রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ ও ইসলামী ছাত্রশিবির কর্মীদের
মধ্যে ‘সংঘর্ষের’ খবরটি ছিল ০৩ অক্টোবর অধিকাংশ পত্রিকার শীর্ষ সংবাদ।
সংঘর্ষের কারণ হিসেবে বেশিরভাগ পত্রিকা লিখেছে, ‘আধিপত্য বিস্তার’, তবে
বিষয়টি কী তার কোনো ব্যাখ্যা ছিল না। আর সংঘর্ষ শুরুর কারণ হিসাবে একেক
পত্রিকা একে রকম বর্ণনা দিয়েছে। ইত্তেফাক লিখেছে, ‘এক পর্যায়ে
ছাত্রলীগ-ছাত্রশিবির নেতাকর্মীরা শ্লোগান দিলে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।’ কালের
কণ্ঠ বলেছে, ‘... দুই পক্ষের কয়েকজন নেতাকর্মীর মধ্যে টুকিটাকি চত্বরে কথা
কাটাকাটি শুরু হয়। এ থেকে শুরু হয় সংঘর্ষ ও ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া।’ প্রথম
আলো’র বর্ণনা: ‘বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ছাত্রলীগৈর কর্মীরা ভাগ হয়ে
গ্রন্থাগারের দিকে আসতে থাকলে শিবিরের কর্মীরা তাদের লক্ষ্য করে ইটপাটকেল
ছোড়েন। এসময় উভয় পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বেধে যায়।’
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এ ঘটনা প্রকাশের ক্ষেত্রে আমাদের সংবাদমাধ্যমের বস্তুনিষ্ঠতা কিছুটা হলেও যে ‘আহত’ হয়েছে, তা উপরের তিনটি উদ্ধৃতি থেকেই বোঝা যায়। বিশেষ কোনো পক্ষকে ‘বাঁচানোর’র চেষ্টার নাম আর যা-ই হোক, বস্তুনিষ্ঠতা হতে পারে না। শিরোনামের ক্ষেত্রেও পত্রিকাগুলোর গা বাঁচানো মনোভাব লক্ষ্যণীয়। তবে ব্যতিক্রম ছিল আমার দেশ ও কালের কণ্ঠ। তারা ব্যবহৃত ছবির সাথে মানানসই শিরোনাম দিয়ে দায়ী পক্ষটির দিকে সরাসরি আঙ্গুল তোলার বস্তুনিষ্ঠতা রক্ষা করেছে।
এদিন অস্ত্রহাতে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের ‘বীরত্বের’ ছবি সব পত্রিকা ছাপালেও সবচাইতে ব্যতিক্রমী ছবিটি ছাপার কৃতিত্ব দেখিয়েছে নিউ এজ। এতে দেখা যায়, এক ছাত্রলীগ কর্মী শিবিরকর্মীদের ওপর হামলা করছে। তার ডান হাতে অস্ত্র, বাম হাতে লাঠি আর পেছনে পুলিশ। পুলিশ প্রহরায় প্রতিপক্ষের ওপর অস্ত্রবাজির ছবিটি ছাপিয়ে প্রশংসার দাবিদার হয়েছে নিউ এজ।
একই ইস্যুতে শিক্ষামন্ত্রীর ক্ষুব্ধ মন্তব্য ছাপিয়ে প্রশংসনীয় কাজ করেছে ইত্তেফাকও। সিঙ্গল কলামে ছাপা সংবাদটির শিরোনাম ‘রাবির ঘটনায় ক্ষুব্ধ শিক্ষামন্ত্রী: গরীব মানুষের টাকায় বিশ্ববিদ্যালয় চালাই কী বদমাশ তৈরির জন্য’। অন্যান্য পত্রিকা এই নজিরবিহীন মন্তব্যটি ছাপাতে ব্যর্থ হয়েছে। আর শিক্ষামন্ত্রী ব্যর্থ হয়েছেন তার কথিত ‘বদমাশদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে।
পুলিশ প্রহরায় অস্ত্রবাজির ছবি প্রথম দিন ছাপতে না পারলেও পরদিন ০৪ অক্টোবর ‘ক্ষতিপূরণ’ করার চেষ্টা করে প্রথম আলো। এদিন তারা ছোট আকৃতির (তিন কলামে তিনটি) তিনটি ছবি ছাপায়, যাতে দেখা যায়, পুলিশের সামনে আগ্নেয়াস্ত্র থেকে গুলি ছুঁড়ছে ছাত্রলীগকর্মীরা। সঙ্গে ছিল রাজশাহী থেকে পাঠানো আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদের রিপোর্ট: ‘পুলিশের সামনেই অস্ত্র উঁচিয়ে গুলি, তবু গ্রেফতার নেই’।
এছাড়া এই ইস্যুতে ০৪ অক্টোবর আমাদের সময়-এর শীর্ষ সংবাদটি ছিল দর্শণীয়। তারা শিরোনাম দিয়েছে ‘যিনি গুলি ছুঁড়ছেন, তিনিই মামলার বাদি!’ অন্য পত্রিকাগুলো ঘৃণ্য দলবাজির ন্যক্কারজনক এই দিকটি ঠিকমতো ধরতে পারেনি অথবা পাঠককে জানাতে চায়নি।
পরদিন ০৫ অক্টোবর উল্লম্ফনের একটি বিরাট সুযোগ তৈরি করেও নিজে থেকে হোঁচট খায় আমাদের সময়। এদিন সব পত্রিকায় শিক্ষকদের পিটুনির খবর ছাপা হলেও ব্যতিক্রমী দিকটি ধরতে পেরেছিল আমাদের সময়। তারা শিরোনাম দেয় ‘বিশ্ব শিক্ষক দিবসের পূর্বদিনে ঢাকায় পুলিশী আচরণ’। শিক্ষকদেরকে বেধড়ক লাঠিপেটা ও তাদের ওপর টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপের বর্বরোচিত ঘটনাটি বিশ্ব শিক্ষক দিবসের ঠিক আগের দিনই ঘটালো পুলিশ, এই ব্যতিক্রমী দিকটিতে আলোকপাত করতে পেরেছে কেবল আমাদের সময়। কিন্তু এরপরই হোঁচট খেল শিরোনামটি। বলা হলো, ‘পুলিশী আচরণ’। সব পত্রিকা যেখানে লাঠিপেটা, টিয়ারসেল নিক্ষেপ লিখলো, সেখানে এসত্যটি উচ্চারণে দ্বিধান্বিত কেন আমাদের সময়? আর ‘আচরণ’ শব্দের অর্থই বা কী? এটা কি লাঠিপেটার প্রতিশব্দ হতে পারে?
ইত্তেফাক ০৩ অক্টোবর দ্বিতীয় শীর্ষ সংবাদ করে ‘প্রতারণার দায়ে সৌদিতে এরশাদের জেল’। উপশিরোনাম ছিল ‘তিল লাখ রিয়েল জারিমানা দিয়ে মাফ’। প্রথম দর্শনে মনে হবে এটি বুঝি নতুন ঘটনা এবং ইত্তেফাক নিজস্ব অনুসন্ধানের মাধ্যমে খবরটি পেয়েছে। কিন্তু বাস্তবে জেল-জরিমানার কথিত ঘটনাটি ২০০৬ সালের এবং খবরটি ইত্তেফাকের নিজস্ব অনুসন্ধান নয়। দলের চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদের বিরাগভাজন হয়ে দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সংসদের হুইপ পদ হারানোর পর অভিযোগটি করেছেন এইচএম গোলাম রেজা এমপি। এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে আরেক ব্যক্তির অভিযোগকে দ্বিতীয় শীর্ষ সংবাদ করলেও অভিযুক্ত ব্যক্তির (এরশাদ) বক্তব্য ছিল না রিপোর্টটিতে, যা থাকাটা ছিল খবরের বস্তুনিষ্ঠতার দাবি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের খবর পরিবেশনে বস্তুনিষ্ঠতা যদি ‘আহত’ হয়ে থাকে, তবে এক্ষেত্রে তা একেবারে উধাও হয়ে গেছে বলা যেতে পারে।
পর দিন অবশ্য বস্তুনিষ্ঠতা ফিরিয়ে আনার প্রয়াস লক্ষ্য করা যায় পত্রিকাগুলোতে। গণতন্ত্রকে ‘আহত’ করে পুলিশ যে ৭২ ঘণ্টা ধরে প্রধান বিরোধী দল বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় অবরুদ্ধ করে রাখে সে খবরকে ০৪ অক্টোবর শীর্ষ সংবাদ করে আমার দেশ, ইত্তেফাক, সকালের খবর ও বাংলাদেশ প্রতিদিন এবং দ্বিতীয় শীর্ষ স্থানে রাখে প্রথম আলো।
০৩ অক্টোবর কালের কণ্ঠের ১৯ পৃষ্ঠায় ডাবল কলামে প্রকাশিত একটি খবরের শিরোনাম: ‘রাত দেড়টায় মোবাইল ফোনে জানানো হয়, দরজায় বোমা!’ শেরপুর শহরের একটি বাড়িতে এ ঘটনা ঘটে। গৃহকর্তা পুলিশকে খবর দিলে শুরু হয় তোলপাড়। আসে পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও সেনাবাহিনীর বোমাবিশেষজ্ঞরা। এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে তীব্র আতঙ্ক। শেষ পর্যন্ত অবশ্য কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি। শেরপুরের পুলিশ সুপার মো. আনিসুর রহমান ‘জানান’ (নাকি, বলেন?), ‘আতঙ্ক ছড়ানোর জন্যই এমন কাজ করা হয়েছে।’ প্রশ্ন হচ্ছে, দুর্বৃত্তরা আতঙ্ক ছড়ানোর জন্য কুকাজটি করেছে, কিন্তু কালের কণ্ঠ কিজন্য খবরটি ছাপালো, আতঙ্ক ছড়ানোর একটা উপায় জানিয়ে দিতে? সব ঘটনাই ‘খবর’ হতে পারে না- একথা কেন ভুলে যাবে একটি দায়িত্বশীল পত্রিকা? কালের কণ্ঠ ও অন্যান্য পত্রিকার কাছে এ ব্যাপারে আরো সতর্কতাই কাম্য থাকবে পাঠকের।
ফখরুদ্দিন-মইনুদ্দিন সরকারের সময় পাম নিয়ে বেশ হামহুম শুরু হয়েছিল। ভাবখানা, পা গাছ লাগালেই দেশের অর্ধেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। তাদের অব্যাহত প্রপাগাণ্ডার ফলে দেশে পাম চাষে উৎসাহ সৃষ্টি হয়। সেই উৎসাহের গাছে ফল ধরেছে। ০৪ অক্টোবর সেরকম একটি নিউজস্টোরি ছাপায় ইত্তেফাক। ভেতরের পৃষ্ঠায় তিন কলাম রঙিন বক্স করে ছাপানো সচিত্র খবরটির শিরোনাম ‘সাতকানিয়ায় পাম চাষে আগ্রহ বাড়ছে’। কেন বাড়ছে- জানাতে গিয়ে সংবাদদাতা উদ্ধৃতি দিয়েছেন স্থানীয় লোকজনের। তারা বলেন, ‘এখন জেনেছি এর লাভের দিক অনেক।’ সেই ‘লাভের দিক’টির ব্যাখ্যা দিয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বলেছেন, ‘প্রতি পরিবার অন্তত একটি পা গাছ লাগালে তাদের ভোজ্য তেলের চাহিদা অনেকটাই মিটবে।’ এবার দেখা যাক একই দিন একই বিষয়ে কী রিপোর্ট করেছে কালের কণ্ঠ। পত্রিকাটির ‘শিল্প-বাণিজ্য’ পাতায় যশোর থেকে পাঠানো ফখরে আলমের রিপোর্টের শিরোনাম ‘পাম চাষ করে বিপাকে কৃষক’। রিপোর্টে বলা হয়েছে, “রঘুনাথপুর গ্রামের রবিউল ইসলাম দুই বছর আগে এক বিঘা জমিতে পাম চাষ করেন। তিনি জানান, ‘গ্রিন বাংলাদেশ লিমিটেড নামে একটি এনজিওর পরামর্শে ৩০ হাজার টাকা খরচ করে ৩০০টি পাম গাছ লাগান। সে সময় এনজিওর কর্মকর্তারা বলেছিলেন, ফল এলে তারা নায্য মূল্যে তা কিনে নেবেন। প্রয়োজনে প্রসেসিং মেশিন দেওয়া হবে। এ কথা শুনে তিনি পা চাষে খরচ করেন দুই লাখ টাকা। এখন রবিউলের সব পাম গাছে ফল ধরেছে; কিন্তু ওই এনজিওর আর খবর নেই।”
“এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে ঝিকরগাছা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জাহিদুল আলম বলেন, ‘আমি এলাকার সব পাম ক্ষেত পরিদর্শন করেছি। বেশির ভাগ পাম গাছেই ফল ধরেছে। কিন্তু আমরা এ ব্যাপারে কৃষকদের কোনো পরামর্শ দিতে পারছি না! এই ফল কে কিনবে? কোথায় প্রসেসিং হবে? কোন মেশিনে ভাঙলে তেল পাওয়া যাবে? তা আমাদের জানা নেই।”
“কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ যশোরের উপপরিচালক শেখ হেমায়েত হোসেন বলেন, ‘ঝিকরগাছা উপজেলাসহ যশোরের আরো কিছু এলাকায় পাম গাছ রয়েছে। পাম গাছে ফল এসেছে। ফল গাছেই নষ্ট হচ্ছে। আমি নিজে মালয়েশিয়ায় গিয়ে ফল থেকে তেল তৈরির ব্যাপারে কথা বলেছি। সেখানে ৩০টি ধাপে শোধনের পর কারখানা থেকে খাওয়ার উপযোগী তেল তৈরি হয়। ওই কারখানা খুবই ব্যয়বহুল। বাংলাদেশে এ ধরনের কারখানা স্থাপন সম্ভব নয়। কাজেই আমরা পাম চাষে আপাতত কৃষকদের নিরুৎসাহিত করছি।”
০৫ অক্টোবর হুমায়ূন আহমেদের অপ্রকাশিত লেখা ‘লীলাবতীর মৃত্যু’ প্রথম পৃষ্ঠায় ছাপায় কালের কণ্ঠ। লেখাটি নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টির আশঙ্কা থাকলেও সৌভাগ্যক্রমে তা হয়নি। একই দিন কালের কণ্ঠের দ্বিতীয় শীর্ষ সংবাদ ‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়: ছাত্রলীগের ভয়ংকর নেতারা’ ছিল উল্লেখযোগ্য। পাঠক টিভি বিজ্ঞাপনের ভাষায় বলতে পারেন, ‘ভাবতে ভালোই লাগে, দেশ এগিয়ে যাচ্ছে’।
০৬ অক্টোবর সব পত্রিকা একযোগে একটি তথ্যবোমা ফাটায়, রেলের অর্থকেলেঙ্কারি ধরিয়ে দেয়ার নায়ক আলী আজমে সাক্ষাৎকার। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেন বেসরকারি টিভি চ্যানেল আরটিভি’র রিপোর্টার বায়েজিদ আহমদ। সেটি ওই চ্যানেলে প্রচারিত হলে সব পত্রিকা পরদিন সেটিকে শীর্ষ সংবাদ করে। এটা করা হয় দু’ট কারণে। প্রথমত দীর্ঘ দিন আলী আজমের কোনো খোঁজ ছিল না। এর মাধ্যমে জানা গেল তিনি নিখোঁজ থাকলেও নিহত হননি। দ্বিতীয় সাক্ষাৎকারে আলী আজম অনেক চাঞ্চল্যকর কথা বলেছেন। যেমন, ৭৪ লাখ টাকার বস্তাটি মন্ত্রীর (সুরঞ্জিত) বাসাতেই যাচ্ছিল, আগেও কয়েক বার গেছে। মন্ত্রীপুরের টেলিকম ব্যবসার পুঁজি এই ঘুষের টাকা থেকেই দেয়া হয়েছে ইত্যাদি। বেশিরভাগ পত্রিকা খবরটিকে ফলাও করে প্রকাশ করলেও দুই কলামে ছেপেছে প্রথম আলো, নিউজ এজ, সকালের খবর প্রভৃতি। সবচাইতে ভালো ট্রিটমেন্টটি ছিল কালের কণ্ঠের। তারা মূল খবরের পাশাপাশি দু’টি আকর্ষণীয় পার্শ্বসংবাদ ছেপেছে। এবিষয়ে সমকাল-এ খলিলের কার্টুনটিও ছিল মজাদার।
একই দিন প্রথম আলো সম্পাদকীয় পাতায় ছেপেছে বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নিবন্ধ ‘বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক: চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা’। এটি প্রথম ছাপা হয় লন্ডন থেকে প্রকাশিত দ্বিমাসিক জার্নাল ‘স্ট্যাটেজিক অ্যানালাইসিস’-এর সেপ্টেম্বর পাতায়। প্রথম আলো তার বাংলা অনুবাদ ছাপে। অনুবাদটি কার তা জানায়নি প্রথম আলো, তবে অনুবাদটি ছাপিয়ে তারা পাঠককে জানিয়ে দিল, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যেমন অনেক বই লিখেছেন, তেমনি তার প্রতিপক্ষ বেগম খালেদা জিয়াও লেখালেখিতে আছেন, সংখ্যায় কম হলোও।
পরদিন ০৭ সেপ্টেম্বর একটি উল্লেখযোগ্য সাক্ষাৎকার ছেপেছে কালের কণ্ঠ। আরিফুজ্জামান তুহিনকে সাক্ষাৎকারটি দিয়েছেন পটুয়াখালীর আওয়ামী লীগ এমপি গোলাম মওলা রনি। সরকারি দলের এমপি হয়েও সরকারের সমালোচনা করতে পিছপা হন না তিনি। ফলে দেশব্যাপী তার একটা পরিচিতি আছে। তবে কোনো পত্রিকায় তার পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকার সম্ভবত এটিই প্রথম। এতেও নিজ অবস্থানে অটল থেকে নানা কথা বলেছেন, যা সরকার ও তার সমর্থকদের কাছে বিস্বাদ ঠেকতে পারে। যেমন, ‘এই সরকার পদ্মা সেতুর একটি খুঁটিও গাড়তে পারবে না’। ‘সরকার চায় ডিজিটাল বাংলাদেশ আর তার আশপাশের মানুষ হলো এনালগ’, ‘বিশ্বব্যাংকের ফিরে আসা নিয়ে সরকার ভয়াবহ বিব্রত হবে’, ‘চুয়াত্তরে... দুর্ভিক্ষ হয়েছিল বাংলাদেশে, আমরা আবার সেদিকে যাচ্ছি’ ইত্যাদি। সাক্ষাৎকারটির জন্য পাঠকের ধন্যবাদ অবশ্যই পেতে পারে কালের কণ্ঠ। তবে সাক্ষাৎকারদাতা এমপি’র সম্বন্ধেও নানা অভিযোগ পত্রিকায় বিভিন্ন সময় এসেছে। সে-বিষয়ে কোনো প্রশ্ন করা হলো না কেন, এটাও পাঠকের একটা প্রশ্ন হতে পারে।
০৮ অক্টোবর একটি বড়- খবর ছিল বিতর্কিত প্রতিষ্ঠান হলমার্ক গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীর মাহমুদ ও মহাব্যবস্থাপক তুষার আহমেদের গ্রেফতার হওয়া। সব পত্রিকা খবরটিকে ফলাও করে ছাপে। পাশাপাশি প্রথম আলো ছাপে আরেক বিতর্কিত প্রতিষ্ঠান ডেসটিনির কর্তাব্যক্তিদের পালিয়ে যাওয়ার খবর। তানভীর-তুষার গ্রেফতার হলেন হারুন-রফিকুল কোথায়, এ প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই পাঠকের মনে জাগতো। প্রথম আলো রিপোর্টটি করে পাঠকের না-চাওয়া দাবিটি মিটিয়েছে।
একই দিন কালের কণ্ঠের শীর্ষ সংবাদ ছিল ‘রূপালী ব্যাংকেও বড় কেলেঙ্কারি’। আবুল কাশেমের রিপোর্টটি থেকে জানা যায়, এই ব্যাংকটিও এক হাজার কোটিরও বেশি টাকা ঋণ অবৈধভাবে বিতরণ করেছে। এর মধ্যে ৮০১ কোটি টাকা আদায়ের সম্ভাবনা খুবই ক্ষীর্ণ। সরকারি ব্যাংকগুলোতে জনগণের টাকা নিয়ে কী চলছে, তা জেনে পাঠক ‘খুশি’ হতে পারেন। নতুন ঋণকেলেঙ্কারি খবর প্রকাশ করায় ধন্যবাদ পেতে পারে কালের কণ্ঠ।
একই দিন আমার দেশ দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান গোলাম রহমানের একটি ‘মূল্যবান’ বক্তব্য ছেপেছে আমার দেশ। প্রথম পৃষ্ঠায় দুদক চেয়ারম্যানের ছবিসহ সিঙ্গল কলামে ছাপা রিপোর্টে উদ্ধৃত বক্তব্যটি এরকম: ‘রেডিও-টেলিভিশনে প্রকাশিত সংবাদ সত্য হলে কোনো তদন্ত সংস্থার প্রয়োজন হতো না। পিয়ন, চাপরাশি ও ড্রাইভারদের কথায় সব বিচার হতো। এটা হয় না।’ প্রশ্ন হলো, পিয়ন, চাপরাশি ও ড্রাইভারদের সাক্ষ্য এবং সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবর- সবকিছুই কি মূল্যহীন? মিডিয়াগুণীরা এ বিষয়ে কিছু বলবেন কি?
চলতি বছরের নোবেল পুরস্কার ঘোষণা শুরু হয়েছে। এবছর চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল জয় করলেন আমেরিকা ও জাপানের দুই গবেষক। খবরটি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। আজ মঙ্গলবার কয়েকটি পত্রিকা খবরটিকে প্রথম পৃষ্ঠায় স্থান দিলেও শীর্ষস্থানীয় দুয়েকটি পত্রিকা ছাপিয়েছে শেষ পৃষ্ঠায়। এ ট্রিটমেন্ট পাঠককে বিস্মিত করবে বৈকি।
আজকের বেশিরভাগ পত্রিকার শীর্ষ সংবাদ ছিল হলমার্ক গ্রুপের এমডি ও জিএমের রিমান্ড। তবে ব্যতিক্রম ছিল কালের কণ্ঠ। তারা বিসিএস পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে একটি অনুসন্ধানী রিপোর্টকে শীর্ষ সংবাদ করে সৃজনশীলতার স্বাক্ষর রেখেছে। আপেল মাহমুদ ও অভিজিৎ ভট্টাচার্যের করা রিপোর্টটির শিরোনাম ‘বিজি প্রেসে মুখস্থ হয়ে প্রশ্ন ফাঁস, ছাত্রলীগের বাণিজ্য’। এদিন কালের কণ্ঠের আরেকটি রিপোর্টও ছিল মর্মস্পর্শী। ‘ফাঁস করে ফেঁসে গেলেন সিরাজী’ শিরোনামের রিপোর্টটি করেছেন শেখ শাফায়াত হোসেন। হলমার্ক-সোনালী ব্যাংক ঋণকেলেংকারী ফাঁস করে দেয়ার ‘অপরাধে’ সোনালী ব্যাংকের মহাব্যবস্থাপক আ. ন. ম. মাসরুরুল হুদা সিরাজীকে কেমন হেনস্তার শিকার হতে হচ্ছে, তারই বর্ণনা দেয়া হয়েছে রিপোর্টে। পাঠকের অবগতির জন্য এর দুয়েকটি লাইন: গত নয় মাসে তাকে চার বার বদলি করা হয়েছে। এ ঘটনায় ১১টি মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এর প্রায় সব-ক’টিতেই তাকে আসামি করা হয়েছে। অথচ সোনালী ব্যাংকের বিশেষ নিরীক্ষা প্রতিবেদনে তার নামগন্ধও ছিল না।
সৎ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত মানুষটির এহেন দুর্ভোগের খবর ছাপিয়ে কালের কণ্ঠ সবার কৃতজ্ঞতাভাজন হয়েছে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এ ঘটনা প্রকাশের ক্ষেত্রে আমাদের সংবাদমাধ্যমের বস্তুনিষ্ঠতা কিছুটা হলেও যে ‘আহত’ হয়েছে, তা উপরের তিনটি উদ্ধৃতি থেকেই বোঝা যায়। বিশেষ কোনো পক্ষকে ‘বাঁচানোর’র চেষ্টার নাম আর যা-ই হোক, বস্তুনিষ্ঠতা হতে পারে না। শিরোনামের ক্ষেত্রেও পত্রিকাগুলোর গা বাঁচানো মনোভাব লক্ষ্যণীয়। তবে ব্যতিক্রম ছিল আমার দেশ ও কালের কণ্ঠ। তারা ব্যবহৃত ছবির সাথে মানানসই শিরোনাম দিয়ে দায়ী পক্ষটির দিকে সরাসরি আঙ্গুল তোলার বস্তুনিষ্ঠতা রক্ষা করেছে।
এদিন অস্ত্রহাতে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের ‘বীরত্বের’ ছবি সব পত্রিকা ছাপালেও সবচাইতে ব্যতিক্রমী ছবিটি ছাপার কৃতিত্ব দেখিয়েছে নিউ এজ। এতে দেখা যায়, এক ছাত্রলীগ কর্মী শিবিরকর্মীদের ওপর হামলা করছে। তার ডান হাতে অস্ত্র, বাম হাতে লাঠি আর পেছনে পুলিশ। পুলিশ প্রহরায় প্রতিপক্ষের ওপর অস্ত্রবাজির ছবিটি ছাপিয়ে প্রশংসার দাবিদার হয়েছে নিউ এজ।
একই ইস্যুতে শিক্ষামন্ত্রীর ক্ষুব্ধ মন্তব্য ছাপিয়ে প্রশংসনীয় কাজ করেছে ইত্তেফাকও। সিঙ্গল কলামে ছাপা সংবাদটির শিরোনাম ‘রাবির ঘটনায় ক্ষুব্ধ শিক্ষামন্ত্রী: গরীব মানুষের টাকায় বিশ্ববিদ্যালয় চালাই কী বদমাশ তৈরির জন্য’। অন্যান্য পত্রিকা এই নজিরবিহীন মন্তব্যটি ছাপাতে ব্যর্থ হয়েছে। আর শিক্ষামন্ত্রী ব্যর্থ হয়েছেন তার কথিত ‘বদমাশদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে।
পুলিশ প্রহরায় অস্ত্রবাজির ছবি প্রথম দিন ছাপতে না পারলেও পরদিন ০৪ অক্টোবর ‘ক্ষতিপূরণ’ করার চেষ্টা করে প্রথম আলো। এদিন তারা ছোট আকৃতির (তিন কলামে তিনটি) তিনটি ছবি ছাপায়, যাতে দেখা যায়, পুলিশের সামনে আগ্নেয়াস্ত্র থেকে গুলি ছুঁড়ছে ছাত্রলীগকর্মীরা। সঙ্গে ছিল রাজশাহী থেকে পাঠানো আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদের রিপোর্ট: ‘পুলিশের সামনেই অস্ত্র উঁচিয়ে গুলি, তবু গ্রেফতার নেই’।
এছাড়া এই ইস্যুতে ০৪ অক্টোবর আমাদের সময়-এর শীর্ষ সংবাদটি ছিল দর্শণীয়। তারা শিরোনাম দিয়েছে ‘যিনি গুলি ছুঁড়ছেন, তিনিই মামলার বাদি!’ অন্য পত্রিকাগুলো ঘৃণ্য দলবাজির ন্যক্কারজনক এই দিকটি ঠিকমতো ধরতে পারেনি অথবা পাঠককে জানাতে চায়নি।
পরদিন ০৫ অক্টোবর উল্লম্ফনের একটি বিরাট সুযোগ তৈরি করেও নিজে থেকে হোঁচট খায় আমাদের সময়। এদিন সব পত্রিকায় শিক্ষকদের পিটুনির খবর ছাপা হলেও ব্যতিক্রমী দিকটি ধরতে পেরেছিল আমাদের সময়। তারা শিরোনাম দেয় ‘বিশ্ব শিক্ষক দিবসের পূর্বদিনে ঢাকায় পুলিশী আচরণ’। শিক্ষকদেরকে বেধড়ক লাঠিপেটা ও তাদের ওপর টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপের বর্বরোচিত ঘটনাটি বিশ্ব শিক্ষক দিবসের ঠিক আগের দিনই ঘটালো পুলিশ, এই ব্যতিক্রমী দিকটিতে আলোকপাত করতে পেরেছে কেবল আমাদের সময়। কিন্তু এরপরই হোঁচট খেল শিরোনামটি। বলা হলো, ‘পুলিশী আচরণ’। সব পত্রিকা যেখানে লাঠিপেটা, টিয়ারসেল নিক্ষেপ লিখলো, সেখানে এসত্যটি উচ্চারণে দ্বিধান্বিত কেন আমাদের সময়? আর ‘আচরণ’ শব্দের অর্থই বা কী? এটা কি লাঠিপেটার প্রতিশব্দ হতে পারে?
ইত্তেফাক ০৩ অক্টোবর দ্বিতীয় শীর্ষ সংবাদ করে ‘প্রতারণার দায়ে সৌদিতে এরশাদের জেল’। উপশিরোনাম ছিল ‘তিল লাখ রিয়েল জারিমানা দিয়ে মাফ’। প্রথম দর্শনে মনে হবে এটি বুঝি নতুন ঘটনা এবং ইত্তেফাক নিজস্ব অনুসন্ধানের মাধ্যমে খবরটি পেয়েছে। কিন্তু বাস্তবে জেল-জরিমানার কথিত ঘটনাটি ২০০৬ সালের এবং খবরটি ইত্তেফাকের নিজস্ব অনুসন্ধান নয়। দলের চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদের বিরাগভাজন হয়ে দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সংসদের হুইপ পদ হারানোর পর অভিযোগটি করেছেন এইচএম গোলাম রেজা এমপি। এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে আরেক ব্যক্তির অভিযোগকে দ্বিতীয় শীর্ষ সংবাদ করলেও অভিযুক্ত ব্যক্তির (এরশাদ) বক্তব্য ছিল না রিপোর্টটিতে, যা থাকাটা ছিল খবরের বস্তুনিষ্ঠতার দাবি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের খবর পরিবেশনে বস্তুনিষ্ঠতা যদি ‘আহত’ হয়ে থাকে, তবে এক্ষেত্রে তা একেবারে উধাও হয়ে গেছে বলা যেতে পারে।
পর দিন অবশ্য বস্তুনিষ্ঠতা ফিরিয়ে আনার প্রয়াস লক্ষ্য করা যায় পত্রিকাগুলোতে। গণতন্ত্রকে ‘আহত’ করে পুলিশ যে ৭২ ঘণ্টা ধরে প্রধান বিরোধী দল বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় অবরুদ্ধ করে রাখে সে খবরকে ০৪ অক্টোবর শীর্ষ সংবাদ করে আমার দেশ, ইত্তেফাক, সকালের খবর ও বাংলাদেশ প্রতিদিন এবং দ্বিতীয় শীর্ষ স্থানে রাখে প্রথম আলো।
০৩ অক্টোবর কালের কণ্ঠের ১৯ পৃষ্ঠায় ডাবল কলামে প্রকাশিত একটি খবরের শিরোনাম: ‘রাত দেড়টায় মোবাইল ফোনে জানানো হয়, দরজায় বোমা!’ শেরপুর শহরের একটি বাড়িতে এ ঘটনা ঘটে। গৃহকর্তা পুলিশকে খবর দিলে শুরু হয় তোলপাড়। আসে পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও সেনাবাহিনীর বোমাবিশেষজ্ঞরা। এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে তীব্র আতঙ্ক। শেষ পর্যন্ত অবশ্য কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি। শেরপুরের পুলিশ সুপার মো. আনিসুর রহমান ‘জানান’ (নাকি, বলেন?), ‘আতঙ্ক ছড়ানোর জন্যই এমন কাজ করা হয়েছে।’ প্রশ্ন হচ্ছে, দুর্বৃত্তরা আতঙ্ক ছড়ানোর জন্য কুকাজটি করেছে, কিন্তু কালের কণ্ঠ কিজন্য খবরটি ছাপালো, আতঙ্ক ছড়ানোর একটা উপায় জানিয়ে দিতে? সব ঘটনাই ‘খবর’ হতে পারে না- একথা কেন ভুলে যাবে একটি দায়িত্বশীল পত্রিকা? কালের কণ্ঠ ও অন্যান্য পত্রিকার কাছে এ ব্যাপারে আরো সতর্কতাই কাম্য থাকবে পাঠকের।
ফখরুদ্দিন-মইনুদ্দিন সরকারের সময় পাম নিয়ে বেশ হামহুম শুরু হয়েছিল। ভাবখানা, পা গাছ লাগালেই দেশের অর্ধেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। তাদের অব্যাহত প্রপাগাণ্ডার ফলে দেশে পাম চাষে উৎসাহ সৃষ্টি হয়। সেই উৎসাহের গাছে ফল ধরেছে। ০৪ অক্টোবর সেরকম একটি নিউজস্টোরি ছাপায় ইত্তেফাক। ভেতরের পৃষ্ঠায় তিন কলাম রঙিন বক্স করে ছাপানো সচিত্র খবরটির শিরোনাম ‘সাতকানিয়ায় পাম চাষে আগ্রহ বাড়ছে’। কেন বাড়ছে- জানাতে গিয়ে সংবাদদাতা উদ্ধৃতি দিয়েছেন স্থানীয় লোকজনের। তারা বলেন, ‘এখন জেনেছি এর লাভের দিক অনেক।’ সেই ‘লাভের দিক’টির ব্যাখ্যা দিয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বলেছেন, ‘প্রতি পরিবার অন্তত একটি পা গাছ লাগালে তাদের ভোজ্য তেলের চাহিদা অনেকটাই মিটবে।’ এবার দেখা যাক একই দিন একই বিষয়ে কী রিপোর্ট করেছে কালের কণ্ঠ। পত্রিকাটির ‘শিল্প-বাণিজ্য’ পাতায় যশোর থেকে পাঠানো ফখরে আলমের রিপোর্টের শিরোনাম ‘পাম চাষ করে বিপাকে কৃষক’। রিপোর্টে বলা হয়েছে, “রঘুনাথপুর গ্রামের রবিউল ইসলাম দুই বছর আগে এক বিঘা জমিতে পাম চাষ করেন। তিনি জানান, ‘গ্রিন বাংলাদেশ লিমিটেড নামে একটি এনজিওর পরামর্শে ৩০ হাজার টাকা খরচ করে ৩০০টি পাম গাছ লাগান। সে সময় এনজিওর কর্মকর্তারা বলেছিলেন, ফল এলে তারা নায্য মূল্যে তা কিনে নেবেন। প্রয়োজনে প্রসেসিং মেশিন দেওয়া হবে। এ কথা শুনে তিনি পা চাষে খরচ করেন দুই লাখ টাকা। এখন রবিউলের সব পাম গাছে ফল ধরেছে; কিন্তু ওই এনজিওর আর খবর নেই।”
“এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে ঝিকরগাছা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জাহিদুল আলম বলেন, ‘আমি এলাকার সব পাম ক্ষেত পরিদর্শন করেছি। বেশির ভাগ পাম গাছেই ফল ধরেছে। কিন্তু আমরা এ ব্যাপারে কৃষকদের কোনো পরামর্শ দিতে পারছি না! এই ফল কে কিনবে? কোথায় প্রসেসিং হবে? কোন মেশিনে ভাঙলে তেল পাওয়া যাবে? তা আমাদের জানা নেই।”
“কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ যশোরের উপপরিচালক শেখ হেমায়েত হোসেন বলেন, ‘ঝিকরগাছা উপজেলাসহ যশোরের আরো কিছু এলাকায় পাম গাছ রয়েছে। পাম গাছে ফল এসেছে। ফল গাছেই নষ্ট হচ্ছে। আমি নিজে মালয়েশিয়ায় গিয়ে ফল থেকে তেল তৈরির ব্যাপারে কথা বলেছি। সেখানে ৩০টি ধাপে শোধনের পর কারখানা থেকে খাওয়ার উপযোগী তেল তৈরি হয়। ওই কারখানা খুবই ব্যয়বহুল। বাংলাদেশে এ ধরনের কারখানা স্থাপন সম্ভব নয়। কাজেই আমরা পাম চাষে আপাতত কৃষকদের নিরুৎসাহিত করছি।”
০৫ অক্টোবর হুমায়ূন আহমেদের অপ্রকাশিত লেখা ‘লীলাবতীর মৃত্যু’ প্রথম পৃষ্ঠায় ছাপায় কালের কণ্ঠ। লেখাটি নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টির আশঙ্কা থাকলেও সৌভাগ্যক্রমে তা হয়নি। একই দিন কালের কণ্ঠের দ্বিতীয় শীর্ষ সংবাদ ‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়: ছাত্রলীগের ভয়ংকর নেতারা’ ছিল উল্লেখযোগ্য। পাঠক টিভি বিজ্ঞাপনের ভাষায় বলতে পারেন, ‘ভাবতে ভালোই লাগে, দেশ এগিয়ে যাচ্ছে’।
০৬ অক্টোবর সব পত্রিকা একযোগে একটি তথ্যবোমা ফাটায়, রেলের অর্থকেলেঙ্কারি ধরিয়ে দেয়ার নায়ক আলী আজমে সাক্ষাৎকার। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেন বেসরকারি টিভি চ্যানেল আরটিভি’র রিপোর্টার বায়েজিদ আহমদ। সেটি ওই চ্যানেলে প্রচারিত হলে সব পত্রিকা পরদিন সেটিকে শীর্ষ সংবাদ করে। এটা করা হয় দু’ট কারণে। প্রথমত দীর্ঘ দিন আলী আজমের কোনো খোঁজ ছিল না। এর মাধ্যমে জানা গেল তিনি নিখোঁজ থাকলেও নিহত হননি। দ্বিতীয় সাক্ষাৎকারে আলী আজম অনেক চাঞ্চল্যকর কথা বলেছেন। যেমন, ৭৪ লাখ টাকার বস্তাটি মন্ত্রীর (সুরঞ্জিত) বাসাতেই যাচ্ছিল, আগেও কয়েক বার গেছে। মন্ত্রীপুরের টেলিকম ব্যবসার পুঁজি এই ঘুষের টাকা থেকেই দেয়া হয়েছে ইত্যাদি। বেশিরভাগ পত্রিকা খবরটিকে ফলাও করে প্রকাশ করলেও দুই কলামে ছেপেছে প্রথম আলো, নিউজ এজ, সকালের খবর প্রভৃতি। সবচাইতে ভালো ট্রিটমেন্টটি ছিল কালের কণ্ঠের। তারা মূল খবরের পাশাপাশি দু’টি আকর্ষণীয় পার্শ্বসংবাদ ছেপেছে। এবিষয়ে সমকাল-এ খলিলের কার্টুনটিও ছিল মজাদার।
একই দিন প্রথম আলো সম্পাদকীয় পাতায় ছেপেছে বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নিবন্ধ ‘বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক: চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা’। এটি প্রথম ছাপা হয় লন্ডন থেকে প্রকাশিত দ্বিমাসিক জার্নাল ‘স্ট্যাটেজিক অ্যানালাইসিস’-এর সেপ্টেম্বর পাতায়। প্রথম আলো তার বাংলা অনুবাদ ছাপে। অনুবাদটি কার তা জানায়নি প্রথম আলো, তবে অনুবাদটি ছাপিয়ে তারা পাঠককে জানিয়ে দিল, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যেমন অনেক বই লিখেছেন, তেমনি তার প্রতিপক্ষ বেগম খালেদা জিয়াও লেখালেখিতে আছেন, সংখ্যায় কম হলোও।
পরদিন ০৭ সেপ্টেম্বর একটি উল্লেখযোগ্য সাক্ষাৎকার ছেপেছে কালের কণ্ঠ। আরিফুজ্জামান তুহিনকে সাক্ষাৎকারটি দিয়েছেন পটুয়াখালীর আওয়ামী লীগ এমপি গোলাম মওলা রনি। সরকারি দলের এমপি হয়েও সরকারের সমালোচনা করতে পিছপা হন না তিনি। ফলে দেশব্যাপী তার একটা পরিচিতি আছে। তবে কোনো পত্রিকায় তার পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকার সম্ভবত এটিই প্রথম। এতেও নিজ অবস্থানে অটল থেকে নানা কথা বলেছেন, যা সরকার ও তার সমর্থকদের কাছে বিস্বাদ ঠেকতে পারে। যেমন, ‘এই সরকার পদ্মা সেতুর একটি খুঁটিও গাড়তে পারবে না’। ‘সরকার চায় ডিজিটাল বাংলাদেশ আর তার আশপাশের মানুষ হলো এনালগ’, ‘বিশ্বব্যাংকের ফিরে আসা নিয়ে সরকার ভয়াবহ বিব্রত হবে’, ‘চুয়াত্তরে... দুর্ভিক্ষ হয়েছিল বাংলাদেশে, আমরা আবার সেদিকে যাচ্ছি’ ইত্যাদি। সাক্ষাৎকারটির জন্য পাঠকের ধন্যবাদ অবশ্যই পেতে পারে কালের কণ্ঠ। তবে সাক্ষাৎকারদাতা এমপি’র সম্বন্ধেও নানা অভিযোগ পত্রিকায় বিভিন্ন সময় এসেছে। সে-বিষয়ে কোনো প্রশ্ন করা হলো না কেন, এটাও পাঠকের একটা প্রশ্ন হতে পারে।
০৮ অক্টোবর একটি বড়- খবর ছিল বিতর্কিত প্রতিষ্ঠান হলমার্ক গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীর মাহমুদ ও মহাব্যবস্থাপক তুষার আহমেদের গ্রেফতার হওয়া। সব পত্রিকা খবরটিকে ফলাও করে ছাপে। পাশাপাশি প্রথম আলো ছাপে আরেক বিতর্কিত প্রতিষ্ঠান ডেসটিনির কর্তাব্যক্তিদের পালিয়ে যাওয়ার খবর। তানভীর-তুষার গ্রেফতার হলেন হারুন-রফিকুল কোথায়, এ প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই পাঠকের মনে জাগতো। প্রথম আলো রিপোর্টটি করে পাঠকের না-চাওয়া দাবিটি মিটিয়েছে।
একই দিন কালের কণ্ঠের শীর্ষ সংবাদ ছিল ‘রূপালী ব্যাংকেও বড় কেলেঙ্কারি’। আবুল কাশেমের রিপোর্টটি থেকে জানা যায়, এই ব্যাংকটিও এক হাজার কোটিরও বেশি টাকা ঋণ অবৈধভাবে বিতরণ করেছে। এর মধ্যে ৮০১ কোটি টাকা আদায়ের সম্ভাবনা খুবই ক্ষীর্ণ। সরকারি ব্যাংকগুলোতে জনগণের টাকা নিয়ে কী চলছে, তা জেনে পাঠক ‘খুশি’ হতে পারেন। নতুন ঋণকেলেঙ্কারি খবর প্রকাশ করায় ধন্যবাদ পেতে পারে কালের কণ্ঠ।
একই দিন আমার দেশ দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান গোলাম রহমানের একটি ‘মূল্যবান’ বক্তব্য ছেপেছে আমার দেশ। প্রথম পৃষ্ঠায় দুদক চেয়ারম্যানের ছবিসহ সিঙ্গল কলামে ছাপা রিপোর্টে উদ্ধৃত বক্তব্যটি এরকম: ‘রেডিও-টেলিভিশনে প্রকাশিত সংবাদ সত্য হলে কোনো তদন্ত সংস্থার প্রয়োজন হতো না। পিয়ন, চাপরাশি ও ড্রাইভারদের কথায় সব বিচার হতো। এটা হয় না।’ প্রশ্ন হলো, পিয়ন, চাপরাশি ও ড্রাইভারদের সাক্ষ্য এবং সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবর- সবকিছুই কি মূল্যহীন? মিডিয়াগুণীরা এ বিষয়ে কিছু বলবেন কি?
চলতি বছরের নোবেল পুরস্কার ঘোষণা শুরু হয়েছে। এবছর চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল জয় করলেন আমেরিকা ও জাপানের দুই গবেষক। খবরটি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। আজ মঙ্গলবার কয়েকটি পত্রিকা খবরটিকে প্রথম পৃষ্ঠায় স্থান দিলেও শীর্ষস্থানীয় দুয়েকটি পত্রিকা ছাপিয়েছে শেষ পৃষ্ঠায়। এ ট্রিটমেন্ট পাঠককে বিস্মিত করবে বৈকি।
আজকের বেশিরভাগ পত্রিকার শীর্ষ সংবাদ ছিল হলমার্ক গ্রুপের এমডি ও জিএমের রিমান্ড। তবে ব্যতিক্রম ছিল কালের কণ্ঠ। তারা বিসিএস পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে একটি অনুসন্ধানী রিপোর্টকে শীর্ষ সংবাদ করে সৃজনশীলতার স্বাক্ষর রেখেছে। আপেল মাহমুদ ও অভিজিৎ ভট্টাচার্যের করা রিপোর্টটির শিরোনাম ‘বিজি প্রেসে মুখস্থ হয়ে প্রশ্ন ফাঁস, ছাত্রলীগের বাণিজ্য’। এদিন কালের কণ্ঠের আরেকটি রিপোর্টও ছিল মর্মস্পর্শী। ‘ফাঁস করে ফেঁসে গেলেন সিরাজী’ শিরোনামের রিপোর্টটি করেছেন শেখ শাফায়াত হোসেন। হলমার্ক-সোনালী ব্যাংক ঋণকেলেংকারী ফাঁস করে দেয়ার ‘অপরাধে’ সোনালী ব্যাংকের মহাব্যবস্থাপক আ. ন. ম. মাসরুরুল হুদা সিরাজীকে কেমন হেনস্তার শিকার হতে হচ্ছে, তারই বর্ণনা দেয়া হয়েছে রিপোর্টে। পাঠকের অবগতির জন্য এর দুয়েকটি লাইন: গত নয় মাসে তাকে চার বার বদলি করা হয়েছে। এ ঘটনায় ১১টি মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এর প্রায় সব-ক’টিতেই তাকে আসামি করা হয়েছে। অথচ সোনালী ব্যাংকের বিশেষ নিরীক্ষা প্রতিবেদনে তার নামগন্ধও ছিল না।
সৎ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত মানুষটির এহেন দুর্ভোগের খবর ছাপিয়ে কালের কণ্ঠ সবার কৃতজ্ঞতাভাজন হয়েছে।
No comments:
Post a Comment