান ভূঁইয়া কিছু স্মৃতি কিছু কথা :: মিডিয়া :: বার্তা২৪ ডটনেট

সাংবাদিক হাবীবুর রহমান ভূঁইয়া কিছু স্মৃতি কিছু কথা :: মিডিয়া :: বার্তা২৪ ডটনেট

আবু দারদা যোবায়ের বিন হাবীব
ঢাকা, ৪ অক্টোবর: আমার আব্বা মুহাম্মদ হাবীবুর রহমান ভূঁইয়ার আজ (৪ অক্টোবর ) চতুর্থ মৃত্যুবার্ষিকী । চার বছর আগে দুই হাজার আট সালের এই দিনে তিনি ইন্তেকাল করেন (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।

একজন পেশাদার সাংবাদিক হিসেবে তিনি দীর্ঘদিন সাংবাদিকতার সাথে জড়িত ছিলেন । ভারত বিভাগের আগে কলকাতায় তিনি কাজ করেছেন ইত্তেহাদ ও মাওলানা আকরাম খাঁ সম্পাদিত আজাদ পত্রিকায়। পরে বাংলাদেশে তিনি দৈনিক আখবার, সাপ্তাহিক আরাফাত এবং  দৈনিক আজাদ পত্রিকায় কাজ করেছেন ’৮৬ সালে দৈনিক ইনকিলাব প্রতিষ্ঠার আগ পর্যন্ত।

সর্বশেষ  দৈনিক আজাদ পত্রিকা লালবাগের ঢাকেশ্বরী রোড থেকে প্রকাশিত হতো। আব্বার সাথে আরো অনেক সাংবাদিক আজাদ ছেড়ে দৈনিক ইনকিলাব পত্রিকায় যোগ দিয়েছিলেন। আর ইনকিলাবের শুরুটা ছিল দেশের প্রথম কম্পিটারাইজড পত্রিকা যা পুরোটাই ছিল আধুনিক ছাপার  যাবতীয় প্রযুক্তি সম্পন্ন। ’৮৬ সালের জুন মাসে প্রকাশিত দৈনিক ইনকিলাবের শুরুতে আব্বা মফস্বল ডেস্কের বার্তা সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন। পদোন্নতি পেয়ে  সিনিয়র সাব এডিটর হিসেবে ২০০৩ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত কাজ করেন তিনি। তখন সংবাদপত্রে ইন্টারনেট, ই-মেইলের ব্যবহার খুব একটা ছিল বলে আমার মনে পড়ে না। ডাক বিভাগের খামে, ফ্যাক্স আর টেলিফোনে দেশের নানা প্রান্তের সংবাদ পাঠাতেন জেলা প্রতিনিধিরা। তখন জেলা-উপজেলা থেকে এক বা একাধিক সংবাদদাতা প্রতিনিধি হবার প্রতিযোগিতায় নামেন। কখনো কখনো এসব বিষয় নিয়ে বাসায় আব্বা কথা বলতেন।

সাংবাদিকতা পেশায় জড়িয়ে বুঝতে পারি নিজস্ব সংবাদদাতা হতে কত কৌশলই না নেন অনেকেই। তখন দুই একজন প্রতিনিধি আমাদের বাসায়ও এসেছেন। কখনো আব্বা তাদের হাসি মুখে, সাধ্য মতো আপ্যায়ন করে বিদায় দিয়েছেন আবার কখনো করতে পারেনি। এতে কেউ কেউ খুশি কিংবা কষ্ট পেলেও আব্বার করার কিছুই ছিল না।

যতদূর মনে পড়ে আমার বড় বোনের শ্বশুরবাড়ি যে জেলায়, সেই জেলার প্রতিনিধি হতে ইচ্ছুক এক সাংবাদিক আমাদের বাসায় মিষ্টি নিয়ে এসেছিলেন। আব্বা মিষ্টি রাখতে রাজি হননি। কেননা তখনো ওই সাংবাদিক ভদ্রলোক জেলা প্রতিনিধি হবার জন্য ইনকিলাব সম্পাদক এ এম এম বাহাউদ্দিন সাহেবের হাতে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হননি।

বেচারা  নাছোড়বান্দা, বললেন, “আমার জেলায় আপনার মেয়ে বিয়ে দিয়েছেন, আমি তো সে হিসেবে আপনার বাসায় আসতে পারি, আপনি আমাকে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখুন।”

তখন আব্বা বললেন, “আপনি কত কেজি মিষ্টি এনেছেন, বড় মেয়ের বিয়ে দিয়েছি আপনাদের জেলায়, মিষ্টির দাম কত, আমি একটি শর্তে মিষ্টি নিতে পারি আপনাকে অবশ্যই টাকা নিতে হবে।”

অবশেষে টাকার বিনিময়ে আব্বা ওই মিষ্টি রাখেন। পরে আব্বার কাছে শুনেছি -সাংবাদিক পরিচয়ে অনেকই -হয়তো আব্বার সাথে সম্পর্ক গড়ে স্থানীয় কারো পক্ষে কিংবা বিপক্ষে সংবাদ ছাপিয়ে নিজের স্বার্থ হাসিল করতে পারেন। এমন আশংকায় আব্বা সবসময়ই সতর্ক থাকতেন।

আরেকটি ঘটনা, সম্ভবত ’৮৭ সালের।  ফরিদপুরের এক  সাংবাদিক রাতে আমাদের বাসায় মিষ্টি নিয়ে হাজির। বৃহত্তর ফরিদপুরের একটি জেলার ইনকিলাবের জেলা সংবাদদাতা হতে চান তিনি। আগেই বলেছি সে সময় এক জেলা থেকে একাধিক প্রতিনিধি খবর পাঠাতেন। তাই ইনকিলাব পত্রিকার মতো জনপ্রিয় ও বহুল প্রচারিত সংবাদপত্রের নিজস্ব সংবাদদাতা হতে কারো কারো চেষ্টা তদবিরের শেষ ছিল না । একদিন রাতে হঠাৎ বাসার গেটে শব্দ শুনে আমি এগিয়ে যাই । এক ভদ্রলোক বাসায় এসে হাজির সাথে মিষ্টি, পরিচয় দিলেন অমুক জেলার অধিবাসী ।

আব্বা ওনাকে প্রশ্ন করলেন, “আপনি আমার বাসায় এসেছেন কেন ? আপনার তো আমার বাসায়  আসার দরকার নেই, আবার মিষ্টি নিয়ে এসেছেন কেন?”

জবাবে তিনি জানান, তার জেলা সদরে নিজস্ব চারতলা বাড়ি আছে, আছে ঠিকাদারি ব্যবসা - শখে সাংবাদিকতা করতে চান ইত্যাদি। আমি তখন আব্বার পাশে দাঁড়ানো। আব্বা বললেন, “এই মিষ্টি আমিও খাই না, আমার ছেলেমেয়েরাও খায় না ।”

সাংবাদিক ভদ্রলোক জানান, তিনি ঢাকায় একটি  বোর্ডিং এ উঠেছেন। তখন আব্বা বললেন মিষ্টি  বোর্ডিংয়ে নিয়ে যান।  সাংবাদিক হতাশ হয়ে আমাদের বাসা থেকে বিদায় নেন। পররর্তীতে আর জানি না তিনি ইনকিলাব পত্রিকার সংবাদদাতা হতে পেরেছিলেন কিনা। আরেকটি ঘটনা আববার কাছে শুনেছি । একজন সাংবাদিক জেলা প্রতিনিধি হিসেবে দৈনিক ইনকিলাব সম্পাদক এ এম এম বাহাউদ্দিন সাহেব চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত করার আগেই সম্পাদকের স্বাক্ষর করা পরিচয়পত্র নিয়ে তিনি বিভিন্ন জায়গায় নিজের পরিচয় দিয়ে বেড়াচ্ছিলেন। একদিন হঠাৎ সম্পাদক সাহেব আব্বাকে হাবিবুর রহমান সাহেব সম্বোধন করে ওই সাংবাদিকের পরিচয়পত্র দেয়া নিয়ে জানতে চান । আব্বা সম্পাদক সাহেবকে বলেছিলেন, এ ব্যাপারে তিনি কিছুই জানেন না। সম্পাদক বাহাউদ্দিন সাহেব পরে ওই সাংবাদিককে ডেকে পাঠান। ওই সাংবাদিক জানান, তিনি, দৈনিক ইকিলাবের জনৈক সাংবাদিক (নামটা সঙ্গত কারণেই প্রকাশ করা   হলো না) যিনি একটি সাংবাদিক সংগঠনের নেতাও ছিলেন, তিনি সম্পাদক সাহেবের স্বাক্ষর জাল করে ওই সাংবাদিককে ইনকিলাব পত্রিকার প্রতিনিধির পরিচয়পত্র বানিয়ে দিয়েছেন। এ ঘটনার পর ওই সাংবাদিক নেতার ইনকিলাব থেকে চাকরি চলে যায়।

এই ঘটনার পর আব্বার ওপর সম্পাদক সাহেবের আস্থা আরো বেড়ে যায়। এমন আরো অনেক ঘটনা রয়েছে যা বলে শেষ করা যাবে না।

এ ঘটনাগুলো বলার কারণ হচ্ছে আব্বা কখনোই মিথ্যার সাথে আপস করেননি। যারা উনার সাথে সাংবাদিকতা করেছেন তারা তা ভালো করে জানেন। আর আমাদের উনি শিখিয়েছেন মিথ্যাকে পূঁজি করে কোনো কিছু না করার । বর্তমানে দেশে অসংখ্য দৈনিক সংবাদপত্র, দুই ডজনের মতো বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল আর অনলাইন পত্রিকা চালু হয়েছে। কিন্তু সৎ ও বস্ত্তনিষ্ঠ পেশাদারি সাংবাদিকতার বিকাশ তেমন ঘটেনি বলে আমার ধারনা। পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রায়ই কতিপয় সাংবাদিকের আচরণ দেখে নিজেকে সাংবাদিক হিসেবে পরিচয় দিতে লজ্জা লাগে।

আব্বার মৃত্যুবার্ষিকীর এই দিনে আমার কামনা আমরা যাতে সততা ও ন্যায় নিষ্টার সাথে আমাদের পেশাগত মর্যাদা ও নিজেদের আত্নসম্মানবোধ বজায় রাখতে পারি। আল্লাহ আব্বাকে জান্নাত নসিব করুন। আমিন।

আবু দারদা যোবায়ের বিন হাবীব: বিশেষ প্রতিনিধি, এটিএন বাংলা
                                                        abudarda.aribah@gmail.com

No comments:

Post a Comment