Pages

Friday, September 28, 2012

আতাউস সামাদ, গণতন্ত্রের বার্তাবাহক ছিলেন যিনি :: জাতীয় :: বার্তা২৪ ডটনেট

আতাউস সামাদ, গণতন্ত্রের বার্তাবাহক ছিলেন যিনি :: জাতীয় :: বার্তা২৪ ডটনেট
 পঁচাত্তর বছর বয়সে বুধবার রাতে ইন্তেকাল হলো বরেণ্য সাংবাদিক ও লেখক আতাউস সামাদের, ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। ১৯৩৭ সালের ১৬ নভেম্বর বৃহত্তর ময়মনসিংহের কিশোরগঞ্জের সাতদরিয়া গ্রামে যেই জীবনের শুরু, বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় এক কিংবদন্তির সাফল্য নিয়ে সেই জীবন-অভিযাত্রার সমাপ্তি ঘটলো।

তার সমকালীন বিখ্যাত সাংবাদিকদের একজন; শফিক রেহমান শোকার্ত কন্ঠে এই প্রতিবেদককে জানালেন, সাংবাদিকতার যেই ব্যাপারটি অন্য যে কারো থেকে তাকে উঁচুতে নিয়ে গেছে- তা হলো চরম প্রতিকূল সব পরিস্থিতিতেও গণতান্ত্রিক প্রচেষ্টা ও মানুষের রাজনৈতিক অধিকারের দৃষ্টিভঙ্গী থেকেই সংবাদ পরিবেশন করতেন তিনি। বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের এক বার্তাবাহকের দায়িত্ব সাফল্যের সঙ্গে ও নিখুঁতভাবে তিনি পালন করেছেন।

বিশেষত, নব্বইয়ের দশকে সামরিক স্বৈরশাসক এইচএম এরশাদের আমলে যখন দেশে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ছিলনা- তখন বিবিসি'র বাংলাদেশ সংবাদদাতা হিসেবে তার কন্ঠস্বরই ছিল গণতান্ত্রিক আন্দোলনের খবর জানতে নিরুপায় মানুষের একমাত্র ভরসা।

লেখক ও সাংবাদিক আবু সাঈদ খান দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন অন্য এক দিকে। তিনি বার্তা২৪ ডটনেটকে বললেন, আতাউস সামাদ হচ্ছেন বাংলাদেশের সেই কমসংখ্যক প্রথিতযশা সাংবাদিকদের একজন- যারা কিনা একইসঙ্গে সংবাদপত্র, বেতার ও টেলিভিশনে নানা উদ্ভাবনী ধারণা নিয়ে কাজ করেছেন।

বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) মহাসচিব শওকত মাহমুদ বললেন, “তিনি থাকবেন না, কিন্তু বাংলাদেশ চলবে-এটি ভাবতে পারি না। তিনি সব সময় তরুণ সাংবাদিকদের পরামর্শ দিতেন। তিনি ছিলেন একজন সফল সাংবাদিক। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের সূচনা তার হাত দিয়েই হয়েছিল। সব মিলিয়ে জাতির অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেল।”

তরুণ লেখক ও দৈনিক সমকালের সহকারি সম্পাদক মাহবুব মোর্শেদ বললেন, ''তিনি যে কোনো লেখালিখির ব্যাপারে খুবই নিখুঁত হতে প্রাধান্য দিতেন। আমাদের এখানে বা যেকোনো জায়গায় কলাম লিখতেন তিনি- সবখানেই পত্রিকা প্রেসে পাঠানোর আগেও দীর্ঘক্ষণ ফোনে বলতেন যে, কিভাবে তার লেখাটিতে আরো ইতিবাচক পরিবর্তন আনা যায়।''

তবে দেশের বিদ্যমান আর্থ-রাজনৈতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে তার সাম্প্রতিক বছরগুলোর কলামে প্রায়ই হতাশা ও আশঙ্কার কথা থাকতো; এমনটি খেয়াল করেছিলেন তরুণ লেখক ও সাংবাদিক খোমেনী ইহসান। দৈনিক আমার দেশ পাঠকমেলার কেন্দ্রীয় পরিচালক জনাব খোমেনী বললেন, ''একজন কনিষ্ঠ সহকর্মী হিসেবে তাকে কাছ থেকে দেখেছি বিগত সাড়ে তিন বছর। সারল্য, বিনয় ও রসবোধের সমন্বয়ে ব্যক্তিত্বের অধিকারী আতাউস সামাদ সাহেবের সাংবাদিক জীবনের যেই মহান সফলতা ও বাংলাদেশের শাসক শ্রেণীর মধ্যে তার যে অবস্থান তৈরি হয়েছিল তা মিলিয়ে তার হতাশ হওয়ার কোন কারণই নেই। কিন্তু স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের একজন অসামান্য সৈনিক হিসেবে তিনি হতাশ হয়ে পড়েছিলেন। তার শেষের দিকের কলামগুলোতে তিনি সেই হতাশাকে চেপে রাখতে পারেন নি। বাংলাদেশের বিরাজমান পরিস্থিতি সব জ্যেষ্ঠ নাগরিককেই হতাশ করে নিশ্চয়।''
 
আতাউস সামাদ তার সাংবাদিকতার সবচেয়ে কর্মমুখর সময়ে; সেই পাকিস্তানি শাসনামল থেকে শুরু করে স্বাধীন বাংলাদেশে সামরিক শাসক এরশাদের স্বৈরশাসনে বিরুপ পরিস্থিতির মধ্যে গণতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গী থেকে প্রতিবেদক ও লেখকের ভূমিকা রেখেছেন বেতার ও সংবাদপত্রে, এমনকি ভিনদেশ ভারতেও এক জরুরি অবস্থার কালে নানা প্রতিকূলতার সময়ে তিনি সাহসী সাংবাদিকতা করেছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে ছাত্রাবস্থায় ফজলুল হক হল ছাত্র সংসদের প্রচার সম্পাদক ছিলেন তিনি। দৈনিক সংবাদে কাজ শুরু করারও আগে ৫০ এর দশকে 'সচিত্র সন্ধানী'তে কাজ শুরু করার মাধ্যমে সংবাদমাধ্যম জগতে পা রাখেন তিনি। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভের পর ১৯৫৯ সালে দৈনিক সংবাদে পেশাদার সাংবাদিক হিসেবে কাজ শুরু করেন। বিভিন্ন সংবাদপত্র, রেডিও ও টেলিভিশনে কাজ করেছেন তিনি।

সংবাদের পর, আজাদ পাকিস্তান অবজার্ভারে কাজ করেন তিনি। ১৯৬৫ সাল থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত পাকিস্তান অবজারভারের প্রধান প্রতিবেদকের দায়িত্ব পালন করেন। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সাল থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত ভারতের নয়া দিল্লিতে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) বিশেষ সংবাদদাতা ছিলেন।

১৯৮২ সাল থেকে টানা এক যুগেরও বেশি সময়ের কর্মক্ষেত্র বিবিসি ছাড়ার পর সাপ্তাহিক 'এখন' নামে একটি পত্রিকা সম্পাদনা করেন তিনি। একইসঙ্গে নম্বইয়ের দশক থেকেই বিভিন্ন সাপ্তাহিক ও দৈনিকে  কলাম লেখা অব্যাহত রেখেছিলেন। এসব কলামেও গণতন্ত্র ও জনকল্যাণের রাজনীতির পথ ধরে জাতীয় ঐক্যের কথাই লিখে আসছিলেন বরেণ্য এই লেখক।

সর্বশেষ গত ২০০৪ সাল থেকে দৈনিক আমার দেশের উপদেষ্টা সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন। পালন করে আসছিলেন বেসরকারি টিভি চ্যানেল এনটিভি'র প্রধান নির্বাহীর দায়িত্ব।

পেশাদার সাংবাদিকই শুধু নন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খন্ডকালীন শিক্ষক হিসেবেও দায়িত্বপালন করেন তিনি। ১৯৬৯ থেকে ৭০ সাল পর্যন্ত তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সাংবাদিক ইউনিয়নের (ইপিইউজে) সাধারণ সম্পাদক ছিলেন, এছাড়া জাতীয় প্রেসক্লাবের আজীবন সদস্য ছিলেন তিনি।

গত বছর বিবিসি'র বাংলা বিভাগের জন্য তিনি লিখেছিলেন তার এই সাংবাদিক জীবনের অভিজ্ঞতার কথা, ''চাপ আর বাধার মধ্যে কাজ করার দুর্ভাগ্য আমার বরাবরের। আমি যখন প্রথম কোন দৈনিক সংবাদপত্রে (সংবাদ) কাজ শুরু করি (১৯৫৯) তখন জেনারেল আইয়ুব খানের সামরিক শাসন চলছিল। ১০ বছর শাসন চালিয়ে আইয়ুব খান যখন বিদায় নিলেন তখন তাঁর জায়গা দখল করলেন আরেক সেনাশাসক জেনারেল ইয়াহিয়া খান। এ লোক তো যুদ্ধ ও গণহত্যা চালিয়ে দিল। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার বিশেষ সংবাদদাতার চাকরি নিয়ে গেলাম ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লী। সেখানে থাকতে থাকতেই মিসেস ইন্দিরা গান্ধী প্রধানমন্ত্রীর গদি রক্ষার জন্য ১৯৭৫-এ জারি করলেন জরুরি অবস্থা। সেই সাথে প্রয়োগ করলেন কঠোর সেন্সরশিপ।''

''১৯৭৬-এর আগস্টে যখন দেশে ফিরলাম তখন এখানে চলছে আবারও সামরিক আইনের শাসন। ১৯৭৯ থেকে ১৯৮২’র মার্চ পর্যন্ত স্বাভাবিক আইনে দেশ চলছিল, একটা নির্বাচিত সরকারও ছিল দেশে কিন্তু সেনাপ্রধান জেনারেল এরশাদ ক্ষমতা দখল করলেন ঐ মাসে এবং সামরিক শাসন জারি করলেন। তিনি দেশের উপর বসে থাকলেন ১৯৯০-এর ডিসেম্বর পর্যন্ত। আর আমি বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিস নিউজ-এর জন্য সংবাদদাতা হিসাবে ঢাকায় কাজ শুরু করি ১৯৮২ সালের অক্টোবর থেকে অর্থাৎ মার্শাল ল’র মধ্যে। অর্থাৎ যুদ্ধ, সেন্সরশিপ, সামরিক শাসন ও অগণতান্ত্রিক জরুরি আইনের শাসনের মধ্যে দিয়ে কেটেছে আমার রিপোর্টার জীবনের প্রায় সবটা সময়।''

বুধবার রাতে রাজধানীর অ্যাপোলো হাসপাতালে রাত নয়টা ২৫ মিনিটে কর্তব্যরত চিকিৎসক জানালেন, আতাউস সামাদ আর নেই। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনির জটিলতায় আক্রান্ত হয়ে গত কদিন ধরে যখন হাসপাতালে এই কিংবদন্তী সাংবাদিক জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে ছিলেন, আরো অনেকের মতো তখন সেখানে বুধবার রাতে ছুটে গিয়েছিলেন তার সমকালের আরেক প্রখ্যাত সাংবাদিক শফিক রেহমান।

নব্বইয়ের দশকে স্বৈরশাসক এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময়ে বিবিসি'র বাংলাদেশ সংবাদদাতা হিসেবে যখন আতাউস সামাদের কন্ঠের অপেক্ষায় থাকতো দেশবাসী, তখন একই সঙ্গে অপেক্ষা ছিল শফিক রেহমান সম্পাদিত সাপ্তাহিক যায়যায়দিনের ।

বুধবার রাতে হাসপাতাল থেকে ফেরার পথে জনাব রেহমান বার্তা২৪ ডটনেটকে বললেন, ''আতাউস সামাদের ব্যাপারে আমি সবকিছুর আগে বলবো শেষ পর্যন্ত তিনি ছিলেন একজন নিখুঁত প্রতিবেদক। একটা গণতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গী থেকে তিনি প্রতিবেদন করতেন, তথ্য ও শৈলীর দিক থেকে সাফল্যের সঙ্গে চেষ্টা করতেন সেই প্রতিবেদনটিকে পূর্ণাঙ্গ করে তুলতে।''

তিনি বলেন, এরশাদের শাসনামলে দেশে আত্মগোপনে থেকেই বিবিসি'র বাংলাদেশ সংবাদদাতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আতাউস সামাদ এদেশে সাহসী সাংবাদিকতার বিরাট নজির তৈরি করেছেন।

শফিক রেহমান বলেন, ''তারওপর আমাদের এখানে যেটা সাংবাদিকদের মধ্যে দুর্লভ, সেই ইংরেজির ওপর চূড়ান্ত দখল ছিল তার। সাংবাদিকতার ভাষা হিসেবে ইংরেজিতে তিনি দক্ষ ছিলেন।''

জনাব রেহমান বললেন, কলাম লেখক হিসেবে বাংলাদেশে এখন খ্যাতিমান প্রায় সবার মতো আতাউস সামাদও শুরু করেছিলেন সাপ্তাহিক যায়যায়দিন দিয়েই। 'এ কালের বয়ান' ও 'আটলান্টিকের দুই তীরে' নামে দুটি কলামে নিয়মিত লিখতেন তিনি।

No comments:

Post a Comment