Pages

Monday, September 24, 2012

বরফি, স্তব্ধতার গান :: এন্টারটেইনমেন্ট :: বার্তা২৪ ডটনেট

বরফি, স্তব্ধতার গান :: এন্টারটেইনমেন্ট :: বার্তা২৪ ডটনেট
 জন্মের সময় তার স্কোর ছিলো পাঁচে তিন। কান, ঠোঁট মাইনাস। তবু তিনটি ইন্দ্রিয় নিয়েই সে রাজা। নিজের নিশ্চুপ ক্যানভাসে সে রঙ ছড়িয়েছে ইচ্ছেমত। আর সেই রঙ্গীন বুদবুদগুলোই আসলে তার কথা, বাক্য, চিৎকার। সে বরফি, সে রণবীর কাপুর।

কথা বলতে পারে না, কানে শুনতে পায় না। অথচ তার মত কথক হওয়াও আমাদের মত ইন্দ্রিয়ওয়ালা মানুষের পক্ষে কঠিনই। আসলে বলা যায় বলিউডে সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমা বরফি হলো আমাদের ইতিবাচক চিন্তাগুলোরই যোগফল।

বহু কষ্টে, ভারি অদ্ভুত ভঙ্গিতে সে কেবল নিজের নামটুকু উচ্চারণ করতে পারে। তাও সেটা আদতে ছিলো মরফি। কিন্তু বোবা ছেলের ঠোঁটে তা হয়ে দাঁড়ায় বরফি। ব্যাস ওইটুকুই। বাকি সময় সে কথা বলে শরীর ও চোখ দিয়ে। একটা পুরোন সাইকেল, পকেট ছেঁড়া কোট, ভাঙ্গাচোরা ঘর-এই তার দুনিয়াদারির হাতিয়ার। তাতে অবশ্য আক্ষেপ নেই তার, নেই ভ্রুক্ষেপও। কেননা তার জীবনযাপনই ভালো থাকার অবিরাম প্রচেষ্টা।

আর ঋষি পুত্র রণবীর এই বরফির মধ্যে মিশে গিয়েছেন পরতে পরতে। দার্জেলিং পাড়ের আশ্চর্য ছেলেটার ভূমিকা যেন তিনি অভ্যস্ত পোশাকের মতই গায়ে জড়িয়েছেন। সে পোশাকে তাকে বেমানান লাগাতো দূরের কথা বরং মনে হয়েছে এই চরিত্রে তার চেয়ে ভালো হয়তো করার সাধ্য অন্তত বলিউডে কারো নেই।

ছোট ছোট অজস্র দৃশ্যে তিনি দর্শকদের মন ছুঁয়ে গিয়েছেন গভীরভাবে। তার জন্যই এই একশো পঞ্চাশ মিনিটের জার্নিতে সামিল না হয়ে যেন উপায়ই থাকে না। তাই যখন বরফি সম্পর্কের গভীরতা মাপতে লাইটপোস্ট ভেঙ্গে তার সামনে বন্ধুর হাত আঁকড়ে অপেক্ষা করতে শুরু করে, দর্শকরাও তখন উদ্বিগ্ন না হয়ে পারেন না। যখন সে স্কুল বাসের জানালায় উদয় হয়ে চুরি করে চকলেট খায় দর্শকরাও তখন মনে মনে যেন প্রার্থনা করতে থাকে যাতে সে দ্রুত পালাতে পারে। যখন সে দার্জেলিং ম্যালের মত ঘড়ির কাঁটা পনেরো মিনিট পিছিয়ে দেয়, দর্শকরা তখন তার নিরাপদে নিচে নেমে আসার জন্য অপেক্ষা করে।  যখন বরফি তার অক্ষমতা বুঝিয়ে প্রেমিকাকে ছেড়ে চলে আসে, তখন এক চিলতে চোখের জল মুছে নিতে হয় সবাইকে।

মাঝরাতে বরফি যখন সাদা ঘোড়ায় চেপে বান্ধবিকে নিয়ে সফরে বের হয়, তখন যেন দর্শকরাও তার সঙ্গে অন্য গন্তব্যে পাড়ি জমায়। বরফির এই স্বপ্নযাত্রাতো আসলে দর্শকদের স্বপ্নের দিকেই এগিয়ে যাওয়া। আর এই স্বপ্নে কারিগর অনুরাগ বসু।

মৌন মুখর এই ছবিটি বানাতে যে প্রবল মানসিক দক্ষতা দরকার হয়, অনুরাগ তা করে দেখিয়েছেন। তাই ছবিটি দেখে তাকে স্যালুট না জানিয়ে কারো উপায় নেই। স্যালুট প্রাপ্য ছবির আরেক পাণ প্রিয়াঙ্কারও। ঝিলমিল চ্যাটার্জি নামে অটিজমে আক্রান্ত মেয়েটি সারা জগতের কাছে অবাঞ্ছিত। এমনকি নেষাগ্রস্ত অবস্থায় তাকে মেরেও ফেলতে চেয়েছিল তার মা। তাই দাদুর কাছেই তার বাস। এ মেয়ের মুখেও অনুরাগ কথা দিয়েছেন খুব কম। পুরো ছবিতেই সামাণ্য কয়েকবার সে বরফিকে ডাকে। দাদুকে ফোন করে আর গান গায় আধখানা। সরল ও শান্ত তার পৃথিবী। সেই পৃথিবীতেই বরফিকে সে আঁকরায়। অবোধ অনুযোগহীন ঝিলমিল সংসারের কাছে অচল। অথচ সে গাড়িতে শুয়ে জঙ্গলের মধ্যে জোনাকি দেখে টিপটিপ। অসামাণ্য এক রুপকথা তৈরি হয়ে যায় সেলুলয়েড জুড়ে। মনে হয় মাথা তুললেই ছাদ নয়, চোখে পড়বে অনন্ত আকাশ।

সিনেমাটোগ্রাফর অনন্ত বর্মনে কাজই বরফির অন্যতম সম্পদ। ঝিলমিল এখনো পর্যন্ত পিয়াঙ্কা চোপড়ার করা জীবনের সেরা অভিনয় চরিত্র। নিস্পাপ মুখের ফিনফিনে ঝিলমিলের কোথাও যেন খুঁজেই পাওয়া যায় না বলিউডের গ্লামারাস পিগি চপসকে। তাই এমন রুপান্তর যে সম্ভব তা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা সত্যিই কষ্টকর।

সেই সঙ্গে খুব মিলেছে প্রিতমের সুর আর আবহ। কলকাতা টালিগঞ্জের বেশ কয়েকজন তারকাকেও পাওয়া গেছে ছবিটিতে। রুপা গাঙ্গুলী, হারাধন বন্দোপাধ্যায়, যিশু সেনগুপ্ত সহ প্রত্যেককেই তার চরিত্রের সঙ্গে বেশ ভালো মানিয়েছে।

No comments:

Post a Comment