সমতল থেকে হাত দুয়েক উঁচু লাল ইটের কবরটির দেয়ালে সাদা সিরামিকের ফলকে কালো কালিতে লেখা- আবদুস সামাদ, ১ এপ্রিল ১৮৯৯- ৯ মে ১৯৬৬।
রাজধানীর আজিমপুর কবরস্থানের এই কবরে মিশে আছে পিতা আবদুস সামাদের জীবনের অবশেষ, এই কবরেই বৃহস্পতিবার বিকেলে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন পুত্র প্রখ্যাত সাংবাদিক ও লেখক আতাউস সামাদ।
নব্বইয়ের দশকে সামরিক স্বৈরশাসক এইচএম এরশাদের আমলে যখন দেশে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ছিলনা- তখন বিবিসি’র বাংলাদেশ সংবাদদাতা হিসেবে তার কণ্ঠস্বরই ছিল গণতান্ত্রিক আন্দোলনের খবর জানতে নিরুপায় মানুষের একমাত্র ভরসা। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও কিডনি জটিলতায় ভুগে বুধবার রাতে রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার অ্যাপোলো হাসপাতালে ইন্তেকাল হয় তার।
তার মৃত্যুতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিরোধী দলীয় নেতা খালেদা জিয়াসহ মন্ত্রিসভার সদস্য, সাংবাদিক সংগঠনগুলো ও নেতৃবৃন্দ এবং বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে শোক প্রকাশ করা হয়েছে। এছাড়া দৈনিক আমার দেশের কারওয়া বাজারস্থ কার্যালয়ে আগামী তিনদিন মরহুমের স্মরণে শোকবই খোলা থাকবে।
সর্বশেষ তিনি দৈনিক আমার দেশ-এর উপদেষ্টা সম্পাদক ছিলেন। এর আগে ১৯৮২ সাল থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত তিনি ঢাকায় বিবিসির সংবাদদাতা হিসেবে কাজ করেন। পরে কিছুকাল তিনি বেসরকারি টেলিভিশন এনটিভি’র প্রধান নির্বাহীর দায়িত্বও পালন করেন। এ ছাড়া দীর্ঘ সময় ধরে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে কাজ করেন।
গত রাতে ইন্তেকালের পর হাসপাতালের হিমঘরে রাখা ছিল তার মরদেহ। বৃহস্পতিবার সকাল ১০টার কিছু পরে পরিবারের সদস্যরা মরদেহ নিয়ে আসেন বারিধারা আবাসিক এলাকার বাড়িতে। জোহরের নামাজ শেষে তার প্রথম জানাজা হয় গুলশানের আজাদ মসজিদে। এতে বিভিন্ন শ্রেণিপেশার হাজারো মানুষ অংশ নেন।
এদিকে জাতীয় প্রেস ক্লাব আঙিনায় তার অপেক্ষায় ছিলেন দীর্ঘদিনের সহকর্মীরাসহ অনুজপ্রতীম সাংবাদিকরা, বেশ কজন মন্ত্রীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিরা। বেলা আড়াইটার দিকে তার মরদেহ বহনকারী হিমগাড়ি প্রবেশ করে প্রেস ক্লাব চত্বরে।
শত শত সাংবাদিকের অংশগ্রহণে দ্বিতীয় জানাজা শেষে বিকেল পৌনে চারটার দিকে শেষ বারের মতো জাতীয় প্রেস ক্লাব আঙিনা ছেড়ে যান আতাউস সামাদ। ক্লাব মিলনায়তনে দ্বিতীয় জানাজা শেষে বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠনের তরফে তার মরদেহে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা জানানো হয়। পরে আলিফ পরিবহনের হিমগাড়িতে তার মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় আজিমপুর কবরস্থানে।
বিকেল সোয়া চারটার একটু আগে যখন আতাউস সামাদের মরদেহ কবরে শুইয়ে দিচ্ছিলেন ছেলে আশিকুস সামাদ ও ভাই আতিকুস সামাদসহ পরিবারের অন্য সদস্যরা, তখন দৈনিক আমার দেশের বার্তা সম্পাদক জাহেদ চৌধুরীসহ তার অন্য শোকার্ত সহকর্মীরা তাদের সাহায্য করছিলেন। শহরের সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকাও এসময় উপস্থিত ছিলেন।
দেশের প্রায় সবকটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলের ক্যামেরার চোখের সামনে যখন শোকার্ত পরিবার-পরিজন, আত্মীয়, সাংবাদিক সহকর্মীরা ধীরে ধীরে মুঠি মুঠি মাটি দিচ্ছিলেন কবরে তখন সবার মুখে নিচু স্বরে- ‘মিনহা খালাকনাকুম, ওয়া ফিহা নুয়িদিকুম, ওয়া মিনহা নুখরিজুকুম তারাতান উখরা’। অর্থাৎ ‘এই (মাটি) থেকেই তোমাদের সৃষ্টি করা হয়েছে, এখানে তোমাদের ফিরে আসতে হবে, এবং এখান থেকেই আরো একবার তোমাদের ফিরিয়ে আনা হবে।’
সেই ফেরার অপেক্ষায় এখন বাবা আবদুস সামাদের কবরের মাটিতে ধীরে ধীরে মিশে যাবেন পুত্র আতাউস সামাদ, কিন্তু বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় সাহস ও কর্মদক্ষতার মাইলফলক হিসেবে তিনি সব সংবাদকর্মীর দিশা হয়ে থাকবেন।
মরহুমের সমকালীন অপর বিখ্যাত সাংবাদিক শফিক রেহমান গতরাতে বার্তা২৪ ডটনেটকে যেমনটি বলছিলেন, ‘‘সাংবাদিকতার যেই ব্যাপারটি অন্য যে কারো থেকে তাকে উঁচুতে নিয়ে গেছে- তা হলো চরম প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও গণতান্ত্রিক প্রচেষ্টা ও মানুষের রাজনৈতিক অধিকারের দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই সংবাদ পরিবেশন করতেন তিনি। বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের এক বার্তাবাহকের দায়িত্ব সাফল্যের সঙ্গে ও নিখুঁতভাবে তিনি পালন করেছেন।’’
সাংবাদিকতায় নিবেদিত এক জীবন
১৯৩৭ সালের ১৬ নভেম্বর ময়মনসিংহে জন্মগ্রহণ করেন আতাউস সামাদ। তার স্ত্রী কামরুন নাহার তথ্য অধিদফরের কর্মকর্তা হিসেবে অবসর নিয়েছেন। তাদের দুই মেয়ে ও এক ছেলে রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে ছাত্রাবস্থায় ফজলুল হক হল ছাত্র সংসদের প্রচার সম্পাদক ছিলেন তিনি। দৈনিক সংবাদে কাজ শুরু করারও আগে ৫০ এর দশকে 'সচিত্র সন্ধানী'তে কাজ শুরুর মাধ্যমে সংবাদমাধ্যম জগতে পা রাখেন তিনি।
পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভের পর ১৯৫৯ সালে দৈনিক সংবাদে পেশাদার সাংবাদিক হিসেবে কাজ শুরু করেন। বিভিন্ন সংবাদপত্র, রেডিও ও টেলিভিশনে কাজ করেছেন তিনি।
সংবাদের পর, আজাদ ও পাকিস্তান অবজার্ভারে কাজ করেন তিনি। ১৯৬৫ সাল থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত পাকিস্তান অবজারভারের প্রধান প্রতিবেদকের দায়িত্ব পালন করেন।
স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সাল থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত ভারতের নয়া দিল্লিতে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) বিশেষ সংবাদদাতা ছিলেন।
১৯৮২’তে যোগ দেন বিবিসিতে। তারপর থেকে জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সামরিক শাসনের সময় তার সাহসী সাংবাদিকতা বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে এক নতুন মাত্রা যোগ করে। এরশাদ-বিরোধী আন্দোলনের সময় তিনি আত্মগোপনে থেকে বিবিসির জন্য খবর পাঠাতেন। বিবিসিতে তার এমনসব বস্তুনিষ্ঠ প্রতিবেদনের জন্য ১৯৮৭ সালে সামরিক সরকার আতাউস সামাদকে কারাবন্দি করেছিল।
১৯৯৫ পর্যন্ত টানা এক যুগেরও বেশি সময়ের কর্মক্ষেত্র বিবিসি ছাড়ার পর সাপ্তাহিক 'এখন' নামে একটি পত্রিকা সম্পাদনা করেন তিনি। একইসঙ্গে নম্বইয়ের দশক থেকেই বিভিন্ন সাপ্তাহিক ও দৈনিকে কলাম লেখা অব্যাহত রেখেছিলেন। এসব কলামেও গণতন্ত্র ও জনকল্যাণের রাজনীতির পথ ধরে জাতীয় ঐক্যের কথাই লিখে আসছিলেন বরেণ্য এই সাংবাদিক।

No comments:
Post a Comment