স্টেফিলোককাস অরেয়াস বা এমআরএসএ এক ধরনের মারাত্মক জীবাণু। ওষুধ বা অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী বলেই এর ভয়াবহতা এত বেশি।
সম্প্রতি নতুন অ্যান্টিবায়োটিক বাজারে এসেছে, যা এই জীবাণু দমনে সক্ষম হবে
বলে আশা করা হচ্ছে। এমআরএসএ বা মাল্টিডরাগ রেজিস্ট্যান্ট জীবাণুর বিরুদ্ধে
লড়াইতে সাধারণ ওষুধপত্র একেবারেই অসহায়। প্রচলিত অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে
কাবু করা যায় না এগুলো।
এই প্রসঙ্গে বন ইউনিভার্সিটি ক্লিনিকের ইমিউনোলজি ও প্যারাসাইটোলজি বিভাগের প্রধান চিকিত্সক অ্যার্নস্ট মলিটর বলেন, এই ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আমাদের অস্ত্রের ভাণ্ডার তেমন পরিপূর্ণ নয়, যেমনটি দেখা যায় অন্যান্য জীবাণুর ক্ষেত্রে। যেসব জীবাণু অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী, তাদের মধ্যে এমআরএসএ অন্যতম। অনেক মানুষই এই জীবাণু বহন করে চলেছে।
ডা. মলিটর জানান, ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ নিশ্চয়তা দিয়ে বলা যায়, এই জীবাণু আমাদের নাকে ও গলবিলে অবস্থান করে। এটা স্বাভাবিক ব্যাপার। দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই। তবে বিষয়টি মারাত্মক হয় তখনই, যখন এই জীবাণু থেকে ক্ষত, ফুসফুসের সংক্রমণ, রক্তদূষণ ইত্যাদির মতো রোগ ব্যাধি দেখা দেয়। সব প্রজাতির এমআরএসএ, মাল্টিড্রাগ রেজিস্ট্যান্ট নয়।
তবে যেসব এমআরএসএ ওষুধ প্রতিরোধী, সেগুলো জড়িত হয়ে পড়লে সমস্যা দেখা দেয়।
পেনিসিলিনের মতো গতানুগতিক অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে অন্যান্য ব্যাকটেরিয়া কাবু
করা গেলেও এগুলোকে আয়ত্তে আনা যায় না।
ডা. মলিটর বলেন, এমআরএসএ’র রয়েছে বিশেষ ধরনের এনজাইম বা উেসচক। তাই এখন পর্যন্ত পাওয়া অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে এই ধরনের জীবাণুকে ধ্বংস করা সহজ নয়। চিকিত্সকরা যখন এই মারাত্মক ধরনের জীবাণুর অস্তিত্ব শনাক্ত করতে পারেন, তখন অনেক দেরি হয়ে যায়।
জার্মানিতে এমআরএসএ’র সংক্রমণে প্রতিবছর কয়েক হাজার রোগী মারা যায়। তিন
ভাগের এক ভাগ সংক্রমণ হাসপাতালের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের কারণে হয়ে থাকে। এই
তথ্য জানা গেছে বিভিন্ন সমীক্ষা থেকে। অন্য দুই ভাগ সংক্রমণ নানা কারণে
হয়ে থাকে, যা এড়ানো সহজ নয়।
অল্প কিছু বিকল্প-অ্যান্টিবায়োটিক এই ভয়ানক জীবাণুটিকে কাবু করতে পারে। তবে প্রায়ই এগুলোর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বিপজ্জনক। এছাড়া এই ওষুধ শরীরের সব জায়গায় একই ধরনের কাজে লাগে না। যেমন কোনো ওষুধ ফুসফুসের সংক্রমণে কাজে লাগলেও গিঁটের সংক্রমণ ভালো করতে ব্যর্থ। তবে সম্প্রতি চিকিত্সকদের মনে আশার আলো জাগিয়েছে একটি ওষুধ। আর তা হলো ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি ‘আস্ট্রাসেনেকার তৈরি ‘সিনফোরো’ নামের অ্যান্টিবায়োটিক। এটি এমআরএসএ জীবাণুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জয়ী হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ডা. মলিটর বলেন, এই পদার্থের ব্যাপারে আমাদের আশা হলো এটি অন্যান্য বিকল্প ওষুধের তুলনায় অনেক কম পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াসম্পন্ন।
আশা করা হচ্ছে, এই অ্যান্টিবায়োটিক জীবাণুর প্রতিরক্ষা শক্তিকে মোকাবিলা করতে এবং এর ভেতরের এনজাইমকে দমন করতে পারবে। ফলে ব্যাকটেরিয়াগুলো আর বিস্তার লাভ করতে পারবে না। তবে নতুন ওষুধও যে এমআরএসএ প্রতিরোধে ধন্বন্তরি তা বলা যায় না।
ডা. মলিটরের ভাষায়, জীবাণুর বিস্তার ও ওষুধ প্রস্তুত করার সম্ভাবনার মধ্যে অনবরত একটা প্রতিযোগিতা চলছে। এটা প্রায় সব ক্ষেত্রেই লক্ষ্য করা যায় যে, কোনো কোনো জীবাণু তার সহযোগীদের তুলনায় কিছুটা শক্তিশালী এবং ওষুধকে পাশ কাটিয়ে টিকে থাকতে সক্ষম। ব্যাকটেরিয়া টিকে থাকার কৌশলী শিল্পী। তারা অতি দ্রুত বিস্তার লাভ করতে পারে এবং নতুন নতুন পরিস্থিতিতে খাপ খাওয়াতে পারে। যত ঘন ঘন তারা মারণঘাতী ওষুধের সম্মুখীন হয়, ততই তারা ফাঁকফোকর খুঁজতে থাকে, হয়ে ওঠে ওষুধ প্রতিরোধী।
ডা. মলিটর জানান, এই মুহূর্তে তেমন নিরাশ হওয়ার কারণ নেই। এমআরএসএ দমনে নতুন ওষুধ আমাদের অতিরিক্ত নিরাপত্তা দিতে পারবে। কাল বা পরশু কেউ এমআরএসএ ব্যাকটেরিয়ায় আক্রান্ত হলে কার্যকর চিকিত্সা করা যাবে। তবে গবেষকদের এমআরএসএ ও অন্যান্য ব্যাকটেরিয়াকে ঘায়েল করতে হলে অনবরত নতুন নতুন অ্যান্টিবায়োটিক তৈরি করে যেতে হবে। কৌশলী ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে লড়াই করতে হলে এটাই একমাত্র উপায়। সূত্র : ডিডব্লিউ
No comments:
Post a Comment